×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

জ¦ালার উপজ¦ালায় উপজেলা

Icon

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জ¦ালার উপজ¦ালায় উপজেলা
গরমের জ¦ালা একদম নিরপেক্ষ। আওয়ামী লীগ-বিএনপি, জাতীয় পার্টি-জামায়াত, ডান-বাম বাছবিচার নেই। এ জ¦ালা সবাইকে জ¦ালাচ্ছে সমানে। শীতাতপে কেউ এ জ¦ালা যদ্দুর সম্ভব নিয়ন্ত্রণে বা বশে আনে। বাজারে নিত্যপণ্যের জ¦ালায় কিছুটা হেরফের আছে। সেখানে সামর্থ্যরে প্রশ্ন। যার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যত বেশি বাজারের জ¦ালা তার তত কম। এর মাঝে রাজনীতির দহন। বিশেষ করে এ গরমের মাঝে উপজেলা নির্বাচন স্থানীয় হলেও জাতীয় রাজনীতিকে মৃদু দাহতে ফেলেছে। তা ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগে এক কিছিমের। বিএনপিতে আরেক। আর উপজেলা পদ্ধতির প্রবর্তক দল জাতীয় পার্টিতে একদম গুরুচরণে। রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ অনেকটা নির্ভার। মাঠ ফাঁকা। কার্যকর কোনো প্রতিপক্ষই নেই সরকারের। কিন্তু উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে ঘরের ভেতরে অনাকাক্সিক্ষত বিরোধ। ৭ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মডেলের মাঝে আরেক মডেল। ওই নির্বাচনে বিরোধী দল বিএনপি না আসায় নিজ দল থেকেই ডামি, স্বতন্ত্র, বিদ্রোহী, নৌকা, ঈগল, ট্রাক ইত্যাদিতে নির্বাচনের এক নতুন মডেল তৈরি করেছে সরকারি দল। এখন উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নৌকা তুলে দেয়া হয়েছে। এতে আরেক বিপত্তি। নাটোরে একজন প্রার্থীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো। নোয়াখালীতে এক এমপি তার ছেলেকে ভোট না দিলে এলাকায় কোনো উন্নয়ন করবে না, এমন হুমকি দিলেন। তা রুখতে মন্ত্রী-এমপির স্বজনদের নির্বাচন না করার কঠোর নির্দেশনা। আল্টিমেটাম, বিবৃতি, মন্তব্য, সাংগঠনিক বার্তা, টেলিফোনে অনুরোধ থেকে শুরু করে দলীয় কার্যালয়ে তলব পর্যন্ত করা হয়েছে। তারপরও উপজেলা নির্বাচন থেকে সরানো যায়নি মন্ত্রী ও এমপির স্বজনকে। ৮ মে প্রথম ধাপের নির্বাচনে মন্ত্রী ও এমপিদের প্রায় ১৬ জন নিকটাত্মীয় বা পরিবারের সদস্য উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন। আওয়ামী লীগ এখনো আশাবাদী ৮ মের নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করা এমপিদের আত্মীয়স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াবেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানো আওয়ামী লীগ নেতাকে সমর্থন করবেন। কিন্তু তাদের রোখা যাচ্ছে না। দুয়েক দিনের মধ্যে তাদের বিষয়ে একটি সিদ্ধান্ত আসতে পারে। শক্ত প্রতিদ্ব›দ্বী মাঠে না থাকায় প্রথম দফা উপজেলা নির্বাচনে বিনাপ্রতিদ্ব›িদ্বতায় জিতে গেছেন ২৬ জন। যা গত সংসদ নির্বাচনেও হয়নি। সামনের তিন দফায় তা কোথায় গড়াতে পারে, সেই ধারণা করাই যায়। এর আগেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ একই ধরনের হুঁশিয়ারি দিলেও পরে নির্দেশনা উপেক্ষাকারী নেতাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করতে হয়। এমনকি তৃণমূলকে দলের সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য করতে আওয়ামী লীগ তাদের সনদে বহিষ্কারের বিধানও সংশোধন করেছে। এবারের উপজেলা নির্বাচন ঘিরে আরেক জ¦ালা-যন্ত্রণা। গত ১৫ বছরের শাসনামলে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ, বিদ্রোহী প্রার্থী, দলীয় কোন্দল সৃষ্টি হয়েছে দলটির। ২০১৯ সালের ২১ অক্টোবর