×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

উন্নয়ন-স্থায়িত্বে মেধাচর্চার গুরুত্ব

Icon

ইফতেখার নাজিম

প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

উন্নয়ন-স্থায়িত্বে মেধাচর্চার গুরুত্ব
সাম্প্রতিক দেশের বিশেষায়িত বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি চালুকে কেন্দ্র করে বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ছাত্ররাজনীতির আদর্শিক চর্চা থাকলে, সেটি যে কোনো পর্যায়ে চর্চায় শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করবে। এটাই স্বাভাবিক। এখানে জোরজবরদস্তির বিষয়টি জড়িত হবে কেন। স্বাধীনতা পূর্ববর্তীকালে দেশের প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে যারা নেতৃত্ব দিতেন, তাদের অধিকাংশই ছিল মেধাবী ছাত্রনেতা। শিক্ষার্থী, ইনস্টিটিউশন সর্বোপরি জাতির প্রতি তাদের বিশেষ দায়বদ্ধতা ছিল। দল লেজুড়বৃত্তির চেয়ে তাদের কাছে জাতি ও সমষ্টির স্বার্থ ছিল অগ্রগণ্য। তাই ছাত্রদের আন্দোলনের হাত ধরে আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা পেয়েছে। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছে। গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রাম জোরদার হয়েছে। শাসকগোষ্ঠীর যে কোনো অন্যায্য সিদ্ধান্ত বাতিল হয়েছে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দলীয় লাঠিয়াল বাহিনী বানানোর সংস্কৃতির হাত ধরে ছাত্ররাজনীতিতে মারাত্মক পচন ধরেছে। এখন ছাত্র নেতৃত্বকে জাতীয় স্বার্থ বেশি একটা আকৃষ্ট করতে পারে না। ব্যক্তি বিত্তমোহে তারা বড় ভাই সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েছে। তাদের সামগ্রিক ক্রিয়াকলাপ সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রতিকূলে গিয়ে ঠেকেছে। এখানে এখন আদর্শিক চর্চা বলতে সেøাগাননির্ভর কিছু বাক্যের আধিক্য বেড়েছে। যেগুলোর অন্তঃমূলে চাঁদাবাজি, ভর্তি বাণিজ্য, টেন্ডারবাণিজ্য, দখলদারিত্ব, আবাসিক হলে সিটবাণিজ্য, নিয়োগবাণিজ্য, র‌্যাগিংয়ের মতো অপসংস্কৃতি বেশি কাজ করে। এমন বাস্তবতায় ছাত্র সংগঠনগুলোর সামগ্রিক ক্রিয়া শিরোনাম হয় খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দখল ও চরম নৈরাজ্যকেন্দ্রিক। যে নৈরাজ্যে প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে বিরাজ করছে চরম অরাজকতা। যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের শুধু শিক্ষা পরিবেশ নয়, সময়ে সময়ে জীবন শঙ্কার কারণ হয়ে উঠে। যে শঙ্কায় মেধাবী সনি, আবরার, খাদিজাদের সারি বাড়ে, আবার এর দায়ে মেধাবীরা ফাঁসির প্রহরে জীবন পার করে। জাতির মেধাবী সন্তানদের এমন করুণ পরিণতিতে জাতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব কী অর্জন করেন, সেটাই এখন জনমনে প্রশ্ন ঠেকেছে। এক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতি আবর্তিত থাকলেও নব্বই-পরবর্তী সময়ে দলীয় প্রভাব বিস্তারের চিন্তাধারা থেকে ছাত্ররাজনীতির বিস্তৃতি লাভ করেছে প্রত্যন্ত গ্রামীণ স্কুল-কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শুধু ছাত্ররাজনীতি নয়, যুব রাজনীতির ডালপালা বিস্তার করেছে গ্রাম মহল্লায়। ফলে জাতীয় রাজনীতির নৈরাজ্যের প্রভাব গিয়ে ঠেকেছে প্রত্যন্ত গ্রামীণ জীবনে। একসময়ে গ্রামীণ জনপদে গণ্যমান্য গুণী ব্যক্তিরা সমাজব্যবস্থাকে পরিচালনার দায়িত্ব পালন করলেও আজ সে জায়গাটি দখল করেছে বখাটে ছাত্র যুবক। জাতীয় রাজনীতিতে কালো টাকা ও করপোরেট মালিকদের প্রভাব বিস্তারের কারণে জনহৈতষী রাজনৈতিক চর্চা ক্রমেই গৌণ হচ্ছে। ফলে রাজনীতিতে আদর্শ বাক্যের ছড়াছড়ি বাড়লেও মৌলিক আদর্শ হারিয়েছে। এখন রাজনীতি সমাজ ও রাষ্ট্র পরিবর্তনের নীতি দর্শনের চেয়ে ব্যক্তি