×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আইন ও করণীয়

Icon

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’- এই বিখ্যাত লাইনটি বলেছিলেন সঞ্জীব চট্টোপ্যাধায়। অর্থাৎ যার যেখানে স্থান তাকে সেখানেই মানায়। সমুদ্রের নোনা জলের বিশাল তিমি নোনা জলেই মানায় মিঠা পানিতে নয়, তেমনি অতি ক্ষুদ্র মাথার উকুন মাথাতেই মানায় লেজে নয়। তাদের স্থানের বিচ্যুতি ঘটলেই মৃত্যু ঘটবে। কারণ প্রত্যেক প্রাণীর স্থান বিশেষত্ব রয়েছে। প্রকৃতির সব কিছুই একটি নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে। প্রতিদিন সূর্য নিয়ম করে পূর্ব আকাশে ওঠে আবার পশ্চিম আকাশে অস্ত যায়। যদি এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটে তাহলে প্রাণীকুল ধ্বংস হয়ে যাবে। বন্যপ্রাণী আমাদের দেশের জাতীয় সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার্থে বন্যপ্রাণীর ভূমিকা অনস্বীকার্য। পাখি ফল খেয়ে বীজের বিস্তারে, মৌমাছি পরাগায়নে, পশুপাখিদের বিষ্ঠা নতুন উদ্ভিদ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষার্থে উৎপাদক, খাদক, বিয়োজকের ভূমিকা অপরিহার্য। উৎপাদক হচ্ছে যারা নিজের খাদ্য নিজেই তৈরি করে, খাদক হচ্ছে যারা উৎপাদককে ভক্ষণ করে, বিয়োজক হচ্ছে যারা মৃত উদ্ভিদ ও প্রাণীকে জৈব পদার্থে পরিণত করে। খাদককে আবার তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করে, যথা- প্রথম শ্রেণির খাদক হচ্ছে হরিণ, মহিষ, জিরাফ ইত্যাদি; দ্বিতীয় শ্রেণির খাদক হচ্ছে ব্যাঙ, শিয়াল, বাঘ; তৃতীয় শ্রেণির খাদক হচ্ছে সাপ, ময়ূর, বাঘ। যদি কোনো শ্রেণির খাদক বিলুপ্ত হয় তাহলে বাস্তুসংস্থান ধ্বংস হয়ে যাবে। কারণ এক স্তরের প্রাণী তার নিচু স্তরের প্রাণীর ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। অথচ মানুষ নানানভাবে তাদের শিকার ও আহত করছে। বনের হাতি মারার জন্য বানানো হয়েছে বৈদ্যুতিক ফাঁদ। কৃষি কাজে অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মারা যাচ্ছে বনের পাখি ও তৃণভোজী প্রাণী। এছাড়া বনের ধারে অনিয়ন্ত্রিত শিল্প কারখানা, নগরায়ণ এবং অনিয়ন্ত্রিত বন নিধনের ফলে বন্যপ্রাণীর আবাস্থল এবং খাদ্য সংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে বন্যপ্রাণী মারা যাচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে বাস্তুসংস্থান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর। ফলস্বরূপ দেখা দিচ্ছে অসময়ে বন্যা, অনাবৃষ্টি, খরা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন ইত্যাদি। এছাড়া কিছু অসাধু লোকজন বন্যপ্রাণীর মাংস ভোজন এবং শখের বসে বন্যপ্রাণী শিকার করছে। এক সময় বাংলাদেশে ডোরাকাটা হায়না, ধূসর নেকড়ে, নীলগাই, গণ্ডার, বনগরু, বারো শিঙা হরিণ, রাজশকুন, সবুজ ময়ূর, তামাটে তিতির, কৃষ্ণষাঁড় এবং লালমাথা টিয়াঠুটি ইত্যাদি বন্যপ্রাণী ছিল। কিন্তু এখন আর নেই। এর অন্যতম কারণ অনিয়ন্ত্রিত বন্যপ্রাণী শিকার এবং বনভূমি ধ্বংস করা। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য ১৯৭৪ সালে আইন পাস করা হয়। ওই আইনে বলা আছে, বন্যপ্রাণী শিকার, ধরা এবং আহত করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। যদি কোনো ব্যক্তি এই আইন ভঙ্গ করে তাহলে ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৬ মাস থেকে ২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে। দুঃখের বিষয়, বাস্তবে এই আইনের ব্যবহার অতি নগণ্য। ২০১৫ সালের আইইউসিএনের জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশ থেকে ইতোমধ্যে ৩১ প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। আরো দেখা যায়, মহাবিপন্ন প্রজাতি সংখ্যা ৫৬, বিপন্ন প্রজাতির সংখ্যা ১৮১, ঝুঁকিতে আছে ১৫৩ প্রজাতি এবং ঝুঁকির কাছাকাছি আছে এমন প্রজাতির সংখ্যা ৯০টি। এমনকি মহাবিপন্ন প্রজাতির তালিকায় আছে আমাদের জাতীয় প্রাণী রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে এখনই আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। বন্যপ্রাণী শিকার এবং বন নিধন বন্ধ করতে হবে। জনসচেতনতা এবং আইনের কার্যকারিতা বাড়াতে হবে। সর্বশেষ বন্যপ্রাণী শিকার দেখলে ৯৯৯ নম্বরে ফোন দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবগত করতে হবে। মো. রিয়াজ হোসাইন : শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App