নাটোরের বিধবা নারীর অদম্য লড়াই
মো. মাজেম আলী মলিন
প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম
ছবি: কাগজ প্রতিবেদক
চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে, দুই বছর পর স্বামীহারা মনোয়ারা বেওয়া। কোলে একমাত্র কন্যা নিয়ে শুরু হয় তার দীর্ঘ সংগ্রাম। জীবন বারবার আঘাত দিলেও তিনি কখনও ভেঙে পড়েননি। কঠোর পরিশ্রম, ধৈর্য এবং ত্যাগের মাধ্যমে তিনি মেয়েকে শিক্ষিত করে গড়ে তুললেন। পরবর্তীতে মেয়ের নির্মম মৃত্যুর মধ্যেও হার মানেননি মনোয়ারা। নাতনিকে নিয়ে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম—শিক্ষা ও পরিশ্রমে তিনি নাতনিকে গড়ে তুললেন একজন গর্বিত পুলিশ সদস্য হিসেবে এবং আবারও সংসারের হাল ধরলেন এক বিধবার অদম্য সাহসে। কিন্তু সেই নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার আজও অধরা।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এমন অসংখ্য নারীর জীবনকাহিনি লুকিয়ে আছে, যাদের সংগ্রাম, ত্যাগ এবং অদম্য সাহস নিঃশব্দে ইতিহাস হয়ে যায়। কিন্তু সেই গল্পগুলোর খুব কমই আলোচনায় আসে। দারিদ্র্য, সামাজিক কটূক্তি, পারিবারিক বিপর্যয় কিংবা নির্মম ট্র্যাজেডির বিরুদ্ধে লড়াই করে অনেক নারীই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আশার আলো জ্বালিয়ে রাখেন। নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের নারী মনোয়ারা বেওয়ার জীবন তেমনই এক অবিশ্বাস্য সংগ্রামের কাহিনি—যেখানে শোকের গভীর অন্ধকারকে শক্তিতে রূপান্তর করে তিনি গড়ে তুলেছেন আশার এক নতুন ইতিহাস।
নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার নাজিরপুর ইউনিয়নের গোপীনাথপুর গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম মনোয়ারা বেওয়ার। গ্রামীণ জীবনের সরলতা, সীমাবদ্ধতা এবং অভাবের মধ্যেই কেটেছে তার শৈশব। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন শান্ত, পরিশ্রমী ও দৃঢ়চেতা। কিন্তু তখনও তিনি জানতেন না, ভবিষ্যৎ তার জন্য কত কঠিন পরীক্ষার আয়োজন করে রেখেছে।
মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে, যখন তিনি পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছিলেন, তখন পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার বিয়ে হয় পাশের রানীনগর গ্রামের নাজিমুদ্দিন প্রামানিকের সঙ্গে। সে সময় গ্রামীণ সমাজে অল্পবয়সে বিয়ে হওয়া অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। কিন্তু সেই সংসারের সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
বিয়ের মাত্র দুই বছর পেরোতেই তার জীবনে নেমে আসে এক নির্মম অন্ধকার। তখনও তার কোলে ছিল মাত্র তিন মাসের এক নিষ্পাপ কন্যাশিশু—মায়ের বুকের দুধ আর স্নেহই যার পুরো পৃথিবী। এমন সময় হঠাৎই এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডে হারিয়ে যায় তার স্বামী। মুহূর্তের মধ্যেই ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তার ছোট্ট স্বপ্নের সংসার।
স্বামীর নিথর দেহের পাশে দাঁড়িয়ে তরুণী মনোয়ারা যেন বুঝতেই পারছিলেন না, জীবনের এত বড় ঝড় তিনি কীভাবে সামলাবেন। একদিকে স্বামী হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে বুকের দুধ খাওয়া তিন মাসের শিশু—যার চোখে তখনও পৃথিবীর নিষ্ঠুরতার কোনো ভাষা নেই। সামনে অনিশ্চয়তার এক দীর্ঘ অন্ধকার পথ। এমন বাস্তবতা অনেককেই ভেঙে দেয়, নিঃশেষ করে দেয় জীবনের সমস্ত শক্তি। কিন্তু মনোয়ারা বেওয়া ভেঙে পড়েননি। বুকভরা কান্না আর অসীম কষ্টকে হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে তিনি এক কঠিন সিদ্ধান্ত নেন—জীবনের কাছে তিনি হার মানবেন না।
সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ সংগ্রামের পথচলা। স্বামীহারা তরুণীকে আশ্রয় দেওয়ার মতো কেউ এগিয়ে আসেনি—না শ্বশুর-শাশুড়ি, না নিজের বাবা-মা। ছোট্ট শিশুকে বুকে নিয়ে একাই তাকে দাঁড়াতে হয়েছে জীবনের নির্মম বাস্তবতার সামনে। সংসারের প্রতিটি দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। অন্যের ক্ষেত-খামারে পরিশ্রম করে, লিজ নেওয়া জমিতে ধান ও রসুন চাষ, গাভী পালন করে দুধ বিক্রি—অমানুষিক কষ্টের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে তিনি সংসারের হাল ধরেন।
অল্প আয়, অগণিত দুঃখ-কষ্টের মাঝেও তিনি কখনো ভবিষ্যতের কথা ভুলে যাননি। কারণ তিনি জানতেন, নিজের কষ্ট সহ্য করেই সন্তানের জন্য একটি শক্ত ভবিষ্যতের ভিত্ত গড়ে তুলতে হবে।
মনোয়ারা বেওয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন ছিল তার একমাত্র কন্যা লতিকা হেলেনকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলা। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষা মানুষের জীবনে পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই অসংখ্য প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি কন্যার পড়াশোনা বন্ধ হতে দেননি।
