×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

বাংলাদেশ হাইকমিশন যুক্তরাজ্য

সমস্যা, উন্নয়ন ও সম্ভাবনা

Icon

প্রকাশ: ০৫ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সমস্যা, উন্নয়ন ও সম্ভাবনা
বাংলাদেশ হাইকমিশন, লন্ডন যুক্তরাজ্য বাংলাদেশের প্রধান কূটনৈতিক মিশন। হাইকমিশন লন্ডনের সাউথ কেনসিংটনের কুইন্স গেট রাস্তায় অবস্থিত। বাংলাদেশ সরকার ম্যানচেস্টার এবং বার্মিংহামে অবস্থিত দুটি সহকারী হাইকমিশন ও পরিচালনা করে। অধিকন্তু এটির আয়ারল্যান্ডের সমবর্তী স্বীকৃতি রয়েছে। বর্তমানে অনুমান করা হয় যে, প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার বাংলাদেশি এখানে বসবাস করছেন। যাদের মধ্যে ৯৫ শতাংশ অভিবাসী সিলেটি। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি লোক বাস করছেন পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটে, যা ওই অঞ্চলের মোট জনসংখ্যার ৩৩ ভাগ। এ কারণে এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশনের চেষ্টা করা উচিত বলে গুণীজন মনে করেন। তাই হাইকমিশনও এই এলাকায় বিশেষ তৎপরতা চালিয়ে যায়। বাংলাদেশি সিলেটিরা এখানে সুপ্রতিষ্ঠ। বর্তমান হাইকমিশনার যিনি অনেকটা সফল হিসেবে অনেকে মনে করেন। তিনি হলেন সাইদা মুনা তাসনিম। তিনি অনেক ভালো কাজ করার চেষ্টা করছেন বলে এখানকার মানুষের ধারণা রয়েছে। তার অনেক সুনামও রয়েছে দেশে ও বিদেশে। এই কূটনীতিবিদরা বাংলাদেশের বৃহৎ দাবিগুলো নিয়ে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রস্তাব আনেন এবং দাবি জানান। তারা দেশের জন্য কাজ করেন নিরলসভাবে। তারা এখান থেকে দেশের জন্য কূটনৈতিক কাজ চালিয়ে যান ইউকেসহ সারাবিশ্বের সঙ্গে। বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বাজেটের টাকার সিংহভাগ গিয়েছিল এই দেশের ব্রিটিশ বাঙালিদের কাছ থেকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই দেশের মানুষের বিরাট ভূমিকার কারণে সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধুকে জীবিত অবস্থায় পাকিস্তানিরা এই দেশে পাঠাতে বাধ্য হয়। আর এখান থেকেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশের উদ্দেশে ফিরে যান। তাই এই দেশ বাঙালির অনেক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। এ কারণে সব সময় বাংলাদেশের কাছ থেকে অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্যতা রাখে যুক্তরাজ্য; কিন্তু অভিযোগ আছে এখানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী মানুষ পাচ্ছে না কাক্সিক্ষত সার্ভিস। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস থেকে এখন পর্যন্ত সাইদা মুনা তাসনিম এই দায়িত্বে আছেন। তিনি সম্প্রতি তার কাজের জন্য ডিপ্লোম্যাট অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। তিনি কাজ করে বাংলাদেশের সুনাম বয়ে আনছেন অথচ এখানকার অনেক বাঙালি এই হাইকমিশন অফিসের কর্মচারীদের কাজে খুশি হতে পারছেন না, এ নিয়ে অনেক গল্প আছে। অবশ্য বর্তমান হাইকমিশনার আসার পর সেবার মান উন্নত করার চেষ্টা করছেন এবং করেও যাচ্ছেন; কিন্তু এই অর্জন মøান করে দিচ্ছেন ওনার অফিসের কিছু কুচক্রী লোক। মানুষকে সঠিক সেবা দেয়ার স্বার্থে তাদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেয়ার এখন সময় এসেছে বলে সুশীলরা মনে করছেন। এখানে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালন করা হয় মর্যাদার সঙ্গে এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য কাজ করা হয় দিনরাত। বর্তমান হাইকমিশনার আসার পর