×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

বিজ্ঞান যাদের কাছে অচল

Icon

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিজ্ঞান যাদের কাছে অচল
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সবচেয়ে নাগরিক স্বাধীন দেশ। আর তার সমাজব্যবস্থাও বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্যমণ্ডিত বহুজাতিক সমাজব্যবস্থা। বিশ্বের বহু দেশ থেকে বিভিন্ন জাতির মানুষের অভিবাসনের ফলে এটি আজ একটি বহুসংস্কৃতিবাদী দেশে পরিণত হয়েছে। শতাধিক দেশের মানুষ আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। এত ভাষাভাষীর দেশ বিশ্বের আর কোথাও দেখা যায় না। তাইতো আমেরিকাকে ল্যান্ড অব ইমিগ্র্যান্ট বা বিশ্ব অভিবাসীর দেশ বলা হয়। বহির্বিশ্বে আমেরিকা আগ্রাসী, কুচক্রী, স্বার্থান্বেষী, মোড়লপনা বদনাম থাকলেও অভ্যন্তরীণ নীতির ক্ষেত্রে তাদের উদার বলা যেতে পারে। দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যই বিশ্বের সর্বাধিক স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড। ওই দেশের জনগণের কথা বলতে বোঝায় বৈচিত্র্য, অভিবাসন ও অভিবাসী। আমেরিকায় বসবাসরত এমন একটি বৈচিত্র্যময় কমিউনিটির কথা আজ তুলে ধরব যারা আধুনিক প্রযুক্তিকে ভালোবাসে না, বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করে না। এরা প্রকৃতির কাছাকাছি বেঁচে থাকাকেই জীবনের অন্যতম ধর্ম বলে মনে করে। আমেরিকার ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ একটি রাজ্য হলো পেনসিলভেনিয়া। এই পেনসিলভেনিয়ার ল্যানকাস্টার কাউন্টিতে অ্যামিশ (অসরংয) নামক বিশেষ এক ধর্মীয় সম্প্রদায় বসবাস করে, যারা আধুনিক প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করে না। এদের জীবন সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতিনির্ভর। আমেরিকায় সোনালি এক্সচেঞ্জে চাকরি করার সুবাদে পেনসিলভেনিয়ার অ্যামিশপল্লীতে যাওয়ার সুযোগ হলেও তাদের সঙ্গে মনখুলে কথা বলতে পারিনি। অপরিচিত মানুষকে দেখলেই তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। ফসলের মাঠেই তাদের বেশি ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। চাকরি-বাকরির ব্যাপারে এদের কোনো লোভ-লালসা নেই। একমাত্র জীবিকা হলো কৃষি খামার তৈরি করা। ক্যামেরা নামক বস্তুটি অ্যামিশরা একদম পছন্দ করেন না। সে কারণেই অপরিচিত কোনো মানুষের ক্যামেরা থেকে অ্যামিশরা নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে রাখে। তবে তাদের সহজ-সরল জীবনযাত্রা দেখে অবাক হয়েছি। আর্থিকভাবে সবরকম সামর্থ্য থাকার পরও এরা গাড়িতে চড়ে না, টিভি, ফ্রিজ, কম্পিউটার ব্যবহার করে না। এ যেন প্রকৃতির আইন দিয়ে ঘেরা আরেকটি জগৎ! এই প্রযুক্তির যুগে আমাদের জীবন যখন প্রযুক্তির কাছে জিম্মি, তখন অ্যামিশদের প্রযুক্তিবিহীন সাদাসিধে জীবন আমাদের মতো শহুরে লোকদের অবাক করে দেয়। অ্যামিশদের জীবন, এদের বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের কিছু গল্প নিয়েই এই লেখাটির সূত্রপাত। প্রকৃতিকে তাড়িয়ে বিজ্ঞানের ছোঁয়ায় আমরা যখন পরিণত হচ্ছি মানুষ নামের রোবটে, তখন এই বিংশ শতাব্দীতে অ্যামিশরা বেছে নিয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে বেড়ে ওঠার এক অসাধারণ অনুকরণীয় দীক্ষা! এরা প্রকৃতির সহজ-সরল জীবনব্যবস্থায় বিশ্বাসী। আর তাদের এই বিশ্বাসের ভিতটা অনেক মজবুত বলেই অ্যামিশরা যন্ত্রনির্ভর জীবনকে উপেক্ষা করে প্রকৃতিবাদী হয়ে বেঁচে থাকাটাকে জীবনের অন্যতম ব্রত বলে ধরে নিয়েছে। তাদের ধারণা, এই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানুষকে প্রকৃতি আর ঈশ্বরের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক করে তুলেছে। তাই তারা সব ধর্ম থেকেই নিজেদের আলাদা করে আরেকটা ধর্ম বানিয়েছে, যার নাম অ্যামিশ ধর্ম। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে অ্যামিশদের তেমন আস্থা নেই। এদের বিশ্বাস শারীরিক সুস্থতার পূর্ব শর্ত হচ্ছে মানসিকভাবে সুস্থ থাকার পূর্ণ নিশ্চয়তা। অ্যামিশদের ধারণা, পৃথিবীতে এত পাপ আর সমস্যার একমাত্র কারণ হলো প্রকৃতিবিরুদ্ধ হওয়া, প্রকৃতিকে ধ্বংস করা। এদের বিশ্বাস, প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা মানেই ঈশ্বরের কাছাকাছি থাকা। পেনসিলভেনিয়া অঙ্গরাজ্যের আইন অনুযায়ী অ্যামিশরা সরকারকে প্রাপ্য খাজনা দিয়ে থাকলেও এর বিনিময়ে সরকারের কাছ থেকে তারা কোনো ধরনের অবসর ভাতা, চিকিৎসা ভাতা কিংবা স্কুল ভাতাসহ কোনো সাহায্যই নেয় না! বৈষয়িক জীবনে এদের কোনো আগ্রহ নেই। কৃষিকাজ করে জীবন-যাপনেই এরা বেশি আগ্রহী। কোলাহলমুক্ত পরিবেশে ঘোড়ার গাড়িই তাদের মূল যানবাহন। অ্যামিশ সন্তানরা স্কুলে যায়। তবে সেই স্কুলের পাঠ খুব বেশি দূর গড়ায় না। একটিমাত্র কক্ষে সেই স্কুলে পড়ানো হয় ক্লাস এইট পর্যন্ত। তারা বিশ্বাস করে জীবনধারণের জন্য এটুকু শিক্ষাই যথেষ্ট। অ্যামিশদের সাদামাটা কাপড় দেখলেই এদের চেনা যায়। ১৬ বছর বয়সের পর থেকে অ্যামিশ পুরুষরা দাঁড়ি কাটে না। এদের ভাষা ইংরেজি। পাশাপাশি ডাচ ভাষায়ও কথা বলে। অ্যামিশরা এমন একটি সম্প্রদায় যারা মানুষকে ভালোবাসে, প্রকৃতিকে আঁকড়ে ধরে সরলভাবে বাঁচতে চায়। শহুরে জীবন এদের পছন্দ নয়। আর সে কারণেই পল্লী সমাজভুক্ত এই অ্যামিশরা নগর সভ্যতায় খুব একটা আস্থা রাখতে পারে না। বংশপরম্পরায় এরা নিজেদের বিশ্বাসের ভিত তাদের পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে শক্ত হাতে বুনে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তারা মনে করে কিছু মানুষ প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে অযাচিত ও অন্যায়ভাবে ব্যবহার করে পৃথিবীকে ভারসাম্যহীন করে তুলছে। এরা মূলত প্রকৃতিকে ভালোবাসে আর ভালোবাসে নিজেদের ছোট্ট সাজানো-গোছানো গ্রামটাকে, যা অ্যামিশ ভিলেজ (অসরংয ারষষধমব) নামে পরিচিত। অর্থ আর ক্ষমতায় এদের কোনো লোভ নেই। সাধারণ জীবন-যাপনেই এরা বেশি আগ্রহী। এক কথায়, শান্তিপ্রিয় ধর্মীয় সম্প্রদায়। আমরা স্বপ্নহীন মানুষরা বেঁচে আছি প্রযুক্তির খাঁচায় বন্দি হয়ে। আর সে কারণেই অ্যামিশদের সহজ-সরল জীবন, আমাদের টিভি, সিনেমা, ইন্টারনেটে আটকে থাকা ব্যস্ত জীবন সম্পর্কে নতুন করে ভাবায়, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ করে। অ্যামিশদের জয় হোক, প্রকৃতির জয় হোক আর জয় হোক মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসার। ড. ইউসুফ খান : কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App