×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

তাজউদ্দীন আহমদ : স্বর্ণহৃদয় মানব

Icon

ড. এম এ মোমেন

প্রকাশ: ১১ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 তাজউদ্দীন আহমদ : স্বর্ণহৃদয় মানব
(২য় কিস্তি) জীবিত বিশিষ্ট আমলাদের মধ্যে সর্বাধিক বয়োজ্যেষ্ঠ নিঃসন্দেহে মোহাম্মদ মতিউল ইসলাম, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অর্থ সচিব। ইংরেজিতে লিখিত তার স্মৃতিকথা ‘রিকালেকশনস অব অ্যা সিভিল সার্ভেন্ট টার্নড ব্যাংকার’-এর একটি অধ্যায়ে স্বাধীন বাংলাদেশের রয়েছেন প্রথম অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। তার রচনা থেকেই অনুসৃত ‘তাজউদ্দীন আহমদ : স্বর্ণহৃদয় মানব’। তাজউদ্দীন আহমদের যে বৈশিষ্ট্য তাকে আমাদের প্রিয় করে তুলেছে সেটি হচ্ছে মানবিক গুণ। ১৯৭২ সালে অর্থমন্ত্রীদের কমনওয়েলথ বৈঠকে আমাদের লন্ডন অবস্থানকালে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাইরুল কবির আমার কাছে প্রস্তাব করলেন যেহেতু ব্রিটেন প্রবাসী আয়ে বাংলাদেশিদের কারণে বৈদেশিক মুদ্রা লাভের একটি উত্তম উৎস- এই প্রবাসী আয় লাভের সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে একটি সমীক্ষা হওয়া উচিত, একই সঙ্গে তিনি আইসিবির প্রধান মুমতাজ ইকবালকে এ কাজের দায়িত্ব দেয়ার অনুরোধ জানালেন, সে সময় স্ত্রীর চিকিৎসাজনিত কারণে তিনি লন্ডন অবস্থান করছিলেন, এটা আমি জানতাম। অর্থমন্ত্রী যদি অনুমোদন করেন এ প্রস্তাবে আমার সম্মতি আছে তাকে জানিয়ে দিলাম। কমনওয়েলথ অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলন শেষ হওয়ার পর আমার যখন লন্ডন এয়ারপোর্টের পিকক লাউঞ্জে প্যান অ্যামের ‘অল ফার্স্ট ক্লাস প্যাসেঞ্জার ফ্লাইট’ ধরার প্রস্তুতি নিচ্ছি, এই সমীক্ষাটি চালানোর জন্য ইকবালের নাম প্রস্তাব করে একটি আবেদন তৈরি করে তাতে অনুমোদন নেয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে খাইরুল কবির চলে এলেন। তিনি যখন নিশ্চিত করলেন যে অর্থমন্ত্রীর মৌখিক অনুমোদন নিয়েছেন, আমি আমার স্বাভাবিক কর্মপদ্ধতি অনুযায়ী আবেদনপত্রের মার্জিনে লিখলাম, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই সমীক্ষার জন্য মুজতাজ ইকবালের নামে ৫০০ পাউন্ড বরাদ্দ করা হলো। উড়োজাহাজে বিষয়টি আমি মন্ত্রীকে বললে তিনি সম্মতি জানালেন। দুই বছর পর ১৯৭৪ সালে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক বৈঠকে যোগ দিতে তাজউদ্দীন তখন ওয়াশিংটনে। আমার পোস্টিংও তখন বিশ্বব্যাংকে, বিকল্প নির্বাহী পরিচালক। তিনি তার স্বাভাবিক উষ্ণতা দিয়ে আমাকে সম্ভাষণ জানালেন। তারপর হঠাৎ অপ্রাসঙ্গিকভাবে বলে উঠলেন নিশ্চয়ই আমি ঢাকায় অনেক ভালো বন্ধু রেখে এসেছি। আমি এক বছর আগে ঢাকা ছেড়েছি। তিনি তির্যকসূত্রে কী বলতে চেয়েছেন আমি বুঝতে পারিনি। পরে তিনি যা বললেন তা আমার জন্য অবিশ্বাস্য। যে কাগজটিতে আমি ৫০০ পাউন্ড সম্মানীর বিনিময়ে যুক্তরাজ্যবাসীর বৈদেশিক আয়ের অর্থ দেশে পাঠানো নিয়ে সমীক্ষার জন্য মুমতাজ ইকবালকে অনুমোদন দিয়েছি, আমাদের ওয়াশিংটন সফরের সময় মন্ত্রীর অনুমোদন নিয়েছি, সেই কাগজটি সংগ্রহ করে দুর্নীতি দমন বিভাগের প্রধান আমার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করতে মন্ত্রীর অনুমোদন গ্রহণ করতে এসেছেন। কারণ আমি মন্ত্রীর অনুমোদনের কথা বলে মিথ্যাচার করে অর্থমন্ত্রীকে জড়িয়ে আমার বন্ধুকে লাভবান করেছি, বাস্তবে মন্ত্রীর সঙ্গে আমার এ ধরনের কোনো আলোচনা