বিদ্রোহী নেতাদের কাছে পাঠানো হয় চিঠি। তাতে বলা হয়, ভবিষ্যতে সংগঠনের স্বার্থ পরিপন্থি কার্যক্রম ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ না করার শর্তে তাদের ক্ষমা করা হয়েছে। তবে ১৯২ জন সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের কথা স্বীকার করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে ক্ষমা চেয়ে চিঠি দেন। তারা ভবিষ্যতে সংগঠনের গঠনতন্ত্র, নীতি ও আদর্শ পরিপন্থি কোনো কার্যক্রমে সম্পৃক্ত না হওয়ারও অঙ্গীকার করেন। ১৯২ জনের মধ্যে উপজেলা নির্বাচনে বিদ্রোহীদের মধ্যে ১২৬ জন চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এই চেয়ারম্যানরাসহ ওই নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্ব›িদ্বতার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার শঙ্কা ছিল বেশ জোরালো। দ্বিতীয় ধাপে দলের শতাধিক নেতাকর্মীকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। নানা কারণে দলের দায়িত্বশীল বেশ কয়েকজন নেতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীকে দল থেকে বহিষ্কার করে আওয়ামী লীগ। বহিষ্কৃত হয়েছিলেন এমন অনেক নেতাকে পরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এমনকি দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বিভিন্ন পর্যায়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বহিষ্কৃতরাও পেয়েছেন সাধারণ ক্ষমা। এছাড়া দল বা সংগঠনে থেকে দলের বিরুদ্ধে নির্বাচন করা, দলের সঙ্গে নানা রকম প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা এবং দলীয় নিয়মনীতি ভঙ্গসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে দল থেকে আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এর মধ্যে গত কাউন্সিলের মিটিংয়ে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল, ছোটখাটো অপরাধ করেছিল, তাদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। অন্যদিকে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচন না করলেও দলের নিয়মনীতি ভঙ্গসহ বিভিন্ন কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ও জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ড. মুরাদ হাসান। পরে তাকেও সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হয়। এর আগে আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচন বা বিদ্রোহী প্রার্থীকে সহায়তা করেছিলেন তাদের বহিষ্কার বা শাস্তি নিয়ে স্বস্তির বার্তা দেয়া হয়েছিল। বিএনপির জ¦ালার তেজ আরেক রকমের। জাতীয় নির্বাচনের পর উপজেলার ভোট বয়কট করে আসা বিএনপি এখন অনেকটা বেকায়দায়। উপজেলা নির্বাচনে এসে এর একটা বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। চলমান উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি না গেলেও তাদের অন্তত তিন ডজন চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোটের মাঠে রয়েছেন। সাংগঠনিকভাবে সর্বোচ্চ শাস্তির বার্তা দিয়েও উপজেলা নির্বাচনে ভোটমুখী নেতাকর্মীকে ঠেকাতে পারছে না বিএনপি। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করায় সব মিলিয়ে ৭৬ জনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির জন্য পরিস্থিতিটা করুণ। জাতীয় নির্বাচনের পর এখন স্থানীয় নির্বাচনে গেলেও সমস্যা, না গেলেও বিপদ বিএনপির। কতদিন পর্যন্ত ভোট বয়কট করে তৃণমূল নেতাকর্মীকে ধরে রাখা যাবে- সেটা বড় প্রশ্ন। কারণ তৃণমূলে নির্বাচন না করলে মাঠ থেকে একেবারে হারিয়ে যেতে হয়। বহিষ্কারে কতটা সমাধান আসবে, এটা সময় বলে দেবে। জাতীয় পার্টি আছে মহাজ¦ালায়। দল সামলাতে গিয়ে উপজেলা নিয়ে ভাবার অবস্থাই নেই উপজেলা প্রবর্তনকারী দলটির। তাদের নেতাদের যাবতীয় ব্যস্ততা অন্য বিষয়ে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দল আরেক দফা ভেঙেছে। এরশাদপতœী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে আলাদা কমিটি গঠন হয়েছে, যে কমিটিতে বেশ কয়েকজন নেতার নাম রয়েছে, যারা জি এম কাদেরের নেতৃত্বে কমিটিতেও আছেন। এই অবস্থায় এই সভা ডাকা হয়। একই দিন রওশনের কমিটির পরিচিতি সভা হওয়ার কথা ছিল। তবে গরমের কারণ দেখিয়ে সেই সভা স্থগিত করা হয়। দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের পরে ডাকা দলের প্রথম বর্ধিত সভায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে বলতে হয়েছে দলের করুণ অবস্থার কথা। নির্বাচনে যেতে চাননি, তারপরও কেন গেলেন সেই প্রেক্ষিত শুনিয়েছেন তিনি। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলেও চাপের মুখে তা পাল্টাতে বাধ্য হয় জানিয়ে তিনি বলেন, কোন্দল করে দল ভেঙে দেয়া হবে- এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। বলতে বলতে এক পর্যায়ে জানান, আমি জেনে গিয়েছিলাম, কিছু শক্তিশালী দেশ এই সরকারকে জয়ী করতে চায়। তাই আমি নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। পরবর্তী সময়ে সরকার আমাদের সঙ্গে নেগোসিয়েশনে গেল। ... ২৬ জনের তালিকা দেয়া হলো। কিন্তু আওয়ামী লীগ যেখানে জাতীয় পার্টির ক্যান্ডিডেট দিল সেখানে স্বতন্ত্র পাওয়ারফুল প্রার্থীও রেখেছে।’ কেবল কয়েকটি আসনে নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘সরকার যাকে পাস করাতে চায়, তাকে পাস করানো হয়েছে। আমি যেই আসনে নির্বাচন করেছি, সেখানেও আমাকে হারানোর জন্য অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। ... দলের কিছু নেতা জাতীয় পার্টির ছবি না দিয়ে আওয়ামী লীগের ছবি দিয়ে পোস্টার করে জানিয়ে জি এম কাদের বলেন, ‘এটা পার্টি মানবে না। যারা গৃহপালিত বিরোধী দল হতে চায়, চলে যান। আমরা হব না। গৃহপালিত হলে রাজনৈতিক মাঠে হারিয়ে যাবেন, আমি ছাড় দেব না।’ যেখানে এ সময়ে কথাবার্তা বা আলোচনা হওয়ার কথা উপজেলা নির্বাচন নিয়ে, সেখানে জাপা চেয়ারম্যান দিয়েছেন ভিন্ন বিনোদন। আর তার বিরোধী রওশনপন্থি জাপার শীর্ষ নেতা কাজী ফিরোজ রশীদ আরেক চামচ দেয়ার মতো যোগ করেছেন... জাতীয় পার্টিকে আগে ‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল বলা হতো, এখন ‘ক্রীতদাস’ বলা হয়। ... ‘এই পার্টির ভবিষ্যৎ অন্ধকার।’ ভেতরের খবর হচ্ছে, উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দিলেও জি এম কাদের কিংবা রওশন অনুসারীরা ভোটের মাঠে নেই। প্রার্থী দেয়ার অবস্থা নেই। নির্বাচনের জামানত ১ লাখ টাকা জলে ফেলার মতো লোক এখন পর্যন্ত ১০ জনও পাওয়া যায়নি। আবার এ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়ার বাস্তবতাও নেই জাতীয় পার্টির। পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু একদম পরিষ্কার করে বলেছেন, ‘সুষ্ঠু ভোটের নিশ্চয়তা না থাকায় আমাদের ভালো প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী নন। তারা সুষ্ঠু ভোটের নিশ্চয়তা পেলে নির্বাচন করবেন, কিন্তু আমরা তো দল থেকে সেই নিশ্চয়তা দিতে পারব না। তাই আমরা কিছুটা অসহায়।’ মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App