×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

লোকসংস্কৃতির মেলা

জব্বারের বলীখেলা

Icon

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জব্বারের বলীখেলা
চট্টগ্রামের লালাদীঘির ময়দানে আবদুল জব্বারের বলীখেলা। বৈশাখ মাসের ১২ তারিখ এ বলীখেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ খেলাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামসহ সারাদেশের মানুষের মধ্যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা বিরাজ করে। চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা গাঁ-গ্রামে বলীখেলা, গরুর লড়াই, ঘোড়দৌড়সহ বিভিন্ন লোকসংস্কৃতি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। এসব মেলাতে এ অঞ্চলের মানুষের গৃহস্থালির নানা ব্যবহার্য পণ্যসামগ্রী বিক্রির জন্য আনা হতো। বছরব্যাপী এ পেশার সঙ্গে জড়িত মানুষগুলো নানাজাতের গৃহস্থালির জিনিসপত্র তৈরি করত। সারাদেশের লালদীঘির বলীখেলার সাদৃশ্যে লোকসংস্কৃতির মেলা জেলা উপজেলার ও গাঁ-গ্রামে তিন দিন, চার দিন ও এক সপ্তাহের জন্য বসত। সেই লোকসংস্কৃতি ও খেলাগুলো স্থানীয় জনগণ নানাজাতের ধর্ম গোত্র পেশার মানুষ উপভোগ করত। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালি জাতি এসব মেলায় একাকার হয়ে আনন্দের সঙ্গে সংস্কৃতির নানা আয়োজন উপভোগ করে আসছে। বৃহদাকারে চলে চট্টগ্রামের লালদীঘির আবদুল জব্বারের এ বলীখেলা। তবে করোনার কারণে ২০২০-২১ বলীখেলাটি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। এবারের বলীখেলা আয়োজনের জন্য ইতোমধ্যে স্থানীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি সব প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানা যায়। মুসলমানদের রমজান, ঈদ এবং বৈশাখীমেলা এবারে একত্রিত হয়ে গেল। তবুও বাঙালি সংস্কৃতি ঐতিহ্যবাহী আবদুল জব্বারের বলীখেলা এবার লালদীঘি মাঠেই অনুষ্ঠিত হওয়ার সংবাদে স্থানীয় সংস্কৃতিমনা মানুষের মধ্যে স্বস্তির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বলীর রাজ্য হিসেবে পরিচিত ‘চট্টগ্রাম’। জব্বারের বলীখেলা সেই নামেরই প্রমাণ বহন করে চলেছে আজো। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কুস্তিকে বলী বলা হয়। জব্বারের বলীখেলা এক বিশেষ ধরনের কুস্তি খেলা, যা এ জেলার লালদীঘি ময়দানে প্রতি বছর ১২ বৈশাখে অনুষ্ঠিত হয়। এই খেলায় অংশগ্রহণকারীদের বলা হয় ‘বলী’। জব্বারের বলীখেলা একটি জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রতিযোগিতা হিসেবে বিবেচিত। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও বার্মার আরাকান অঞ্চল থেকেও নামি-দামি বলীরা এ খেলায় অংশ নিতেন। এই প্রতিযোগিতার শুরু ১৯০৯ সালে, যা আজো চলছে। বলীখেলাকে কেন্দ্র করে লালদীঘি ময়দানের আশপাশে প্রায় ৩ কিলোমিটার জুড়ে বৈশাখীমেলার আয়োজন হতো। এটি বৃহত্তর চট্টগ্রামের সবচেয়ে বৃহৎ বৈশাখী ও লোকসংস্কৃতি মেলা। মধ্যযুগে সেনাবাহিনীতে যারা চাকরি নিতেন, তাদের শারীরিক সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্য তারা কুস্তি করতেন। সেখান থেকেই কুস্তি খেলার শুরু। কিন্তু আবদুল জব্বারের বলীখেলার শুরুটা কীভাবে হয়েছিল? কীভাবে এই প্রতিযোগিতার স্থান করে নিয়েছিল সারাদেশের মানুষের মনে? সেসব ইতিবৃত্ত নিয়ে আজকের লেখা। ১৯০৯ সালে প্রথম এই প্রতিযোগিতার প্রবর্তন করেন চট্টগ্রামের বদরপাতি এলাকার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর। তার মৃত্যুর পর এই প্রতিযোগিতা ‘জব্বারের বলীখেলা’ নামে পরিচিতি লাভ করে। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর এই দেশে ব্রিটিশ শাসন শুরু হয়। বাঙালি সংস্কৃতির বিকাশ এবং একই সঙ্গে বাঙালি যুবসম্প্রদায়ের মধ্যে ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব গড়ে তোলা এবং শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মাধ্যমে তাদের মনোবল বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ী আবদুল জব্বার সওদাগর বলীখেলা বা কুস্তি প্রতিযোগিতার প্রবর্তন করেন। ১৯০৯ সালের ১২ বৈশাখ নিজ নামে লালদীঘির মাঠে এই বলীখেলার সূচনা করেন তিনি। ব্যতিক্রমধর্মী ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনের জন্য ব্রিটিশ সরকার আবদুল জব্বার মিয়াকে খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করলেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। খেলাটা কিছুটা প্রচলন হওয়ার পর আশপাশের বলীরা সেই সময় মাস দুয়েক আগে এসে লালদীঘি ময়দানে জড়ো হতেন। জব্বার মিয়ার বাড়িতেই বড় একটা বৈঠকখানা ছিল। সেই ঘরেই থাকতেন তারা। সেখানেই তারা খাওয়া-দাওয়া করতেন এবং দিনভর নানা শারীরিক কসরত ও অনুশীলন করতেন, প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুতি নিতেন। ধীরে ধীরে চট্টগ্রামের নানা এলাকার বলী বা কুস্তিগীরেরা এই প্রতিযোগিতায় আসতে শুরু করেন। একসময় চট্টগ্রামের আশপাশের জেলা- নোয়াখালী, কুমিল্লাসহ নানা জায়গা থেকেও বলীরা আসত। এরপর সারাদেশ থেকে আসতে শুরু করে কুস্তিবীররা। এমনকি একবার ফ্রান্স থেকে দুজন কুস্তিগীর এখানে অংশগ্রহণ করার ইতিহাস আছে। সত্তরের দশক থেকে ধীরে ধীরে সারাদেশের বলীরা আসতে থাকে। যখন প্রথম টেলিভিশনে সম্প্রচার শুরু হয় তখনই এর সম্পর্কে সবাই আরো ভালোভাবে জানতে পারেন। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল আই প্রথম এর সম্প্রচার করেছিল। এরপর এখন সব টিভি চ্যানেল সম্প্রচার করছে। আর গণমাধ্যমের আগ্রহের কারণে জব্বারের বলীখেলা সম্পর্কে আরো প্রচার বাড়তে থাকে। বর্তমানে দেশে ব্যাপক মিডিয়ার প্রচার প্রসার হয়েছে। ফলে আবদুল জব্বারের বলীখেলা বাংলাদেশ নয়, দেশের বাইরেও ব্যাপকভাবে লাইভ সম্প্রচার হয়। জব্বারের বলীখেলা বাংলাদেশি মানুষের যেখানেই যে দেশেই বসবাস তারা আগ্রহের সঙ্গে খেলা উপভোগ এবং খবরাখবর রাখার অপেক্ষায় থাকে। সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে খেলাটি সুসম্পন্ন হোক স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সংস্কৃতিমনা মানুষের প্রত্যাশা। মাহমুুদুল হক আনসারী : লেখক ও গবেষক, চট্টগ্রাম।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App