হয়নি এবং প্রস্তাবিত নিয়োগ মন্ত্রী অনুমোদন করেননি। হতবাক হয়ে আমি শুনছিলাম, তারপর মন্ত্রী কী বলবেন। তাজউদ্দীন জানালেন তিনি রেগে দুর্নীতি দমন বিভাগের প্রধানকে এই বলে তার রুম থেকে বের করে দিলেন যে, যদি এই অভিযোগটি এখনই বাতিল না করেন তাহলে ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে বলে তারই বরখাস্তের ব্যবস্থা করবেন। প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারি কর্মচারীর জবাবদিহিতা সম্পর্কে তার ধারণার বিষয়টি আমি অবহিত, তাজউদ্দীনের কাছ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি টেলিফোন কলই যে দুর্নীতি দমন প্রধানের কর্মজীবন শেষ করার জন্য যথেষ্ট ছিল সম্ভবত তিনি তা বোঝেননি, তার টিকে থাকার জন্য তাজউদ্দীনের উদারতার কাছেই তিনি ঋণী। সে রাতে একা একা গাড়ি চালিয়ে যখন ফিরছিলাম, কাহিনিটি মনে করে আমি আঁতকে উঠি। আল্লাহকে শুকরিয়া জানাই, তাজউদ্দীন আহমদ আমার মন্ত্রী ছিলেন। তাজউদ্দীন দুর্লভ প্রজাতির প্রয়োগিক নেতা আমরা আগন্তুক হিসেবে শুরু করেছিলাম, শেষ করেছি ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে। ১৯৭১-এর স্বাধীনতা-উত্তর ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকারের জন্য ছিল একটা কঠিন সময়; ২২ ডিসেম্বর তা ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ, চারদিকে অনিশ্চয়তা, অরাজক অবস্থা। এ পরিস্থিতি বদলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দরকার নিপুণ ও প্রয়োগিক নেতৃত্ব। তখন ঢাকায় ছিলেন মুজিবনগর থেকে প্রত্যাগত লোকজন, অতি উচ্চাশা তাদের, অভিজ্ঞতা অতি সামান্য; নব জন্মলব্ধ দেশের বড় বড় গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হতে তাদের অনেকেরই চোখ টাটাচ্ছে; তাদের অনেকে সরকারি পদ ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন এবং অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকারি কর্মকতারাও ছিলেন, যারা দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ করা পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান সরকারের অধীনে চাকরি অব্যাহত রেখেছেন। আর মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সচিবালয়ে তাদের উদ্দেশে বক্তৃতা করতে আসছেন। যারা কখনো তাদের পদ ছেড়ে যাননি, যারা পাকিস্তান সরকারের চাকরি ছেড়ে যাননি, তিনি কি তাদের সবাইকে চাকরি থেকে বের করে দেবেন? তিনি কি নতুন করে শুরু করবেন? আশঙ্কা ছিল, উদ্বেগ ছিল। তাজউদ্দীন সব আশঙ্কা নস্যাৎ করে দিলেন। কোনো বিদ্বেষ নেই, শাস্তির কোনো হুমকি নেই, কোনো গণচাকরিচ্যুতি নেই; কিন্তু একটি টিম হিসেবে একান্তভাবে কাজ করার আহ্বান রয়েছে, নতুন জাতিকে সোনার বাংলা গড়ে তুলতে নিবেদিত হতে হবে, পাকিস্তানের লায়লপুর জেলে এখনো কারাবন্দি শেখ মুজিবের স্বপ্নের সোনার বাংলা। যারা পদ ছেড়ে চলে যাননি তিনি তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন করেননি কিংবা নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি তাদের আনুগত্যের পরীক্ষা নেয়ার কথাও বলেননি। এমনই একজন প্রয়োগিক মানুষ, একজন আলোকিত রাজনীতিবিদ; মুজিবনগর থেকে সরকারের ঢাকায় স্থানান্তর সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবেই সম্পন্ন হলো। তাজউদ্দীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার ক’দিনের মধ্যেই একটি নতুন সংকট দেখা দিল। গত ১৪ আগস্ট পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ৩০ জন জ্যেষ্ঠ সিভিল অফিসার পাকিস্তান সরকারের পদক গ্রহণ করেছেন। সুতরাং তাদের দালাল বিবেচনা করতে হবে- এই অভিযোগে সংস্থাপন বিভাগের পরামর্শে প্রধানমন্ত্রী তাদের চাকরিচ্যুত করেছেন। আমি যখন তাজউদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলাম তিনি কেবল বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত তাই নন, গত রাতের এই আদেশটি প্রত্যাহার করানোর অনুরোধ নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখাও করেছেন। এটা বেশ স্পষ্ট, অতি উৎসাহী কিছু মুজিবনগর-ফেরত কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেদের দ্রুত পদোন্নতির পথ খুলতে প্রধানমন্ত্রীকে বেপথু করে এই আদেশ জারি করিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী জানতেন না যে ১৯৭১ সালে প্রদত্ত পুরস্কারের প্রক্রিয়া ২৬ মার্চের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই আরম্ভ হয়েছিল। যখন এই পুরস্কার ঘোষণা হয় তার সঙ্গে ২৬ মার্চ থেকে পুরস্কার ঘোষণার ১৪ আগস্ট পর্যন্ত অফিসারদের আচরণ ও কাজকর্মের কোনো সম্পর্ক নেই। প্রধানমন্ত্রী একটানে তার আদেশ বাতিল করতে অস্বীকার করলেন, তবে আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে এক সদস্যের একটি রিভিউ কমিটি গঠনে সম্মত হলেন। কমিটি প্রতিটি কেসের গুরুত্ব পরীক্ষা করে আলাদাভাবে পর্যালোচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ দাখিল করবে। আমার সর্বোচ্চ জ্ঞান অনুসারে এই এক সদস্যের কমিটি প্রত্যেককেই পুনর্বহাল করার সুপারিশ করেছে। তাজউদ্দীন ছিলেন কঠোর শৃঙ্খলা আরোপকারী, শ্রমিক ইউনিয়নে বিষয়গুলো শক্ত হাতে মোকাবিলা করতেন। উচ্ছৃঙ্খল লেবার ইউনিয়নের মোকাবিলা করার সময় আমি অনেকবার তার সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকে গিয়েছি, তাকে কখনো অযৌক্তিক ও অন্যায় দাবির কাছে মাথা নত করতে দেখিনি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অমান্য করে ইউনিয়নের চাপে এনসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক তার ক্ষমতার বাইরে তার কিছু স্টাফের বেলায় নতুন পে-স্কেল অনুমোদন করলেন। সরকার যে চাপের মুখে নতি শিকার করবে না এই বার্তা ব্যাংকিং সেক্টরে পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রপতির ৯ নম্বর আদেশে (পিও ৯) ব্যবস্থাপনা পরিচালককে সেদিনই চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়ার প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ অনুমোদন করলেন। স্বাধীনতার পরপর চালু থাকা পাকিস্তানি নোট প্রত্যাহারের অংশ হিসেবে আমরা যখন ভারতের নাসিক সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছাপা এক টাকার নোট প্রচলন করলাম, রাজনৈতিকভাবে ব্রিবতকর অবস্থা সৃষ্টি করার মতো একটা দুর্লভ ঘটনা ঘটে গেল। মুজিবনগর সরকার ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়ার আগেই এই নোট ছাপার আদেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই নোট চালু হতে না হতেই একটি অশুভ রাজনৈতিক প্রচারণা শুরু হয়ে গেল যে, এটা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দাবিয়ে রাখতে ভারতের ষড়যন্ত্র এবং নাসিক আদেশকৃত সংখ্যক নোটের চেয়ে বেশি ছেপেছে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত করতে এই অর্থ নাশকতামূলকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে আরো নাটকীয় করে তুলতে একটি পত্রিকা নাসিকে মুদ্রিত একই নম্বরে