×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

রেল উন্নয়নের মিথই যেখানে চলমান

Icon

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রেল উন্নয়নের মিথই যেখানে চলমান
কেউ কেউ বলেন মিথ্যা বা বানানো গল্পই পরবর্তীকালে মিথ হিসেবে রচিত হয়েছে। মিথলজি নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের অনেকেই এ রকমই বলেন, আবার ভিন্নমতও আছে। লোকসংস্কৃতিতে ওইসব লোকপুরাণ/লোকগল্প হিসেবে দেখা হয়। আবার মিথ আর পুরাণকে ভিন্ন বলে মনে করেন অনেক মিথ-বিশ্লেষক/লোকবিজ্ঞানী। এসব জ্ঞান ও বিজ্ঞানের খেলায় অনেক সত্য ও অনেক মিথ্যা মিথ হয়ে উঠেছে। যাকে আমরা বলতে পারি সত্যের সঙ্গে নকল ও নিকেলের ব্যবহারে এটা হয়েছে। মানে নকলে-নিকেলে গলাগলি চলছে। এই চেতনার মূলে তো লোকজীবন ও লোকধ্যানই কাজ করে থাকে। আজকে যা চলছে, তার ১০/২০/৩০/৫০ বছর পর মিথে পরিণত হয়। মানে সত্য আর পুরোপুরি সত্যের আলোকোজ্জ্বল রূপে আমরা পাই না। তার সঙ্গে মিথ্যা, বানোয়াট অনেক তথ্য জড়িয়ে পড়ে এবং সেই সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিলে নতুন একটি ধারণার জন্ম নেয়। তবে সেই নকলে-নিকেলে মেশানো সত্য নতুন মহীরূপে ধরা দেয়। সেখানে ইতিহাসের উপাদান যেমন থাকে তেমনি বানোয়াট ইতিহাসও গলায় ঝুলে পড়ে, যা দেখতে সত্যের মতোই অবিকল লাগে। আজকের মিথ্যা কালকে সত্যের মতোই অবিকল মনে হতে পারে। এই কথার মানে হচ্ছে যা চলমান তার মধ্যেই মিথ্যাও লুকানো থাকে। কখনো কখনো সেই মিথ্যা সত্য রূপে এসে হানা দেয় আসলের সঙ্গে। এই কথাগুলো বলার পেছনে আজকের রাজনীতির অনেক উপকরণ উপাদান রয়েছে, যা আসলে সত্যের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও সশস্ত্রযুদ্ধের নানা সত্য ধামাচাপা পড়ে ছিল এবং আছে, সেগুলোর ঝলক আমরা দেখি; কিন্তু সেখানে প্রকৃত সত্য কতটা তা অনুধাবন করা কঠিন। একজনের সরাসরি যুদ্ধের বিষয় যখন তার সহযোগী বর্ণনা করেন, তখন তা অতিরঞ্জিত বর্ণনার সহযোগ পায়। সত্যের প্রলেপমাখা মিথ্যা সেই বর্ণনায় জায়গা পায়। দুই. রেলওয়ের একটি উন্নয়নবিষয়ক রিপোর্টের তথ্য নিয়ে কথা বলা যাক। দেশজুড়ে সাড়ে ৪ হাজার কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ বাদে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ রেলপথই সিঙ্গেল লাইনের। এসব পথে ট্রেন চলে আবার সক্ষমতার চেয়েও বেশি। ফলে যাত্রাপথে লাগে বাড়তি সময়। প্রায়ই এলোমেলো হয় সময়সূচি। এ প্রেক্ষাপটে অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০২০-২৫) দেশের ব্যস্ততম ৮৯৭ কিলোমিটার পথকে ডাবল লাইনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে রেলওয়ে। এ পরিকল্পনার ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কেবল ৮৫ দশমিক ৫১ কিলোমিটার রেলপথকে ডাবল লাইনে উন্নীত করতে পেরেছে সংস্থাটি। এই অংশের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার তথ্যটুকু নেয়া হলো। ২০২০-২৫ সালের মধ্যে দেশের ব্যস্ততম ৮৯৭ কিলোমিটার ডাবল লাইনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে রেলওয়ে। এই পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ। গণপরিবহনের এই উন্নয়নে সরকার সঠিক পরিকল্পনাই এঁটেছে। কিন্তু পরিকল্পনার ৪ বছর পেরিয়ে গেলেও সংস্থাটি কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছে মাত্র ৮৫ দশমিক ৫১ কিলোমিটার। এই সংস্থার প্রধান ৪ বছর পর এসে সাংবাদিকের প্রশ্নের মুখে পড়ে বলেছেন- বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্বে) সরদার সাহাদাত আলী বলেন, ‘পর্যায়ক্রমে দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করা হবে এবং এর জন্য বিভিন্ন প্রকল্প চলমান।’ তার এই কথায় সত্য অনেকটাই মিথ্যার আবরণ নিয়েছে। যেমন বিভিন্ন প্রকল্প চলমান রয়েছে, বলেছেন মহাপরিচালক। আসলে কয়েকটি পরিকল্পনা যে চালুর বা সূচনাই করতে পারেননি তার বক্তব্য তা-ই প্রমাণ দিচ্ছে। তিনি বলেছেন- এর মধ্যে কোনোটি আলোচনার পর্যায়ে আছে, কোনোটি সমীক্ষা পর্যায়ে আছে, কোনোটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির পর্যায়ে আছে। সব প্রকল্প তো আর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হবে না। কারণ এখানে বড় ধরনের বিনিয়োগের বিষয় রয়েছে। এজন্য এডিবি, বিশ্বব্যাংক, জাইকার মতো উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়। লক্ষ্য অনুযায়ী আমরা ডাবল লাইন রেলপথ তৈরির কাজগুলো এগিয়ে নিতে পারিনি এটা ঠিক, তবে ভবিষ্যতে আমরা লক্ষ্য অনুযায়ীই কাজগুলো করব। এই যে ‘আমরা লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ করব’ বললেন মহাপরিচালক, এ থেকেই স্পষ্ট হলো যে তিনি ও তার সংস্থা ওই গৃহীত প্রকল্পগুলোর প্রাথমিক কাজও করতে পারেননি। ঋণ নেয়ার ব্যাপারে তিনি এডিবি, জাইকা, বিশ্বব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নাম নিয়েছেন। কিন্তু তিনি ওই সংস্থাগুলোর সামনে কি কাগজপত্র জমা দেবেন? তিনি তো সমীক্ষা (সার্ভে রিপোর্ট) করতে পারেননি। তিনি তো কোনোটার উন্নয়ন প্রস্তাবও তৈরি করতে পারেননি। এরপর তিনি বলেছেন সব প্রকল্প তো আর লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী হবে না। এখানেই তিনি সত্য বলে ফেলেছেন। তিনি এবং তার সংস্থার দায়িত্বশীল ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাগণ যে স্ব-স্ব কাজে দক্ষ ও উপযুক্ত নন, সেই সত্য তিনি লুকিয়েছেন। আমরা বুঝি, যারা সরকারি দলের লেজুড় হয়ে চাকরি করছেন, তারা দেশ ও গণমানুষের চেয়ে সরকারকেই তার প্রধান সহায়ক ভাবেন। সেটা মিথ্যা নয়। যে স্ট্রাকচারের প্রশাসন, তাতে জি-হুজুর করাই প্রধান যোগ্যতা। এখন মহাপরিচালককে জবাবদিহি করতে হবে। কারণ তিনি এবং দায়িত্বপ্রাপ্তগণ সরকারের বেতন-ভাতা, গাড়ি-বাড়ির সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। আসলে ওই সবই দেশের মেহনতি মানুষের টাকা। সরকার কেবল তা পরিচালনার দায়িত্বে আছে। আর সরকারের এসব সংস্থার লোকবল আসলে গণমানুষের অর্থে লালিত-পালিত হচ্ছে। তারা একবারও এটা মনে রাখেন না যে তারা জনগণের সেবাদানের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন। দেশের প্রশাসন পরিচালনায় সরকার যদি দক্ষ ও কর্মক্ষম না হয়, তা হলে সেই ম্যানেজারিয়াল কাজটি যারা দক্ষ ও যোগ্য তাদের হাতে দেয়া উচিত। কিন্তু ক্ষমতাসীন সরকার সেটা না করে নানা অপকৌশলের মাধ্যমে ক্ষমতার মগডালে থেকে যান। যখন এই রকম অগণতান্ত্রিক পথে ক্ষমতায় বসা যায়, তখন তারা হয়ে পড়েন বেপরোয়া। মানে তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হয় না, হবে না, সেটা তারা জানেন বলেই লেজুড়দের হাতে প্রকল্প প্রস্তুত ও সমীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে সরকার ঘুমিয়ে থাকে। সরকার ঘুমিয়ে থাকে বললাম এ কারণে যে, প্রকল্পের ৪ বছর শেষ হওয়ার পরও সরকারের টনক নড়েনি। কারণ প্রকল্পগুলোর রাজনৈতিক লেজ উঁচিয়ে ধরে জনগণকে বোঝানো যে তারা জনগণের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে কাজ করছেন। এই যদি জানপ্রাণ বিনিয়োগ করে দেশের গণপরিবহনের উন্নয়ন ধারাবাহিকতা যদি এতটাই মন্থরগতির হয়, তা হলে কি আমরা সাশ্রয়ীমূল্যে গরিব মানুষদের পরিবহন সেবা দিতে পারব? আবার প্রশ্নটি অন্যভাবেও করা যেতে পারে, তা হলো সরকার নিজেই চায় না যে গণপরিবহন রেলসেবা খাতটি দেশের প্রত্যন্ত এলাকা পর্যন্ত ডাবল লাইনে রূপান্তরিত হোক। হলে সাধারণ কৃষকরাও কম দামে টিকেট কিনে সেবা নিতে পারবে। তাদের হাজার হাজার বা