×

সারাদেশ

ভেড়ামারায় জিকে পাম্প বন্ধ

সেচ প্রকল্পের আওতাধীন কৃষকরা দিশাহারা

Icon

প্রকাশ: ০৩ মে ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সেচ প্রকল্পের আওতাধীন  কৃষকরা দিশাহারা
ইসমাইল হোসেন বাবু, ভেড়ামারা (কুষ্টিয়া) থেকে : পানির অভাবে পদ্মার যেন মরণদশা। হার্ডিঞ্জ ব্রিজের কাছে বিশাল বালুচর জেগে উঠেছে। হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার প্রসার এখন ৬শ মিটার। আগে ছিল ১৬শ মিটার। ব্রিজের ৫টি পিলার ধু-ধু বালুচরের উপর দাঁড়িয়ে আছে। বৈশাখ মাস শেষ হতে চলেছে। কোথায় কোনো দেখা মিলছে না। চলমান শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানির সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। চলতি বোরো মৌসুমে পানি সংকটে জিকে সেচ প্রকল্পের আওতাধীন কৃষকদের অবস্থা শোচনীয়। সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প ভেড়ামারার গঙ্গা-কপোতাক্ষের (জিকে) ইনটেক চ্যানেলের মুখে বিশাল চর জেগে উঠায়, পদ্মা থেকে পানি জিকের প্রধান খালে পানি যেতে পারছে না। ফলে সেচ প্রকল্পটি অনেক দিন হলো বন্ধ রেখেছেন জিকে সেচ কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে পদ্মা ও গড়াই নদী দেখলে মনে হবে ছোট খাল। নদীর আশপাশের গ্রামগুলোর নলকূপে পানি উঠছে না। কারণ মাটির প্রায় ৪০ ফুট নিচে পানির স্তর নেমে গেছে। এই বিরূপ অবস্থায় মানুষ, পশুপাখি ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মা নদীর তীরে ১৯৫১ সালে স্থাপন করা হয় গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প। ১৯৫৪ সালে কুষ্টিয়াসহ আশপাশের জেলাগুলোর প্রায় চার লাখ হেক্টর জমি এ প্রকল্পের অধীনে এনে সেচ প্রকল্পটির যাত্রা শুরু হয়। পদ্মা নদীর উজানে ভারতের ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মায় পানিপ্রবাহ কমে আসায় সেচ প্রকল্পের আওতাধীন আবাদি জমির পরিমাণ কমতে থাকে। বর্তমানে প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও চুয়াডাঙ্গার প্রায় সোয়া লাখ হেক্টর জমি আছে। ইনটেক চ্যানেলের মাধ্যমে পদ্মা নদী থেকে পানি নিয়ে তিনটি পাম্পের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রধান খালে ফেলা হয়। শাখা-উপশাখা খালের মাধ্যমে সে পানি চলে যায় কৃষকের ক্ষেতে। কিন্তু পদ্মায় নেই পানি। পানির অভাবে জিকের কার্যক্রম বন্ধ। এতে পাশ্ববর্তী চার জেলার লাখ লাখ চাষি দিশাহারা। জিকে পাম্প হাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, পানির অভাবে ও পাম্প মেশিনের নানা সমস্যায় পাম্প ৩টি বহু আগেই বন্ধ। বিষয়টি ঊর্ধ্বতনদের জানিয়েছেন বলে জানান তিনি। বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পাম্পগুলো ঠিকঠাক করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। পাম্পগুলো কবে চালু করা যাবে তাও বলতে পারেননি মিজানুর রহমান। ভেড়ামারা প্রধান পাম্পহাউস সূত্রে আরোৃ জানা যায়, বছরের ১০ মাস (১৫ জানুয়ারি থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত) দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা তিনটি পাম্পের মাধ্যমে পানি তোলা হয়। বাকি দুই মাস রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখা হয়। পাম্প দিয়ে উঠানো পানি ৪ জেলায় ১৯৩ কিলোমিটার প্রধান খাল, ৪৬৭ কিলোমিটার শাখাখাল ও ৯৯৫ কিলোমিটার প্রশাখা খালে যায়। জিকে সেচ প্রকল্পের প্রধান এবং শাখা খালগুলোতে পানি থাকলে সেচ সুবিধাসহ আশপাশের টিউবওয়েল ও পুকুরে পানি স্বাভাবিক থাকে। পদ্মায় পানির স্তর স্বাভাবিক থাকলে প্রতি পাম্পে প্রতি সেকেণ্ডে গড়ে ২৮ হাজার ৩১৬ দশমিক ৮৫ লিটার পানি সরবরাহ করা সম্ভব হয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষিতে একসময় বিপ্লব ঘটানো গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) প্রকল্পের কার্যক্রম সঙ্কুচিত হতে হতে বর্তমানে ৮ ভাগের ১ ভাগে নেমে এসেছে। পাম্প নষ্ট ও খালগুলো দখল-দূষণের কবলে পড়ায় সেচ প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়ছে। অল্প খরচের সেচ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষকদের কয়েক গুণ বেশি খরচে শ্যালো মেশিনে পানি তুলে ধানের জমিতে পানি দিতে হচ্ছে। এতে কৃষকের ধান চাষে খরচ পড়ছে বেশি। এদিকে ক্রমাগতভাবে নদীর পানি কমে যাওয়ায় শঙ্কিত পানি বিশেষজ্ঞরা। পরিবেশবাদীরা বলছেন, পদ্মা নদীর বুকে যে পানি সংকট দেখা দিয়েছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি মরুকরণের কবলে পড়তে পারে। ভেড়ামারা পানি বিজ্ঞান শাখা (বাপাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী ইলিয়াস হোসেন বলেন, গত মঙ্গলবার সকালে পদ্মায় বর্তমানে পানির লেভেল রয়েছে ৩ দশমিক ৫৭ (এমএসএল) মিটার। পানির এই লেভেলে পাম্প মেশিন চলবে কি না তিনি জানেন না। পাবনা পানি বিজ্ঞান শাখা (বাপাউবো) প্রকৌশলী মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, মঙ্গলবার সকালে পদ্মায় পানির প্রবাহ রের্কড করা হয় ৩৭ হাজার ৩শ ৬৭ কিউসিক। এ ব্যাপারে ভেড়ামারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আকাশ কুমার কুন্ডু বলেন, জিকে সেচ প্রকল্প বন্ধ থাকার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। সেচ এলাকায় বোরিং চালানো নিষিদ্ধ। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে কথা হয়েছে যে, জিকে সেচ সম্প্রসারণ এলাকার চাষিদের সেচ সুবিধার্থে বোরিংয়ের জন্য বিদ্যুৎ সংযোগের ব্যবস্থা করা হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App