×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

মানুষের বুদ্ধিমত্তা বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

মানব সভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ

Icon

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 মানব সভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ
প্রখ্যাত সাহিত্যিক জর্জ আর আর মার্টিন রচিত ‘অ্যা সং অব আইস অ্যান্ড ফায়ার’-এর পরবর্তী দুটি পর্ব রচয়িতার নাম জর্জ আর আর মার্টিন নন। জনৈক ব্যবহারকারী চ্যাটজিপিটির পরিষেবা ব্যবহার করে এ পর্ব দুটি তৈরি করেছে। নাম দিয়েছে যথাক্রমে ‘দ্য উইন্ডস অব উইন্টার’ এবং ‘অ্যা ড্রিম অব স্প্রিং’। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ‘প্রোগ্রাম’ সহজেই এ কাজটি করেছে। ট্রেনিং হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণ করেছে জর্জ মার্টিনের প্রথম পর্বের বইটি। স্বয়ং জর্জ মার্টিন মামলা করেছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিরুদ্ধে। কেননা তার বইটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ট্রেনিং হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। চ্যাটজিপিটি আর মেধার সৃজনশীলতার লড়াই চলছে আজ সর্বত্র। মানুষ তার জীবনের জন্মমুহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত প্রতিটি ছোট-বড় ঘটনার সম্মুখীন হয়। প্রতিটি ঘটনাকে সেই মানুষটি তার মস্তিষ্কে ধারণ করে এবং নিজের মতো করে বিশ্লেষণ করে। তার সেই ধারণ থেকে সে লিখতে পারে কোনো ঘটনার বর্ণনা কিংবা তার আত্মজীবনী। অঙ্ক কষলে দেখা যাবে, মানুষটি কোটি কোটি গিগাবাইট অথবা পেটাবাইট পরিমাণে তথ্য আহরণ করেছে, বিশ্লেষণ করেছে এবং এখনো করে চলেছে। এই একই কাজের জন্য যদি একটি এআই সফটওয়্যার তৈরি এবং চালনার প্রয়োজন পড়ে, তাহলে সেভাবে ভৌত পরিকাঠামো ও যান্ত্রিক গণনাশক্তিসম্পন্ন যন্ত্র নির্মাণের দরকার হয়। একটি মস্তিষ্কের ধারণ, আর অন্যটি যন্ত্রের ধারণ। একটি মানুষ, আর অন্যটি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এআই কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবেই তাকে ডাকা হোক, এর প্রতাপ-প্রাবল্য-প্রসার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে- এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এমনকি সমান তালে বাড়ছে তার স্পর্ধা আর ঔদ্ধত্যও। এআইয়ের দাপট ও প্রভাব এতটাই বেড়েছে এবং ক্রমশ এতটাই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে তার তর্জন-গর্জন, মানুষ বেশ অসহায় মনে করতে শুরু করেছে নিজেকে। শিক্ষা, বুদ্ধি, প্রতিভা, জ্ঞান দিয়ে মানুষ যা করতে পারে, এআই তার সবই করতে পারে। বরং মানুষের চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি এবং নিখুঁতভাবে তা করতে পারে। কিন্তু মানুষের পক্ষ নিয়ে তর্কে মেতে উঠেছেন সালমান রুশদির মতো অনেকেই। এআই শুধু বুদ্ধি দিয়ে লিখতে জানে। নিজস্ব রসবোধ, কৌতুকবোধ, জীবনচেতনা- এসব কোথায়? এসব ছাড়া গভীর সাহিত্য কীভাবে লিখবে চ্যাটজিপিটি? চ্যাটজিপিটি তো একটি প্রাণহীন যন্ত্র; তার জীবন অভিজ্ঞতা কোথায়? এআই হয়তো মেনেও নেবে জীবনদর্শনে