সর্বপ্রথম বাংলাদেশের কোনো প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইংল্যান্ডের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ দেখা করলেন। বাংলাদেশের জাতীয় দিবসে এখন এই দেশের অনেক জায়গায় বাংলাদেশের পতাকা পতপত করে উড়তে দেখা যায়। বাংলাদেশ হাইকমিশন বৈধপথে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য বিভিন্ন সভা ও সেমিনারের আয়োজন করে থাকে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বিশেষ অবদান রাখছে। বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে যে যে কাজ করা হয় তা হলো ই-পাসপোর্ট ও মেশিন রিডাবল পাসপোর্ট (এমআরপি), এনআইডি, ভিসা, প্রত্যয়ন দলিল, জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু নিবন্ধন, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি, দ্বৈত নাগরিক সনদপত্র, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ফর ফরেন ন্যাশনাল, ভ্রমণের অনুমতি, নো ভিসা রিকয়ারড (এনভিআর), বিভিন্ন অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। কিন্তু এসব কাজ করতে আসা মানুষের নানা অভিযোগ রয়েছে। হাইকমিশনের ওয়েবসাইটে যে হেল্প নম্বর দেয়া রয়েছে তাতে কল করলে সব সময় উত্তর আসে না অন্যান্য হাইকমিশনের মতো। ওয়েবসাইটও উন্নতমানের নয়- এই অভিযোগ অনেকেই করেন। এখানে সহজে প্রবেশ করা যায় না সব সময়। এছাড়া এখানে কিছু বুঝতে অক্ষম হলে সাহায্য করার মতো কাউকে পাওয়া যায় না। অফিসে গেলে তিনিরা বলেন, এটা করেন, ওটা করেন; কিন্তু দেখানোর কেউ নেই, তাই মানুষ বাধ্য হয় দালালের কাছে যেতে। আর দালালরা প্রতিটি কাজে ৩০-৬০ পাউন্ড পর্যন্ত চার্জ করে থাকেন। উপায় নেই তাই মানুষকে এই টাকা দিতে হয়। হেল্প লাইনে কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে তা অজানাই থেকে যায় অনেকের। তখন অসম্পূর্ণ কাজ নিয়ে অফিসে যেতে হয়। সেখানে গিয়েও অনেক বিড়ম্বনা পোহাতে হয় এই সাধারণ মানুষের। অথচ এই দেশে অন্যান্য হাইকমিশনে কল করার সঙ্গে সঙ্গে অপশন আসে, এখানে কোন অপশন চান সেটি পছন্দ করার জন্য বলা হয় এবং যে বিষয়ে দরকার সেই বিষয়ে পরামর্শদাতা নিজে কথা বলেন ফোনে এবং যে কোনো সমস্যারও সমাধান করে দেন নিজে। এখানে কিন্তু এটি স্বপ্ন। অথচ একই দেশে দুই সিস্টেম চালু রয়েছে। তাই দিন দিন মানুষ এই প্রতিষ্ঠানকে অথর্ব বলে ভাবতে শুরু করেছে। ই-মেইল করলেও সঙ্গে সঙ্গে অনেকে রেসপন্স পান না বলে অভিযোগ আছে। সিরিয়ালে অনিয়ম নিয়মিত ব্যাপার হয়ে গেছে বলে অনেকে মনে করেন এবং বাংলাদেশ সরকারের সম্মানিত নাগরিকদের সিরিয়ালে নাম ডাকার সময় সম্মানের জায়গাতে অসম্মানিত করা হচ্ছে- অবস্থাদৃষ্টে অনেকে ভাবেন এই কথা। কেউ কেউ জানান, মনে হয় পাকিস্তানের কোনো অফিসে বাঙালিকে কটাক্ষ করে কেউ নাম ডাকছেন, সিরিয়াল অনেক সময় বেশ দীর্ঘ হয়; কিন্তু ট্রাভেল এজেন্সির লোক বিশেষ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে দেখা যায় হরহামেশা। এই হলো সাধারণ মানুষের অভিযোগ। অফিসের ভেতরের লিফট নষ্ট কিন্তু এটি কেন ঠিক হচ্ছে না তা জানা নেই মানুষের। তাই অক্ষম ব্যক্তিরা ই-ভিসার আবেদন করলেও সম্ভব হচ্ছে না এই কাজ সম্পন্ন করা। কারণ মেশিন রাখা হয়েছে গ্রাউন্ড ফ্লোরে, তাই এ কাজ কী করে করা সম্ভব? সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় তাদের তখন দীর্ঘ সময় বসে থাকতে হয়, তা দুই তিন ঘণ্টা পর্যন্তও ছাড়িয়ে যায় অনেক সময়। এটি হলো ভুক্তভোগীদের কথা। এ ছাড়া শুনতে হয় অনেক তিরস্কার। মহামান্য অফিসাররা খুব ব্যস্ত থাকার ভান