×

মুক্তচিন্তা

জুলাই সনদ, গণভোট, সংবিধান ও আদালতের রুল

Icon

রাসেল আহমদ:

প্রকাশ: ০৫ মার্চ ২০২৬, ০৬:৪৪ পিএম

জুলাই সনদ, গণভোট, সংবিধান ও আদালতের রুল

ছবি: কাগজ প্রতিবেদক

রাষ্ট্র যখন বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তার বৈধতা কেবল জনসমর্থন দিয়ে নির্ধারিত হয় না, হয় সংবিধানের সীমারেখায়। জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোট অধ্যাদেশের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্ট যে রুল জারি করেছেন, সেটি তাই একটি সাধারণ বিচারিক পদক্ষেপ নয়, এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক স্থাপত্যকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এর হাইকোর্ট বিভাগ আইন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে জানতে চেয়েছেন,"কেন 'জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫', 'গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫' অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না?" আদালতের এই প্রশ্নই আজ জাতীয় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

এই লেখাতে মূলত তিনটি প্রশ্ন বিবেচ্য:

প্রথমত, গণভোট আয়োজনের সাংবিধানিক ভিত্তি আছে কি? দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকার কি সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু বা নির্ধারণের এখতিয়ার রাখে? তৃতীয়ত, গণভোট কি সংসদকে বাধ্য করতে পারে?

১.সংবিধান সংশোধনের একমাত্র পথ: ১৪২ অনুচ্ছেদ

বাংলাদেশের সংবিধান এর ১৪২ অনুচ্ছেদ সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে। সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সংশোধন পাস করতে হয়। অর্থাৎ, সংবিধান পরিবর্তনের একমাত্র বৈধ মঞ্চ হলো সংসদ।

প্রশ্ন হচ্ছে,গণভোটের মাধ্যমে প্রস্তাব অনুমোদিত হলে সংসদ কি বাধ্যতামূলকভাবে তা সংবিধানে যুক্ত করবে? ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, আগামী সংসদ প্রথম ২৭০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত না করলে সেগুলো "স্বয়ংক্রিয়ভাবে" সংবিধানের অংশ হয়ে যাবে।

এই ধারণা সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ তৈরি করে। কারণ:

ক.সংবিধান কোনো প্রশাসনিক আদেশে সংশোধিত হয় না।

খ.সংসদের ভোটাভুটি ব্যতীত সংশোধন কার্যকর হয় না।

গ."স্বয়ংক্রিয় সংশোধন" সংসদের আইন প্রণয়ন ক্ষমতাকে অকার্যকর করে।


৬৫ অনুচ্ছেদে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত। যদি সংসদ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কিছু না করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়ে যায়, তবে সংসদের সার্বভৌমত্ব কোথায় থাকে?


পৃথিবীর কোনো কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রে সংবিধান সংশোধন "স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর" হওয়ার নজির নেই।

২. গণভোটের আইনি ভিত্তি: আছে কি?

বাংলাদেশের সংবিধানে গণভোটের বিধান একসময় ছিল, পরে তা বিলুপ্ত হয়। সাম্প্রতিক রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ বাতিল ঘোষণার পর গণভোটের বিধান পুনরুজ্জীবিত হয়েছে কি না,তা নিয়ে আইনগত বিতর্ক রয়েছে। জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্ট, ১৮৯৭ অনুযায়ী কোনো আইন বাতিল হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত হয় না, পুনর্বহালের জন্য সংসদীয় পদক্ষেপ প্রয়োজন।

অতএব, গণভোট আয়োজনের আগে এর সাংবিধানিক ভিত্তি সুস্পষ্ট করা আবশ্যক ছিল। আদালতের রুল মূলত এই অস্পষ্টতার দিকেই ইঙ্গিত করছে।

আরেকটি প্রশ্ন, রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে গণভোট ঘোষণা কতটা বৈধ? সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে সংসদ না থাকলে অধ্যাদেশ জারির ক্ষমতা দেয়। কিন্তু "আদেশ" জারির স্বতন্ত্র ক্ষমতা সংবিধানে স্পষ্ট নয়। ফলে গণভোট অধ্যাদেশ ও বাস্তবায়ন আদেশ- দুটোর সাংবিধানিক অবস্থানই প্রশ্নবিদ্ধ।

৩. অন্তর্বর্তী সরকারের এখতিয়ার

সংবিধান বা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ এ "অন্তর্বর্তীকালীন সরকার" এর কোনো সংজ্ঞা বা বিধান নেই। একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিত্তিতে গঠিত সরকার কি সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করতে পারে?


রাষ্ট্রের সংস্কার প্রস্তাব দেওয়া এক বিষয়। কিন্তু সংবিধান পরিবর্তনের বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করা আরেক বিষয়। অন্তর্বর্তী সরকারের নৈতিক ম্যান্ডেট থাকতে পারে, কিন্তু আইনগত ম্যান্ডেট কোথায়? এই প্রশ্নের জবাবই আদালত চেয়েছেন।

৪. এক প্রশ্নে ৪৮ প্রস্তাব: ভোটারের স্বাধীনতা কোথায়?

