×

সারাদেশ

আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে বাড়ছে চাপ জনজীবনে

Icon

মরিয়ম সেঁজুতি

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে বাড়ছে চাপ জনজীবনে
  • অস্থির ডলারের বাজারর
  • পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়ছে
  • ব্যাংক সুদ ১৮-২০% হওয়ার আশঙ্কা

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রেসক্রিপশনে চাপ বাড়ছে দেশের জনজীবনে। বিদ্যুতের দাম বাড়ায় বাড়ছে কৃষি ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচ। টাকার বিপরীতে কয়েক দফায় ডলারের দাম বাড়ায় আমদানিকৃত সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। এতে করে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ছে প্রতিনিয়ত। ফলে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। সংস্থাটির শর্ত পালনে ব্যাংকের সুদের হার বাজারভিত্তিক করা হয়েছে। এতে করে ঋণের বিপরীতে সুদহার বর্তমানে ১৩ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে। 


উদ্যোক্তারা বলছেন, আগামীতে এ সুদহার ১৮-২০ শতাংশ হতে পারে। এর ফলে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া বাজেটে সব ধরনের ভর্তুকি কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ। দেশে কৃষি খাত বিকাশ এবং রপ্তানি বাড়াতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেয়া হয়। সব ধরনের প্রণোদনা সংকুচিত করা হচ্ছে। এছাড়া শিল্পে কর অবকাশ সুবিধা তুলে দেয়া এবং নতুন নতুন খাতে করারোপের শর্ত দিয়েছে আইএমএফ। এসব শর্ত পুরোদমে বাস্তবায়ন শুরু হলে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ আরো কঠিন হয়ে পড়বে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। 

জানা গেছে, আইএমএফের ঋণের শর্ত পরিপালন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর কী প্রভাব পড়ছে বা পড়তে পারে তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এমনকি সরকারের মধ্যেও এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। 

অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান সম্প্রতি জানিয়েছেন, আইএমএফের দেয়া প্রায় সব শর্ত পূরণ করা হয়েছে। তবে শর্ত পূরণ করতে গিয়ে মানুষের জন্য ভোগান্তি হয় এমন কোনো পদক্ষেপ নিবে না সরকার। আইএমএফের ঋণ এদেশ ও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হবে এবং হচ্ছে। ঋণের শর্ত পরিপালনের ফলে জনজীবনে তার কী প্রভাব হয় সেটাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সারাবিশ্বেই এখন অর্থনীতিতে সংকট চলছে। এ অবস্থায় আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ পাওয়া বাংলাদেশের জন্য ভালো। তবে সংস্থাটির শর্ত পরিপালন করতে গিয়ে জনজীবনে অস্বস্তি তৈরি হবে। ইতোমধ্যে অর্থনীতির বেশকিছু খাতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। 

সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের ঊর্ধ্বতন গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখত সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেছেন, দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ রয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়লে এই চাপ আরো বাড়বে। ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। তিনি বলেন, আইএমএফের সব পরামর্শ মেনে চলার দরকার পড়ত না। কিন্তু তাদের পরামর্শে ডলারের দাম বাড়ানো হলো, সুদ করা হলো বাজারভিত্তিক। এসব শর্ত পরিপালনের ফলে জনজীবনে দুর্ভোগ দেখা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

জানা গেছে, আইএমএফের ঋণ পেতে মূলত পাঁচ ধরনের পদক্ষেপ সরকারকে নিতে হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে- সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো, মূল্যস্ফীতি কমাতে মুদ্রানীতির কাঠামো আধুনিক করা, আর্থিক খাতকে শক্তিশালী করা, বাণিজ্য পরিবেশ ভালো করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলার সামর্থ্য বাড়ানো। এসবের মধ্যে মূল বিষয়গুলো হচ্ছে, সরকারের ভর্তুকি কমাতে হবে, যাতে সরকার বেশি অর্থ উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে ব্যয় করতে পারে। এজন্য সরকারকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস, পানি ও সারের দাম বাড়াতে হবে। এ পাঁচ পণ্যেই সরকারকে বেশি ভর্তুকি দিতে হয়। সরকার এ কাজ সহজেই করে ফেলছে। রাজস্ব আয় বাড়ানোর শর্তও রয়েছে। এজন্য নানা খাতে যেসব করছাড় দেয়া হয়, তা কমাতে বলেছে আইএমএফ। 

এছাড়া ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিতকরণ, টাকার বিনিময় হার নমনীয়সহ অনেকগুলো শর্ত দিয়েছে সংস্থাটি। তবে অন্যতম শর্ত হচ্ছে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনা। সরকার তাদের (আইএমএফ) এই শর্ত  মেনে নিয়েছে এবং বছরে চার দফা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কীভাবে এই দাম সমন্বয় করা হবে, তার একটি পরিকল্পনাও দিয়েছে আইএমএফের কাছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী তিন বছর বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমিয়ে আনা হবে। 