তার এ দুর্বলতাকে। কিন্তু তারপরও এ বিশাল সম্ভাবনা নিয়ে কথা থেকেই যায়। কতখানি হইচই পড়েছে- সেই মাপকাঠিতে যদি কোনো জিনিসের গুরুত্ব বিচার করতে হয়, তাহলে বলতে হবে- এ মুহূর্তে এআইর গুরুত্ব অপরিসীম। তবে গুরুত্বের পাশাপাশি সমালোচনার পাহাড়সম বাস্তবতাও আছে। এআই নিয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। ৪০ বছর বয়সি ওই ব্যক্তি একটি সবজির গুদামে কাজ করত। কাজ চলাকালীনই রোবটের আচমকা আক্রমণে তার মৃত্যু। চলতি বছরে এ নিয়ে দ্বিতীয়বার রোবটের আঘাতে আক্রান্ত হলো দক্ষিণ কোরিয়ার এই ব্যক্তি। সবজির গুদাম থেকে বাক্সে ভরে পাঠিয়ে দেয়ার কাজ করত সে। সবজিভরা বাক্স কনভেয়ার বেল্টে তুলে দিত রোবট। সেই কাজ চলাকালীনই হঠাৎ ওই ব্যক্তিকে সবজির বাক্স ভেবে কনভেয়ার বেল্টে ছুড়ে দেয় রোবট। গুরুতর আহত হয় ওই ব্যক্তি। তার দেহের অন্তত ৫০টি জায়গায় আঘাত লাগে; থেঁতলে যায় তার মুখ ও বুক। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। রোবটের ভুলের খেসারত দিতে হলো ওই ব্যক্তিকে। রোবটের আক্রমণে মৃত্যুর ঘটনা এটাই প্রথম নয় দক্ষিণ কোরিয়ায়। আরেক রোবটের আক্রমণে গুরুতর আহত হয় ৫০ বছর বয়সি এক ব্যক্তি। গুরুতর আহত হলেও ওই ব্যক্তি প্রাণে বেঁচে যায়। ইতোমধ্যে নেটফ্লিক্সে কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক সিরিজ ‘ব্ল্যাক মিরর’-এর একটি পর্ব ছিল ‘জায়ান ইজ অফুল’। এর মধ্যে ছিল একটি টিভি শোর কথা, যার গল্পটা লিখেছে কম্পিউটার। আর এতে অভিনয় করেছে কম্পিউটারে তৈরি সালমা হায়েকের প্রতিমূর্তি। অর্থাৎ বিনোদনের ক্ষেত্রেও মানুষকে অপ্রাসঙ্গিক করে দিতে চাইছে এআই প্রযুক্তি। এআই নিয়ে ভয়ের যে ঠাণ্ডা স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে মানব সভ্যতার শিরদাঁড়ায়, সে কথা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই। সার্বিকভাবে মানুষের কর্মচ্যুতির ভয়, প্রতিস্থাপিত হওয়ার ভয়, জীবনের অনেক অংশ এআইর দখলে চলে যাওয়ার ভয়। চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর তো সভ্যতার ইতিহাসের এক পরিবর্তন-বিন্দু তৈরি হয়েছে। কল্পকাহিনি আর বাস্তব চ্যাটজিপিটির বদৌলতে একাকার হয়ে গিয়েছে। ইতোমধ্যেই হলিউডে চ্যাটজিপিটি নিয়ে চিত্রনাট্যকার আর শিল্পীদের দুটি বড় মাপের ধর্মঘট হলো। ১৪৮ দিন ধরে চলা প্রথম ধর্মঘটের পরিণতিতে ‘রাইটার্স গিল্ড অব আমেরিকা’-এর আপাত জয় হলো। ১১৮ দিন ধরে চলা দ্বিতীয় আন্দোলনের সমাপ্তিতে প্রধান স্টুডিওগুলোর সঙ্গে অভিনেতাদের সংগঠনের সমঝোতা হলো। দুটি আন্দোলন এবং সমঝোতাই মানবসভ্যতার ইতিহাসের মাইলফলক হয়ে থাকল। সমঝোতা হলো- আপাতত হলিউডে এআইকে লেখক হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এভাবেই হলিউডে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিবার্য বিজয়রথ ঠেকাতে মরিয়া হয়েছিল মানুষ। তবে এ আপাত সমাধান কি স্থায়ীভাবে ঠেকাতে পারবে এআইর বিজয় প্লাবন? উত্তরটি পেতে আমাদের হয়তো আরো অপেক্ষা করতে হবে। মানুষের প্রগতি অবশ্যই এগোচ্ছে। তবে তা এগোচ্ছে সরলরৈখিক ছন্দে। আর এআই হাঁটছে বিশ্বের অবিশ্বাস্য গতিতে। মানুষ তাই কীভাবে অনিবার্যতাকে সামলাবে- এ প্রশ্ন আজ সবার মনেই জাগ্রত। অপরিসীম তথ্যমন্থন প্যাটার্ন ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে এআইর যে কর্মপদ্ধতি, তার সঙ্গে মানুষের জটিল চিন্তাশৈলীর ব্যাপক পার্থক্য। এটা যেমন সত্য, তেমন সত্য হলো, জীবনযাপনের অনেক ক্ষেত্রেই এআই ম্যাজিক দেখাবে তার উৎকর্ষ এবং উৎপাদনশীলতায়। ২০১১-এর ছবি ‘দ্য আইরিশম্যান’-এ রবাট ডি নিরোর বয়স কমিয়ে তাকে বিভিন্ন বয়সের দেখানো হয়েছে এআই প্রয়োগ করে। চীনা দুগ্ধ সংস্থা ‘মেং নিউ’-এর বিজ্ঞাপনে দৌড়াতে দেখা গেল ফরাসি ফুটবলার এমবাপেকে। আসলে দৌড়িয়েছেন অন্য এক মানুষ এবং ব্যবহৃত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্মিত ডিজিটাল মুখোশ। এতকিছুর পর তবুও কথা থেকেই যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি প্রতিস্থাপন করতে পারে সালমান রুশদির গল্প? রুশদির এ চ্যালেঞ্জের পর চ্যাটজিপিটির কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তা গ্রহণ করে ৪৩ বছর আগের রুশদির গদ্য-স্টাইল নকল করে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে লিখে ফেলল ২০০ শব্দের কয়েকটি প্যারা। সেই লেখা পড়ে রুশদি বললেন, ‘অ্যা বাঞ্চ অব ননসেন্স।’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমর্থকরা জানতে চাইলেন, লেখা একগুচ্ছ অর্থহীন বাক্যমাত্র কেন? রুশদির উত্তর, শুধু বুদ্ধি দিয়ে কী হবে? নিজস্ব রসবোধ, কৌতুকবোধ, জীবনচেতনা- এসব কোথায়? এসব ছাড়া গভীর সাহিত্য লেখা যায় না। আর চ্যাটজিপিটির এগুলো নেই। কেবল সালমান রুশদিই নন, অনেকে তাই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন এআইর সফলতার মুখে। চ্যাটজিপিটি কি একজন লেখকের আবেগকে প্রতিস্থাপিত করতে পারে? পারে কি শাহরুখ খানের ম্যাজিক অভিনয়কে? লেখা কিংবা অভিনয়ের ক্ষেত্রে মানুষের আবেগ এবং অভিজ্ঞতার জটিলতাই তো কেন্দ্রীয় বিষয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি এই মানবিক অনুভূতির সূ²তার তারটির নাগাল পাবে কোনোদিন? এক গভীর মানসিক পরিমণ্ডলে দর্শককে আষ্টেপৃষ্ঠে আবিষ্ট করার ক্ষমতা কি আদৌ আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংবলিত রোবটের? কিন্তু কথা তো সেখানেই শেষ হয়ে যায় না। ১৯৯৭ সালের ১১ মার্চ সভ্যতার ইতিহাসের এক অমোঘ পরিবর্তন বিন্দুতে আইবিএমের দাবা খেলার ক¤িপউটার ‘ডিপ ব্লæ’ হারিয়ে দিয়েছিল কিংবদন্তি দাবাড়– গ্যারি কাসপারভকে। যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তার কাছে মানুষের বুদ্ধিমত্তার পরাভবে শিউরে উঠেছিল সেদিন মানুষ। পৃথিবীর মানুষ আজ যেন এক জটিল সময়কালে, সভ্যতার এক ভয়ংকর আবর্তে দাঁড়িয়ে। মানুষের বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সংঘাত, না মিলন- এ ভাবনায় দিন কাটছে পৃথিবীর মানুষের। বোতলমুক্ত প্রযুক্তির দৈত্যকে আবার বোতলবন্দি করা আর সম্ভব নয়। তাকে হারানোও মানুষের পক্ষে কঠিন। সুচিন্তিত আর সুনিয়ন্ত্রিত উপায়ে সেই এআইকে আমাদের জীবনের সঙ্গে স¤পৃক্ত করার কথা কি ভাবা যায়? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদেরই খুঁজে বের করতে হবে। সুধীর সাহা : কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App