×

অর্থ শিল্প বাণিজ্য

বাম্পার ফলনে কৃষকের মুখে হাসি

হাওরে ৪ হাজার ১১০ কোটি টাকার ধান উৎপাদনের আশা

Icon

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মো. সাজ্জাদ হোসেন শাহ্, সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর ঘুরে : পর্যটন জেলা হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের হাওরে এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। সেই খুশিতে কৃষকের মুখে ফুটেছে হাসি। পূবালী বাতাসে হাওরজুড়ে এখন সোনালি ধানের ঘ্রাণ ম-ম করছে। শুরু হয়েছে ধান কাটা। মাড়াই ও শুকিয়ে গোলায় তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন হাওরাঞ্চলের কিষাণ-কিষাণি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে- আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ৪ হাজার ১১০ কোটি টাকার ধান উৎপাদন হবে। প্রতিবছর বৈশাখ এলেই সুনামগঞ্জের হাওরে অন্য রকম এক উৎসব চলে। এটি কৃষকের সারা বছরের শ্রমে-ঘামে জমিতে ফলানো সোনালি ধান গোলায় তোলার উৎসব। এ উৎসবে কৃষক পরিবারের নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-শিশু সবাই যোগ দেন। এমনকি গ্রামের বাইরে থাকা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ছুটে আসেন ধান কাটা, মাড়াই ও শুকিয়ে গোলায় তুলতে। কষ্টার্জিত এ ধানের ওপর নির্ভর করে হাওরের প্রতিটি পরিবারের সারা বছরের খাবার, খরচ, ছেলে-মেয়ের বিয়েশাদি, ধারদেনা মেটানোসহ সন্তানদের লেখাপড়া। এ ব্যাপারে ধর্মপাশা উপজেলার কালিজানা হাওরের কৃষক শফিক মিয়া, আলম মিয়াসহ অনেকেই জানান- প্রতি বছর ধান গোলায় তোলা সম্ভব হয় না। ২০১৭ সালের হাওর-বিপর্যয়ের সেই দুঃসহ স্মৃতি এখনো তাড়া করে। সে বছর একেবারে শূন্য হাতে ফিরতে হয়েছিল কৃষকদের। গত বছর নির্বিঘেœ ধান গোলায় তুলেছেন তারা। এর আগের বছর জেলার অন্তত ২০টি হাওরে ফসলহানি ঘটেছিল। জামালগঞ্জ উপজেলার শনিরহাওরের কৃষক আব্দুল হাই জানান- বছরের এ সময়ে সুনামগঞ্জ ও জেলার উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে অতিবৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। উজানে ভারি বৃষ্টি হলে এ জেলার হাওরে পাহাড়ি ঢল নেমে আগাম বন্যা দেখা দেয়। ভারি বৃষ্টি ও উজানের পাহাড়ি ঢলে হাওরের ফসল রক্ষাবাঁধ ভেঙে অথবা উপচে হাওরের ফসল তলিয়ে যায়। তাহিরপুর উপজেলার কৃষক জালাল উদ্দিন বলেন, এবারো মার্চের শেষ সপ্তাহ এবং এপ্রিলের শুরুতে সুনামগঞ্জে ব্যাপক ঝড়বৃষ্টি হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল। বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে জেলার দুটি উপজেলার কয়েকটি হাওরে বেশ কিছু ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছে। তবে এখন বৃষ্টিপাত না হওয়ায় কৃষকদের মনে স্বস্তি ফিরেছে। হাওরে এখন পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। সদর উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের কৃষক ফুরকান আলী জানান, তিনি এবার দেখার হাওরে ১০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছেন। ধান কাটা শুরু করেছেন। ধানের ফলনও হয়েছে ভালো। আবহাওয়া ভালো থাকলে আগামী ১০ দিনের মধ্যে সব ধান তুলে ফেলবেন। একই গ্রামের অপর কৃষক মহিনুল ইসলাম বলেন, পুরোদমে ধান কাটা শুরু হতে আরো কয়েকদিন সময় লাগবে। রোদ ওঠায় হাওরের সব কৃষক খুশি। এভাবে আর ১০ থেকে ২০টা দিন পেলেই হবে। পুরো বৈশাখ হাওরে কাটে কৃষক পরিবারের লোকজনের। ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানো- সবই চলে হাওরে। এ জন্য হাওরে উঁচু জায়গায় ‘খলা’ (ধান শুকানোর মাঠ) তৈরি করা হয়। আবার কোনো কোনো হাওরপাড়ে অস্থায়ী ঘর তৈরি করে পুরো পরিবারসহ স্থানান্তরিত হয়ে যান কেউ কেউ। স্থানীয় ভাষায় তাদের বলা হয় ‘জিরাতি’। দিরাই উপজেলার কৃষক প্রদ্যুৎ তালুকদার বলেন- দিন ভালা, আমরা খুশি। এ ধানই আমরার সব। ধান পাইলে সুখী, না পাইলে ফকির। জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সুনামগঞ্জের ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৪০৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার ২০০ টন। জেলায় ধান কাটা ও মাড়াইয়ের জন্য ৮৫০টি কম্বাইন্ড হারভেস্টর আছে। মেশিনে ৫৫ ভাগ এবং শ্রমিকরা ৪৫ ভাগ জমির ধান কাটবেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত জেলার সব উপজেলার হাওরের সার্বিক পরিস্থিতি ভালো। হাওরে এখন পর্যন্ত ৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরের ফসল রক্ষায় প্রতিবছর জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ৪০টি হাওরের ফসল রক্ষায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করে। এবার জেলার ১২টি উপজেলায় ৭৩৫টি প্রকল্পে ৫৯১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, এ সময় সুনামগঞ্জে ও তার উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে হালকা ও মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে। তবে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ ইকবাল চৌধুরী ভোরের কাগজকে বলেন, গত সপ্তাহের ঝড়বৃষ্টিতে হাওরবাসীর মধ্যে কিছুটা আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল, সেটা কেটে গেছে। কৃষকরা যাতে হাওরের ফসল নির্বিঘেœ গোলায় তুলতে পারেন সেজন্য প্রয়োজনীয় সবকিছুই করার প্রস্তুতি রয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App