দুটি নোটের ছবি পাশাপাশি ছেপে দিল, যা এই ধারণা দিল এ ধরনের অনেক দ্বৈত নোট চালু রয়েছে। আমরা দুজনের কেউই বিচলিত হইনি বরং বলি একটি নোট দুবার ছেপে এমন করে দেখানো যেতে পারে, কিন্তু এতে মনে করার কারণ নেই ডুপ্লিকেট নোট চালু রয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত আন্দোলনটি দমে যায়নি, বরং যখন তুঙ্গে ওঠে আমরা ইংল্যান্ড থেকে ছাপা এক টাকার নোটের সঙ্গে নাসিকের নোট বদলে নেয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দিই। এই সিদ্ধান্ত কাউকে কাউকে সন্তুষ্ট করলেও সবাইকে করল না। সমালোচনা চলতে থাকল আমরা কেন নোটগুলো অচল ঘোষণা না করে আরো সময় দিলাম, এই সুযোগে আরো নোট ছাপিয়ে তারা বাজারে ছাড়ার সুযোগ পেয়ে গেল। তাজউদ্দীন সংসদে একটি বিবৃতি দিলেন, যদি ব্যাংকে জমা পড়া ভারতীয় টাকা ছাপার আদেশ দেয়া নোটের চেয়ে একটি নোটও বেশি হয় তাহলে তিনি পদত্যাগ করবেন। ফেরত পাওয়া নোট জমা দেয়ার নির্ধারিত তারিখের পর বাংলাদেশ ব্যাংক হিসাব করে জানাল, যে পরিমাণ নোট জমা পড়েছে তার চেয়ে ৪০ লাখ টাকা বেশি নোট ছাপার আদেশ দেয়া হয়েছিল। তাজউদ্দীনের অবস্থান যে সঠিক ছিল তাই প্রমাণিত হলো। প্রায় এক মাস আগে আমার গুলশানের বাসায় পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক ডেপুটি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম এবং ক’জন পুরনো সহকর্মী যখন একত্র হলেন আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠলেন তাজউদ্দীন। আমি একটি ঘটনা বিবৃত করলাম- একজন অফিসারকে বরখাস্ত করতে তাজউদ্দীন আহমদের লিখিত আদেশ পাওয়ার পরও আমি এক মাস তা বাস্তবায়ন না করে পুনর্বিবেচনা করার জন্য আবার পেশ করলাম। ডক্টর নুরুল ইসলাম জিজ্ঞেস করলেন, মন্ত্রী যদি তাজউদ্দীন না হতেন আমি কি এই স্বাধীনতা নিতে পারতাম? আমি নিশ্চুপ রইলাম। আমার নৈঃশব্দ আমার উত্তরের চেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠল। তাজউদ্দীনের সরল হৃদয় এবং তিনি যে কখনো কারো ক্ষতি করবেন না আমি সেই সুযোগটাই নিয়েছি। মিসেস গান্ধীর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের দুই সপ্তাহের মাথায় তিনি আমাকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তিনি যে আমার ওপর কতটা বিশ্বাস স্থাপন করেছেন তা বুঝতে পারিনি। আমার ওপর তাজউদ্দীনের নির্দেশ ছিল আমি যেন প্রধানমন্ত্রীকে ছায়ার মতো অনুসরণ করি। ১৯৭২ সালে প্রধানমন্ত্রীর মস্কো সফরের সময়ও আমাকে প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আমি এই দায়িত্বগুলো খুব উপভোগ করেছি এবং প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকারের সময় আমি তাকে সহযোগিতা করেছি। তবে সবটাই যে গোলাপের বিছানা ছিল এমন নয়। এক হাজারের ওপর বেতন কাটা যাচ্ছে এমন সরকারি কর্মচারীর ক্ষতিপূরণের জন্য সমমানের সেভিংস সার্টিফিকেট ইস্যুর যে আদেশ আমি জারি করেছিলাম তিনি তা বিশেষভাবে গর্হিত মনে করেছেন। আমার নাম উচ্চারণ না করে তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিকৃত করার জন্য আমলাদের দোষারোপ করেছেন। আমি শান্তভাবে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারই অনুমোদন করা সিদ্ধান্তটি দেখাই, যাতে এভাবেই ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তাজউদ্দীন তারপরও বললেন, অনেক কিছু বদলে গেছে। বেতন কর্তনের ক্ষতিপূরণের আদেশটি বাতিল করতে হবে। জ্যেষ্ঠ আমলাদেরও দেশের জন্য ত্যাগ করা শিখতে হবে। আমি যুক্তি দেখালাম