×

অর্থ শিল্প বাণিজ্য

মোংলা বন্দরের রাজস্ব আয় বেড়েছে ২৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ

সব সূচকেই ঊর্ধ্বমুখী, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার,ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তি

Icon

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 মোংলা বন্দরের রাজস্ব আয় বেড়েছে  ২৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ

তালুকদার আব্দুল বাকী, বাগেরহাট থেকে : দশের অর্থনীতির চাকা চাঙা রাখতে পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে মোংলা সমুদ্রবন্দরকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার ও বন্দরে ব্যবসায়ীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করায় হয়রানি ও অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা কমেছে। এতে বন্দরে জাহাজ বেশি নোঙর করায় কনটেইনার, কার্গো পরিবহন ও রাজস্ব আয়সহ সব সূচকেই ঊর্ধ্বমুখী মোংলা বন্দর।

পদ্মা সেতুর কারণে যোগাযোগব্যবস্থা সহজ হওয়ায় বেড়েছে এ বন্দর ব্যবহার করে পণ্য আমদানি-রপ্তানি। মোংলা বন্দর খুলনার অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ এবং বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমুদ্র বন্দর। এ বন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন শিল্প কারখানা, সম্প্রসারিত হয়েছে ব্যবসাবাণিজ্য। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণসহ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল তথা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ বন্দর ব্যাপক ভূমিকা রেখে চলেছে।

মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৮৪৬টি জাহাজ এসেছে অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৮২৭টি জাহাজ এসেছিল। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় এ বছরে মোট ১৯টি জাহাজ বেশি এসেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জাহাজ আগমনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৪০টি কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৬টি জাহাজ বেশি এসেছে। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে ১৫ হাজার ৩৪০টি গাড়ি আমদানি হয়েছে অন্যদিকে ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে গাড়ি আমদানি হয়েছিল ১৩ হাজার ৫৭৬টি। অর্থাৎ এ বছরে ১৭৬৪টি গাড়ি বেশি আমদানি হয়েছে। গত ১০ বছরে এ বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত গাড়ির সংখ্যা ১০৭৮৫৯৭৯টি (এক কোটি সাত লাখ পঁচাশি হাজার নয়শ ঊনআশি)। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১০৮ দশমিক ৬৮ লাখ টন কার্গো হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৯৯ দশমিক ০৫ লাখ টন কার্গো হ্যান্ডলিং করা হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৩১০৪৪ টিইইউজ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ২৬৫৮৩ টিইইউজ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট ৩১৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে মোট ৩০২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। পূর্ববর্তী অর্থ বছরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের অর্জিত রাজস্ব আয় ২৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

খাদ্যশস্য, সার, গাড়ি, এলপি গ্যাস, স্লাগ, লাইম স্টোন, সয়াবিন তেল, জিপসাম, মেশিনারি, কয়লা, পাথর, ক্লিংকার, পামওয়েল, ফ্লুড ওয়েল, ফ্লাইঅ্যাস ইত্যাদি এ বন্দরের প্রধান আমদানি পণ্য। ইলেকট্রনিক্স পণ্য, মোবাইল এক্সোসরিজ, ট্রাইসাইকেল পার্টস, ডাল, ক্যালসিয়াম কার্বনেট, পাটজাতপণ্য, খালি গ্যাস সিলিন্ডার, খেলনা, মেশিনার, রেফ্রিজারেন্ট গ্যাস, গøু এবং মটরপার্টস, লক, উডেন লক ইত্যাদি কন্টেইনারে আমদানি পণ্য।

মোংলা ইপিজেড হতে বিশ্বের প্রায় ৩৮টি দেশে পণ্য রপ্তানি হয়। রপ্তানিকৃত পণ্যসমূহ হলো যেমন- গার্মেন্টস, কাগজের তৈরি পণ্য, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, ব্যাগ, পাটজাত পণ্য, গাড়ির সিট, হিটার, মারবেল টাইলস, হিউম্যান হেয়ার, জিপার, সিগারেট, জ্যাকেট এবং নেট ইত্যাদি প্রধান রপ্তানি পণ্য।