জুলাই সনদের ৪৮টি সাংবিধানিক প্রস্তাবকে একত্র করে একটি 'হ্যাঁ' বা 'না' প্রশ্নে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদসহ বহু মৌলিক বিষয়।

এই “bundled referendum” পদ্ধতিতে ভোটার পৃথক মত প্রকাশের সুযোগ পান না। গণতন্ত্রে সম্মতি হতে হয় সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট। এখানে সম্মতি সামগ্রিক, কিন্তু অস্পষ্ট।

সংবিধান রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তি। এমন চুক্তি পরিবর্তনে অস্পষ্ট সম্মতি কতটা বৈধ? এ প্রশ্ন আদালতের বিবেচনায় আসতেই পারে।

৫. সংসদ বনাম গণভোট: কে চূড়ান্ত?

প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্রে জনগণ তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করেন নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে। গণভোট একটি ব্যতিক্রমী উপাদান,যা সংসদীয় কাঠামোকে পরিপূরক করতে পারে, প্রতিস্থাপন করতে পারে না।

যদি গণভোট সংসদের স্বাধীন বিবেচনাকে অকার্যকর করে, তবে তা প্রতিনিধিত্বমূলক কাঠামোর বিরুদ্ধে যায়। সংসদ ব্যর্থ হলে প্রস্তাব স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে, এই ধারণা সংসদকে কেবল আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাজনৈতিক ম্যান্ডেট দিতে পারে। কিন্তু সাংবিধানিক বৈধতা সৃষ্টি করে প্রক্রিয়া।

৬. ইতিহাসের সতর্কবার্তা

বাংলাদেশে ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালের গণভোটের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে। গণভোটের ফলাফল প্রায়শই ক্ষমতাসীনদের পক্ষে গেছে। সরকারি পরিসংখ্যান বিপুল সমর্থন দেখালেও গবেষণা বলেছে, বাস্তব অংশগ্রহণ অনেক কম ছিল।

অতীতের অভিজ্ঞতা বর্তমান বিতর্ককে আরও সংবেদনশীল করে তোলে। আদালত তাই ফলাফলের অঙ্ক নয়, প্রক্রিয়ার বৈধতা বিবেচনা করছেন।


৭. আদালতের রুল: একটি সাংবিধানিক বিরতি


হাইকোর্ট চূড়ান্ত রায় দেননি। কিন্তু রুল জারি করে রাষ্ট্রকে বলেছেন,আপনারা ব্যাখ্যা দিন। এই ব্যাখ্যা কেবল আইনি জবাব নয়, এটি সাংবিধানিক আত্মসমালোচনার সুযোগ।

বিচার বিভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে না, বরং সংবিধানের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে। সংবিধানই রাষ্ট্রের চূড়ান্ত মানদণ্ড।


উপসংহার: সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, প্রক্রিয়াই বৈধতা

জুলাই সনদ ও গণভোটের বিতর্ক আমাদের সামনে এক মৌলিক সত্য তুলে ধরেছে। সংবিধান আবেগের দলিল নয়, এটি প্রক্রিয়ার দলিল।

সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে অনুমোদিত প্রস্তাবও যদি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে, তবে তা বৈধতা পায় না। আদালতের রুল রাষ্ট্রকে একটি সুযোগ দিয়েছে- রাজনৈতিক আবেগ নয়, সাংবিধানিক যুক্তির আলোকে পথ নির্ধারণের।

রাষ্ট্র যদি এই সুযোগকে সম্মান করে, তবে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। আর যদি প্রক্রিয়ার প্রশ্ন এড়িয়ে কেবল ফলাফলের অঙ্কে নির্ভর করা হয়, তবে সাংবিধানিক ভারসাম্যই ঝুঁকির মুখে পড়বে।

আজ প্রশ্নটি কেবল জুলাই সনদ বা গণভোটের নয়। প্রশ্নটি হলো,বাংলাদেশে সংবিধানই কি সর্বোচ্চ, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠতার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত?

এই প্রশ্নের জবাবই নির্ধারণ করবে আমাদের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে খাবার বিতরণ করেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা

বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে খাবার বিতরণ করেছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতারা

মার্কিন সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ সংস্থা প্রধানের পদত্যাগ

ইরান ইস্যুতে মতবিরোধ মার্কিন সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ সংস্থা প্রধানের পদত্যাগ

হরমুজ প্রণালিতে কোনো অভিযানে অংশ নেবে না ফ্রান্স

হরমুজ প্রণালিতে কোনো অভিযানে অংশ নেবে না ফ্রান্স

খ্যাতিমান অভিনেতা শামস সুমন মারা গেছেন

খ্যাতিমান অভিনেতা শামস সুমন মারা গেছেন

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App