×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

আওয়ামী লীগে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই

Icon

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

প্রকাশ: ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিকল্প নেই
উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে মন্ত্রী, এমপি এবং প্রভাবশালী নেতাদের পরিবার, নিকট আত্মীয় এবং অনুগত স্থানীয় নেতাদের মনোনয়ন দেয়া নিয়ে দলের ভেতরে আগে থেকেই সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা আরো জটিল আকার ধারণ করেছে। বিশেষত, উপজেলা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন এবং প্রতীক বরাদ্দ না দেয়ার সিদ্ধান্তকে মন্ত্রী, এমপি এবং প্রভাবশালীরা নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার এক অপূর্ব সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। সে কারণেই বিভিন্ন উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নিজেদের উত্তরাধিকারকে বসাতে প্রতিযোগিতা দিয়ে যেন মাঠে নেমেছেন। দলের হাইকমান্ড থেকে কোনো অনুমোদন কিংবা আলাপ-আলোচনা করা হয়েছে বলে মনে হয়নি। শুধু মনোনয়ন দেয়াই নয়, কেউ কেউ তার প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলের কেউ যেন প্রতিদ্ব›িদ্বতা করতে না পারে সেই দুর্বৃত্তায়িত অপচেষ্টাটিও বাদ দেননি। আবার কেউ কেউ তার পুত্র কিংবা মনোনীত আত্মীয় প্রার্থীকে ভোট না দিলে এলাকায় উন্নয়ন বন্ধ রাখা হবে বলে হুমকি দিয়েছেন। প্রতিটি আসনেই মন্ত্রী, এমপি বা প্রভাবশালীদের মধ্যে যারা নিজেদের অনুগত প্রার্থী দাঁড় করিয়েছেন তাদের প্রত্যেকেরই কাহিনি আলাদা আলাদা। এসব কোনো কাহিনিই আওয়ামী লীগের জন্য সুখকর নয়। এখনো উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রথম ধাপের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি, কেবল তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে মাত্র। তাতেই আওয়ামী লীগকে যতটা সমালোচনার মুখে দলীয় মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালীরা ফেলে দিয়েছেন, ভাবমূর্তির সংকট তৈরি করেছেন, ততটা বোধহয় বিরোধী দলগুলো করতে সক্ষম হয়নি। অথচ মন্ত্রী, এমপি এবং প্রভাবশালী আওয়ামী লীগের নেতারা কথায় কথায় নিজেদের বঙ্গবন্ধুর সৈনিক এবং শেখ হাসিনার উন্নত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সৈনিক হিসেবে নিজেদের দাবি করে আসছেন। কিন্তু তারা যা করলেন তাতে বোঝা বড়ই মুশকিল যে, আওয়ামী লীগের মতো এত বড় সংগঠনে বড় বড় পদধারী, মন্ত্রী, এমপি হয়ে তারা যা করতে গেলেন তাতে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে, আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি কোথায় গিয়ে নামতে পারে সেটি তারা আদৌ কি অনুমান করতে পেরেছেন? এত বড় পদধারীদের তো অনেক কিছুই বোঝার কথা। যদি রাজনৈতিকভাবে তা না বোঝেন তাহলে আওয়ামী লীগ করার ফল কি এমনটি দেখতে হবে। আওয়ামী লীগ তো অন্য রাজনৈতিক দলের মতো রাজনীতিতে উড়ে এসে জুড়ে বসেনি। এই দলটি উদ্ভবের ইতিহাসটাই তো রাজনীতির এক অনবধ্য সৃষ্টি। সোহরাওয়ার্দী, ভাসানি, বঙ্গবন্ধু, সামসুল হকসহ যারা এই দলের প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নিয়ে গোটা জাতিকে পাকিস্তান রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একসময় ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, পাকিস্তানি শাসন, শোষণের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একমাত্র দল হিসেবে পরিচিত করাতে ত্যাগ, সংগ্রাম, দাবিনামা