×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

মানবতার ব্যবসা, একজন মিল্টন সমাদ্দার ও মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা

Icon

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মানবতার ব্যবসা, একজন মিল্টন সমাদ্দার ও মিডিয়ার দায়িত্বশীলতা
বিশ্বায়নের যুগে মুনাফামুখী অর্থনীতির সূত্রানুযায়ী পুঁজির বেপরোয়া এবং বেয়াড়া বিকাশের পথ-পরিক্রমায় মোটাদাগে সবকিছুই পণ্য; আর কোনো কিছুই ব্যবসার বাইরে নয়। বৈশ্বিক এবং স্থানিক পুঁজি কাঠামোতে আমরা নিজের অজান্তেই, কিংবা জেনে-বুঝে, সবকিছুকেই পণ্য বানিয়ে ফেলছি কিংবা নিজেরাও পণ্যে পরিণত হচ্ছি। ফলে মানবতার নামে যা কিছু হোক না কেন পুঁজির বেপরোয়া বিকাশের কালে মানবতাও এক প্রকার ব্যবসা। মানবতার ব্যবসা নিয়ে বিশ্বব্যাপী নানা বিতর্ক ও বাহাস আছে। কট্টরপন্থিরা মনে করেন, মানবতার ব্যবসায় প্রকৃতপক্ষে ব্যবসা বেশি মানবতা কম। আবার উদারপন্থিরা মনে করেন, মানবতাও ব্যবসা বটে; কিন্তু ব্যবসা হলেও কিছুটা মানবতার কাজ তো হয়! একেবারে না-হওয়ার চেয়ে খানিকটা মানবতার কাজ তো হচ্ছে। বাংলাদেশেও এ বিতর্ক জারি আছে। বিশেষ করে মানবতার নামে কিছু এনজিও মানবতার ব্যবসা করে। তখন উদারপন্থিরা বলেন, মানবতার নামে এখানে খানিকটা ব্যবসা হয় বটে, কিন্তু কিছুটা মানবিক কাজ তো হয়। মানবতার কাজও যে হয়, তার নজিরও আছে। মানবতার কাজ করে ইতোমধ্যে সাধারণ্যে খ্যাতি, সুনাম এবং আস্থা অর্জন করা একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বিদ্যানন্দ। ভূমিকা হিসেবে এ কথাগুলো বলার কারণ সম্প্রতি ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এইজ কেয়ার’ আশ্রমের চেয়ারম্যান, যিনি সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়েছেন, মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে যে মানবতার ব্যবসার অভিযোগ উঠেছে, সেটা বেশ ভয়ংকর এবং সমাজের একটি অত্যন্ত অশুভ এবং নিকৃষ্ট চিত্রকে উন্মোচিত করছে। কিন্তু মিল্টন সমাদ্দারের খবরটা বাংলাদেশের প্রায় সব মিডিয়া প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক্স- যেভাবে প্রকাশ ও প্রচার করছে, তাতে সমাজের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে সেটার একটা ক্রিটিক আমি দাঁড় করাতে চাই। কেননা মিডিয়া পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্বের প্রতি আদৌ কতটা যতœশীল, সেটা জানা জরুরি। কিংবা মিল্টন সমাদ্দারের ইস্যু কাভার করতে গিয়ে পেশাগত দায়িত্ব এবং সামাজিক দায়িত্বশীলতার মধ্যে ন্যূনতম নৈতিক ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলছে না তো? এসব নিয়ে স্বাস্থ্যকর বিতর্ক সমাজে জারি থাকা জরুরি। আমি এখানে সে বিতর্ক খানিকটা আনতে চাই। ২ মে বাংলাদেশের প্রায় সব সংবাদপত্রে মিল্টন সমাদ্দারকে নিয়ে বিস্তারিত খবর ও প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। কিন্তু যেহেতু পুরো বিষয়টি এখনো অভিযোগের পর্যায়ে আছে, সেহেতু আমি মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদের বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়েই এখানে পেশ করব। হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘মিল্টন সমাদ্দারের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ উঠেছে। তার প্রতিষ্ঠিত আশ্রয়কেন্দ্রে অসহায় শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে আসতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে তিনি স্বীকার করেছেন, সেখানে (আশ্রয়কেন্দ্র) অপারেশন থিয়েটার (অস্ত্রোপচারকেন্দ্র) আছে। যদি অপারেশন থিয়েটার থাকে বা হাসপাতাল থাকে, সেটির লাইসেন্স থাকতে হয়। কিন্তু তিনি এ-সংক্রান্ত কোনো লাইসেন্স দেখাতে পারেননি।’ তিনি আরো বলেন, ‘মানবিকতার আড়ালে ভয়াবহ প্রতারণার জাল বিস্তার করেছেন মিল্টন। প্রকৃতপক্ষে তিনি যে কয়জনকে লালন-পালন করছেন, প্রচার করছেন তারচেয়ে কয়েক গুণ। লাশ দাফন করার যে হিসাব দিচ্ছেন, তাতেও আছে বিরাট গরমিল। সবচেয়ে ভয়ংকর, মিল্টনের বিরুদ্ধে রয়েছে অসহায় মানুষকে আশ্রয় দেয়ার নামে তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা এটাও জেনেছি, ইতোমধ্যে তিনি ৯০০ লাশ দাফন করেছেন। কিন্তু ৮৩৫টি লাশের হিসেবে গরমিল পাওয়া যায়। এসব লাশ দাফনের কোনো ডকুমেন্ট (নথি) তার কাছে নেই। তিনি গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন, নিজেই মৃত্যুসনদ তৈরি করে চিকিৎসকের স্বাক্ষর ও সিল জাল (নকল) করতেন। তার আশ্রমের পাশে একটা মসজিদ আছে, সেখান থেকেও প্রশ্ন উঠেছে, লাশের শরীরে কিডনির পাশে রক্তের দাগ রয়েছে। এসব বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ মিল্টন সমাদ্দারের দুটি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে জানিয়ে ডিবি কর্মকর্তা হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘তার একটি আশ্রয়কেন্দ্র মিরপুরে এবং অন্যটি সাভারে।’ তিনি বলেছেন, আশ্রয়কেন্দ্রে ৫০০-৭০০ লোক রয়েছে। কিন্তু সেখানে (আশ্রয়কেন্দ্র) খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০-৩০ বা ৪০ জনের বেশি নেই। আমাদের কথা হলো, আমরা তাকে নিয়ে (গ্রেপ্তার) এসেছি। কিছু অভিযোগকারী রয়েছে, তারা মামলা করবেন। আমরা তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করব, কতসংখ্যক মানুষ তার আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছিলেন। সেখানে কতসংখ্যক মানুষ মারা গেলেন। তিনি যেখানে অপারেশন থিয়েটার স্থাপন করেছেন, সেখান থেকে কিডনি বিক্রি করেছেন কি না, সেই অভিযোগটিও তদন্ত করা হবে।’ ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’-এর নামে যে প্রতিষ্ঠান এতদিন ধরে মানুষের কাছে একটি অত্যন্ত মানবতাবাদী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ছিল, যার মানুষ নানা অনুদান দিয়েছেন, মানবতার ডাকে অনেকে দেশ-বিদেশ থেকে নানা সাহায্য সহযোগিতা করেছেন, অনেকে অনেক বড় আশা নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ব্রত নিয়ে ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’-এর পাশে দাঁড়িয়েছেন, অথচ অভিযুক্ত মিল্টন সমাদ্দার (যদি অভিযোগ সত্য হয়) তলে তলে মানবতার অন্তরালে কী ভয়াবহ এবং অমানবিক কাজ করেছেন, তা ভাবলেই গা শিউরে উঠে। শিশু ও বৃদ্ধ মানুষের কিডনিসহ নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রির মতো জঘন্য কাজ করেছেন মানবতার অন্তরালে। এর চেয়ে নিকৃষ্ট, জঘন্য এবং ঘৃণ্য কাজ আর কী হতে পারে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি খবর পড়ে আমার নিজেরই নিঃশ্বাস প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড় : ‘চাইল্ড অ্যান্ড ওল্ড এজ কেয়ার’-এ কাজ করেছেন- এমন একজন বলেন, ‘কোনো রোগী অসুস্থ হলে সরকারি হাসপাতালে নেয়া হয় না। এখানে রেখেই চিকিৎসা করা হয়। কারণ তিনি চান না কেউ পুরোপুরি সুস্থ হোক। এটা তার ব্যবসা।’ এটাই আদতে মানবতার ব্যবসা। মানবতা যে বেশ মুনাফা অর্জনকারী একটি চমৎকার ব্যবসায়িক পণ্য, সেটা মিল্টন সমাদ্দার নতুন করে প্রমাণ করলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মিল্টন সমাদ্দার যা অপকর্ম করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, সেটা এত বীভৎসভাবে মানুষের সামনে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে মিডিয়া কি সত্যিই সামাজিক দায়িত্বশীলতা পালন করেছে? পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মিডিয়া কি সমাজকে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে না? মিল্টন সমাদ্দারের এ ঘটনার পর বাংলাদেশের ওল্ড হোমগুলোর (বৃদ্ধাশ্রম) ওপর কি একটি নেতিবাচক সামাজিক প্রভাব পড়বে না? যারা বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রাখেন, তাদের মনের ওপর কি একটা আতঙ্কের চাপ সৃষ্টি করছে না? শিশুদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন চ্যারিটেবল সংগঠনগুলো যাদের অর্থায়ন হয় মানুষের মানবিক অনুদান থেকে, তাদের ওপর কি একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না? কিংবা সাধারণ মানুষ বিশেষ করে শিশু-কিশোররা এ সংবাদ পড়ে সমাজের একটি ভয়ংকর এবং বীভৎস চেহারা কি এর মধ্য দিয়ে পাবে না? তাদের মনের ওপর কি একটা বীভৎস চাপ সৃষ্টি হবে না? আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, বাংলাদেশে অসংখ্য ওল্ড হোম আছে, শিশুদের লালন পালনের জন্য অসংখ্য চ্যারিটেবল সংগঠন আছে এবং অসংখ্য এতিমখানা আছে। এদের মধ্যে অনেকেই সত্যিকার অর্থে প্রকৃত মানবতার কাজ করে। সবাইকে মিল্টন সমাদ্দারের বাটখারায় মাপা যাবে না। এবং ঠিকও হবে না। তাই আমি মনে করি, এ ধরনের ভয়ংকর এবং নিকৃষ্ট খবর প্রচার এবং পরিবেশনের ক্ষেত্রে মিডিয়ার আরো দায়িত্ব হওয়ার প্রয়োজন আছে, কেননা এ ধরনের ভয়ংকর ও বীভৎস খবর সমাজের ওপর কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারে সেটা মাপঝোঁক করাও সংবাদিকের পেশাগত দায়িত্বের অংশ বটে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমাদের সম্মিলিত সামাজিক দায়িত্বশীলতা একটি সুষ্ঠু এবং সুস্থ সমাজের বিকাশের জন্য জরুরি। আর একটি সুষ্ঠু ও সুস্থ সমাজের মানবতার ব্যবসা হয় না, সত্যিকার মানবতার চর্চা হয়। মানুষ ও মানবতার মেলবন্ধন একটি সুষ্ঠু সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App