×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

সর্বনাশ প্রকৃতির; দোষ নিয়তির!

Icon

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সর্বনাশ প্রকৃতির; দোষ নিয়তির!
আলো-আঁধার, ভালো-মন্দ মাপতে এখন আর নিক্তি লাগে না। যুক্তি বা তথ্য-সাবুদ দরকার করে না। একটা বলে দিলেই হয়ে যায়। পাল বা দল ভারী থাকলে হুক্কাহুয়ায় সমর্থকের অভাব পড়ে না। ওয়াজের ‘ঠিক ঠিক’-এর মতো আওয়াজ। দোষারোপ বা দায়ী করা আরো সোজা। কোনো ইনভেস্ট বা যুক্তি লাগে না। কিছুদিন ধরে নতুন করে চলছে প্রকৃতিকে গালমন্দ করা। যত দোষ প্রকৃতির ঘাড়ে চাপানো। প্রকৃতি খারাপ হয়ে গেছে, ক্ষেপে গেছে, চণ্ডাল হয়ে গেছেসহ কত ধরনের দোষারোপ। খরা-বন্যা, রোদ-বৃষ্টি, জলোচ্ছ¡াসসহ নানা অতি ঘটনায় মানুষ প্রকৃতিকে গালমন্দ করছে। প্রকৃতির স্বভাব-চরিত্র নষ্ট হয়ে গেছে বলে কথা খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে। প্রকৃতি মানবসৃষ্ট নয়। মানুষ প্রকৃতির অংশ। প্রকৃতি বলতে এই পৃথিবী তথা গোটা সৃষ্টি জগৎকে নির্দেশ করে। প্রকৃতি জীবন্ত, বিপুল শক্তিশালী, সার্বভৌম চলমান সত্তা। মানুষসহ প্রাণিকুল বেঁচে থাকছে প্রকৃতির দয়ায়-ছায়ায়। এই প্রকৃতি যে সাম্প্রতিককালে রুক্ষ-মহাক্ষেপাটে তা প্রকাশ্যেই। এখানে লুকোচুরি বা আড়াল করার কিছু নেই। প্রকৃতিকে রুক্ষ করল কে? ক্ষেপাল কে? এক শব্দে এর জবাব ‘মানুষ’। মানুষই প্রকৃতির সর্বনাশের আসল হোতা। তাদের ক্রিয়াকর্মের কারণেই প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ। বিকল্প ব্যবস্থা থাকার পরও তারা শিল্পের বর্জ্যরে বিষ বাতাসে ছেড়ে, পাহাড়, বন, গাছপালা কেটে সাফা করে। বিশ্বময় অস্ত্র, গোলা-বারুদে প্রকৃতিকে দুমড়েমুচড়ে দেয়। এই অত্যাচারে প্রকৃতি কি মাইন্ড করতে পারে না? এছাড়া সব ক্রিয়ারই বিপরীত ক্রিয়া বা প্রকৃতির প্রতিশোধ বলে একটা কথা আছে। প্রকৃতির ওপর মানুষের অত্যাচার অনেক দিনের। সাম্প্রতিককালে তা আরো বাড়বাড়ন্ত। মাত্রা ছাড়ানো। প্রকৃতিকে জয় করার বাসনা- প্রতিজ্ঞা নিয়েই এগিয়েছে মানব সভ্যতা। জয় করা আর অবিচার করা এক নয়। জয় আর অবিচার গুলিয়ে ফেলায় প্রকৃতিকে মানুষের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। যার অনিবার্যতায় খাদ্য, বাসস্থান, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসার সংকট কম-বেশি গোটা বিশ্বেই। নিরপেক্ষ-নির্দোষ প্রকৃতিও বেদরদি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে বেদরদের তীব্রতা তুলনামূলক বেশি। চলতি তাপদাহ, হিটস্ট্রোকের একাংশ মাত্র। এর মাঝেই বৃহত্তর সিলেটে এবারো বন্যার আভাস মিলছে। ওপারের পানি ও অতিবৃষ্টির ধারা এবারো। উত্তরজনপদেও তিস্তার আতঙ্ক। অথচ প্রকৃতি মানুষের জন্য আশীর্বাদ। ধর্মাশ্রয়ীদের ভাষায় রহমত। প্রকৃতিকে সংরক্ষণের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব মানুষের। কিন্তু তাদের নানা কর্মকাণ্ড ও সভ্যতার বিকাশের নামে প্রতিনিয়ত আঘাত পড়ছে প্রকৃতির ঘাড়-মাথায়। এতে প্রকৃতির বিগড়াতে বা মাইন্ড করতে কি সময় লাগে? দেশে প্রকৃতি নিয়ে কথা বলা, কাজ করার লোকও কম। পরিবর্তন প্রকৃতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলেও এর ফল সব সময় খারাপ হয় না। কখনো কখনো ভালো কিছুও হয়। প্রকৃতির সব পরিবর্তন সব সময় মানুষের দৃষ্টির সম্মুখে হয় না। দৃষ্টি ও জ্ঞানের অন্তরালেও হয়। অলক্ষ্যে ঘটা ওই পরিবর্তনের ফল সব সময় জানা হয় না। ওই পরিবর্তনের সুফল-কুফলও থেকে যায় জানার বাইরে। অথবা জানতে জানতে অনেক সময় চলে যায়। প্রকৃতির পরিবর্তনকে শালিন ভাষায় ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ নামে সম্বোধন করা হয়। পরিবর্তন হলেও প্রকৃতি কখনো প্রতিহিংসাপরায়ণ হয় না। অভিসম্পাত করে না। নিরপেক্ষ বলতে যা বোঝায় প্রকৃতি সেটাই। প্রকৃতি সবার জন্যই সমান। কাউকে দুচোখে দেখে না। তবে একের পাপে সবাইকে তাপে-চাপে ফেলে। ঝড়, জলোচ্ছ¡াস, বন্যা খরা মোটেই প্রকৃতির হেলাখেলা বা লীলা নয়। ক্ষমতার অপব্যবহার নয়। বরং প্রকৃতির ওপর মানবসৃষ্ট কাজকর্মের ফল। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্বের বাহাদুরি করে। নিজেকে অতিমানব থেকে কখনো কখনো স্রষ্টার কাছাকাছিও ভেবে বসে। প্রকৃতির সহনশীলতা ও সম্প্রীতি বোধকে গলাটিপে মারার বাহাদুরির জের এখন মানুষকে হাড়ে হাড়ে ভুগতে হচ্ছে। প্রাকৃতিকভাবে পরিণামের গভীরে পড়ছে। অমানবিক নানা ঘাতপ্রতিঘাতে ধরণির ঐশ্বরিক সৌন্দর্যকে বিপর্যস্ত করে এখন পরিণাম ভোগার পালা। সাগরকে ভাগাড়, বহতা নদীকে ভরাট পাথরের ঢিবি, সবুজ বনানীকে উৎপাদনসই কলকারখানা বানানোর নিষ্ঠুরতায় প্রকৃতিকেই মেরে ফেলার চর্চা বাংলাদেশসহ অনেক দেশে। এ সত্য আড়াল করতে গিয়ে নিয়তিকে দায়ী করার একটি আরোপিত চর্চাও আছে। পৃথিবীর ফুসফুসে অক্সিজেনের ঘাটতি ঘটিয়ে বন, বৃক্ষ, নদী, পাহাড় এমনকি পশুপাখিদের আবাসস্থলেও মানবজাতির রাজত্বের পরিণাম যা হওয়ার তাই হচ্ছে। বৃক্ষনিধন, শিল্প-কারখানা স্থাপন, দূষণ ও নগরায়নের জেরে আবহাওয়ায় দীর্ঘ দূষণ চলছে। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে জনবসতির ওপর প্রতিনিয়ত নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, বজ্রপাত, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াস ইত্যাদি আঘাত হেনেছে। গবেষকরা বলছেন, গত ১০ বছরে বিশ্বে যত বন্যা, ঝড় ও দাবানল হয়েছে তার সবই তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে। বাংলাদেশের প্রকৃতি এর বেশি শিকার। অসময়ে বৃষ্টি, বৃষ্টির মৌসুমে খরা, এক এলাকায় বৃষ্টি, আরেক এলাকায় খরা। শীতকালেও শীতের দেখা মেলে না। তখন কথায় কথায় শীতকে কত গাল দেয়া হয়। শীত না এলে গালমন্দ। আবার এলেও গাল মাফ নাই। ডেকে এনে অপমান। অযৌক্তিক কথাবার্তায় ঋতু সমাজে শীতের একটা নেগেটিভ ইমেজ তৈরি করে ফেলেছে সুবিধাভোগীরাই। প্রকৃতিতে স্বাভাবিকতা থাকলে শীত বা গরম তার ডিসিপ্লিন মতো সবাইকে সার্ভিস দেয়। কখনো কিছু নেয় না। শুধু দেয়। কাউকে নাখোশ করে না। প্রকৃতির মান ভাঙিয়ে আবার উদার করে তোলার লক্ষণ নেই। বরং প্রকৃতিকে আরো ক্ষেপানোর বিস্তর আয়োজন। মানুষ সমানে নির্গমন করছে ক্ষতিকর গ্যাস যেমন কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন, সিএফসি বা ক্লোরোফ্লোরো কার্বনসহ মিথাইল ক্লোরোফর্ম ইত্যাদি। এছাড়া জীবাশ্মকে জ¦ালানি হিসেবে পুড়িয়ে তাতে উৎপাদন করা হচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড। কৃষিশিল্পের কথিত আধুনিকায়নের ফলে মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড বেশি পরিমাণে নির্গত হচ্ছে। এর ফলে বায়ুমণ্ডল তাপ আটকে রাখছে। বিজ্ঞানী ও গবেষকদের আশঙ্কা, আগামী বছর কয়েকে বাংলাদেশের প্রায় ১৭ শতাংশ ভূমি বঙ্গোপসাগরে তলিয়ে যাবে। নতুন নতুন রোগ, ঘূর্ণিঝড়, খরা, ভূমিকম্পসহ নানাবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগ তখন নিয়মিত হয়ে উঠবে। আবহাওয়া হয়ে উঠবে আরো শুষ্ক, আরো উত্তপ্ত। এতে বাংলাদেশসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে বিলুপ্ত হবে বিশেষ প্রজাতির জীব। মানবসমাজও ঝুঁকি ও