×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

প্রথম অর্থসচিবের চোখে শেখ মুজিবের সোভিয়েত সফর

Icon

ড. এম এ মোমেন

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

প্রথম অর্থসচিবের চোখে শেখ মুজিবের সোভিয়েত সফর
১৯৭১-এ রাশিয়া নামের কোনো দেশ ছিল না, ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। গণতন্ত্রের ঢেউ, ধনতন্ত্রের চাপ, নেতৃত্বের ওপর অনাস্থা এবং জনগণের গতিশীলতায় সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন কিংবা রুশ ফেডারেশনের পূর্ব ইউরোপীয় অঞ্চলে সৃষ্টি হয়েছে রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ ও মলডোভা; সেন্ট্রাল এশিয়ায় উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান; জর্জিয়া, আজারবাইজান ও আর্মেনিয়া পড়েছে ট্রান্স-ককেশাস অঞ্চলে এবং বাল্টিক এলাকায় পড়েছে লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়া। ১৯৭১ সালে লিওনিদ ব্রেজনেভ ছিলেন সোভিয়েত শাসক দল কমিউনিস্ট পার্টির প্রবল ক্ষমতাধর মহাসচিব, আলেক্সি কোসিগিন ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, নিকোলাই পদগর্নি প্রেসিডেন্ট, আদ্রেই গ্রোমিকো পররাষ্ট্রমন্ত্রী। একাত্তরের ২ এপ্রিল সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগর্নি উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে লেখেন, ‘ঢাকায় আলোচনা ভেঙে যাওয়ার খবর এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের বিরুদ্ধে সামরিক প্রশাসনের চরম ব্যবস্থা গ্রহণ ও সশস্ত্র শক্তি প্রয়োগের খবর সোভিয়েত ইউনিয়নে গভীর আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে। যেসব ঘটনা ঘটেছে তাতে পাকিস্তানের অসংখ্য মানুষের মৃত্যু, ভোগান্তি ও দুরবস্থায় সোভিয়েত জনগণ উদ্বিগ্ন না হয়ে পারে না। এম রহমান (শেখ মুজিবুর রহমান) ও অন্যান্য রাজনীতিবিদ যারা সম্প্রতি সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের নিরঙ্কুশ সমর্থনে বিজয়ী হয়ে এসেছেন, তাদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতন সোভিয়েত ইউনিয়নে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। লিওনিদ ব্রেজনেভ বলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মৌলিক অধিকার দাবিয়ে রাখা এবং লাখ লাখ শরণার্থী ট্র্যাজেডির কারণেই এই যুদ্ধ...।’ আলেক্সি কোসিগিন ও ব্রেজনেভ ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় মার্কিন অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর প্রথম সোভিয়েত সফর ছিল মূলত একটি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপক সফর। তার সফর সঙ্গী হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম অর্থসচিব এম মতিউল ইসলাম। এ সফর নিয়ে তারই রচনার অনুসৃতি : ১১ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদে আসীন হন এবং মার্চের প্রথম দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন সফরের পরিকল্পনা করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের সক্রিয় সহযোগিতা বৃহৎ শক্তির হস্তক্ষেপ দেরি করিয়ে দিয়েছে কিংবা বাধাগ্রস্ত করেছে এবং নিরাপত্তা পরিষদে সময়োচিত সোভিয়েত হস্তক্ষেপ স্বাধীনতাযুদ্ধে সফল সমাপ্তি ঘটাতে সহায়তা করেছে। এসব সহযোগিতাই বঙ্গবন্ধুর সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর ত্বরান্বিত করেছে। তিনি কৃতজ্ঞ জাতির পক্ষে তাদের ধন্যবাদ জানাবেন। তাছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্গঠনে সোভিয়েত সহায়তার ওপর আমরা