×

অর্থ শিল্প বাণিজ্য

অর্থাভাবে বন্ধ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প

চট্টগ্রামের পাঁচলাইশে থাকা শহরের সবশেষ তাঁত কারখানা গুটিয়ে নিচ্ছেন উদ্যোক্তারা, ঋণ সুবিধার বাইরে প্রায় ৫২ শতাংশ উদ্যোক্তা

Icon

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থাভাবে বন্ধ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প

কাগজ প্রতিবেদক : দেশে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্প খাতে প্রতিষ্ঠান ছাড়িয়ে গেছে ৭৮ লাখেরও বেশি। যার মধ্যে ৫৫ লাখের অবস্থান গ্রামাঞ্চলে। আর এসব প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় ২ কোটির বেশি মানুষ। এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, জিডিপিতে এসব খাতের অবদান ৩২ শতাংশ। অর্থনীতি চাঙা ও কর্মসংস্থান বাড়াতে এ খাতে ঋণ ও নীতি সহায়তা বাড়াতে তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। পর্যাপ্ত ও সময়মতো ঋণ না পাওয়া এ খাতের উদ্যোক্তাদের প্রধান সমস্যা। প্রায় ৫২ শতাংশ এসএমই উদ্যোক্তা এখনো ব্যাংক ঋণ সুবিধার বাইরে। গতকাল ছিল বিশ্ব ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্প দিবস। দিবসটিতে কেমন আছে বাংলাদেশে এ খাতের বিপুল শ্রমিক ও উদ্যোক্তারা? চ্যালেঞ্জ আর সম্ভাবনাগুলোই বা কী?

জানা গেছে- চট্টগ্রাম নগরীতে পাঁচলাইশ এলাকায় ৪৫ বছর ধরে টিকে থাকা শহরের সবশেষ তাঁত কারখানা গুটিয়ে নিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। কারখানাটিতে একসময় ২৫ থেকে ৩০ জন শ্রমিক কাজ করত, এখন আছেন মাত্র ৫ জন। তাদেরই একজন বয়সের ভারে কাবু ইসমাাইল মিয়া একসময় তাঁত কারখানার মালিক ছিলেন। জাপান থেকে আমদানি করা যন্ত্রপাতি আর সুতোয় বুনা তাঁত কাপড়ের চাহিদা ছিল দেশজুড়ে। এখন তিনি নিজেই শ্রমিক হয়েছেন।

উদ্যোক্তারা জানান, আন্তর্জাতিকভাবে সুতা ও তুলার দাম বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করতে না পারা ও সর্বোপরি পুঁজির অভাবে অন্য কারখানাগুলোর মতোই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এ কারখানাটিও। একজন তাঁতি বলেন, অনেক দিন কোথাও কাজ ছিল না। এখানে কয়েকদিন কাজ করলাম, এখন এটাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। স্বাধীনতার পর থেকে এখানে অনেক তাঁত ছিল। কিন্তু বর্তমানে এ তাঁত ছাড়া আর কোনো কারখানা চালু নেই। অনেকে সুযোগ-সুবিধা দেয়ার কথা বলে যায়। কিন্তু তারা চলে গেলে আর কিছুই পাই না আমরা।

জাতিসংঘের হিসাবে বিশ্বজুড়ে ব্যবসার ৯০ শতাংশ, চাকরির ৭০ শতাংশ আর জিডিপির ৫০ শতাংশের জোগান দেয় ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্প। সংস্থাটির হিসাবে, বাংলাদেশেও চাকরি ও ব্যবসা বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ এ খাতের দখলে রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, দেশে বর্তমানে কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান আছে ৬৮ লাখ ৪২ হাজার। যার মধ্যে ৫১ লাখই গ্রামাঞ্চলে। ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তা আছেন প্রায় ৯ লাখ ৬২ হাজার, মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তা ৭ হাজার ১০৬ জন। সব মিলিয়ে ৭৮ লাখ উদ্যোক্তার ৫৫ লাখ গ্রামে আর ২২ লাখ শহরে থাকেন। এছাড়া শহরে গাড়ির যন্ত্রপাতি তৈরির একটি ছোট কারখানা আছে। সেখানে কাজ করছে কিশোর ও যুবকরা। যাদের তেমন শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই। দেশে ক্ষুদ্র শিল্প কারখানায় কাজ করেন এমন শ্রমিকের সংখ্যা ৭২ লাখেরও বেশি।