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতে বছরে ভর্তুকি ৮৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। আইএমএফ চায়, দাম সমন্বয় করে (বাড়িয়ে) বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ কমাতে। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী, ক্রমান্বয়ে দাম বাড়িয়ে তা নিয়ে আসা হবে উৎপাদন খরচের সমান বা কাছাকাছি পর্যায়ে। এখন প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের পাইকারি দাম গড়ে ৭ টাকার কিছু বেশি। তবে আইএমএফের পরামর্শ মেনে ভর্তুকি প্রত্যাহার করা হলে এ দর ১২ টাকার ওপরে নিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে ভোক্তাপর্যায়ে গড়ে বিদ্যুতের দাম হবে প্রায় ১৫ টাকা, যা এখন প্রায় ৯ টাকা।

এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ এক সেমিনারে বলেন, আইএমএফের কথা শুনলে জনগণের ওপর চাপ বাড়বে, এটি খুবই স্বাভাবিক। কথা হচ্ছে, সরকার তাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছে। কাজেই তাদের কথা শুনতেই হবে। এটি সরকারের নীতির দুর্বলতা। সরকার কেন এ ধরনের শর্তে ঋণ নিচ্ছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে জনগণ আরো দিশেহারা হবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি মনে করি, বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পুনর্গঠন দরকার। সেখানে আলোচনা করে দাম বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তেল-গ্যাসে এখন ভর্তুকি নেই। আইএমএফের প্রতিনিধি দল সম্প্রতি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) সঙ্গেও আলাদা বৈঠক করে। 

পেট্রোবাংলা ও বিপিসি প্রায় একইভাবে আইএমএফকে জানিয়েছে, গ্যাস ও জ্বালানি তেলে নতুন করে ভর্তুকির চাপ নেই। তেলের দাম নিয়ে স্বয়ংক্রিয় যে পদ্ধতি (আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লে দেশে বাড়বে, কমলে কমবে) চালু করার কথা আইএমএফ বলেছিল, তা হয়েছে। প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। এতে জ্বালানি তেলে আর কখনো ভর্তুকি দিতে হবে না। 

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ জানিয়েছেন, উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করা হয়। ঘাটতি মেটাতে দাম সমন্বয় করা হচ্ছে। আগামী তিন বছর ধরে ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় করা হবে। এর অংশ হিসেবে সর্বশেষ গত মার্চ মাসে বিদ্যুতের দাম সরকার একবার বাড়ায়। মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপি অনুপাতে বাংলাদেশে কর আদায় বিশ্বে সবচেয়ে কম। এর অন্যতম কারণ হলো কর অব্যাহতির পরিমাণ বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশে জিডিপির তুলনায় কর অনুপাত ৯ শতাংশের নিচে। আইএমএফ এ অনুপাত কমপক্ষে ১২ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। এজন্য কর অব্যাহতি তুলে নিতে বলেছে সরকারকে। 

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ৩০টি শিল্প খাত কর অবকাশ সুবিধা পায়। এ সুবিধা চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত আছে। একই সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি ও সার্ভিস সেক্টরে ২১টি খাত একই সুবিধা পাচ্ছে। স¤প্রতি এনবিআরের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব খাত থেকে কর অব্যাহতি তুলে নেয়ার প্রস্তাব করেছে আইএমএফ প্রতিনিধি দল। কর অবকাশ সুবিধা প্রত্যাহার করা হলে বিনিয়োগ হ্রাস ও নতুন কর্মসংস্থানের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া ডলারের দাম একদিনে ৭ টাকা বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করা হয়েছে। এর ফলে আমদানিকৃত সব পণ্যের দাম বেড়ে যাবে। সর্বশেষ এর দায়ভার ভোক্তা বা দেশের জনগণকে বহন করতে হবে। 

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক মো. সহিদুল হক মোল্লা বলেন, আইএমএফের ঋণ প্রয়োজন আছে। তবে সংস্থাটির বেশকিছু শর্ত পরিপালনের ফলে ভোক্তারা বেকায়দায় পড়বেন। বিশেষ করে সব ধরনের আমদানিপণ্যের আমদানি ব্যয় বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার জনবান্ধব বাজেট প্রণয়নের কথা বলছে। তবে আইএমএফের এসব শর্ত পরিপালন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যাতে না বাড়ে সেদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। এদিকে আইএমএফের ঋণের শর্তের কারণে দেশে ধনী-গরিবের বৈষম্য আরো বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

সম্প্রতি তিনি জানান, এ ঋণ পেতে ভর্তুকি কমানো ও আর্থিক খাতে সংস্কারসহ সংস্থাটির দেয়া বিভিন্ন শর্ত মানতে সমঝোতা করে বাংলাদেশ। ভর্তুকি অনেক সময় ভালো হয়, আবার খারাপও হয়। বিদ্যুৎ খাতে যে বিপুল পরিমাণে ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হচ্ছে তা বাদ দিয়ে কৃষকের কাছে সার, বীজ ও ডিজেলে ভর্তুকি বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, বিভিন্ন গবেষণায় এমনকি আইএমএফের গবেষণায়ও দেখা গেছে, তারা বিশ্বের যেসব দেশে গেছে সেসব দেশের সব জায়গায় বিভিন্ন রকম কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হলেও বৈষম্য বাড়ে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App