দুর্যোগের সম্মুখীন হবে। পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বৃষ্টি ও তাপমাত্রা পরিবর্তনে বাংলাদেশের আক্রান্তের কথা বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। করোনা, ডেঙ্গু, ইবোলা মহামারিসহ অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাবও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে ভোগান্তি এবং কষ্ট সব প্রাণীর প্রজননগত বিষয়ে ব্যাঘাত করছে। প্রকৃতিকে দোষ দিয়ে সেখান থেকে নিস্তারের সুযোগ থাকবে না। কবরের আজাব বা দোযখের আগুন; মানুষের বিশ্বাসের বিষয়। দুটোই পরলোকের পর্ব। ইহলোকেই ক’দিন ধরে তাপেচাপে মাত্রা ছাড়ানো আজাবে ভুগছে মানুষ। আগুন সইছে। তাপদাহসহ অসুখ-বিসুখে ভুগছে। একদিকে প্রকৃতির নিষ্ঠুরতা আরেকদিকে মানবসৃষ্ট দুর্গতির এ যোগফল সামনে কেবল আজাবের বার্তাই দিচ্ছে। স্বস্তির ভরসা কম। তার ওপর লোডশেডিংয়ের অস্বাভাবিক মাত্রা। প্রকৃতির নিষ্ঠুরতার মাঝে বিদ্যুতের যন্ত্রণা। তারওপর আজ এখানে, কাল সেখানে আগুন লাগছে। আগুন নিজে লাগে, না কেউ লাগিয়ে দেয়- এ নিয়ে বহু কথা আছে। আবিষ্কারের শুরুতেও আগুন কখনো নিজে নিজে জ¦লেনি। ঘষা লেগে কিংবা ঘষা লাগিয়েই জ্বলে উঠতে হয়েছে আগুনকে। একের পর এক আগুনের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এসব কথাকে প্রাসঙ্গিক করে তুলেছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র দিয়ে কোনো রুম বা ভবনের ভেতরটা ঠাণ্ডা করলেও গরম হাওয়াটা আরো বেশি করে চলে যাচ্ছে বাইরে। সে কারণে অফিস ও অভিজাতপাড়ার তাপমাত্রা আরো বেশি। এ গরমে পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। এর পরিণামে ছড়ছে অসুখ-বিসুখ। জ্বর, সর্দি ও ডায়রিয়ার প্রাদুর্ভাব। শেরে বাংলানগর শিশু হাসপাতাল, মহাখালীর আইসিডিডিআরবির খবর রাখার অবস্থা অনেকের নেই। আলামত বলছে, আরো দুর্গতি অপেক্ষমাণ। বলা হয়ে থাকে, বাজার পুড়লে মাজারও থাকে না; লোকালয়ে আগুন লাগলে দেবালয়ও রক্ষা পায় না। এ ধরনের আরো অনেক কথার প্রচলন আছে আমাদের সমাজে ও লোকসাহিত্যে। এগুলোর অনেক উদাহরণ আমরা দেখছি। কিন্তু আমলে নিচ্ছি না। দোষটা প্রকৃতির নয়, প্রকৃতির আশীর্বাদ মানবকুলের। এখন তাদেরই বিপন্নদশা। ব্যাপারটি যে হঠাৎ করে ঘটল তা নয়, লক্ষণ আগেই দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সভ্যতার উন্নতিতে গর্বিত মানুষ ভ্রæক্ষেপ করেনি। প্রকৃতির ওপর তার হস্তক্ষেপ ক্রমাগত বেড়েছে। প্রকৃতি এখন ভীষণ বিরূপ হোক, আর ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখাক, সেটাই অনিবার্য-অবধারিত। বিশ্ব এত এগিয়েছে, এত রকমের উদ্ভাবন ও আবিষ্কার ঘটেছে- চাঁদে গিয়ে বসবাসের কথা ভাবা হচ্ছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির দরুণ বিশ্ব মানুষের হাতের মুঠোয় এসে গেছে। মানবাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য উন্নত বিশ্ব ব্যাপকহারে মানুষ খুনেও দ্বিধা করছে না। সেই আদিম বর্বরতারকালে খাদ্য সংগ্রহ নিয়ে যে দুর্ভাবনা মানুষকে কাতর করে রাখত সেই লক্ষণ আবারো। বরাবরই প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট যে কোনো বিপর্যয়ের আঘাত সবচেয়ে বেশি পড়ে দুর্বলদের ওপর। যথারীতি এবারো তাই। একের পাপেতাপে ভুগছে কতজন? বিত্তবানরা সেখানে গরহাজির। তাদের আবাসন শীতাতপে। গাড়িও শীতাতপ। অভাব-হাহাকারও তাদের ছুঁতে পারে না। মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন। সড়ংঃড়ভধ৭১@মসধরষ.পড়স

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App