এই আদেশটি বাতিল করলে তা সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে; কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি, মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিব বিজ্ঞপ্তিটি বাতিল করার আদেশ দিলেন। ততদিনে আমি তার আচরণের ধরনটি জেনে গেছি, তার ক্ষুব্ধতার মুহূর্তটি পার হলেই পরের মুহূর্তে তার আচরণ এমন হবে- যেন কিছুই হয়নি। সরকারি কর্মচারীদের ব্যাপারে তিনি কোনো ধরনের ক্ষোভ পুষতেন না, কিংবা কোনো সরকারি কর্মচারীর চাকরিক্ষেত্রে ক্ষতি হবে এমন কোনো কিছু তিনি করেননি। তাজউদ্দীন সত্যিই ছিলেন একজন স্বর্ণহৃদয় মানুষ। তাজউদ্দীন আমাকে মন্ত্রিপরিষদে ১৯৭২-৭৩ সালের বাজেট এবং ১৯৭১-৭২ (১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন ১৯৭২) সালের সংশোধিত বাজেট পেশ করার সুযোগ দেন। মন্ত্রিপরিষদের পুরো বৈঠক তিনি গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। এই দীর্ঘ উপস্থাপনার মধ্যে তিনি কখনো বাধা দেননি বা নিজের চিন্তা ঢোকাতে চেষ্টা করেননি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে তাজউদ্দীনের বাজেট ভাষণ সম্প্রচারিত হয়, টেলিভিশন তখন ডিআইটি ভবনের (এখন রাজউক) নিচের তলায়। বাজেট উপস্থাপনের পরদিন আমি ভারপ্রাপ্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনারের কাছ থেকে ফোন পাই। তিনি বাজেটের জন্য অভিনন্দন জানান। আমি বললাম, আমার বদলে অর্থমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। তিনি বললেন, বাজেট তার কাছে বরাবরই একটি জটিল দলিল; কিন্তু এত স্বচ্ছ বাজেট তিনি কখনো পড়েননি। ১৯৭২ সালের ডিসেম্বরে ডেভেলপমেন্ট ফোরামের বৈঠকে মিস্টার উমব্রিখট বললেন বাজেট দাতাদের মধ্যে বিশ্বাস জন্মিয়েছে যে, নিজেদের অর্থ ব্যবস্থাপনার সামর্থ্য বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে। বৈঠকে আমার পাশে বসা টম হেস্কনার আমার দিকে তাকিয়ে প্রশংসাসূচক ইঙ্গিত করলেন। তাজউদ্দীনের সঙ্গে পাঁচটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও বৈঠকে যোগ দেয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। দুটি কমনওয়েলথ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক, দুটি বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা এবং একটি এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের বোর্ড অব গর্ভনসের বৈঠক। ১৯৭২-এর সেপ্টেম্বরে লন্ডনে কমনওয়েলথ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠকটি ছিল আন্তর্জাতিক অর্থ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের সামনে সদ্য স্বাধীন হওয়া একটি দেশের অর্থমন্ত্রীর প্রথম আত্মপ্রকাশ, সুতরাং সবার দৃষ্টিই তার ওপর নিবদ্ধ ছিল। সেবারই প্রথম ফিক্সড ফরেন এক্সজেঞ্জ ব্যবস্থা থেকে মুদ্রার ফ্লোটিং রেট চালুর সূচনা করে। তাজউদ্দীনকে সরকারি যে ভাষণ তৈরি করে দেয়া হয়েছিল তিনি তা প্রত্যাখ্যান করে নিজের নেয়া নোট থেকে বক্তৃতা দেন এবং যথেষ্ট মনোযোগ আকর্ষণ করেন এবং টেবিলের চারদিকে তার সহকর্মীদের কাছ থেকে প্রশংসা লাভ করেন। শেষবার আমি তাজউদ্দীনের সঙ্গে দেখা করি ৭ জুলাই ১৯৭৫, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পরপরই আমি তার ধানমন্ডির বাসায় যাই। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে আমাকে গ্রহণ করেন, আমরা একত্রে কিছু সময় কাটাই, তাকে আমার সেই শেষ দেখা। ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App