অভাবের তাড়নায় কারখানায় কাজ নিয়েছেন এরা। বেশির ভাগই সরকারি কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। এসব কারখানায় বেতন, কাজের সময় নির্ধারণ, সুযোগ-সুবিধা নির্ভর করে মালিকের ইচ্ছা, অনিচ্ছার ওপর। কারণ এই শ্রমিকদের দেখভাল করার কোনো সংস্থা নেই। তবুও কোনো একদিন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় কাজ করছেন তারা।

দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বড় অংশীদার নারীরা। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, শহর ও গ্রাম মিলিয়ে দেশের ৪০ লাখ ৫১ হাজার নারী এসএমই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত। বিউটিশিয়ান, সেলাই, বুটিকস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতসহ নানা খাতে সফলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে নারীরা, তারা স্বাবলম্বীও হয়েছেন।

শামীমা শিলা নামের একজন চাকরি ছেড়ে বিউটিশিয়ানের পেশায় এসে এখন সফল উদ্যেক্তাদের মধ্যে একজন। তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে ২০ থেকে ২৫ জন নারী। এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলে স্বাবলম্বী করছেন অন্য নারীদেরও। তবে এর শুরু থেকে তার যাত্রা কেমন ছিল? কী কী চ্যালেঞ্জ নারী উদ্যোক্তারা পার করছেন রাজধানীর বাইরে? তিনি বলেন, যখনই আমরা কোনো ব্যাংক লোন বা সরকারি সহায়তার কথা বলি, তখনই প্রথম শর্ত হিসেবে এক্সপেরিয়েন্স লাগিয়ে দেয়া হয়। যারা নতুন উদ্যোক্তা তাদের তো সেই এক্সপেরিয়েন্স নেই। এ জায়গায় আমরা আসলে সবচেয়ে বড় সমস্যার মুখোমুখি হয়ে থাকি।

দেশে প্রায় ৭ হাজার মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করছে ৭ লাখের মতো শ্রমিক। এসব কারখানা দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি আয়ও করছে। বৈশ্বিক সংকট, ডলারের দাম, খরচ বৃদ্ধি , প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব মাঝারি শিল্প খাতের বড় সমস্যা। তবে তার চেয়েও বড় সমস্যা হলো এ শিল্পে বৃহৎ শিল্প গ্রুপের প্রবেশ। এখনই নীতিগত সিদ্ধান্ত না নিলে ভবিষ্যতে মাঝারি শিল্প টিকে থাকবে কিনা? তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন উদ্যোক্তারা।

উল্লেখ্য- ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্প খাতকে এগিয়ে নিতে ২০০৭ সালে ২০০ কোটি টাকা নিয়ে দেশে যাত্রা শুরু করে এসএমই ফাউন্ডেশন। এ পর্যন্ত তারা প্রায় ৮ হাজার ৬০০ উদ্যোক্তাকে ঋণ দিয়েছে। আশার কথা হলো, এই উদ্যোক্তাদের এক শতাংশও ঋণখেলাপি নন, তাই ২০০ কোটি টাকার ফান্ডের আকার এখন ৭১৬ কোটি টাকা।

উৎপাদন শিল্প জরিপ অনুযায়ী, দেশের অতি ক্ষুদ্র শিল্পকারখানার ৪৮ শতাংশের ব্যাংক ঋণ রয়েছে। বাকি ৫২ শতাংশ কারখানার মালিক নিজের টাকায় বিনিয়োগ করেছেন। অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এনজিও থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিচ্ছে। ব্যাংকার বলছেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের জটিলতায় ব্যাংকগুলো এসএমই খাতে ঋণ দিতে আগ্রহী হয় না।

এ ব্যাপারে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স (এবিবি) বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বলেন, লোনগুলো দিতে যথেষ্ট স্বচেষ্ট হতে হবে ব্যাংকগুলোকে। সবাই সব জানি আমরা। কার টাকা দরকার, ব্যাংকে লোন দরকার, সবাই এটা জানে। কিন্তু এটার মিলনটা হচ্ছে না।

এটার জন্য প্রথমেই ব্যাংকগুলোর মাইন্ডসেট পরিবর্তন করতে হবে যে হ্যাঁ, আমরা এ সেক্টরে যাবই। তবে এ চ্যালেঞ্জ উত্তরণে সরকারের নীতি আবশ্যক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App