×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

বাইডেনের বার্মা অ্যাক্ট : মিয়ানমারের বারুদ

Icon

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাইডেনের বার্মা অ্যাক্ট : মিয়ানমারের বারুদ
সীমানা ছাড়ানো উত্তেজনার পরও অন্য বৃহৎ ভূরাজনৈতিক শক্তিগুলোর মতো এখনো মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বা কোনো ভূরাজনীতিতে নিজেকে সম্পৃক্ত না করার বিচক্ষণতা দেখিয়ে আসছে বাংলাদেশ। আবার পরিবর্তিত সময়, পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতার আলোকে আগের মতো মানবতার দৃষ্টান্তে উদারভাবে সীমান্ত খুলে দিচ্ছে না, দেবেও না। বরং সীমান্তে নজরদারি ও কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সংঘাতে অনুপ্রবেশ করা মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যদের ফিরিয়ে দেয়ার আলোচনা এখন পর্যন্ত চালিয়ে নিচ্ছে দ্বিপক্ষীয়তায়। ২০১৭ সালে সীমান্ত খুলে দেয়ার ঘটনায় জাতিসংঘসহ সারা পৃথিবী বাংলাদেশ ও প্রধানমন্ত্রীর মানবতার প্রশংসা করেছে। এবারের গোটা বাস্তবতাই ভিন্ন। এরই মধ্যে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করে বাংলাদেশের উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে। প্রাসঙ্গিকভাবে চীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। মিয়ানমারে সংঘাতের মধ্যে বাংলাদেশের সীমান্ত ‘সুরক্ষিত আছে’ দাবি করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেছেন, প্রতিবেশী দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পালিয়ে আসা সদস্যদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আলোচনা করছে সরকার। তাদের বিজিপি বা বর্ডার গার্ড পুলিশের যারা এসেছে, তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। আকাশপথে না পোর্টের মাধ্যমে কোন প্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে নেবে সেটিও প্রশ্ন। আশপাশে আরো কিছু প্রশ্ন ও বিষয় রয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে আসা জান্তা সদস্যদের মধ্যে মূলত বার্মিজ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যই সর্বাধিক। এই বিজিপিসহ পুরো বাহিনীটাই বার্মিজ সামরিক জান্তা দ্বারা পরিচালিত। এরা সম্মিলিতভাবেই অংশ নিয়েছিল রোহিঙ্গা নিধনে। ২০১৭তে তাদের ক্রিয়াকর্মের জেরেই এখনো বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে আছে ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। সবাই ওই কর্মে না থাকলেও তারা জানে কারা অংশ নিয়েছিল ওই গণহত্যা ও নিধনে। তাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে বার্মিজ সামরিক জান্তার গুপ্তচরও। যারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন কাজ করে আসছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এ বিষয়গুলোকে খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন। আমলে নেয়ার তাগিদও দিচ্ছেন। সাধারণ বুঝ জ্ঞানের মানুষের কাছেও তা যথেষ্ট আমলযোগ্য। পালিয়ে আসা এই বর্মি সামরিক সদস্যদের বিষয়ে ফয়সালা অবশ্যই আসবে। এর আগে উপরোক্ত প্রশ্ন ও বিষয়গুলোর একটা হিল্লা হওয়া দরকার। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে সরকারের সামনে এখন দুটি পথ। সহজ পথটি হলো বার্মিজ জান্তা সরকারের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে তাদের সমূলে ফেরত পাঠানো। তার আগে তাদের ওয়ার্ক ও কেস হিস্টোরির আদ্যোপান্ত জেনে রাখা। বিশেষ করে ২০১৭ এর ২৪ ও ২৫ আগস্টে তাদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা। বাাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনে এ বিষয়ে জাতিসংঘ অথবা আইসিজে বা আইসিসির সহায়তাও চাইতে পারে। রাখাইন রাজ্যটির নিয়ন্ত্রণ এখন আরাকান আর্মির হাতে। তাদের দুটি পরিচয়। কারো কাছে বিদ্রোহী, কারো কাছে স্বাধীনতাকামী। এমন অবস্থায় বাংলাদেশকে পা ফেলতে হচ্ছে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়েছে, মিয়ানমারের চলমান সংঘাতে বাংলাদেশের জনসাধারণ, সম্পদ বা সার্বভৌমত্ব কোনোভাবে যাতে হুমকিতে না পড়ে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ চালানো হচ্ছে। মিয়ানমারের ভেতরে সংঘাতের জেরে সীমান্তবর্তী টেকনাফ-সেন্টমার্টিন রুটে ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে পর্যটকবাহী সব জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে এখন বাংলাদেশের খুব বেশি কিছু পদক্ষেপ নেয়ার নেই। কারণ সংঘাতের বিষয়টি এখনো মিয়ানমার সীমান্তের ভেতরেই রয়েছে। বাংলাদেশ সেখানে গা মাখাচ্ছে না। এরপরও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী তাদের দখল হয়ে যাওয়া টহল চৌকি পুনরুদ্ধারে অভিযান শুরু করলে বাংলাদেশের ভেতরে এক ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হবে। মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী পুলিশ বাংলাদেশের ভেতরে আশ্রয়ের জন্য ঢুকে পড়েছে, সামনে আরাকান আর্মির সদস্যরাও যাতে ঢুকে পড়তে না পারে নিশ্চিত করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। গোটা পরিস্থিতি জটিল। সমস্যা তাদের, আক্রান্ত আমরা। তাদের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বারুদ আছড়ে পড়ছে আমাদের ওপর। আগে নিরস্ত্র রোহিঙ্গা এসেছে। এখন আশ্রয় দিতে হচ্ছে তাদের সশস্ত্র সদস্যদের। ওপারের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে এপারের রোহিঙ্গাদের যোগাযোগ আছে। ওপারের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে এপারে আশ্রয়ে থাকা সদস্যদেরও যে যোগাযোগ নেই বা যোগাযোগ হবে না তা কে বলতে পারে? এ প্রশ্নকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। পালিয়ে আসা বিজিপি সদস্যরা আমাদের বিজিবির হেফাজতে থাকলেও তাদের প্রতিরক্ষার একটা পাকা ব্যবস্থা রাখতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সীমান্তঘেঁষা এলাকাগুলো থেকে সরিয়ে নেয়া সাময়িক সমাধান। এটি দীর্ঘমেয়াদে চলা সম্ভব নয়। রাখাইন রাজ্যে যে সংঘাত চলছে তা শিগগির শেষ হওয়ার নয়। মিয়ানমারে গণমাধ্যম বলতে কার্যকরভাবে কিছু নেই। দেশটির অভ্যন্তরে কী হচ্ছে বা কী হতে যাচ্ছে- এ বিষয়ক তথ্য আমাদের কাছে ঠিকভাবে আসে না। বিচ্ছিন্ন বা খণ্ডিত কিছু তথ্যই ভরসা। বিপদে পড়ে আমাদের এখানে আশ্রিত বিজিপি সদস্যদের কাছে তথ্য অনেক বেশি। রয়েছে গোয়েন্দা তথ্যও। এর আগে সীমান্তে মর্টারশেল পড়েছে। তাদের হেলিকপ্টার আমাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে বারবার। তখন মিয়ানমার সরকারের কাছেই প্রতিবাদ ও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। এখন আরাকান আর্মি বা অন্য কোনো বিদ্রোহীগোষ্ঠী একই ধরনের লঙ্ঘনের মতো যদি কোনো ঘটনা ঘটায় বা সীমান্তের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে, তাহলেও সেটি মিয়ানমারের সরকারকেই কূটনীতিক মাধ্যমে সমাধানের জন্য চাপ দিতে হবে। বিষয়টি উদ্বেগের। আরাকান আর্মি রাখাইনে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বসলে দেখা দেবে আরেক সমস্যা। তাই এই মুহূর্তে বাংলাদেশকে পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছে অত্যন্ত সতর্কতায়। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, মিয়ানমারের মোট ভূখণ্ডের ৭০ শতাংশের মতো জায়গাতেই যুদ্ধ। এর বেশির ভাগ হয় বিদ্রোহীদের দখলে, না হলে জান্তা সরকার ও বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাতময়। জান্তা সরকারের সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব বাকি মাত্র ৩০ শতাংশ ভূখণ্ডে। বাংলাদেশের সীমান্তের সঙ্গে যারা থাকবে তারা কোনো বৈধ সরকার কিনা সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে সামনে আসবে। কারো সঙ্গে আগ বাড়িয়ে যুদ্ধে না জড়ানো বাংলাদেশের কূটনীতি। কিন্তু যোগাযোগ ও তথ্য সংগ্রহ অবশ্যই কাম্য। বাংলাদেশ চীনের সহায়তা বা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে বলে জানানো হয়েছে সরকার থেকে। বিষয়টি জাতিসংঘসহ বিশ্বসভার গুরুত্বপূর্ণদের জানানোও জরুরি। মিয়ানমারের দু’পক্ষের মধ্যে জাতিসংঘ অবস্থান নিলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের একটি নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও ধারণা কারো কারো। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিদ্রোহীদের হামলার মুখে বিজিপি সদস্যদের এভাবে আশ্রয় নেয়ার ঘটনা না ঘটলে মিয়ানমারের ঘটনা বাংলাদেশে এত আলোচিত নাও হতে পারত। এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ ঘটনা হিসেবেই থাকত। এখন অনিবার্যভাবেই মিয়ানমারে আসলে কী চলছে, দেশটির সরকার ব্যবস্থা কেমন, সেখান থেকে যারা পালিয়ে আসছে তাদের সঙ্গে কী করা হবে- এমন বিষয়-আসয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তা জানতে-বুঝতে মানুষের আগ্রহও বেশ। মিয়ানমারের একসময় নাম ছিল বার্মা, আর রাজধানী রেঙ্গুন। ১৯৮৯ সালে দেশটির সামরিক সরকার বার্মার নতুন নাম দেয় মিয়ানমার। রাজধানী রেঙ্গুনের নতুন নাম রাখা হয় ‘ইয়াঙ্গুন’। ২০০৫ সালে ইয়াঙ্গুন দেশটির রাজধানীর মর্যাদা হারায়। পরে এবং বর্তমানে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিদো। আর ইয়াঙ্গুন তাদের দেশের প্রধান শহর। মিয়ানমার শাসিত হতে অভ্যস্ত। হাজার বছর ধরে মিয়ানমারকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী শাসন করেছে। তবে দেশটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে ছিল ১৮২৪ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত টানা ১২৪ বছর। শুরুতে বার্মাকে ভারতের একটি প্রদেশ ধরা হতো। ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশরা বার্মা প্রদেশকে আলাদা রাষ্ট্র ঘোষণা করে। ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে বেরিয়ে আসার পর বার্মা প্রথমবারের মতো স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এর মাঝে ৩ বছর ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বার্মা জাপানিদের দখলে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মায় জাপানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি। মূলত বার্মা ইনডিপেনডেন্ট আর্মির সহায়তায় জাপানিরা দেশটি দখল করেছিল। ১৯৪২ সালে জাপানিদের তত্ত্বাবধানে ও প্রশিক্ষণে তৈরি হয়েছিল বার্মা ইনডিপেনডেন্ট আর্মি। তৎকালীন বার্মার জেনারেল, নোবেল শান্তিপুরস্কারজয়ী অং সান সুকির বাবা অং সান এই বার্মা ইনডিপেনডেন্ট আর্মি তৈরি করেছিলেন। এই আর্মি তৈরির উদ্দেশ্য ছিল বার্মা থেকে ব্রিটিশ ও জাপানি শাসন উৎখাত করা। বার্মা পরে স্বাধীন হয়েছে ঠিকই তবে সেটা অং সানের মৃত্যুর পর। ২০১৫ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে অং সান সুকির নেতৃত্বাধীন বিরোধী এনএলডি সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে জয় পায়। তবে দলটি নিজেদের মতো দেশ পরিচালনা করতে পারেনি। সময়ের পরিক্রমায় সেই বার্মা আজকের মিয়ানমার আরেক যুগসন্ধিক্ষণে। ইতিহাসের এক নতুন বাঁকে। এই বার্মাকে আবার একসময় মগেরমুল্লুকও বলা হতো। ২০২২ সাল থেকে সেখানে ঘুরছে বহুল আলোচিত বার্মা অ্যাক্ট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালের ২১ ডিসেম্বর এই বিশেষ অ্যাক্টটি কার্যকর করে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন এতে স্বাক্ষর করার পর এটা তাদের আইনে পরিণত হয়। এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়। একটি হলো মিয়ানমারকে তার পূর্ব নাম বার্মা হিসেবে উল্লেখ করা। দ্বিতীয়টি হলো ‘রিগোরাস মিলিটারি’ এ দুটি শব্দ। সোজাকথায় কঠোর সামরিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বার্মাকে পুনঃএকত্রিত করা। এর নানান রসায়নের ছিঁটা পড়ছে বাংলাদেশ-ভারতসহ আশপাশের দেশগুলোতে। মোস্তফা কামাল : সাংবাদিক ও কলাম লেখক; ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন। mostofa71@gmail.com

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ভারতের ৫ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ী ১০৭ মুসলিম প্রার্থী

ভারতের ৫ রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে বিজয়ী ১০৭ মুসলিম প্রার্থী

বরকত উল্লাহ বুলুর বক্তব্য উদ্ভট ও শিষ্টাচারবিরোধী: জামায়াত

বরকত উল্লাহ বুলুর বক্তব্য উদ্ভট ও শিষ্টাচারবিরোধী: জামায়াত

এবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষকদের দুই মাসের অনুদান ছাড়

এবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষকদের দুই মাসের অনুদান ছাড়

সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে ইতালির সহযোগিতা চাইলেন আইজিপি

সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে ইতালির সহযোগিতা চাইলেন আইজিপি

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App