বন্দরে রয়েছে ৫টি জেটি যার প্রতিটির দৈর্ঘ্য ১৮২মিটার। ৩০ হাজার টনের ৪টি ট্রানজিট শেড রয়েছে। রয়েছে ১টি স্টাফিং ও আনস্টাফিং শেড যার আয়তন ৪ হাজার ৭৪৩ বর্গমিটার (প্রায়)। ৩০ হাজার টনের ২টি ওয়্যারহাউস রয়েছে। ৬টি কন্টেইনার ইয়ার্ড যার আয়তন ৬৮ হাজার ৬৬৭ বর্গমিটার, যেখানে ৬০০০ (টিইইউজ) কন্টেইনার রাখা যায় (দুই উচ্চতায়)। ২টি কার ইয়ার্ডে প্রায় ২০০০ ইউনিট গাড়ি সংরক্ষণ করা যায়। রেফার প্লাগ পয়েন্ট ১৬০টি রেফার কন্টেইনারে এক সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ দেয়া যায়।

মোংলা বন্দরে ৫টি চলমান প্রকল্প রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- আধুনিক বর্জ্য ও নিসৃত তেল অপসারণ ব্যবস্থাপনা; মোংলা বন্দরের জন্য সহায়ক জলযান সংগ্রহ; পশুর চ্যানেলের ইনার বারে ড্রেজিং; আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট এবং বন্দরের ২টি অসম্পূর্ণ জেটি নির্মাণ (পিপিপির মাধ্যমে)। প্রকল্পগুলো বাস্তবয়িত হলে বন্দরের সুযোগ সুবিধা আরো বহুগুণে বাড়বে ও কর্মসংস্থান তৈরি হবে।

এছাড়া বন্দরে অনুমোদন প্রক্রিয়াধীন উল্লেখযোগ্য অনেক প্রকল্প রয়েছে। প্রকল্পগুলো হলো- মোংলা বন্দরের সুবিধাদির সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, বন্দর চ্যানেলে সংরক্ষণ ড্রেজিং, পশুর চ্যানেলে নদী শাসন এবং মোংলা বন্দরের আরো সম্প্রসারণের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা।

এ ব্যাপারে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল শাহীন রহমান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সুদক্ষ নেতৃত্ব ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে মোংলা বন্দরের গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ বন্দর দিয়ে ৮৪৬টি বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ আগমন করে। রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানি হয় ১৫ হাজার ৩৪০ ইউনিট। এ সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিংও কন্টেইনার হ্যান্ডলিং বৃদ্ধি পেয়েছে। সব সূচক পজেটিভ হওয়ায় বন্দরে নিট মুনাফা ২৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

তিনি আরো বলেন, পদ্মা সেতুর কারণে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর মোংলা বন্দরের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মহাকর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। এ বন্দর থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা থেকে চার ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে পণ্য আনা নেয়া করার ক্ষেত্রে বন্দর ব্যবহারকারীদের সময় এবং অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে। পদ্মা সেতুর কল্যাণে রাজধানীর সব থেকে কাছের বন্দর হওয়ায় মোংলা হয়ে পোশাক শিল্পের বিভিন্ন পণ্যও যাচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। মোংলা বন্দরের সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপন করায় পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে নবদিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। মোংলা বন্দরে জাহাজ হ্যান্ডলিং দ্রুত ও নিরাপদ হওয়ায় বিদেশি ব্যবসায়ীরাও এ বন্দর ব্যবহারে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন ফলে এই বন্দর দিয়ে এখন পণ্য আমদানি-রপ্তানি বেড়ে চলেছে। পণ্যগুলোকে নিরাপদ ও নির্বিঘেœ আমদানি-রপ্তানি করার ক্ষেত্রে মোংলা বন্দরও সার্বিক দিক দিয়ে প্রস্তুত রয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App