ভাগ্য পরিবর্তনের হাতিয়ারে রূপ নিয়েছে। গণতান্ত্রিক চর্চার নামে এখন প্রার্থী ও ভোট বিক্রির উৎসব চলে। রাজনীতির এখন অনেকটা কালো টাকার খেলায় পরিণত হয়েছে। সামগ্রিক পচনের কালোছাপ পড়েছে কিশোরদের মাঝেও। বেড়েছে কিশোর গ্যাং। যে কিশোর ছাত্র-যুবকদের হাত ধরে আগামীর বাংলাদেশ চলবে, তাদের নানাভাবে নষ্ট করে দেয়া হচ্ছে। প্রভাব বলয় বৃদ্ধির জন্য কিশোর তরুণ শিক্ষার্থী ও যুবকদের হাতে মাদক ও অস্ত্র তুলে দেয়া হচ্ছে। তাদের সামনে ‘অর্থ থাকলে সবই সম্ভব’ এমন এক অদ্ভুত অনাদর্শ ধারণা দাঁড় করানো হয়েছে। তাই তারা বড় ভাই সংস্কৃতিতে জড়িয়ে এমন কোনো জঘন্য কর্ম নেই, যা করতে দ্বিধা করছে। দলীয় বৃত্তায়নের গড়ে ওঠা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনযন্ত্রও এই বিপথগামী তরুণদের নানাভাবে উৎসাহ দিয়ে এলাকায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে। বাস্তব অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে- কেউ কারো চেয়ে পিছিয়ে থাকতে নারাজ। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয় আইন সংস্কার করে শিক্ষক ছাত্ররাজনীতি প্রচলনের সুপারিশে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট জানিয়ে দেন এই দুটো বিশ্ববিদ্যালয়কে নষ্ট করা যাবে না। মাটি সিক্ত রাজনীতি থেকে বঙ্গবন্ধু বেড়ে উঠেছেন বিধায় রাজনীতির অলিগলি ও অন্ধ-আলোর সব দিক তার জানা ছিল। তাই তিনি দেশাত্মবোধের জাগরণ থেকে এমন সত্য উচ্চারণ করেছেন। তিনি জানতেন, সবাইকে রাজনীতি করতে হয় না, সবাইকে ইতিহাসবিদ হতে হয় না, সবাইকে সাহিত্যিক হতে হয় না। দেশ গঠন করতে হলে প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের বড় প্রয়োজন। সেই তাড়না থেকে বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের সমাবেশে স্পষ্টতই বলেছিলেন, ‘বাবারা একটু লেখাপড়া শিখ। যতই জিন্দাবাদ আর মুর্দাবাদ করো, ঠিকমতো লেখাপড়া না শিখলে কোনো লাভ নেই। আর লেখাপড়া শিখে যে সময়টুকু পাবে বাপ-মাকে সাহায্য করো। প্যান্ট পরা শিখছ বলে বাবার সঙ্গে হাল ধরতে লজ্জা করো না। দুনিয়ার দিকে চেয়ে দেখ।...শুধু বিএ-এমএ পাস করে লাভ নেই।’ বঙ্গবন্ধুর এই ঐতিহাসিক আহ্বান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘শুধু বিএ, এমএ পাস করলে হবে না, চাকরির পেছনে ঘুরলে হবে না। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, নিজেরা যেন চাকরি দিতে পারে, সেভাবে নিজেদের কাজ করতে হবে। আমরা সেইভাবে এ দেশের যুবসমাজকে গড়ে তুলতে চাই।’ বঙ্গবন্ধু ও তাঁর কন্যার অভিব্যক্তির সঙ্গে বাস্তবতায় প্রচলিত ক্রিয়াশীল ছাত্ররাজনীতির কোনো সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায় কী? বিভাজিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে জাতীয় সব অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনগুলোও প্রায় ভেঙে পড়েছে। এমন কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই, যেখানে অপরাজনীতির স্পষ্ট চাপ এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব। শিক্ষকদের দলবাজি অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের পাঠদানের চেয়ে অনৈতিক ক্রিয়াকলাপের দিকে ঠেলে দিয়েছে। শিক্ষকরা নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের তাগাদা থেকে ক্রিয়াশীল বিশেষ করে সরকার দলীয় ছাত্র সংগঠনকে বেশি ব্যবহার করছে। যার কারণে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অনেক অনৈতিক-অন্যায্য দাবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রত্যাখ্যান করতে ব্যর্থ হয়। মেধাবীদের বিকশিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তব্য ও দায়িত্ব। সবাইকে রাজনীতি করতে