×
Icon এইমাত্র
কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে কোটা আন্দোলনকারীরা বাংলাদেশ টেলিভিশনের মূল ভবনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। বিটিভির সম্প্রচার বন্ধ। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সারা দেশে এখন পর্যন্ত ১৯ জন নিহত কোটা ইস্যুতে আপিল বিভাগে শুনানি রবিবার: চেম্বার আদালতের আদেশ ছাত্রলীগের ওয়েবসাইট হ্যাক ‘লাশ-রক্ত মাড়িয়ে’ সংলাপে বসতে রাজি নন আন্দোলনকারীরা

সারাদেশ

কারখানার বর্জ্য গিলে খাচ্ছে লবলং খাল

Icon

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কারখানার বর্জ্য গিলে  খাচ্ছে লবলং খাল

নাসির উদ্দিন জর্জ, শ্রীপুর (গাজীপুর) থেকে : শ্রীপুরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া লবলং খাল শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে এখন মৃতপ্রায়। দখল, দূষণ ও আর্বজনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে এক সময়ের খরস্রোতা খালটি। অনাবাদি হয়ে পড়েছে দুই পাশের ফসলি জমি। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন তীরবর্তী মানুষরা।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, শ্রীপুরে ৪৩৮টি শিল্প কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে মাওনা ইউনিয়নেই রয়েছে ৭৩টি। লবলং খালটি ময়মনসিংহের ভালুকার খিরু নদী থেকে গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা হয়ে তুরাগ নদীতে এসে যুক্ত হয়েছে। গাজীপুর অংশের শিল্প-কারখানাগুলোর বর্জ্য সরাসরি খালে পড়ছে। রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) গবেষণায় খালে ১৫টি পয়ঃনিষ্কাশন লাইন এবং ১১টি ডাম্পিং স্টেশন গড়ে উঠেছে। ওই সংস্থাটির গবেষণায় সবচেয়ে দূষিতের তালিকায় লবলং অন্যতম।

লবলং খাল বড় নদীর মতো। এই নদী বা খালকে কেন্দ্র করে এলাকার কৃষি অর্থনীতি গড়ে উঠেছিল। নব্বই দশকে শ্রীপুরে শিল্প কারখানা গড়ে উঠলে খাল দূষণ শুরু হয়। লবলং খালের মাওনা ইউনিয়নের মাওনা-ফুলবাড়িয়া সড়কের দুই পাশে ক্রাউন কারখানা, তেলিহাটি ইউনিয়নের অংশে দখলে অস্তিত্ব হারিয়েছে ধাউরের খাল। শ্রীপুর পৌরসভার বৈরাগীরচালা খালটি শিল্পবর্জ্য ও দখলে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। ওই খালের গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি অংশে কয়েক মাস ধরে বর্জ্য ফেলায় পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে পড়ছে। গোসিঙ্গা ও রাজাবাড়ি ইউনিয়নের তরুণের খালটির বিভিন্ন অংশ দখল-দূষণে এখন মৃত।

