×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

জনজীবনে তীব্র দুর্ভোগ

Icon

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জনজীবনে তীব্র দুর্ভোগ
ঈদ উপলক্ষে গ্রামের বাড়ি গিয়ে এবার যে অভিজ্ঞতা হলো তেমন অভিজ্ঞতা অতীতে কখনো হয়েছে বলে মনে পড়ে না। পল্লী বিদ্যুতের করুণ দশা ভালোই উপলব্ধি করা গেছে। ২৪ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার মধ্যে থেকেছে। এটি শুধু আমাদের এলাকার চিত্র নয়, যতদূর খবর রাখি সারাদেশের গ্রামাঞ্চলের। গ্রাম পল্লী বিদ্যুতের নেটওয়ার্কের আওতাধীন। শহরাঞ্চলে যেখানে পিডিবির সংযোগ আছে সেখানকার চিত্র ভিন্ন, লোডশেডিং সহনীয় মাত্রায়। গ্রাম ও শহরের ভেতর বৈষম্য কতটা প্রবল এ তারই এক দৃষ্টান্ত। একেতো তীব্র গরম, তার ওপর সেচের মৌসুম- অবস্থা কতখানি বেগতিক বলে বোঝানোর দরকার নেই। হাওরের বোরো, আর সমতলের ইরির গুরুত্বের কথা হয়তো আমরা সবাই জানি। এককালের অতি গুরুত্বপূর্ণ আমন এখন হার মেনেছে বোরো-ইরির কাছে। হাওরের বোরো ভালোয় ভালোয় ঘরে ওঠার পথে, ইরি সবেমাত্র ফলবতী হয়েছে, জ্যৈষ্ঠ মাসে ঘরে উঠবে। ইরির ফলন একেবারেই সেচনির্ভর। পরিপক্ব ফলনের জন্য এই মুহূর্তে সেচ অতি প্রয়োজনীয়, এ সময়ে বিদ্যুতের মাত্রাতিরিক্ত লোডশেডিং কতটা ক্ষতিকর ভাষায় প্রকাশের অপেক্ষা রাখে না। ঘরে ঘরে বিদ্যুতের কথা সরকার ফলাও করে প্রচার করে। বাস্তবতা হলো- বিদ্যুতের সংযোগ আছে, কিন্তু বিদ্যুৎ নেই। এক সময় খাম্বা ছিল, সংযোগ ছিল না, ছিল না বিদ্যুৎও। এখন সংযোগ আছে, বিদ্যুৎ নেই। তাহলে পার্থক্য কী দাঁড়াল? একদিক থেকে বরং খারাপই হলো। বিদ্যুতের সংযোগ থাকায় অনেকেই গ্রামাঞ্চলে রাইস মিল, গমের মিল, মসলার মিল, ছোটখাটো কারখানা ইত্যাদি করেছেন। তারা সবাই বেকার বসে থেকে নিঃস্ব হতে চলেছেন বিদ্যুতের অভাবে। বিদ্যুতের সংযোগ দেয়ার প্রতিযোগিতা শুরু করেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। সরকারের ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেয়ার ঘোষণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আবেদন পাওয়া মাত্রই খুঁটি গেড়ে লাইন টানছেন। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের খবর নেই। তাহলে কি তারা মিটার ভাড়া তোলার ব্যবসা খুলে বসেছেন? এর একটা বিহিত হওয়া দরকার। মিটার ভাড়া কেন অহেতুক দিতে হবে, যদি বিদ্যুতের সরবরাহ না-ই থাকবে? পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা নেই, পিডিবির দয়া-দাক্ষিণ্যের ওপর তারা নির্ভরশীল। পিডিবি দিলেই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎ পায়, তা থেকে গ্রাহকদের সরবরাহ করতে পারে। সত্য হলো এই, পিডিবি তার প্রয়োজন মেটানোর পর অবশিষ্ট যা থাকে তা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিকে দেয়। বিদ্যুতের প্রবল ঘাটতির এই সময়ে ‘অবশিষ্ট’ খুব কমই থাকে, যার দরুন গ্রামাঞ্চলে সরবরাহের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না। সরকার এই বৈষম্যের কথা নিশ্চয়ই জানে, হয়তো তাদের (সরকার) ইশারাতেই