×

অর্থ শিল্প বাণিজ্য

লোহিত সাগর সংকটে ‘ফ্রেইট চার্জ’ দ্বিগুণ

বৈদেশিক বাণিজ্যে চরম দুর্ভোগ

Icon

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বৈদেশিক বাণিজ্যে চরম দুর্ভোগ

কাগজ ডেস্ক : চলমান লোহিত সাগর সংকটে বৈশ্বিক বাণিজ্যে চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। দেখা দিয়েছে জাহাজ ও কনটেইনার জট। এর ফলে গত ছয় মাসে বাংলাদেশ-চীন রুটে জাহাজে পণ্য পরিবহনের ভাড়া (ফ্রেইট চার্জ) দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।

কনটেইনার শিপিং অ্যানালাইসিস ফার্ম লাইনারলিটিকার তথ্য মতে, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ট্রান্সশিপমেন্ট রুট সিঙ্গাপুর বন্দরে জাহাজের বার্থিং পেতে সময় লাগছে প্রায় ৭ দিন। স্বাভাবিক সময়ে এ বন্দরে জাহাজ ভেড়াতে লাগত দেড় দিনের মতো। সিঙ্গাপুর বন্দরে ৫০ শতাংশ এবং কলম্বো বন্দরে প্রায় ১৫ শতাংশ ভাড়া বেড়েছে।

এ ব্যাপারে বৈশ্বিক একটি শিপিং কোম্পানির বাংলাদেশ অফিসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান- সিঙ্গাপুর ও চীনের বন্দরগুলোয় জটের কারণে বাংলাদেশে বেশির ভাগ আমদানি পণ্য, বিশেষত শিল্পের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক্স পণ্য, যন্ত্রপাতির সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এসব পণ্য চীন থেকে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর হয়ে বাংলাদেশে আসে। আবার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর যেমন সিঙ্গাপুর, পোর্ট কেলাং, কলম্বো, তানজুম পেলাপাস বন্দর হয়ে চীনসহ ইউরোপ আমেরিকার বন্দরে পণ্য পরিবহন হয়। ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দরের মাধ্যমে তৃতীয় একটি দেশের বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে প্রতিবেশী বা অন্য কোনো দেশ তাদের পণ্য পরিবহন করে থাকে।

সংশ্লিষ্টরা জানান- দুই কারণে ফ্রেইট চার্জ এখন আকাশছোঁয়া। প্রথমত লোহিত সাগরে হুথিদের হামলার কারণে অনেকটা পথ ঘুরে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। দ্বিতীয়টি হচ্ছে সিঙ্গাপুর, চীনসহ বিভিন্ন দেশের বন্দরে জাহাজ ও কনটেইনার জট। বন্দরে কনটেইনার আটকে থাকায় সমুদ্রপথে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যাও কমে গেছে। ফলে শিপিং কোম্পানিগুলোও যে যার মতো ভাড়া বাড়িয়েছে।

শিপিং কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, লোহিত সাগরে হুথিদের হামলার কারণে বাংলাদেশ ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য আফ্রিকা ঘুরে যেতে হচ্ছে। এতে এশীয় অঞ্চল তথা চীন থেকে ইউরোপে পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত সময় লাগছে কমপক্ষে ১৫ দিন।

এর মধ্যে ডেনমার্কভিত্তিক শিপিং কোম্পানি মায়েরস্ক লাইন হংকংসহ দক্ষিণ চীন থেকে বাংলাদেশ রুটে পিক সিজন সারচার্জ যুক্ত করতে চলেছে ৭০০ ডলার থেকে ১,৪০০ ডলার পর্যন্ত। আগামী ১৫ জুন থেকে এটি কার্যকর হবে।

শিপিং কোম্পানির তথ্য মতে- বর্তমানে চট্টগ্রাম-চীন রুটে একটি ২০ ফুটের কনটেইনার (টিইউ) পরিবহনের ভাড়া ২,১০০ থেকে ২,৫০০ ডলার। ছয় মাস আগেও যা ছিল ৮০০ থেকে ১ হাজার ডলার। বর্তমানে চট্টগ্রাম থেকে সিঙ্গাপুর বন্দরে কনটেইনার পরিবহনের ভাড়া (ফ্রেইট চার্জ) ৩০০ ডলার এবং কলম্বো বন্দরে ২৩০ ডলার অর্থাৎ যথাক্রমে ৫০ ও ১৫ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক ও ক্রাউন ন্যাভিগেশনের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহেদ সারোয়ার বলেন, করোনা মহামারির আগে আমেরিকায় কন্টেইনার ভাড়া ছিল ৩,৫০০ ডলার। করোনার সময় সেটি বেড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার ডলারের বেশি হয়ে যায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে সেটি নেমে আসে ৩ হাজার ডলারের নিচে। সাম্প্রতিক সময়ে লোহিত সাগরে হুথিদের হামলা এবং ইরান- ইসরায়েল অস্থিরতার প্রভাবে আমেরিকার গন্তব্যে কনটেইনার ভাড়া বেড়ে ৪৫০০-৫০০০ ডলার হয়েছে।

একইভাবে করোনার সময় ইউরোপে ২ হাজার ডলার থেকে বেড়ে ফ্রেইট চার্জ হয় ১০ হাজার ডলার পর্যন্ত। সেটি একপর্যায়ে ১,৫০০ ডলারে নেমে এলেও বর্তমানে এই ভাড়া আবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,০০০ থেকে ৩,৫০০ ডলারে।

ব্যবসাবাণিজ্যের ক্ষতি : গার্মেন্টস মালিকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে ফেব্রিক আমদানি করতে সময় লাগে প্রায় এক মাস। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার কাঁচামাল ৭ দিনে পৌঁছে যায়। কিন্তু ইউরোপ ও আমেরিকায় ঘুরপথে পণ্য পাঠানোর কারণে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এখন ১৫ দিনের বেশি সময় লাগছে। ফলে ডেলিভারিতে দেরি হচ্ছে। এ কারণে ইউরোপ-আমেরিকার ক্রেতারা ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াসহ কম সময়ে পণ্য ডেলিভারি দিতে পারে এমন দেশে চলে যাচ্ছে। তারা বলছেন, কেবল কনটেইনারে পণ্য পরিবহনের খরচই বেড়েছে তাই নয়, বাল্ক ক্যারিয়ারের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের খরচও ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বলে মনে করছেন পোশাক কারখানা মালিকরা।

এ ব্যাপারে বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট রাকিবুল আলম চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাত টাইম বাউন্ড চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। ফ্রেইট চার্জ বৃদ্ধি এবং (পণ্য ডেলিভারিতে) সময় বেশি লাগার কারণে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ পরিবর্তে বিকল্প দেশে চলে যাচ্ছে। তাদের টাইম ফ্রেম পূরণের জন্য অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে বিদেশি ক্রেতারা।

এদিক অভ্যন্তরীণ ?রুটেও পণ্য পরিবহন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ডিপোগুলোতে রপ্তানি পণ্য পরিবহনে কাভার্ড ভ্যানের ভাড়া আগে ছিল ১৫ হাজার টাকা। পোশাক রপ্তানিকারকরা বলছেন, এখন সেই ভাড়া বেড়ে ২২ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান- কয়েক মাস আগেও চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় পণ্যবোঝাই কনটেইনার পরিবহনের গড় খরচ ছিল ১৫ হাজার টাকা। কিন্তু সম্প্রতি তা বেড়ে হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ক্রমাগত ভাড়া বাড়ার ফলে তৈরি পোশাক পংণ্য উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App