এবং মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন, তারা আইয়ুবের সামরিক শাসনেও ন্যূব্জ হননি। এক পর্যায়ে ভাসানি যখন ছিটকে গেলেন তখন ইতিহাসের সাহসী নেতা শেখ মুজিব অদম্য স্পৃহায় দলকে নেতৃত্ব দিলেন, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা দিয়ে তিনি জাতিকে স্বায়ত্তশাসনের চুম্বকে একত্রিত করলেন। তার সঙ্গে তখন তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুলসহ অসংখ্য ত্যাগী নেতাকর্মী ষড়যন্ত্রের সব জাল ছিন্নভিন্ন করে জাতিকে একটি স্বাধীন দেশের আকাক্সক্ষায় পুষ্ট করেছিলেন। ’৬৯, ’৭০ পেরিয়ে ’৭১-কে নতুন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের বাস্তবতায় তারা নিয়ে গেলেন। এমন ইস্পাত কঠিন দৃঢ় অঙ্গীকারই স্বাধীনতায় নেতৃত্বদানকারী দল দেশের তো নয়-ই, পৃথিবীর ইতিহাসেও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই রাজনৈতিক দলটিকে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীরা ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করার নীলনকশা ১৯৭২ সালেই শুরু করেছিল। ’৭৫-এ এসে কামান, বন্দুক সাঁজোয়া বাহিনী নিয়ে ৩২ নম্বরের বাড়িটিকে রক্তাক্ত করা হলো, বঙ্গবন্ধুর রক্তের এবং রাজনীতির ধারক-বাহকদেরও সপরিবারে হত্যা করা হলো। ৩ নভেম্বর জেলের অভ্যন্তরে চার জাতীয় নেতাকে একই উদ্দেশ্যে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো। আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার সব কালাকানুন প্রবর্তন করা হলো। আওয়ামী লীগ যেন মাথা তুলে আর কোনোদিন রাজনীতিতে দাঁড়াতে না পারে সেই ব্যবস্থাই করা হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে। সব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে দিলে এক পা দু পা করে এগিয়ে যেতে থাকে। ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দলের হাল ধরেন। দল আবার লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগের শত্রæপক্ষ বাংলাদেশের রাজনীতিতে ততদিনে রাজনীতির মুখোশ পরিহিত অবস্থায় মানুষকে বিভ্রান্ত করার নীতি কৌশলে জায়গা করে নেয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়ে ওঠা রাজনীতি অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে। তারপরও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিশ্রæতি নিয়ে অগ্রসর হওয়ার লক্ষ্যেই দলকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। ১৯৯৬-এ ক্ষমতায় এসে তিনি বেশকিছু কাজ এগিয়েও নিয়েছিলেন। শত্রæপক্ষ শেখ হাসিনার অগ্রযাত্রা বুঝতে পেরে ১৯৯৯ সালে চার দলীয় ঐক্যজোট গঠন করে, দেশের অভ্যন্তরে জেএমবির গুপ্ত বাহিনী, প্রগতিশীলদের হত্যা, শেখ হাসিনাকেও বোমা পুঁতে রেখে মেরে ফেলার চেষ্টা এবং পহেলা বৈশাখে রমনার বটমূলে বোমা মেরে মানুষ হত্যার যে চোরাগুপ্তা হামলা বাস্তবায়ন করছিল তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনেকেরই জানা ছিল না। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনাকে পরাজিত করার কৌশল সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে বাস্তবায়ন করা হলো। এরপর ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশে আওয়ামী এবং অসাম্প্রদায়িক শক্তি নিধনের অভিযান গুপ্ত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত হতে থাকে। ২১ আগস্ট ছিল আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করে দেয়ার দীর্ঘ পরিকল্পনা। আরো অনেক ষড়যন্ত্র হয়েছিল- এর সবই আমাদের জানা কথা। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর আবারো উৎখাতের ষড়যন্ত্র একের পর এক চলতে থাকে। তখন সেই ষড়যন্ত্রে স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক অনেক অপশক্তিই যুক্ত হয়েছিল। ১৪ সালে নির্বাচন সেই ষড়যন্ত্রেরই শিকারে পরিণত হয়েছিল। বাংলাদেশের নির্বাচনকে নিয়ে নতুন খেলা, নতুন কৌশল আর গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী, মুখোশধারী নানা অপশক্তির এক মল্লযুদ্ধে পরিণত হয়। শেখ হাসিনা ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত দেশটাকে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তুলে আনার ক্ষেত্রে মিশনারি-ভিশনারি নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশটা সত্যি সত্যিই দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সব শক্তিরই নজর কাড়তে সক্ষম হয়। ফলে বাংলাদেশকে নিয়ে কাড়াকাড়ির একটি প্রতিযোগিতা শুরু করতে দেখা গেছে। এই অবস্থায় দেশে উদীয়মান নানা শক্তি ও গোষ্ঠী আওয়ামী লীগের দিকে ভর করতে থাকে। আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে বিশাল রাজনৈতিক দল। কিন্তু এই দলটিকে ৭৫-পূর্ববর্তী বঙ্গবন্ধুর এবং তাঁর সুযোগ্য সহযোগীদের নেতৃত্বে পরিচালিত ও প্রতিষ্ঠিত দলের আদর্শে পুনর্গঠনের যে ব্যাপক প্রয়োজনীয়তা অন্তত ২০০৮ এর পর থেকে দেখা দিয়েছিল সেই অতীব প্রয়োজনীয় কাজগুলো দলের যারা পদ-পদবি পেয়েছেন কিংবা নেপথ্যে বাগিয়ে নিয়েছেন তারা যুগের উপযোগী করে দলকে সুসংগঠিত করতে মোটেও ভূমিকা রাখেননি। অথচ তারা দলীয় হওয়ার সুবাদে মন্ত্রী, এমপি কিংবা নানা পর্যায়ে নানাভাবে নির্বাচিত বা মনোনীত হয়ে ক্ষমতা উপভোগ করেছেন। তিন মেয়াদে অসংখ্য মানুষ আওয়ামী লীগের পরিচয় দিয়ে নানাভাবে ক্ষমতা উপভোগ করছে। খুব কম সংখ্যককেই দেখা গেছে বঙ্গবন্ধুর কিংবা শেখ হাসিনার আদর্শের প্রতিফলন তাদের কাজে ও আচরণে ঘটাতে পেরেছেন। বরং অনেকেই তাদের কাজে আওয়ামী লীগকে ব্যবহার করেছেন মাত্র। এখন তারা-ই ডালপালা বিস্তার করে আওয়ামী লীগকে তাদের দখলে রাখতে যারপরনাই চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এরই নমুনা আমরা গত কয়েকটি নির্বাচন এবং আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে দেখতে পাচ্ছি। দল থেকে ওইসব প্রার্থীকে প্রত্যাহার করার আদেশ নির্দেশ দেয়া হলেও তা মানা হচ্ছে না বলেই জানা যাচ্ছে। এটি কী করে সম্ভব? আওয়ামী লীগের চেয়েও কি তারা শক্তিশালী? যদি তাদের বিরুদ্ধে দল সত্যি সত্যিই কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে থাকে তা হলে বুঝতে হবে আওয়ামী লীগের ভেতরের অবস্থান তাদেরই দখলে চলে গেছে। এখন আওয়ামী লীগকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এমন বিশৃঙ্খল অবস্থা দলে আর চলতে দেয়া যায় কি না? রাজনীতি সচেতন যে কেউই বলবেন যে আওয়ামী লীগকে এখন আর আগের মতো ছেড়ে দিয়ে চলতে দেয়া উচিত হবে না। শুধু দলের স্বার্থেই নয়, দেশের স্বার্থে আওয়ামী লীগকে আওয়ামী লীগে ফিরে যেতে হবে, পুনর্গঠন করতে হবে এর সাংগঠনিক নরমস, শৃঙ্খলা, দলীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ মেধাবী, ত্যাগী যোগ্য নেতৃত্ব, ঝেরে ফেলতে হবে খড়কুটা আবর্জনাকে। ও দিয়ে রাজনীতি চলে না, চলবেও না। আওয়ামী লীগে প্রতিপক্ষ সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় আছে। এটি মনে রেখেই আওয়ামী লীগকে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনতে হবে। মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক। ঢ়ধঃধিৎরসধসঃধুঁফফরহ@মসধরষ.পড়স

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App