×

সারাদেশ

কুষ্টিয়াজুড়ে পানির জন্য হাহাকার

Icon

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৪, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কুষ্টিয়াজুড়ে পানির জন্য হাহাকার
নুুর আলম দুলাল, কুষ্টিয়া থেকে : কুষ্টিয়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের অপরূপ প্রমত্তা গড়াই নদীর আজ মৃতপ্রায় অবস্থা। গ্রীষ্মকাল আসতে না আসতেই পানির খুব একটা অস্তিত্ব নেই নদীতে। প্রমত্তা গড়াই এখন পরিণত হয়েছে ছোট খালে। সেসঙ্গে নেমে গেছে পানির স্তর। এর প্রভাবে পৌর এলাকাসহ কুষ্টিয়া জেলার দক্ষিণাঞ্চলের কয়েক লাখ নলকূপে উঠছে না পানি। এমনকি পানির স্তর নেমে যাওয়ায় নদীর এমন করুণ পরিণতির কারণে এখানকার মানুষের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য, চাষাবাদ, স্বাভাবিক জীবনযাপন পড়েছে হুমকির মুখে। হাহাকার চলছে পানির জন্য। কুষ্টিয়া পৌরসভার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, পৌর এলাকার ২১টি ওয়ার্ডে হোল্ডিং সংখ্যা ৩৭ হাজার, যার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই নিজস্ব নলকূপ আছে। এছাড়া পৌরসভার পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকায় দেয়া হয়েছে প্রায় ৫ হাজার নলকূপ। পানির স্তর নেমে যাওয়ার কারণে এসব এলাকার প্রায় সব নলকূপই অকেজো হয়ে গেছে। যেগুলো সচল আছে সেগুলোতে পানি উঠছে খুবই কম। এক বালতি পানি তুলতে আধা ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। শুধু কুষ্টিয়া পৌর এলাকায়-ই নয়, কুমারখালী ও খোকসা উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী জেলা ও উপজেলাগুলোতেও চলছে পানি সংকট। এসব এলাকায় পানির জন্য হাহাকার চলছে। গড়াই নদীর তীরবর্তী স্থানে বসবাস করা মানুষের অবস্থা সবচেয়ে বেশি খারাপ। পানির সংকট এতটাই প্রকট যে খাবার পানিসহ গোসল এবং গবাদি পশুর জন্য পানির ব্যবস্থা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পানির জন্য নদীর চরের প্রায় দেড় দুই কিলোমিটার হেঁটে যেতে হচ্ছে। এমন সংকটে এর আগে কখনো পড়েননি ওইসব অঞ্চলের মানুষ। গড়াই নদীর ওপর সৈয়দ মাছ-উদ রুমী সেতু এবং গড়াই ব্রিজের নিচে ড্রেজিং করার ফলে কিছুটা পানি প্রবাহ থাকলেও বেশির ভাগ পিলার ধুধু বালির ওপর। সাধারণ মানুষ এই গড়াই নদীর অনেক স্থান দিয়ে হেঁটে পার হচ্ছে। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে গড়াই নদীর করুণ দশা বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন। বিগত বছরগুলোর তুলনায় ২৫ থেকে ৩০ ফুট নেমে যাওয়ায় হস্তচালিত নলকূপে উঠছে না পানি। পানি সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা সক্রিয় না থাকায় বিপাকে পড়েছে মানুষ। এমনকি পৌরসভার পক্ষ থেকে যে সাপ্লাই পানির ব্যবস্থা করা আছে তার উৎপাদনও অনেক কম। এটি একটি প্রাকৃতিক সমস্যা। বৃষ্টি শুরু হলেই এই সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে। আর পানির স্তর এভাবে কমে যাওয়ার পেছনে যত্রতত্র গভীর নলকূপ ব্যবহারকে দায়ী করছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। তারা বলছেন, শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে নদীর পানিও শুকিয়ে যায়। সেক্ষেত্রে যেসব নলকূপের লেয়ার কম দেয়া সেসব নলকূপে পানি না ওঠারই কথা। নতুন নলকূপ স্থাপনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা মাফিক আরো গভীরে লেয়ার দেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে বলে জানান তারা। উৎসগুলো থেকে আসা পানি নদীতে সংরক্ষণ করা গেলে অনাবৃষ্টি বা শুষ্ক মৌসুমে যেমন মিটবে পানির চাহিদা অন্যদিকে বাড়বে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। আর এভাবেই সম্ভব এই সমস্যা থেকে বেড়িয়ে আসা। কুমারখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা এমএ উল্লাস বলেন, পানির সংকট এতটাই প্রকট যে খাবার পানির ব্যবস্থা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। গোসল এবং গবাদিপশুর জন্য পানি সংগ্রহ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মালারানী বলেন, পানির জন্য নদীর চরে দেড়-দুই কিলোমিটার হেঁটে যেতে হচ্ছে। এমন সংকট আগে কখনো দেখেননি বলে জানান তিনি। যদুবয়রা গ্রামের গৃহিণী সালমা বেগম বলেন, কল থাকলেও তাতে পানি নেই। তার গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতেই পানির সংকট চলছে। যার কলে পানি উঠছে, সেখানে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আনতে হচ্ছে। উপজেলা জনস্বাস্থ্যের নির্বাহী প্রকৌশলী আল আলামিন মনে করছেন, যত্রতত্র সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন ও ব্যবহারের কারণেই পানির এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে নদীর পানিও শুকিয়ে যায়। এ কারণে যেসব নলকূপে গভীরতা কম সেগুলোতে পানি ওঠে না। তাই নতুন নলকূপ আরো গভীর করার পরামর্শ দিচ্ছেন তারা। এছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কথাও বলছেন বিশেষজ্ঞরা। পানি সংকটে জনদুর্ভোগের কথা স্বীকার করে কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ-সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রউফ জানান, তার এলাকায় পানির জন্য হাহাকার চলছে। তিনি বিষয়টি সমাধানের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পিডিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছেন। খুব দ্রুত সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন তিনি।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App