নির্ভর করছি। চট্টগ্রাম বন্দর ডুবে যাওয়া জাহাজে আবদ্ধ হয়ে আছে, আশুগঞ্জ পাওয়ার প্ল্যান্ট তো পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে শুরু হয়েছিল, এখন থমকে আছে। এ ধরনের প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন আটকে আছে। এসব চুক্তি আবার সমঝোতার মাধ্যমে চূড়ান্ত করতে হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন পুনরায় শুরু করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ, পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান ডক্টর নুরুল ইসলাম, পররাষ্ট্র সচিব, অর্থসচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব চিফ অব প্রটোকল ও অন্যান্য ব্যক্তিগত স্টাফ। একদল জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকও প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়েছেন। সোভিয়েত সরকার ভিভিআইপি ফ্লাইটের আসা-যাওয়ার জন্য ইউশিন ১৮ এয়ারলাইনার চার ইঞ্জিনের একটি টার্বোপ্রপ যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ পাঠিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য উড়োজাহাজের সামনের দিকে ভিআইপি কেবিন, ডক্টর নুরুল ইসলামের আসনও সেখানে, সফরসঙ্গী অন্য সব সদস্যের আসন জাহাজের সামনের দিকে, মস্কো যাওয়া ও ফেরার দীর্ঘ ক্লান্তিকর ভ্রমণে ভেতরে শরীর টানা দেয়ার মতো পর্যন্ত পরিসর এই উড়োজাহাজে। পাকিস্তানের আকাশসীমা এড়িয়ে যেতে সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঢাকা ছেড়ে আসা ভিআইপি ফ্লাইট রিফুয়েলিংয়ের জন্য বোম্বেতে টেকনিক্যাল ল্যান্ডিং করল। বোম্বের নাগরিকরা এয়ারপোর্টে প্রধানমন্ত্রীকে একটি বড় ধরনের সংবর্ধনা জানাল। এতে মহারাষ্ট্রের গভর্নর ও বোম্বের শেরিফ উপস্থিত ছিলেন। ঢাকা থেকে যাত্রার প্রথম দিকটাতে আমি ভিআইপি কেবিনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কিছুক্ষণ সময় কাটালাম। তিনি অত্যন্ত আয়েশি মুডে ছিলেন। লায়লপুর জেলে থাকাকালীন তার ভয়াবহ দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করছিলেন। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে, তাকে যেখানে রাখা হয়েছিল, জেলখানার ভেতর তিনি তার নিজের কবর খনন হওয়া দেখেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সম্বন্ধে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন, ইয়াহিয়া খানের পতন এবং রাজনৈতিক দৃশ্যপটের নাটকীয় পরিবর্তনের ফলে জুলফিকার আলী ভুট্টো যতক্ষণ না তাকে রাওয়ালপিন্ডির বাইরে একটি রেস্ট হাউসে নিয়ে আসেন। ভুট্টো তাকে দেখতে আসেন এবং ঘোষণা করেন, তিনি (ভুট্টো) এখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক। বঙ্গবন্ধুর তাৎক্ষণিক সাড়া ছিল, ভুট্টো নির্বাচনে আমি বিজয়ী হয়েছি, আপনি নন। কাজেই কাউকে যদি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হতে হয়, তা হব আমি। ভুট্টো তাকে উপমহাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ব্রিফ দিলেন এবং জানালেন বাংলাদেশ এখন বাস্তবতা এবং ভুট্টো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁকে মুক্তি দেবেন যাতে তিনি বাংলাদেশে ফিরে জাতিকে নেতৃত্ব দিতে পারেন। আমরা মধ্যরাতের দিকে বোম্বে থেকে যাত্রার দ্বিতীয় পর্যায়ে মস্কোর দিকে যাওয়ার আগে জর্জিয়ার রাজধানী তিবিলিসি রওনা হলাম। সাত ঘণ্টার ফ্লাইট, প্রায় সবটাই ইরান ও সেন্ট্রাল এশিয়ার ওপর দিয়ে, আমরা সবাই দীর্ঘ সফরের জন্য আরামদায়ক অবস্থান নিলাম। আমরা যখন উড়োজাহাজ থেকে নামলাম সোভিয়েত ইউনিয়নের ভয়ংকর শীত তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের আঁকড়ে ধরল। যদিও তখন মার্চের প্রথম ভাগ সোভিয়েত ইউনিয়নের শীতের যাত্রা অব্যাহত, রুশ শীত প্রতিরোধ করার মতো যথাযথ পোশাক আমাদের নেই। জর্জিয়ার গভর্নর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বক্তিবর্গ প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং বিশালাকৃতির স্থাপনা পুরনো এয়ারপোর্ট টার্মিনাল ভবনে নিয়ে গেলেন, এটি মোটেও আধুনিক টার্মিনালের মতো নয়। আমাদের সবাইকে একটি হলরুমে নিয়ে যাওয়া হলো, সেখানে টেবিল পাতা, জ¦লজ¦লে স্ফটিকের পাত্রে আমাদের নাস্তা অপেক্ষমাণ। কয়েক মুহূর্ত পরই তাদের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বললেন, প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়া আর সবাই যেন তাকে অনুসরণ করি। আমরা বাধ্যগত হয়েই এয়ারপোর্ট ভবনের করিডোরের মায়াজালের মধ্য দিয়ে তাকে অনুসরণ করলাম। আমাদের জন্য যে কত বড় বিস্ময় অপেক্ষমাণ যতক্ষণ পর্যন্ত না পাশ্চাত্য দেশের স্টাইলে সাজানো বিভিন্ন ধরনের মালামালে ভর্তি একটি বড় হলরুমের সামনে হাজির হই, আমরা বুঝতে পারিনি। সেই সব সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে শার্ট, আন্ডারগার্মেন্টস মোজা, জুতা, বুট, সোয়েটার, স্যুট, টপ কোট, পশমি টুপি, হ্যান্ড গøাভস- দুটি হলরুমে পরিপাটিভাবে সাজানো। যে রুশ কর্মকর্তা আমাদের এখানে নিয়ে এসেছেন শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন, ভদ্র মহোদয়গণ আপনাদের যা যা দরকার বেছে নিন। আমরা পোশাকের দিকে ঝুঁকে পড়ি যার যার পছন্দ মতো সঠিক সাইজ মেলাবার জন্য, আমাদের তীব্র অনুসন্ধান শুরু হয়ে যায়। জুতা, মোজা, শার্ট, আন্ডারগার্মেন্টস, ওভারকোট, লেদার গøাভস, পশমি টুপি পুলওভার থেকে শুরু করে সবই তুলে নিই; তাদের দেয়া বড় ব্যাগে আমাদের নতুন সব অর্জন ভরে রাশিয়ার তীব্র শীত মোকাবিলা করতে উড়োজাহাজে নিয়ে আসি। এক সময় আমি যখন একটি টপ কোট গায়ের মাপে মেলাতে চেষ্টা করছিলাম পররাষ্ট্র সচিব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন সফর শেষে ফেরার সময় রাশানরা আবার না এসব রেখে যেতে বলে। আমার খুব দৃঢ় জবাব, প্রশ্নই আসে না। নাস্তা শেষ হলে আমরা আমাদের সফরের শেষ ভাগে মস্কোর উদ্দেশে আমাদের উড়োজাহাজ উড়ল। আমরা বিকাল নাগাদ পৌঁছলাম। সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী আলেক্সি কোসিগিন এবং তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানালেন এবং রেড আর্মির একটি চৌকস দল তাকে প্রশংসনীয় একটি গার্ড অব অনার প্রদান করল। প্রধানমন্ত্রী উড়োজাহাজ থেকে বের হলেন নবলব্ধ রুশ পোশাকে সজ্জিত হয়ে, গ্যাংওয়ে ধরে যখন এগোচ্ছিলেন রাশান ব্যান্ড তখন আমার সোনার বাংলার সুর বাজাচ্ছিল। আমি বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের যত বাদন শুনেছি তার মধ্যে এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ। আমরা যখন ক্রেমলিন পৌঁছলাম তখন অপরাহ্ণ উত্তীর্ণ হয়ে গেছে; এখানে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের অধিকাংশ অবস্থান করবেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে সোভিয়েত ফার্স্ট সেক্রেটারি লিওনিদ ব্রেজলেভ যে সংবর্ধনা ও বাঙ্কোয়েটের আয়োজন করেছেন তাতে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত হতে আমাদের বলা হলো। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর রুশ প্রতিপক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক দাপ্তরিক আলোচনার জন্য পরের দিনটি নির্ধারিত। আমাদের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে সহায়তা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পরিকল্পনা কমিশনের ডেপুটি চেয়ারম্যান, সোভিয়েত ইউনিয়নে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শামসুর রহমান, পররাষ্ট্র ও অর্থসচিব। বঙ্গবন্ধু প্রায় তিন ঘণ্টা বক্তৃতা করলেন। বিস্তারিতভাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নৃশংসতার কথা বললেন, অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ দিলেন, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় জরুরি সহায়তার কথা বিবৃত করলেন। প্রধানমন্ত্রী বাংলায় বললেন আর আমন্ত্রণকারী সরকারের দোভাষী পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তা উপস্থাপন করলেন। আর তাতেই প্রথম অধিবেশনের পুরোটা সময় কেটে গেল, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে কোসিগিনের সাড়া পরের দিনের জন্য নির্ধারিত হলো। এতে রাশানরাও তাদের মনস্থির করার সময় পেল বাংলাদেশকে কী সাহায্য প্রদান করবে, তা বিবেচনা করতে পারবে। কোসিগিন রুশ ভাষায় বলেন এবং দোভাষী তা যথাযথভাবে বাংলায় তর্জমা করে দিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সহায়তার অনুরোধ কোসিগিনের সাড়া উৎসাহব্যঞ্জক। তার সরকার সক্রিয়ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় সহায়তা করেছে, এখন পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় আর্থিক সহায়তা করতে প্রস্তুত। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজেরও যেহেতু আর্থিক সমস্যা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ মেনে নিয়ে ব্যাপক আর্থিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে কোসিগিন জানালেন। তারপরও তিনি সংক্ষেপে তার সরকারের তাৎক্ষণিক সহায়তার একটি বিবরণী পেশ করলেন : চট্টগ্রাম বন্দর চালুর ব্যবস্থা করা, বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য লোকোমোটিভ দেয়া, কিছু পরিমাণ গম সরবরাহ করা এবং রুশ সহায়তায় শুরু হওয়া পাওয়ার প্ল্যান্ট, জিইএম প্ল্যান্ট ইত্যাদি এবং আরো কিছু বিষয়ে পুনরায় কাজ শুরু করা। ডক্টর নুরুল ইসলাম এবং আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহায়তার প্যাকেজ নিয়ে পুনরায় সমঝোতা করে প্রকল্পগুলো আবার চালুর পথ সুগম করলাম। প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের সংক্ষিপ্ত সফরে লেনিনগ্রাদ নিয়ে যাওয়া হলো, সে সময় আমরা আর্ট গ্যালারি হার্মিটেজ পরিদর্শন করলাম, এখানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কিছু চিত্র সংগৃহীত আছে। সিটি কাউন্সিল হলে ডিনারের সময় প্রধানমন্ত্রীর ডাক পেলাম। তিনি আমাকে এক পাশে ডেকে নিয়ে একটি খাম হাতে দিয়ে বললেন, ‘আমার আশঙ্কা হচ্ছে তোমাকে ডিনারটা বাদই দিতে হবে। এখানে প্রেসিডেন্ট জাস্টিস আবু সাঈদ চৌধুরীর কাছ থেকে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত ডিসাইফার করা বার্তা রয়েছে। হোটেলে ফিরে যাও, একটি যথাযথ উত্তর তৈরি করে আজ রাতের মধ্যে জবাব পাঠিয়ে দাও।’ আমি বার্তাটি পড়লাম এবং হতবাক হয়ে গেলাম। আমরা মস্কোর উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার আগে ঠিক করা হয়েছিল উচ্চমানের পাকিস্তানি নোট ধীরে ধীরে প্রত্যাহার করে নেয়া হবে এবং ২০ মার্চ ১৯৭২ তা অচল বলে ঘোষিত হবে। আশঙ্কা করা হচ্ছিল পূর্ব পাকিস্তান হারানোর ক্ষতি মানতে না পেরে পাকিস্তান তাদের নোট অচল ঘোষণা করে বাংলাদেশে চালু মুদ্রা এখন অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। ৯ বা ১০ তারিখে লেনিনগ্রাদে প্রধানমন্ত্রী যে বার্তাটি পেয়েছেন তাতে বলা হয়েছে পাকিস্তান আকস্মিকভাবে উচ্চমূল্যের নোট অচল ঘোষণা করেছে। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রেসিডেন্টকে একটি ঘোষণা প্রদানের জন্য অনুরোধ করেছেন যাতে তাৎক্ষণিকভাবে বাংলাদেশে চালু নোটগুলো অচল ঘোষণা করা হয়। কিন্তু যেহেতু প্রেসিডেন্ট কেবল প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই কাজ করতে পারেন, কাজেই বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়াতে এরই মধ্যে জারি করা ঘোষণার ঘটনা-উত্তর অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চাওয়া হয়েছে। আমি একটি জবাব প্রস্তুত করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে পাঠিয়ে দিলাম। সে রাতে আমার ডিনার ছিল হোটেলের কিচেন থেকে পাঠিয়ে দেয়া ঠাণ্ডা মুরগি। আমাদের সফরের তৃতীয় দিন বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রী এবং লিওনিদ ব্রেজনেভের নির্ধারিত একান্ত বৈঠক। একই দিনে তার দেয়া মধ্যাহ্নভোজে তিনি সম্মানীয় অতিথি। কিন্তু সেদিন আড়াইটার আগে প্রধানমন্ত্রী ব্রেজনেভের সঙ্গে সে বৈঠক থেকে বের হলেন না। মধ্যহ্নভোজ পিছিয়ে গেল। সুবিধাজনক সময় আমি প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, ব্রেজনেভের সঙ্গে সাড়ে তিন ঘণ্টার বৈঠকে তিনি কী আলাপ করেছেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, এটা খুব ফলপ্রসূ সাক্ষাৎ আলোচনা হয়েছে। তিনি বিস্তারিত কিছু বললেন না, আমিও জানতে চাইলাম না। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দুই নেতার মধ্যে আলোচনায় কোনো দাপ্তরিক রেকর্ড রয়েছে কিনা আমার জানা নেই। আমাদের সফরসূচিতে তাশখন্দ গমন অন্তর্ভুক্ত হলো। ব্যাপক মুসলিম অধ্যুষিত এই অংশে এলে দক্ষিণ ও উত্তরের মধ্যে তুলনামূলক অর্থনৈতিক বৈষম্যের দৃশ্য লক্ষ না করে পারা যাবে না। এখানকার জনগণ সরল বিনয়ী। এয়ারপোর্টে আমাদের জন্য নির্ধারিত গাড়ি পেলাম, ড্রাইভার আসসালমু আলাইকুম বলে সম্ভাষণ জানান। এটা ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু মধুর সফর, আমাদের আনুষ্ঠানিক সফরসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় একটি যূথবদ্ধ খামার পরিদর্শন এবং স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে সাক্ষাৎ। এর আগে আমরা যখন মস্কো ছেড়ে আসি প্রধানমন্ত্রীকে দাপ্তরিক ও আনুষ্ঠানিক বিদায় জানান সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী কোসিগিন। সেখান থেকে সরাসরি তাশখন্দের উদ্দেশে উড়োজাহাজ ছেড়ে আসে। সকালবেলা প্রাণ হরণ করা নাস্তা সেরে আমি যখন আয়েশ করছিলাম, রুশ কেবিন ক্রু ক্যাভিয়ার পরিবেশন করে; ঠিক তখনই ভিআইপি কেবিনে প্রধানমন্ত্রীর ডাক পাই। প্রধানমন্ত্রী একটি অস্বাভাবিক ধরনের অনুরোধ করেন। তাকে একটি রবীন্দ্রসংগীত শোনাতে বলেন। চারটি টার্বোপ্রপ ইঞ্জিনের শব্দ যে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক সৃষ্টি করেছে তাতে আমি একজন মহান ব্যক্তির আদেশ প্রতিপালন করতে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। যে ভালোবাসা ও স্নেহ আমার ওপর অর্পণ করেছেন তাঁর কাছে আমার যে ঋণ তা কখনো পরিশোধ করতে পারিনি। পাকিস্তানি সামরিক জান্তা আমার মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করেছিল, যেভাবে তিনি তা পুনরুদ্ধার করেছেন, আমার সে ঋণ অপরিশোধ্যই রয়ে গেছে। ড. এম এ মোমেন : সাবেক সরকারি চাকুরে, নন-ফিকশন ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App