×

সারাদেশ

বদলেছে তিস্তার গতিপথ ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা

Icon

প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বদলেছে তিস্তার গতিপথ ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা

শেখ জাহাঙ্গীর আলম শাহীন, লালমনিরহাট থেকে : তিস্তা নদী গতিপথ বদলেছে। ভাটিতে বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। রংপুর অঞ্চলে আগাম সেই প্রস্তুতি নেই। তিস্তা নদীর স্থায়ী বন্যা নিয়ন্ত্রণের অভাবে রংপুর অঞ্চলের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারছে না। গত বছর ভারতের সিকিম বিপর্যয়ে যে ক্ষতি হয়েছে ভাটিতের থাকা রংপুরাঞ্চলের। এ বছর বর্ষা তার চেয়েও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। বিগত কয়েক বছরের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি হবে। সরকার ও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে তিস্তা মহা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে যতসব আলোচনা হচ্ছে। সেই তুলনায় প্রকৃতপক্ষে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।

ভারতের রিভার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আরআরআই) তিস্তা নদীর গতিপথ বদলানো নিয়ে সমীক্ষা করেছে। গত বছরের ৪ অক্টোবর ভারতের সিকিমে প্রাকৃতিক বিপর্যয় হয়। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বাঁধ ভেঙে যায়। সিকিমের সাউথ লোনাক হ্রদের পানি উপচে এসে পড়ে তিস্তা নদীতে ভয়ঙ্কর আকস্মিক বন্যা নেমে এসেছিল। এতে তিস্তা নদীর একাধিক জায়গায় গতিপথ বদলে ফেলে প্রবাহিত হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সমতলের কয়েক জায়গায় তিস্তা গতিপথ পাল্টেছে। রাজ্য সেচ দপ্তরের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে। ভাটির জেলা লালমনিরহাটে সেই বন্যায় সরকারিভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ৪ অক্টোবরের হরকা ঢলের আগেকার তথ্যের সঙ্গে বর্তমান তথ্য মিলিয়ে দেখা গেছে, তিস্তা নদীর গতিপথের কিছু জায়গায় গরমিল। সুস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে, তিস্তা নদী গতিপথ বদলে ফেলেছে। এদিকে তিস্তা নদীর সিকিম বিপর্যয়ের প্রভাবে ভাটির দেশ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় তিস্তা নদীর ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। প্রধান পরিবর্তন তিস্তা নদীতে ৫-৭ ফিট করে পলি পড়েছে। তিস্তা নদীর কোথাও এখন আর গভীরতা নেই। তিস্তা নদী এখন পুরোপরি নাব্য সংকটে পড়েছে। আকর্ষিক বন্যার কারণে গত বর্ষায় তিস্তা নদীর পানি স্রোতে জল নয়, এসেছে শুধু কাদামাটি। সেই কাদামাটি এখন জমে গিয়ে তিস্তায় বিশাল বিশাল চর জেগেছে। তিস্তা নদীতে এখন বালুর আস্তরণের পরিবর্তে পলিমাটির আস্তরণ পড়েছে। যার পুরো সুবিধা পাচ্ছে তিস্তা পাড়ের কৃষকরা। তারা নানা জাতের ফসল ফলাচ্ছে। সেই তিস্তা পাড়ের মানুষ বর্ষা মৌসুমের আগমনকে ভয় পাচ্ছে। তিস্তা পলি পড়ে গভীরতা হারিয়ে ফেলেছে। তার মধ্যে সিকিম বিপর্যয়ে সিকিমের বাঁধগুলো এখনো শতভাগ মেরামত হয়নি। তাই বর্ষা ভারতের উজানের ঢলে ভাটির দেশের রংপুর অঞ্চল ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে নদী বিশেষজ্ঞরা। তিস্তা নদী বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারেজের পরেও নানা স্থানে তার মূল প্রবাহ পরিবর্তন করে ফেলেছে। খরাস্রোতা তিস্তা এখন বর্ষায় বিস্তৃণভাবে প্রবাহিত হয়ে ভয়াল রূপ ধারণ করে। কোথাও আর তিস্তা নদীর স্রোতধারা প্রবাহিত হয় না। তিস্তা মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। বর্ষায় নদীতে জল বাড়লে কোথায় কী ঘটে যাবে তা ভেবে বর্ষার মৌসুমের আগে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন ছিল। বর্ষার আগে বন্যা মোকাবিলায় তিস্তা পাড়ের মানুষকে প্রস্তুত করে রাখতে হতো। তিস্তা নদীর সেচ প্রকল্প, নদীর কোন বাঁধ দুর্বল, কোথায় নদীপার থেকে মাটি খসে পড়েছে। কোথায় স্পরের গোড়ায় মাটি নেই। এসব মেরামত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের জনৈক কর্মকর্তা জানান, প্রতিটি নদীর গতিপথের পৃথক পৃথক ভাষা রয়েছে। নদীর তলদেশের মাটির ভূ-প্রকৃতির উপরও নির্ভর করে তীব্র স্রোতধারায় নদী পরিবর্তন হবে কি না। নদীর নিজস্ব গতিতে কোথায় স্বাভাবিকভাবে সরে গিয়েছে, কোথায় ফিরে আসার আশঙ্কা সেসব বোঝা যাবে। সে হিসেবে, উত্তরাঞ্চলে নদীতে বন্যা নিয়ন্ত্রণের কাজ না হলে, সামনের বর্ষায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এবারে তিস্তা নদী পাড়ের মানুষ বর্ষা মৌসুমে যে কোনো বর্ষার চেয়ে পড়তে যাচ্ছে মহা বিপাকে। বর্ষায় বন্যার আগাম কোনো প্রস্তুতি নেই বললেই চলে।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রবিউল ইসলাম জানান, তিস্তা নিয়ে আপাতত কোনো বৃহৎ পরিকল্পনা নেই। তিস্তার কিছু বাঁধ সংস্কার করা হয়েছে। কিছু বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। বাঁধের ভিতরেও কিছু মানুষের বসবাস রয়েছে। তিস্তা ক্ষেপাটে নদী। প্রধান কোনো চ্যানেল নেই। একাধিক চ্যানেলে প্রবাহিত হয়। বর্ষায় সব চ্যানেল মিলেমিশে একাকার হয়ে ভয়াল রূপ ধারণ করে।

তিস্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ও অর্থনৈতিক গুরুত্ববহ করতে হলে তিস্তায় সব চ্যানেলকে এক ধারায় নিয়ে আসতে হবে। তিস্তা মহাপরিকল্পা হতে পারে সেই পরিকল্পার বাস্তবায়নের একমাত্র উপায়। আপাতত বর্ষায় তিস্তা নদীতে বন্যায় আগাম কোনো প্রস্তুতি নেই।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App