হবে; এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে এসে খুনাখুনির ছাত্ররাজনীতি জাতিকে কী দেবে? সেটা ভাবার সময় এসেছে। এখনো আমাদের মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন, উদ্ভাবন ও উন্নয়নের মৌলিক কাজগুলো করার জন্য বিদেশ নির্ভর থাকতে হচ্ছে। অথচ আমরা মেধাবীদের সেভাবে তৈরি না করে বরং নষ্ট করার পাঁয়তারা করছি। সময় এসেছে আমাদের সব বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষ করে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, নার্সিং ইনস্টিটিউটগুলোকে বিভাজিত রাজনৈতিক সংস্কৃতি বলয়ের বাইরে নিয়ে আসার। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর নাগরিক বিকাশে জন্য আন্তঃপ্রতিষ্ঠান বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার ন্যায় সহায়ক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। অন্যদিকে বিকশিত কিশোরদের বিভাজিত রাজনীতিতে ঠেলে না দিয়ে স্কুল কলেজগুলোতে দলীয় ছাত্ররাজনীতি বাদ দিয়ে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান বিতর্ক প্রতিযোগিতা, সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা, শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট নেতৃত্ব চর্চার ন্যায় সহায়ক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। যারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনীতি চর্চার মাধ্যমে নাগরিক বিকাশের কথা বলেন, তারা কেন ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি প্রচলনে নিশ্চুপ! তাদের কাছে বিনীত জিজ্ঞাসা পার্শ^বর্তী ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় ছাত্ররাজনীতি না থাকার কারণে কি তাদের জাতির চাকা থেমে গেছে? চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হওয়ার জন্য যেখানে শিক্ষাগত যোগ্যতার সর্বোচ্চটাকে অগ্রাধিকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেখানে কোনো খোঁড়া যুক্তির বলে আমরা জাতির মেধাবী সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করার জন্য ওঠে পড়ে লেগেছি। যারা ছাত্ররাজনীতি থেকে সুনাগরিক গড়ার অভিপ্রায়ে বুয়েট বা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি প্রচলনের যুক্তি দেখাচ্ছেন, তারা কি সনি, আবরারদের করুণ পরিণতি দেখেননি। তারা কি দেখতে পাচ্ছেন না রাজনৈতিক বৃত্তবলয়ের মাঝে বিকশিত হওয়া মেধাবীরা কর্মজীবনে এসে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েন। যারা প্রশাসনে চেইন অব কমান্ড মানতে অবাধ্য হন। যা রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতি উদ্ভব ঘটায়। জাতির ভবিষ্যৎ দিকদর্শনের চিন্তা-চেতনা ধারণা থেকে জাতীয় অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। জাতির দুর্ভাগ্য, বিভাজিত ছাত্ররাজনীতি অনুশীলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ও দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিয়োগ পাওয়া আমাদের প্রশাসন ও বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দলমতের ঊর্ধ্বে ওঠে সেই নজির স্থাপন করতে পারছেন না। বরং হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ভাষায় তারা সবাই ব্যক্তি প্রাপ্তির প্রবল আকাক্সক্ষা থেকে তৈলবাজির প্রতিযোগিতায় দেশের মুখ উজ্জ্বল করে আছেন। উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে হলে টেকসই উন্নয়ন ও জাতীয় মেধা বিকাশের স্বার্থে আমাদের তৈলবাজির এই অপদৃষ্টান্তের বৃত্তবলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেটাই জনপ্রত্যাশা, সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ। ইফতেখার নাজিম : কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App