লবলং খাল দেখে এক সময় মনে হতো জলে টইটম্বুর এক রাক্ষুসে নদী। সেই রাক্ষসরূপী খাল এখন অস্তিত্ব সংকটে হারিয়ে ফেলেছে তার নদী চরিত্র। এখন কেউ বলে লবলং খাল আবার কেউ বলে লবলং নালা। লবলং ভরাট করে গতিপথ পরিবর্তন করে গড়ে উঠেছে শিল্প কারখানা। সরকারি এসব খাল দখল-দূষণে কোথাও কৃষক, কোথাও প্রভাবশালী এবং শিল্প-কারখানার মালিকেরা জড়িয়ে পড়ছেন। শুধু দখল করেই থেমে নেই, ইচ্ছামতো বিভিন্ন জায়গায় খালের গতিপথও পরিবর্তন করছেন। খালের কিছু দূরে যেসব জমিতে এখনো ফলন হচ্ছে বর্ষা মৌসুমে পানির সঙ্গে ওইসব জমিতে বর্জ্য গিয়ে ফলন কমে যাচ্ছে। অতিমাত্রায় দূষণের কারণে এ খালে কোনো মাছ নেই। এমনকি সাপ বা ব্যাঙও পাওয়া যায় না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী বা খালের দুই পাশ দখল করে শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় গতিপথ সরু হয়ে গেছে। ওইসব কারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত পানি নদীতে পড়ে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। তীরবর্তী নিচু ফসলি জমিগুলো পানিতে তলিয়ে থাকায় অনাবাদি রয়েছে কয়েক বছর ধরে। নদী দখলমুক্ত ও ফসলি জমি রক্ষার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিয়েও কোনো ফল পায়নি বলে অভিযোগ তাদের। পরিবেশ দূষণকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারছে না। স্থানীয় পরিবেশ অধিদপ্তরে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে তারা ছাড়পত্র বা সনদ নবায়ন করছেন। কারখানার বর্জ্যে পানির রং কালো ও দুর্গন্ধযুক্ত। তারা আগামী কয়েক বছর জমিতে চাষ করতে পারবেন না। তাদের অভিযোগ কেউ গুরুত্ব দেয় না। গাজীপুর সদর উপজেলার বাঘেরবাজার থেকে সাফারি পার্ক যাওয়ার পথে লবলং খালে নির্মিত সেতুর গোড়ায় মাঝরাতে বাঘের বাজার থেকে ট্রাক ভরে বর্জ্য ফেলা হয়। আমরা এসব নিয়ে অভিযোগ দিলে কারখানার মালিকরা স্থানীয় প্রতিনিধিদের ম্যানেজ করেন। বলাইঘাটা এলাকার কৃষি জমির মালিক আলতাব হোসে বলেন, আমার ৫ বিঘা ধানের জমির পাশ দিয়েই কারখানার বর্জ্যরে পানি চলে গেছে। আমরা বছরের পর বছর ধরে ভুগছি নষ্ট হচ্ছে কৃষিজমি। মূলত জমিগুলো কিনে নেয়ার জন্যই কারখানাগুলো তাদের দূষিত পানি সরবরাহের কোনো স্থায়ী সমাধান করছে না।

বাংলাদেশ রিভার অ্যান্ড নেচার ফাউন্ডেশেনের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, বেশির ভাগ শিল্প কারখানায় ইটিপি সংযোগ কেবলই লোক দেখানো। পরিবেশ দূষণের প্রতিবাদে এবং দূষণকারীদের শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেও কোনো লাভ হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থাও নেয়নি। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদাক হারুন অর রশিদ ফরিদ বলেন, গাজীপুরে ডাইং ও প্রিন্টিং কারখানা রয়েছে ১৪টি। বর্জ্য শোধনের জন্য ওইসব কারখানায় শোধনাগার বা ইটিপি থাকার কথা পরিবেশ অধিদপ্তর স্বীকার করলেও অধিকাংশ কারখানায় নিয়ম মেনে যথাযথভাবে ইটিপি স্থাপন হয়নি। কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের ইটিপিগুলো ঠিকমতো পরিচালনা করে না। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, লবলং খাল দূষণ নিয়ে আমরা অনেকবারই নদীরক্ষা কমিশন, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসেছি। শিল্প-কারখানা প্রয়োজন আছে। কিন্তু পরিবেশ দূষণ ঠেকাতে ইটিপি মানা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

গাজীপুর জেলা কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক রফিকুল ইসলাম খান বলেন, জেলায় কারখানার বর্জ্যরে কারণে ৩৮০ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে। তবে পরিবেশ নিয়ে কাজ করেন এমন সংগঠন ও পরিবেশবিদদের দাবি, নষ্ট হওয়া জমির পরিমাণ আরো অনেক বেশি।

গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নয়ন মিয়া বলেন, খাল, বিল ও নদী দখল-দূষণের অভিযোগে বিভিন্ন সময় কারখানায় অভিযান চালিয়ে ক্ষতিপূরণ বা জরিমানা করা হয়েছে। এ ধরনের অভিযান অব্যাহত আছে। বর্জ্য পরিশোধনে ইটিপি ব্যবহার না করলে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবুল ফাতে মো. সফিকুল ইসলাম জানান, খালগুলোর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তা দখলমুক্ত করে দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন সবসময় তৎপর রয়েছেন।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App