×

সারাদেশ

দেওয়ানগঞ্জ

তৃতীয় লিঙ্গের মুন্নি এখন ভাইস চেয়ারম্যান

Icon

প্রকাশ: ২৫ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

তৃতীয় লিঙ্গের মুন্নি এখন  ভাইস চেয়ারম্যান

সাইমুম সাব্বির শোভন, জামালপুর থেকে : ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে চমক দেখালেন তৃতীয় লিঙ্গের মুন্নি আক্তার। পাঁচ নারীকে হারিয়ে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন তিনি। জয়ের পরেও থেমে নেই মুন্নি। নির্বাচনের পরের দিনই ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশসহ সুখে-দুঃখে পাশে থাকার প্রতিশ্রæতি দিচ্ছেন সেলাই মেশিন প্রতীকে জয় পাওয়া মুন্নি আক্তার।

মুন্নির জীবনের প্রতিটি ধাপ ছিল একেকটি যুদ্ধের মতো। প্রতিটি কর্মস্থল ছিল রণক্ষেত্র। গতকাল শুক্রবার সকালে এই প্রতিবেদকের কথা হয় মুন্নির পরিবারের সঙ্গে। মুন্নির ছোট ভাই আব্দুর রহমান বলেন, মুন্নি আপা কখনো পরিবারের সঙ্গে থাকেননি।

বাবা-মার সঙ্গে থাকেননি। একা থাকছেন ছোটবেলা থেকে। কিছু ছিল না। ছোট থাকতেই একটা কম্বল গায়ে দিয়ে এসেছিলেন দেওয়ানগঞ্জে। কখনো সারা দিনে একবেলা খেয়েছেন। আবার কখনো না খেয়ে থেকেছেন। আজ অনেক কিছু হয়েছে। অনেক মানুষকে অনেক কিছু করে দিয়েছেন। তিনি জনগণের পাশে ছিলেন। তাই জনগণ আজ উপজেলা নির্বাচনে মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদান দিয়েছে।

মুন্নি আক্তারের মা রেজিয়া বেগম বলেন, সাত ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ মুন্নি আক্তার। তাকে নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। আমাদের বাসা জামালপুর শহরের দেওয়ানপাড়া হলেও মুন্নি ১৮ বছর ধরে দেওয়ানগঞ্জে থাকে। অনেক ছোট থাকতে চলে এসেছে। কারণ সমাজ তাকে মেনে নেয়নি। আমাদের অনেক কষ্ট ছিল, অনেক ব্যথা ছিল। এখন এই মুন্নি মানুষের মতো মানুষ হয়েছে। সে সবার দোয়ায় মানুষ হয়েছে। যতদিন বেঁচে থাকবে সে সবার দোয়া নিয়ে বেঁচে থাকবে। যা কিছু করবে, সবার জন্য করবে।

সাধারণ ভোটাররা বলছেন, পরিবর্তনের প্রতিশ্রæতি ও আগে থেকেই গরিব-দুঃখীদের পাশে থাকায় মুন্নিকে ভোট দিয়েছেন তারা। এছাড়াও আগামীতে এলাকার উন্নয়নে আরো কাজ করবেন মুন্নি- এমনটাই আশা তাদের।

আব্দুল কুদ্দুস নামে উপজেলার সানন্দবাড়ী বাজারের একজন বলেন, মুন্নি আগে বাজারে দোকানে দোকানে গিয়ে টাকা তুলতেন। এখন আর এটা নেবেন না। ওয়াদা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাকে ভোট দিলে আর বাজারে টাকা ওঠাবেন না।

তার কোনো সংসার নেই, ভোট দিলে এলাকার গরিব, অসহায় মানুষের পাশে থাকবেন। তাই জনগণ তাকে ভোট দিয়েছেন।

বিল্লাল মণ্ডল নামে আরেকজন বলেন, গরিব দুঃখী এবং অবহেলিত মানুষের পাশে মুন্নি আগেও ছিলেন, এখনো থাকবে। সাধারণ জনগণ তাকে ভোট দিয়েছেন কারণ গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে এবং অবহেলিত মানুষের পাশে তিনি সর্বক্ষণ থাকেন।

মুন্নি আক্তারের গুরু মা দুলালী বলেন, মুন্নি কয়েকটি সামাজিক সংগঠনের নেত্রী। তিনি এখন ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন। তিনি যেন আরো ভালো কাজ করতে পারেন। যেন জনগণের আরো উপকারে আসতে পারেন। আমরা এরপর জামালপুর পৌরসভায় আরেকজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে কাউন্সিলর পদে দাঁড়া করাব।

মুন্নি আক্তারকে দেখে এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায় অন্যান্য তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরা। আর মুন্নির এই জয়কে নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি দৃষ্টান্ত বলে মনে করছেন অনেকে।

তৃতীয় লিঙ্গের একজন বলেন, মুন্নি আমাদের জন্য আইকন। আমরা কারো কাছে হাত পাতব না আর। একটা কাজ দিলেই আমরা কর্ম করে খাব। আমরাও এখন সমাজের একটি অংশ।

জামালপুরের মানবাধিকারকর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, সমাজে দিন বদলের সময় এসেছে। পরিবর্তনের সময় এসেছে। তারই উদাহরণ আজকের মুন্নি। এভাবে এক সময় সবাই সবার অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে।

মুন্নি আক্তার বলেন, আমার কোনো পিছুটান নেই। সন্তান নাই। আমার কোটিপতি হওয়ার দরকার নেই। দরকার আছে মানুষের ভালোবাসার। আমি যেন মানুষের ভালোবাসা নিয়ে আগামী দিনগুলো চলতে পারি। জনগণ আমাকে ভালোবেসে বিজয়ী করেছে। আমি জনগণের কাছে কৃতজ্ঞ।

এর আগে গত পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে দাঁড়ালেও বয়স কম থাকায় মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায় মুন্নি আক্তারের। এবারের নির্বাচনে মহিলা ভাইস চেয়ার?ম্যান পদে ২৩ হাজার ৭৬৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন মুন্নি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App