×

অর্থ শিল্প বাণিজ্য

গরমে অর্থনীতির ঘাম ঝরছে

Icon

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গরমে অর্থনীতির ঘাম ঝরছে
কাগজ প্রতিবেদক : চলমান দাবদাহে ব্যষ্টিক থেকে সামষ্টিক পুরো অর্থনীতিতে ঝরছে ঘাম। রিকশাচালকের আয় থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের ঋণ করে এসি কেনা; সবখানেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই আঁচ লেগেছে তীব্র দাবদাহের। এভাবে চলতে থাকলে জনজীবনের মতো অর্থনীতিও অস্থির হয়ে উঠবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। প্রতিদিনের মতো জীবিকার সন্ধানে রিকশা নিয়ে বের হয়েছিলেন আব্দুল আউয়াল। তীব্র রোদ, হল্কা বাতাস আর প্রচণ্ড গরমে শুরু থেকেই হাঁসফাঁস করছিলেন তিনি। রিকশা ঢাকা মেডিকেল এলাকা পর্যন্ত আসতেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন আউয়াল, কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যান হিটস্ট্রোকে। আবহাওয়া অফিসের সর্বশেষ তথ্য বলছে, দেশে সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা যশোর-খুলনা অঞ্চলে। লাগাতার ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরের তাপমাত্রায় দমবন্ধ অবস্থা সেখানে। ঢাকায় তাপমাত্রা দিনের বেলা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশপাশে বিরাজ করছে। গুগল ওয়েদারের দেয়া তথ্যানুয়ায়ী, তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও অনুভূত হচ্ছে ৪০ ডিগ্রির ওপরে। দিনের বেলা চামড়া-পোড়া গরম আর রাতে বাতাসে আর্দ্রতা বেড়ে অস্বস্তির সৃষ্টি হওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে মানুষ, শিকার হচ্ছে হিটস্ট্রোকের। রিকশাচালক আব্দুর আউয়ালের মতোই গত মঙ্গলবার হিটস্ট্রোকে মারা গেছেন মধ্যবয়স্ক চাকরিজীবী আলমগীর শিকদার। প্রতিদিনকার মতো অফিসের উদ্দেশে বাসা থেকে বের হয়ে গুলিস্তান আসতেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি। পরবর্তী সময়ে ঢাকা মেডিকেল নেয়া হলে চিকিৎসকরা জানান, হিটস্ট্রোকে আলমগীর মারা গেছেন। এ তো গেল রাজধানীর কথা। রাজধানীর বাইরে মাদারীপুর ও রাজশাহীতে হিটস্ট্রোকে কৃষকের মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটেছে। এদের প্রত্যেকেই দুপুরে মাঠে কাজ করতে গিয়ে তীব্র রোদে জ্ঞান হারিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন। তীব্র গরমে সবচেয়ে মানবেতর অবস্থা ঢাকা শহরের রিকশাচালকদের। একদিকে পেটের ক্ষুধা, অন্যদিকে মহাজনের দৈনিক টাকা জমা দেয়ার চাপ- এসব ছাপিয়ে যোগ হয়েছে তীব্র দাবদাহ। বাইরে রোদ্দুরে বেশিক্ষণ থাকলে জ্ঞান হারানোর দশা হয় বলে জানান তারা। কিছুক্ষণ রিকশা চালিয়ে ছায়ায় বসে বারবার বিশ্রাম নিতে হয়। নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে শান্তিনগরের আরেক রিকশাচালক আরিফ বলেন, কয়দিন আগে মালিবাগ মোড়ে গরমে বেহুঁশ হয়ে গেছিলাম। লোকজন মাথায় পানি দিয়া হুঁশ ফিরাইছে। গরমে রিকশা না বাইর হওয়ার আধা বেলা হইতে না হইতেই শরীর খারাপ করে। টানা চার দিন রিকশা নিয়া বাইর হই নাই। রিকশাচালকদের মতোই বেহাল দশা রাইড শেয়ারিংয়ের বাইকারদের। তীব্র দাবদাহে যাত্রীরা যথাসম্ভব বাইক এড়িয়ে চলছেন বলে জানান তারা। এদের বাইরে যারা মার্কেটিং ও সেলসে চাকরি করেন দাবদাহে তাদেরও বেহাল অবস্থা। মুরসালিন নামে করপোরেট এক সেলস কর্মকর্তা বলেন, এই গরমে ফরমাল শার্ট-প্যান্ট পরে দোকানে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বাইরে অবস্থান করা এক রকমের অসম্ভব হয়ে উঠছে। অফিসের অনেকে অসুস্থ হয়ে ছুটিতে আছেন। এতে অফিসের কাজকর্মও ব্যাহত হচ্ছে। একইভাবে গরমে করুণ দশা পোশাক শ্রমিকদের। অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ায় কারখানার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। আবার কারখানার মধ্যে এমন পরিবেশ যাতে লাগাতার কাজ করাও এই গরমে কঠিন হয়ে উঠছে পোশাক শ্রমিকদের জন্য। রেটরো নিটওয়্যার পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলতাফ হোসেন বলেন, গরমের কারণে অনেক কর্মচারী অসুস্থ হয়ে পড়ায় ২০ শতাংশের কম লোক নিয়ে কারখানা চালাতে হচ্ছে। এতে বায়ারদের অর্ডারমাফিক সময়মতো পণ্য সরবরাহের ব্যাপারটিও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। জীবনের হুমকি ছাড়াও চলমান দাবদাহে অতিষ্ঠ জনজীবনের প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতিতেও। রিকশাচালকের আয় থেকে শুরু করে দেশের সবচেয়ে বৃহৎ রপ্তানি খাত পোশাক শিল্পেও দাবদাহের ঘাম ঝরতে শুরু করেছে। এভাবে চলতে থাকলে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতেও এর