লাখ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ তাদের জন্য সুফল দেবে বা দিচ্ছে। সরকারের চাওয়া অত্যন্ত দুর্বল, তাই চার বছরেও কোনো খোঁজ নেয়নি বা নিচ্ছে না। আমরা তো উন্নয়নের ডামাডোল বাজতে শুনছি, চারদিকে এতটাই উন্নয়ন হচ্ছে যে তাতে দেশ ভেসে যাওয়ার কথা। এই রিপোর্টের মাধ্যমেই জানতে পারলাম যে একমাত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের আখাউড়া-লাকসাম অংশের কাজ সম্পন্ন করতে পেরেছে রেলওয়ে। ওইটুকু রেলপথের দৈর্ঘ্য মাত্র ৭২ কিমি। রিপোর্ট বলছে- অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় থাকা আখাউড়া-লাকসামের ৭২ কিলোমিটার রেলপথের কাজ কেবল সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এটি ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের অংশ। আখাউড়া-লাকসাম অংশ চালুর মধ্য দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রামের পুরো ৩২১ কিলোমিটার রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত হয়েছে। তার মানে হচ্ছে রেলওয়ে তেমন কোনো উন্নয়নই করতে পারেনি গত ৪ বছরে। আর সরকারও চায়নি এর চেয়ে বেশি কাজ হোক। তাই তো অদক্ষ ও অযোগ্যদের হাতে রেখে দেয়া হয়েছে প্রকল্পের কাজ। এখন সরকার কী করবে? ওই স্থবির হয়ে পড়ে থাকা প্রকল্পগুলোর জন্য কি নবম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্থানান্তর করবে? নাকি এই প্রকল্পগুলো রাবারের মতো টেনে বড় করে নেবে ২০৪১ সাল নাগাদ? উন্নয়ন কাজগুলো যদি সমন্বিতভাবে না এগোয়, তা হলে কী রকম বিশৃঙ্খলা হয়, তা আমরা দেখেছি এবং দেখে চলেছি বিআইটি প্রজেক্টে। এই প্রজেক্টটি নেয়া হয়েছিল সাড়ে ৩ বছরের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে। সেই কোম্পানিটি কাজ শুরু করে ২০১৮/১৯ সালে। তার আগে তাদের তহবিল শূন্য ছিল। ঋণ পাওয়ার পর তারা কাজে হাত দেয় এবং অনেক ঘটনার জন্ম ও মৃত্যুর পর এখনো তা চলমান। কবে নাগাদ এই প্রকল্প শেষ হবে, তা তারা বলতে পারে না, সরকারের তো সময় বাড়ানো, ব্যয় বাড়ানো এবং অন্যান্য সহায়ক ভূমিকা ছাড়া করার কিছু নেই। চীনা ও মালয়েশিয়ান বা থাই কোম্পানির কাছে বন্দি হয়েই কাটাতে হলো তিন/সাড়ে ৩ বছরের প্রকল্পের জন্য ১২ বছরের দীর্ঘযাত্রা। এ রকম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকল্পগুলোর প্রকৃত সংখ্যা আমরা জানি না। কেননা কোনটা জানব আর কোনটা বাদ রাখব- এই দোটানায় জাতি পড়ে রয়েছে অন্ধকারে। তিন. রেলওয়ে যে কত গুরুত্বপূর্ণ পথ তা কেবল সরকারই নয়, আমাদের মতো গরিব ও দলবিহীন লোকেরাও বেশ বোঝে। একটি বাসে যদি ৬০ জন পরিবহন করা যায়, তাহলে ১০০ গাড়িতে ৬ হাজার লোক যাতায়াত করতে পারে। আর একটি ট্রেনের ১০টি বগি বা কোচে তার কয়েক ডাবল মানুষ যাতায়াত করতে পারে। তুলনাটি দেয়া হলো খরচের বিষয়ে। বাসে খরচ বেশি, ট্রেনে খরচ অনেক কম। শুধু এই বিষয়ই নয়, আরো বহু বিষয় এর সঙ্গে জড়িত। সরকারি দলের বাস মালিকদের লক্কড়-ঝক্কড় বাসের চেয়ে রেল অনেক ভালো ও আরামদায়ক। আপনারা কেবল ঢাকা মহানগরের চলাচলকারী বাসের চেহারাগুলো মনে করেন, তাহলেই বুঝতে পারবেন, ওইসব বাস কেবল অকেজোই নয়, তাদের সড়কে নামারও যোগ্যতা নেই। কিন্তু দিব্যি চলছে। এত নোংরা/কাইপড়া সিট এবং সেগুলোতে বসলে বা সিটের মাথা আঁকড়ে ধরলেও গা ঘিন ঘিন করে ওঠে। কিন্তু আপনি প্রতিবাদ করলে বা ওইগুলো পাল্টাতে বললে উত্তর আসে আপনি করে দেন। একজন কন্ডাক্টর ও হেলপারের মুখে যদি মালিকের পক্ষে যাত্রীদের ওপর এ রকম কথা আসে তাহলেই বুঝতে হবে এরা হচ্ছে সিন্ডিকেট বাস মালিকদের লেজুড়। এই লেজুড়দের অধীনেই দেশ চলছে। ড. মাহবুব হাসান : সাংবাদিক ও কলাম লেখক। সধযনড়ড়নয৮৬৮@মসধরষ.পড়স

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App