কিন্তু জীবনের নির্মমতা যেন বারবার এই পরিবারকে আঘাত করেছে। লতিকা হেলেন যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছিলেন, তখন তার বিয়ে হয় এক প্রাইভেট শিক্ষকের সঙ্গে। কিন্তু সেই সংসারও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। দুই বছরের মধ্যেই সেই সম্পর্ক ভেঙে যায়। সেই সময় লতিকা হেলেনের কোলজুড়ে জন্ম নেয় এক কন্যা সন্তান—মিতু।
কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েও লতিকা হেলেন ভেঙে পড়েননি। তিনি নতুন করে জীবন শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। আবার পড়াশোনা শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে নিজের শিক্ষাজীবন এগিয়ে নিয়ে যান। অবশেষে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি লাভ করেন। এটি ছিল মনোয়ারা বেওয়ার দীর্ঘ সংগ্রামের এক গর্বিত অর্জন।
কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুরতা যেন এখানেই থেমে থাকেনি। মিতু যখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী, তখন তার বাবা মমিনুল আবার লতিকা হেলেনকে সংসারে ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা ও আত্মসম্মানের কারণে লতিকা হেলেন সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এই প্রত্যাখ্যানই জন্ম দেয় আরেকটি ভয়াবহ ট্র্যাজেডির। ক্ষোভ ও প্রতিহিংসার বশে একদিন সেই ব্যক্তি নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করে লতিকা হেলেনকে। মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে একটি সংগ্রামী জীবনের স্বপ্ন, আর অনাথ হয়ে পড়ে ছোট্ট মিতু।
এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মনোয়ারা বেওয়া ২০১৯ সালের ২৩ জুলাই গুরুদাসপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে তদন্তে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় তিনি নাটোর জজ কোর্টে মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত সংস্থা পিবিআইয়ের অধীনে বিচারাধীন রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলার প্রধান আসামি মামুনুলসহ তিন আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। কিছুদিন আগে পর্যন্ত মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চললেও গত প্রায় এক বছর ধরে অজ্ঞাত কারণে বন্ধ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের মিমাংসার চাপ ও নানা জটিলতার কারণে মামলার কার্যক্রম বারবার বিলম্বিত হচ্ছে। ফলে ন্যায়বিচারের আশায় থাকা এই পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করছে।
এই ভয়াবহ ঘটনার মধ্যেও মনোয়ারা বেওয়া ভেঙে পড়েননি। তিনি বুঝেছিলেন, অতীতের বেদনায় ডুবে থাকলে ভবিষ্যৎ রক্ষা করা যাবে না। তাই একমাত্র নাতনি মিতুকে নিয়ে তিনি আবার শুরু করেন নতুন জীবনসংগ্রাম।
মিতু ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও পরিশ্রমী। পরিবারের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস তাকে আরও দৃঢ় করে তোলে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করার পর তিনি নিজের যোগ্যতায় বাংলাদেশ পুলিশে চাকরি লাভ করেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত।
আজ ৭০ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে মনোয়ারা বেওয়া যখন তার নাতনিকে একজন পুলিশ সদস্য হিসেবে দেখতে পান, তখন তার চোখে ভেসে ওঠে জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের স্মৃতি। সেই স্মৃতিতে আছে অসংখ্য কষ্ট, ত্যাগ ও অশ্রু; কিন্তু তার চেয়েও বড় হলো সাফল্যের গর্ব এবং গভীর আত্মতৃপ্তি।
মনোয়ারা বেওয়ার জীবন আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয়—শোক, দারিদ্র্য এবং প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক না কেন, সাহস, ধৈর্য এবং অক্লান্ত পরিশ্রম থাকলে মানুষ আবারও উঠে দাঁড়াতে পারে। তার জীবন শুধু এক নারীর ব্যক্তিগত ইতিহাস নয়; এটি বাংলাদেশের গ্রামীণ নারীর অদম্য শক্তি, আত্মমর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এগিয়ে নেওয়ার এক উজ্জ্বল প্রেরণা।
তবে এই গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আমাদের সামনে এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে। একটি নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার এখনো সম্পূর্ণ হয়নি, অথচ একজন বৃদ্ধা নারী এবং তার নাতনি আজও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় অপেক্ষা করছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাই বৃদ্ধ মনোয়ারার বিনীত প্রত্যাশা—এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক। কারণ ন্যায়বিচার শুধু একটি পরিবারের অধিকার নয়; এটি মানবতা, নৈতিকতা এবং সভ্যতারও প্রশ্নও।
লেখক, সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
