×

সারাদেশ

ভুয়া সনদে চাকরির অভিযোগ প্রমাণিত

তবুও বহাল তবিয়তে প্রধান শিক্ষক

Icon

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মসিউর ফিরোজ, সাতক্ষীরা থেকে : ভুয়া সনদে চাকরি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরেও বহাল তবিয়তে চাকরি চালিয়ে যাচ্ছেন সাতক্ষীরা সদরের নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজী। যশোর শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মকর্তা ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরা বিষয়টি নিয়ে ভীষণ ক্ষুব্ধ বলে জানা গেছে।

প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজীর নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে যশোর বোর্ডে অভিযোগ করেন তার সহকর্মীরা। তাদের অভিযোগের ভিত্তিতে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম ভূঁইয়া অনিয়ম তদন্তের দায়িত্ব দেন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সঞ্জিব কুমার দাশকে। তদন্ত শেষে তিনি অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, মালেক গাজী ১৯৯৯ সালে জুনে কারিমা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিষয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান। ওই পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নীতিমালার জনবল কাঠামো ১৯৯৫ অনুযায়ী প্রার্থীকে এসএসসি, এইচএসসি ও স্নাতক শ্রেণিতে দ্বিতীয় বিভাগে পাস থাকতে হবে। কিন্তু মালেক গাজির স্নাতক ডিগ্রি ছিল ৩য় শ্রেণির। উপরন্তু নিয়োগের ৬ মাস পরে সাতক্ষীরার কম্পিউটার পয়েন্ট নামে যে প্রতিষ্ঠানের সনদ তিনি দাখিল করেন সেটি সরকার অনুমোদিত বা নিবন্ধিত কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। তারপরও ওই প্রতিষ্ঠানের সনদসহ সব পরীক্ষায় ২য় বিভাগে পাস উল্লেখ করে ২ হাজার ৫৫০ টাকার স্কেলের পরিবর্তে ৩ হাজার ৪০০ টাকার সরকারি বেতন-ভাতা নেয়া শুরু করেন তিনি। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে সাতক্ষীরা সদরের নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষকের ক্ষেত্রে জনবল কাঠামোর শর্তানুযায়ী সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (টিটিসি) থেকে বিএড সনদ অর্জন করা বাধ্যতামূলক থাকলে তিনি তা করেননি।

শিক্ষক নিয়োগের পর আবেদন সাপেক্ষে বিষয় অনুমোদনের পর এমপিওভুক্তি হতে হয়। কিন্তু ২০০১ সালের ২০ নভেম্বর স্কুল কর্তৃপক্ষ কম্পিউটার বিষয় খোলার আবেদন করেন। ২০০২ সালের ৩১ জুলাই যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ডের উপপরিচালক নবম ও দশম শ্রেণিতে কম্পিউটার বিষয় খোলার চিঠিতে সাক্ষর করেন। এর আগেই নিয়ম বহির্ভূতভাবে ২০০১ সালে পহেলা অক্টোবর আব্দুল মালেক গাজী এমপিওভুক্ত হন। কম্পিটার বিভাগ খোলার আগেই তিনি কীভাবে এমপিওভুক্ত হলেন তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

২০১৪ সালের জুনে নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় সেকেন্ডারি এডুকেশন কোয়ালিটি অ্যান্ড অ্যাকসেস এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট (সেকায়েপ) থেকে ১ লাখ টাকা উদ্দীপনা পুরস্কার পায়। নীতিমালা অনুসারে এ টাকা নির্ধারিত শিক্ষকদের মধ্যে শতকরা হিসাবে বণ্টনের শর্ত ছিল। সেকায়েপ নীতিমালা বহির্ভূতভাবে এ টাকা শিক্ষকদের মধ্যে বণ্টন না করে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয়ের জন্য ২০২১ সালে এক সভায় উল্লেখ করা হয়। কোন উন্নয়নকাজে এ টাকা ব্যয় হয়েছে তদন্তের সময় প্রধান শিক্ষক তা উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছেন। ২০১৪ সালে গাজী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানের পরে কোনো অর্থ কমিটি করার উদ্যোগ নেননি। যার ফলে প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযুক্ত গাজী প্রতি শ্রেণিতে দুইটি শাখার অনুমোদন থাকলেও আরো বাড়তি দুইটি শাখা খুলেছেন। যার কোনো অনুমোদন নেই। এই শাখা চালানোর জন্য খণ্ডকালীন ২৫ জন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করেননি তিনি।

তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। কিন্তু বেপরোয়া মালেক গাজী বহাল তবিয়তে চাকরি চালিয়ে যাচ্ছেন। বেতন-ভাতাও তুলছেন।

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আব্দুল মালেক গাজী বলেন, ভাই আপনার সঙ্গে আমার কোনো ঝগড়া নেই, ভালো সম্পর্ক আছে। কোনো কিছু জানা লাগবে না। দেখা হলে ঠিক হয়ে যাবে। স্কুলের অর্থ লুটপাট ও জাল সার্টিফিকেট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাই কিছু শোনা লাগবে না। দেখা হলে ঠিক হয়ে যাবে।

এ ব্যাপারে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মো. আহসান হবিব বলেন, এ ধরনের ঘৃণিত কাজ করলে প্রথমে বেতন বন্ধ, পরে কমিটিকে চিঠি দিব তাকে সাময়িক বরখাস্ত করার জন্য এবং পরে আমরা তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করব। বেতন-ভাতা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার চাকরি জীবনের সমগ্র বেতন-ভাতা ফেরতপূর্বক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App