প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দাবদাহের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির সংযোগ নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। যদি এ আবহাওয়ার কারণে সরবরাহ সংকট দেখা দেয়, তাহলে বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকবে। এই অস্বস্তিকর আবহাওয়ায় পণ্য যাতে নষ্ট না হয়, তাতে যে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে সেখানেও যোগ হচ্ছে বাড়তি খরচ। এর প্রভাব বাজারে পড়া খুব স্বাভাবিক। তিনি বলেন, চলমান দাবদাহে ব্যষ্টিক থেকে সামষ্টিক পুরো অর্থনীতিতে ঝরছে ঘাম। রিকশাচালকের আয় থেকে শুরু করে মধ্যবিত্তের ঋণ করে এসি কেনা; সবখানেই নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। শহর থেকে গ্রাম সবখানেই আঁচ লেগেছে তীব্র দাবদাহের। এভাবে চলতে থাকলে জনজীবনের মতো অর্থনীতিও অস্থির হয়ে উঠবে। কৃষকরা বলছেন, গরমের কারণে এবার ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে এখন মাঠে থাকা বোরো ফসল দাবদাহের কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। মাটিতে আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় বাড়তি সেচ দিতে হচ্ছে তাদের। ফলে ফসল উৎপাদনে বেড়ে যাচ্ছে খরচ। বরিশালের উজিরপুরের কৃষক মকবুল হোসেন বলেন, আগে ক্ষেতে টানা ১০ ঘণ্টা কাজ করতাম। এখন ২-৩ ঘণ্টার বেশি কাজ করাই যাচ্ছে না। টাকা বাড়িয়েও ক্ষেতকামলা পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে ধানের আগা শুকিয়ে যাওয়ায় চিটা ধানের পরিমাণ বেড়ে যাবে বলে শঙ্কা করা যাচ্ছে। দাবদাহের প্রভাব পড়েছে সবজি ক্ষেতেও। ঝালকাঠির কৃষক সামসুল হক হাওলাদার বলেন, রোদ্দুরে শসা ও টমেটো ক্ষেতে সবজি শুকিয়ে যাচ্ছে। বেগুনে পোকার পরিমাণ বেড়ে গেছে। সেচ দিয়েও আর্দ্রতা ঠিক রাখা যাচ্ছে না। এর ওপর দফায় দফায় লোডশেডিং হওয়ায় সেচকাজে ঘটছে বড় রকমের ব্যাঘাত। আম-লিচুর বাগানেও পড়েছে দাবদাহের নেতিবাচক প্রভাব। বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষি, উৎপাদন, খনিজ, খনন, পরিবহন ও নির্মাণের মতো খাতের অবদান ৫০ শতাংশের বেশি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব খাতের শ্রমিকেরা উন্মুক্ত পরিবেশে কাজ করেন। তবে কী পরিমাণ শ্রমিক উন্মুক্ত পরিবেশে কাজ করেন, তার কোনো নির্ভরশীল পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু যাঁরা এ রকম উন্মুক্ত পরিবেশে কাজ করেন, তাঁরা গরমের সময় তুলনামূলক কম ঘণ্টা কাজ করতে বাধ্য হন বলে দেখা যায়। বিজ্ঞানবিষয়ক ওয়েবসাইট ফিজ ডট ওআরজির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তীব্র তাপমাত্রার কারণে নির্মাণ ও কৃষি খাতে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে। অর্থাৎ, অবকাঠামো নির্মাণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং কৃষির ফলন কমে যেতে পারে। প্রচণ্ড গরমে ভুট্টা, সয়াবিন ও তুলার মতো অনেক ফসলের ফলন কমে যায়। এর ফলে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি উৎপাদন কমার কারণে দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের সংকট হলে মূল্যও বৃদ্ধি পায়। এতে আবার ভোক্তাদের ব্যয়ও বাড়ে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এক প্রতিবেদনে বলেছে, প্রচণ্ড তাপমাত্রা ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বে দৈনিক কর্মঘণ্টা ২ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে, যা ৮ কোটি পূর্ণকালীন (ফুল টাইম) চাকরির সমতুল্য। পণ্য পরিবহনেও প্রচণ্ড তাপমাত্রা প্রভাব ফেলে। যেহেতু দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণ কোল্ড চেইন অবকাঠামো নেই, তাই পরিবহনের সময় প্রচণ্ড তাপে অনেক খাদ্যপণ্য নষ্ট হতে পারে। গবেষণা বলছে, বেশি গরম আবহাওয়ায় কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের উৎপাদনশীলতা কমে যায়, এমনকি তাঁরা যদি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসেও কাজ করেন। এর ফলে সার্বিকভাবে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে যায়। দাবদাহের যন্ত্রণায় ভুগছেন খামারিরাও। বিশেষ করে পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বড় বিপদে। প্রচণ্ড গরমে হাজার হাজার মুরগির মৃত্যুতে বিপাকে পড়েছেন তারা। চাঁদপুরের পোল্ট্রি ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, গরমের কারণে একদিনে তার ২ হাজার মুরগি হিটস্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক করে মারা গেছে। বড় রকমের লোকসানে পড়েছেন তিনি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App