×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

কিশোর গ্যাং

নষ্ট রাজনীতির বিনষ্ট সংস্কৃতি

Icon

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 নষ্ট রাজনীতির বিনষ্ট সংস্কৃতি
‘কিশোর গ্যাং’ সমসাময়িককালে আমাদের সমাজে বহুল আলোচিত-সমালোচিত একটি সামাজিক আতঙ্কের নাম। সাধারণত সদ্য শৈশব পেরোনো ১৩-১৭ বছর বয়সি কিশোর বালকদের সংঘবদ্ধ চক্র, গোষ্ঠী বা দলকে ‘কিশোর গ্যাং’ বলা হয়। তবে এ চক্রে ১৮, ১৯ ও ২০ বছর বয়সি বয়ঃসন্ধিকালীন যুবকদেরও (ধফড়ষবংপবহঃ ুড়ঁহম) দেখা যায়। প্রায় দুই দশক আগে এমন সামাজিক অবক্ষয়ের সূচনা ঘটে। বর্তমানে তা শুধু সামাজিক নয়, রাজনৈতিক অবক্ষয়েরও রূপ পরিগ্রহ করেছে। এভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের সংমিশ্রণে বর্তমানে এটা এক ভয়ংকর সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে। বর্তমানে এটা গণআতঙ্কে পরিণত হয়েছে। অতিসম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরে কিশোর গ্যাংয়ের হিংস্র কবল হতে ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে এদেরই হামলায় গুরুতর আহত কোরবান আলী নামে এক চিকিৎসকের নির্মম মৃত্যু ঘটে। এ ঘটনায় কিশোর গ্যাং নিয়ে সারাদেশে সমালোচনার ঝড় বইছে। ২০১৭ সালে রাজধানীর উত্তরায় কিশোর গ্যাং কর্তৃক জনসম্মুখে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির হত্যা ঘটনায় কিশোর গ্যাং কালচারটি সারাদেশে আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে গণমাধ্যম ও প্রশাসনের যৌথ তদন্তে দেশব্যাপী এর ভয়ার্ত চিত্র ফুটে ওঠে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, সারাদেশে পাঁচ শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় আছে। এদের সদস্য সংখ্যা ৫-৬ হাজার। তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি হতে পারে। প্রতিটি গ্যাংয়ে ১০, ১৫, ২০, ২৫, ৫০ জন পর্যন্ত সদস্য থাকে। প্রথমাবস্থায় রাজধানীতে এর প্রভাব দেখা গেলেও এখন তা সমগ্র দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের ফলে প্রবিষ্ট বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রভাবে তাদের মধ্যে এক বিশেষ ধরনের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়, যেটাকে ‘যবৎড়রপ ঃৎবহফ’ বলা যেতে পারে। তাদের পোশাক, চুলের কাটিং, চলন, বচন প্রভৃতি জীবনাচারে এক অভিন্ন ও অস্বাভাবিক স্টাইল পরিলক্ষিত হয়। যা দ্বারা এদের সমাজের অন্যদের থেকে সহজে আলাদাভাবে নির্ণয় করা যায়। এই অস্বাভাবিকতা তাদের মধ্যে এক ধরনের উন্মাদনা ভাব (পৎধুু সড়ড়ফ) সৃষ্টি করে। গ্যাংগুলোর নামের মধ্যেও অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়, যেমন- বয়েজ, ডিসকো বয়েজ, একে-৪৭, সুজন ফাইটার, ফাইভস্টার, তুফান, ক্যাবরা, ভাইপার, নাইন এমএম বয়েজ, জিইউ ইত্যাদি বিচিত্র। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক নাম বিকৃত করেও তারা নিজেকে বিদঘুটেভাবে সমাজে উপস্থাপন করে থাকে; যেমন- পারিবারিক নাম কালাম হলে গ্যাং কালচারে নাম হয় কাইল্ল্যা বা কাল্লু। চুরি, ছিনতাই, সন্ত্রাস, জমি দখল, চাঁদাবাজি, খুন, মাদক ব্যবসা, অবৈধ অস্ত্র সংরক্ষণ ও ব্যবহার, ইভটিজিংয়ের মতো গর্হিত সব অপরাধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে এরা জড়িত থাকে। যে বেশি ভায়োলেন্স বা ত্রাস সৃষ্টি করতে পারে সে ‘গ্যাং স্টার’ বনে গিয়ে পুরো গ্যাংটাকে নেতৃত্ব দেয়। সে দায়বদ্ধ থাকে ‘বড় ভাই’-এর কাছে। ঘৃণিত বিস্ময় হলো, এই ‘বড় ভাই’-ই হলো রাজনৈতিক দলের একজন কালো তালিকাভুক্ত সক্রিয় নেতা অথবা সদস্য। চট্টগ্রামে উক্ত চিকিৎসক হত্যাকারী কিশোর গ্যাংয়ের নেপথ্য পরিচালক হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ সহসভাপতির নাম ওঠে এসেছে। এমনকি তার নেতৃত্বাধীন কিশোর গ্যাংয়ের টর্চার সেলের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা রীতিমতো উদ্বেগের! অতি সম্প্রতি দৈনিক প্রথম আলোর তদন্ত প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম নগরে কিশোর গ্যাংয়ের লোমহর্ষক চিত্র ফুটে উঠেছে। সেখানে সক্রিয় রয়েছে ২০০টি গ্যাং, যারা নগরের ৪৫টি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। গত ৬ বছরে ৩৪টি খুনসহ মোট ৫৪৮ অপরাধ সংঘটন করেছে। বিচারাধীন রয়েছে ২ হাজার ২৩২টি মামলা। অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ সবকিছু জানার পরেও ইচ্ছাকৃতভাবে হাল ছেড়ে দেয়। তাদের নাকের ডগায় এই ভয়ংকর গ্যাং কালচার চর্চিত হয়। প্রতিটি থানায় এবং স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়িগুলোতে এদের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে কিন্তু যথার্থ নজরদারি নেই। বলাবাহুল্য, এই অপসংস্কৃতি রাতারাতি সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির নামে অপরাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ইচ্ছাকৃত উদাসীনতায় বা দায়িত্বহীনতায় ক্রমশ বিস্তার লাভ করে তা এখন এমন ভয়ংকর পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাবৎ রাজনীতি ও প্রশাসন কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কিশোর গ্যাং অপরাধীদের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। বিচার ও শাস্তিদানে তাদের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। সাধারণ আসামির মতো তাদের প্রতি আচরণ না করার এবং কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে তাদের সংশোধনে এনে কর্মমুখী করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে বলেছেন। নিঃসন্দেহে এটি ইতিবাচক নির্দেশনা। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে সারাদেশে মোট তিনটি কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে। তার মধ্যে টঙ্গীতে ৩০০ জন ধারণক্ষমতার বিপরীতে রয়েছে ৯০৯ জন এবং যশোরে ১৫০ জনের বিপরীতে রয়েছে ৩৫৩ জন; শুধু বালিকা কেন্দ্র হিসেবে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে ১৫০ জনের বিপরীতে রয়েছে ৮৯ জন [২০২২ সালের তথ্য]। অর্থাৎ গড় ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক অপরাধী রাখা হচ্ছে, যা অবশ্যই তাদের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বাস্থ্যসম্মত নয়। কিশোর কেন্দ্রে বন্দি হওয়ার আগেই সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখা উচিত। সেটা কতটুকু রাখছে? অবস্থাদৃষ্টে এসব প্রশ্ন এখন জন্ম নিচ্ছে। এ দুরবস্থা উত্তরণের ক্ষেত্রে সমাজ বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও উন্মুক্ত সেমিনার করা উচিত। সবচেয়ে বড় কথা, কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সততা। গভীর পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এসব কিশোরের রাজনৈতিক অপব্যবহারের কারণেই মূলত পরিস্থিতি এমন ভয়ানক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সুতরাং যেখানে অপরাজনৈতিক ইন্ধন বা প্ররোচনা জড়িত সেখানে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল বিভাগ বা শাখাগুলো কতটুকুই বা কাজ করতে পারবে তা যথেষ্ট সন্দিহান। যেখানে রাজনীতিকদের নৈতিক দায় ছিল এসব কিশোরের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আলোর পথে ধাবিত করার সেখানে চিত্রটা স্রেফ উল্টো। মনে রাখা উচিত, এরা আমাদেরই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এদের নষ্ট করার ফলে এর খেসারত এখন সবাইকে দিতে হচ্ছে। এখনই এদের লাগাম টেনে না ধরলে সামনে সবার জন্য আরো ভয়ংকর পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে। এ লক্ষ্যে এদের নেপথ্য পৃষ্ঠপোষকদেরও কঠোর আইনের আওতায় আনতে হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, ‘বড় ভাই’ নামক অদৃশ্য গডফাদারদের আজো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা যায়নি। ফলে সমস্যা আরো প্রকটতর হয়ে উঠছে। তাই কিশোর গ্যাংদের নেপথ্য প্রভাবকদের নির্মূল না করতে পারলে কোনো উদ্যোগই টেকসই হবে না। এজন্য প্রচলিত নষ্ট রাজনীতি সংস্কার করা খুবই জরুরি। শুধু সামাজিক নিরাপত্তার জন্য নয়, এদের জনশক্তিতে পরিণতের মাধ্যমে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল বিভাগসহ দল, মত নির্বিশেষে সবাইকে কাজ করতে হবে। অন্যথায় এই প্রজন্ম বিনষ্টের দায় সবারই ঘাড়ে বর্তাবে। সবাইকেই এর ভয়ংকর পরিণতি ভোগ করতে হবে। কাজী মাসুদুর রহমান : কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App