×

সারাদেশ

জমিতে পুকুর খনন করে মিঠা পানির সংস্থান

সাতক্ষীরায় লোনা জমিতে সবজি আবাদে কৃষকের সাফল্য

Icon

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

 সাতক্ষীরায় লোনা জমিতে সবজি আবাদে কৃষকের সাফল্য

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জেলায় লবণাক্ত জমিতে সবজি উৎপাদনে দেখা দিয়েছে অভাবনীয় কৃষি সাফল্য। দিগন্তজুড়ে ক্ষেতগুলো সবজি আবাদে সবুজে ছেয়ে গেছে। এক ফসলি জমিগুলো এখন তিন ফসলিতে রূপান্তর হচ্ছে। সেই লবণাক্ত জমিতে লাউ, কুমড়া, পেঁপে, ঢেঁড়শ, পুঁইশাক, উচ্ছে, শসা ও লালশাকসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করে সফল্য দেখা দিয়েছে। সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখাচ্ছে কৃষকদের। পতিত জমি এখন আশা দেখাচ্ছে। স্বপ্ন বুনছেন আগামীর জন্য। গত কয়েক দশক ধরেই লবণাক্ততার কারণে জমিতে ফলে না ফসল। মিঠাপানির আধারগুলো গেছে শুকিয়ে। গ্রামের পাশ দিয়ে খাল প্রবহমান থাকলেও পানির অভাবে শস্য আবাদ করতে পারেন না উপকূলের কৃষকরা। শুষ্ক মৌসুমে দিগন্তজুড়ে দেখা দেয় খরা। এরই মধ্যে সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছে এই এলাকার কৃষকরা। পতিত থাকা ফসলি জমির কোনায় পুকুর করে মিঠা পানির ব্যবস্থা করছেন তারা। সেই পানি দিয়ে এখন ফলানো হচ্ছে শস্য। দিগন্তজুড়ে শস্যের ক্ষেতগুলোতে ভূট্টা ও সবজির আবাদে সবুজে ছেয়ে গেছে। এক ফসলি জমিগুলো এখন তিন ফসলিতে রূপান্তর হচ্ছে। গল্পের এই পরিবর্তনের নাম সাতক্ষীরার উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার কাশিমারি ইউনিয়নের খুটিকাটা গ্রামের কৃষকদের। আগে এখানকার কৃষকদের শুধু আমন ধান আবাদ করতে পারত। এখন সেই লবণাক্ত জমিতে লাউ, কুমড়া, পেঁপে, ঢেঁড়শ, পুঁইশাক, উচ্ছে, শষা ও লাল শাকসহ বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন করে সফল হয়েছে।

খুটিকাটা গ্রামের প্রান্তিক কৃষক নির্মল সরকার, রবিন্দ্র নাথ সরকার ও নিহার সরকার জানান, লবণাক্ততার কারণে তাদের গ্রামের শত শত হেক্টর কৃষিজমি পতিত থাকে। ফসল ফলে না ঠিকমতো। তাছাড়া মিঠাপানির আধারগুলো শুকিয়ে গেছে। গত বছর সিনজেনটার সহযোগিতায় লবণাক্ত জমিতে ফসল উৎপাদন করে এলাকায় রীতিমত সাড়া ফেলে দিয়েছে তারা। গ্রামের অধিকাংশ কৃষককে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণে পুকুর খনন করে দিয়েছে সিনজেন্টা। এছাড়া আবাদের জন্য ভার্মিং কম্পোজ সার প্লান্ট, শস্য বীজ এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণ সরবরাহ করেছে। কৃষকরা লবণাক্ত জমিতে বৃষ্টির পানি ব্যবহার করে নানা প্রকার ফসল উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন। চলতি মৌসুমে প্রতি বিঘা জমিতে একেক জন কৃষক ৩০-৫০ হাজার টাকা লাভ করেছেন। আরো অধিকসংখ্যক পুকুর খনন এবং গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া খালগুলো পুনঃখনন করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে বারো মাসই সবজিসহ বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।

এ বিষয়ে সিনজেনটা বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হেদায়েত উল্লাহ বলেন, সাতক্ষীরার যে অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে সারাবছর ফসল ফলাতে পারত না। সেখানে সিনজেনটার প্রযুক্তিগত ও উপকরণ সহায়তার মাধ্যমে এক ফসলি জমিকে তিন ফসলি জমিতে রূপান্তর করা সম্ভব হয়েছে। এতে কৃষকের সক্ষমতা এবং জীবন জীবিকার মান উন্নয়ন হয়েছে। কৃষিতে একটা অমূল পরিবর্তন আনা গেছে। এ অঞ্চলে টেকসই কৃষি ব্যবস্থার পাশাপাশি রিজেনারেটিভ অ্যাগ্রিকালচার পদ্ধতিগুলো বাস্তবায়ন করছে সিনজেনটা। গো গ্রো প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসডিজির অনেকগুলো লক্ষ্য পূরণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি জলবায়ুর পরিবর্তনের ঝুকি মোকাবিলা করে সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি মডেল হিসেবে কাজ করছে প্রকল্পটি।

জানা গেছে, খুটিকাটা গ্রামে শস্য আবাদের মাধ্যমে কৃষিকে টেকসই রূপান্তর করতে গো গ্রো প্রকল্প গ্রহণ করেছে সিনজেন্টা বাংলাদেশ লিমিটেড। গত বছরে শুরু হওয়া এ প্রকল্পে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান জড়িত রয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), বিনা, ডিএইর এসএসি প্রকল্প এবং এসআরডিআই। শুরুতে পুকুর খননের মাধ্যমে মিঠা পানির সংস্থান করা হয়েছে। খুটিকাটা গ্রামের ৪০ জন কৃষক দিয়ে এই কার্যক্রম শুরু হয়। সেসব কৃষক জমির কোনায় কয়েকটি পুকুর খনন করেন। এক একটি পুকুর খনন করতে ১০-১৫ ফুট গভীর করা লাগে। খননে প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ হয়। আর সেই পুকুর মিঠা পানির আধার হিসেবে কাজ করে। সবজি ও শস্য আবাদের সময় পুকুরের পানি দিয়ে সেচ দেয়া হয়। তবে মিঠা পানির সরবরাহ বাড়াতে এই ধরনের পুকুর খননেন পাশাপাশি বিদ্যমান খালের পানি সরবরাহের উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে এ অঞ্চলে আরো বেশি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির জানান, উপকূলে বসবাসরত মানুষের বারো মাসই নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিল করতে হয়। ঝড়, জলোচ্ছ¡াস ও খরার কারণে এসব উপকূলবাসীদের টিকে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছে। সেখানে জমি পতিত থাকলে অর্থনৈতিকভাবে তারা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন। তাদের টিকে থাকার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার উপায় বের করতে হবে আমাদের। কারণ ঝড়, জলচ্ছ¡াস ও বন্যা বন্ধ করা তো কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে এমন পরিবেশে টিকে ফসল উৎপাদন বাড়াতে হবে। সিনজেনটার এ প্রযুক্তি এই জেলার অন্যান্য গ্রামে সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসার প্রয়োজন। লবণসহিষ্ণু বিভিন্ন প্রকার ধান, সবজি, ফল এবং অন্যান্য গাছ রোপণ করতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। মিঠা পানির সরবরাহের লক্ষ্যে খালে পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানান।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App