এমন বঞ্চনার ঘটনা ঘটছে। পেছনের কারণ বুঝতেও অসুবিধা হয় না। শহরবাসীকে তুষ্ট রাখা আসল উদ্দেশ্য। পিডিবি শহরের মানুষের জন্যই। গ্রামের জন্য আছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, যাদের এ মুহূর্তে দেউলিয়া বললে ভুল বলা হবে না। গ্রামের মানুষ বিদ্যুতের বিল সময়মতো পরিশোধ করতে ভুল করে না। বিদ্যুৎ না পেলেও তারা মিটারের ভাড়া ঠিক সময়ই পরিশোধ করছে। দুষ্টুচক্র যদি থেকে থাকে তো তা শহরে। এর সঙ্গে নিঃসন্দেহে মেলবন্ধন আছে পিডিবির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ শোনা যায় না। তাদের বন্ধ্যা করে ফেলা হচ্ছে। শহর-গ্রামের এমন বৈষম্যের অবসান হোক। শহরের মানুষ বুঝুক প্রকৃত অবস্থা কী! প্রভাবশালী ও সচেতন মানুষ শহরে বাস করে। পরিস্থিতির প্রতিকারে তারা কতটা ভূমিকা রাখতে পারে দেখা যাবে তখন। বাজার দীর্ঘদিন ধরে জনজীবন উচ্চমূল্যের চাপে পিষ্ট। মুদ্রাস্ফীতির হার দুই অঙ্কের কাছাকাছি অনেক দিন থেকে। দীর্ঘ সময়জুড়ে এমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের হা-পিত্যেশের অবসান হচ্ছে না কিছুতেই। করোনা মহামারির পর রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এমন পরিস্থিতিতে পড়েছিল অনেক দেশ। তাদের অধিকাংশ বিপদ কাটিয়ে উঠেছে, আমরা পারিনি। অর্থনীতিবিদরা পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে উপায় বের করার নির্দেশ দিচ্ছেন। সরকারের নীতিনির্ধারকরা এসব বিচার-বিশ্লেষণকে কতটা আমলে নিচ্ছেন, এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। মনে হয় সরকার চলছে নিজের মতো করে। তাতেও আপত্তি থাকত না যদি না পরিস্থিতির হেরফের হতো। আজ এ নিয়ে সংকট তো কাল ওটা নিয়ে, এ রকম চলছে দিনের পর দিন। সমস্যা ঘাড়ে এসে পড়ার পর সম্বিত ফিরছে সবার, আগে নয়। আগেভাগে সতর্ক হলে পরিস্থিতির রকমফের হতে পারত। প্রশ্ন তোলা যায়, বাজার কি আসলে বাজারের রীতি অনুযায়ী চলছে? এর উত্তর নেতিবাচক অনেকাংশে। অর্থনীতির নীতি এ মুহূর্তে কোন পথ প্রদর্শকের ভূমিকায় আছে বলা যাবে না। অর্থনীতির আদিম একটি সূত্রের কথা আমরা সবাই জানি। সেটি হলো- চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য ছাড়া বাজার স্থিতিশীল থাকতে পারে না। সেই ভারসাম্য নেই, যার দরুন যখন-তখন সংকট হচ্ছে। সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলে এমন হওয়ার সুযোগ কম থাকত। তাছাড়া তথ্যের সমস্যাও আছে। আমাদের উৎপাদিত পণ্যাদির, বিশেষত কৃষিপণ্যের উৎপাদন নিয়ে যে তথ্য দেয়া হয় তার সঠিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তথ্য বিভ্রাট সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দেয়। চাল উৎপাদনে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ এ ঘোষণার পর চাল আমদানি করতে হয় কেন? পেঁয়াজ নিয়ে ফি-বছর সমস্যা হয়। দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের পরিমাণ নিয়ে যে হিসাব দেয়া হয় তা নিয়ে অন্তত ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্দিহান। আমাদের