করেন। যেখানে ইউকে সরকার সিলেটি ভাষাকে সম্মান করে বিভিন্ন জায়গায় সিলেটি অনুবাদক রেখেছে, সেখানে অনেক স্টাফ আছেন- তারা এই ভাষাভাষী মানুষদের অবজ্ঞা করছেন বলে শক্ত অভিযোগ আছে এই দেশের মানুষের কাছে। কেউ কেউ নীরবে হজম করছেন এই অবজ্ঞাকে। এরকমও অভিজ্ঞতা আছে অনেকে বলেন, অনেক সময় লাইনে থেকে অনেককে বলতে শোনা যায় আমরা তাদের দেশের লোক না। মানে সিলেটি না হলে হয়তো ভালো ব্যবহার পাওয়া যেত। সিলেটিরা এই বিষয়ে খুব ক্ষুব্ধ বলা যায়। সিলেট অঞ্চলের মানুষ বেশি এই দেশে, তবুও কেন যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও হাইকমিশন অফিসে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য এক-দুজনের বেশি সিলেটি লোকজনকে চাকরি দিতে চায় না বাংলাদেশ সরকার- এই প্রশ্ন এখন সব সিলেটি মানুষের মনে। তাই তারা এখন নারাজ বলা যায় সরকারের ওপর। সেবা নিতে আসা অনেকে জানান, কর্মচারীদের কাউকে যদি বলা হয় আমাদের ট্যাক্সের টাকায় সরকার আপনাদের বেতন দেয়, তবে কেন আপনারা এই কাজে আমাদের ঠিকমতো সহযোগিতা করেন না? তখন তিনি জানান, আপনাদের টাকায় আমাদের বেতন হয় না। কিন্তু প্রশ্ন হলো এ রকম উত্তর কি শোভা পায় একজন সরকারি কর্মচারীর মুখে। এই দেশে বাংলাদেশ হাইকমিশনের অনেক অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ লাভ করেন নিয়মিত কিছু মানুষ। এরা এই কমিশনের পছন্দের লোক বলা যায়। কিন্তু বিশাল এই দেশে যে অন্য গুণীজনরা রয়েছেন বা তৈরি হচ্ছেন সেদিকে কোনো ভ্রæক্ষেপ নেই বলে মনে হয় এই কমিশনের। তাই এই তালিকার বাইরের কিছু সুশীল দাওয়াতের বাইরে থাকেন সব সময়। লন্ডনে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে হাইকমিশনের তেমন একটা তৎপরতা দেখা যায় না। এ দেশে বছরে একবার বইমেলা হলেও হাইকমিশন অফিস থেকে কোনো অর্থনৈতিক সহযোগিতা করতে পারছেন বলে কোনো খবর মিলছে না। কিন্তু এই দেশে যারা বসবাস করেও বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার জন্য কাজ করছেন তারা খুব একটা সচ্ছল নয় আমরা জানি। তাই এ বিষয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশন ও সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়া উচিত বলে সুশীলরা মনে করেন। এদিকে পাসপোর্ট করতে আসা অনেক ব্রিটিশ নাগরিক জানান, অফিসের অসহযোগিতা আর অনিয়মের কারণে মনে হয় বাংলাদেশি পাসপোর্ট না করলেই ভালো হতো। কেন এই বিতৃষ্ণা- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে এখানে একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত তৈরি করা উচিত। যেখানে মানুষ রিপোর্ট করতে পারবে সহজে এবং সঙ্গে সঙ্গে বিচার লাভ করতে পারবে। এখানে অনেক সময় বিচার দেয়ার জন্যও সঠিক জায়গা পাওয়া যায় না, এ ছাড়া বিচারপ্রার্থী হলে কর্মকর্তারা দায় এড়ানোর জন্য বলেন- লিখিত অভিযোগ করেন। এই সময় এই দেশের মানুষের সবার নেই, এটা তারা জেনেই এই সুবিধা নেন বলে অনেকে ধারণা করেন। যদি বাংলাদেশ সরকার ছদ্মবেশে তদন্তকারী দল সেখানে প্রেরণ করে, তবে এই অনিয়ম চোখে পড়বে বলে বিজ্ঞজনরা মনে করেন এবং সব অফিস সিসি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে যদি আসা হয়, আর তা যদি প্রতিনিয়ত চেক করা হয় তবেই এই অনিয়ম চোখের সামনে আসবে, আর অসাধু লোকদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হবে। আশাকরি সরকার এ বিষয়ে আন্তরিকতার পরিচয় দিয়ে নিজেদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে। ড. আজিজুল আম্বিয়া : কলাম লেখক ও গবেষক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App