অত জমি কোথায় পেঁয়াজ উৎপাদনের? পেঁয়াজের অতি-ব্যবহারে অভ্যস্ত বাংলাদেশের মানুষের চাহিদা সংকুলান করতে হলে পেঁয়াজের আমদানি সারা বছরের জন্য অবাধ করে দেয়া উচিত। ভারতে পেঁয়াজ নিয়ে নীতিগত কোনো সিদ্ধান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাংলাদেশে পেঁয়াজের বাজার অস্থির হয়ে যায়। এ থেকে রেহাই পেতে হলে বিদেশে নতুন একাধিক উৎসের সন্ধান এবং সেখান থেকে নিয়মিতভাবে পেঁয়াজ আমদানি সমস্যার স্থায়ী সমাধান বলে বিবেচনা করি। দেশে গরু ও খাসির মাংসের বিপুল চাহিদা রয়েছে। চারণভূমি না থাকায় শুধু আমদানি করা কৃত্রিম খাবার দিয়ে খামার পরিচালনা করে পর্যাপ্ত মাংসের জোগান দেয়া সম্ভবপর মনে করি না। যদি তা করতেই হয় তাহলে ভর্তুকিমূল্যে খামারিদের পশুখাদ্যের জোগান দেয়ার দায়িত্ব নিতে হবে সরকারকে। নয়তো গরু ও খাসির মাংস উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ ভোক্তাদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকবে। বিকল্প হতে পারে আমদানি। সরকার কোন পথে যাবে ঠিক করুক। এটি স্পষ্ট যে, বাজারে প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও সিন্ডিকেটের প্রবল প্রতাপ বিদ্যমান। রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের কাছে অসহায়। বাজার প্রতিযোগিতাপূর্ণ করার মধ্যে এর সমাধান নিহিত। সুদূর অতীত নয়, নিকট অতীতেও দেশে ক্ষুদ্র-মাঝারি-বড় প্রচুর আমদানিকারকের অস্তিত্ব ছিল। বাজার ছিল প্রতিযোগিতায় পূর্ণ। ফলে আমদানিকৃত পণ্যের দাম নিয়ে তেলেসমাতি ছিল না। বড় মাছ আস্তে আস্তে ছোট মাছ গিলে খেয়েছে, আমদানি নিয়ন্ত্রণে গেছে গুটিকতকের হাতে। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে, ভোক্তাসাধারণ জিম্মি হয়ে পড়েছে তাদের হাতে। প্রতিযোগিতার সম্প্রসারণ করা গেলে পরিস্থিতির হেরফের হতে পারে। সময়টা একেবারেই ভোক্তাদের প্রতিকূল। অন্তত তেল-ডাল-চিনি-গুঁড়া দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি শুল্ক হ্রাস বা মওকুফ করতে পারলে মানুষ কিছুটা রেহাই পেত। টিসিবির মাধ্যমে কিছু কিছু পণ্য স্বল্প দামে স্বল্প আয়ের মানুষদের দেয়া হচ্ছে। এ নিয়েও আছে অব্যবস্থা। যাদের ভাগ্যে কার্ড জোটার কথা তারা পাননি, আবার যাদের পাওয়ার কথা না তারা পেয়েছেন। তাছাড়া কার্ডধারীর সংখ্যা ও প্রাপ্ত মালামাল অপর্যাপ্ত। এর পরিসর বাড়ানো দরকার। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তদেরও পর্যায়ক্রমে এমন সুবিধা প্রদান প্রয়োজন। রেশন প্রথা চালু করতে পারলে ভালো হয়। বিদ্যমান ব্যবস্থায় টিসিবির পণ্য ট্রাক থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে নিতে হয় দিন পার করে। বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী এ বিধান পরিবর্তন করে স্থায়ী দোকানের মাধ্যমে প্রদানের কথা বলছেন। যত তাড়াতাড়ি এ আশ্বাস বাস্তবায়িত হয় ততই মঙ্গল- কর্মঘণ্টা বাঁচে, দুর্ভোগ কমে। মজিবর রহমান : কলাম লেখক। সড়লরনংন@মসধরষ.পড়স

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App