×

মুক্তচিন্তা

ভাষা আন্দোলন: অর্জন ও বর্জন

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১০:০৪ পিএম

গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র বা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি ধর্মীয়, শৈল্পিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে বাঙালি সংস্কৃতির বহুবিধ বিকাশ উন্নয়নের কি অপূর্ব অনুকূল পরিবেশই না সৃষ্টি হয়েছিল। তাই হিসাব-নিকাশ কি পাওয়া যায়? ভাষা আন্দোলনের বিপুল অর্জনের পাশাপাশি আমরা হারালাম কতটুকু? মৌলিক আদর্শিক বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে? আমরা শহীদদের আদর্শ বাস্তবায়নের নামে বর্জনের পথেই কি হাঁটছি না?

১৯৪৮ ও ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের বহুমাত্রিক অর্জন আমাদের জানা। তবুও নতুন নতুন প্রজন্মের আগমনের কারণে এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যর্থতার সুযোগে যে সব অর্জন কার্যত ইতোমধ্যেই ফিকে হয় এসেছে, আমাদের সাংবাৎসরিক কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে সাধ্যমতো সেগুলো তুলে ধরা। যাতে বর্তমানে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আবার নতুন উৎসাহে হারানো বিজয়গুলো পুনরায় অর্জন করতে পারে।

১৯৪৭-এর রাষ্ট্রীয় বিভাজন ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব যে উৎকট সাম্প্রদায়িকতার ফসল (এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির সাফল্যও বটে) ১৯৪৮-এ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাস যেতে না যেতেই, বাঙালি মূলে ফেলে দেয় ১৯৪৮-এর মার্চে রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। আমাদের সবারই মনে আছে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টে। ছয় থেকে সাত মাস যেতে না যেতেই ১৯৪৮ সালের মার্চে বাঙালি তরুণরা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ বলে মাঠে নেমে পড়লেন আজ তা ভাবলে বিস্মিতই হতে হয়। কারণ ১৯৪৭ সালে অসাম্প্রদায়িক শক্তির পরাজয়ই তো ঘটেছিল ‘মুসলমানের রাষ্ট্র’ হিসেবে, সেখানে ১৯৪৮-এর শুরুতেই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আদলিক তাত্ত্বিক ভিত্তিমূলেই তো আঘাত হেনে ফেলল কারণ ওই আন্দোলন ছিল স্পষ্টতই দ্বিজাতিতত্ত্বের বিরোধী। দ্বিজাতিতত্ত্ব ও সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিমূলে বড় ধরনের আঘাত হেনেছিল ওই আন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু এত দ্রুততার সঙ্গে আন্দোলনটির সূচনা হলো যে ব্যাপক মানুষের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে তা বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি। কারণ যে মানুষ ১৯৪৬-এ (বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায়) ভোটের জোরে ‘মুসলিম রাষ্ট্র’ হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল, যে ইসলামী বাঙালি মুসলিম মানুষকে গ্রাস করেছিল তা কি অত দ্রুতই সমাজদেহ থেকে বিদূরিত হয় কখনো? তাই তার রেশ বেশ ভালোভাবেই ছিল সেই পাকিস্তানি জোশ হারিয়ে যায়নি তখনো মুসলিম সমাজদেহ থেকে। এ কারণেই মূলত ১৯৪৮-এর আন্দোলন দ্রুত আরো ব্যাপকতা লাভ করতে সক্ষম হয়নি। তবে একটা আগুন জ্বলেছিল যা তুষের আগুনের মতো ধিকি ধিকি করে জ্বলছিল। ১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে এসে তা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল।

সমাজকে প্রচণ্ড নাড়া দিলো। বাঙালি তীব্রভাবে ঘুরে দাঁড়ালো ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে। ঝড়ের মতো জানান দিল যে তারা হিন্দু নয়। মুসলমান না, তারা সবাই বাঙালি। যে বাঙালিত্ব রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকা সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ ভয় পেতো এবং সে কারণেই প্রচার করত যে বাংলাভাষা হিন্দুর ভাষা, মুসলমানের নয়। বাংলাভাষা ভারতের ভাষা, পাকিস্তানের নয়।

সবাই ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছেন। শিল্পীরা, সাহিত্যিকরা, কবি ও গাল্পিক এবং ঔপন্যাসিক, সঙ্গীতশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, বাদ্যশিল্পী, ছাত্র ও যুব সংগঠন, নারী সমাজসহ সমগ্র বাঙালি জাতি। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে মুখরিত করে তুলেছিল সারা বাংলার মানুষ। সরকার গুলি দিয়ে জবাব দিল। মানুষ দলে দলে জেলে গেল আন্দোলন অব্যাহত রাখল তীব্রতর করে তুলল দিনে দিনে। বিজয় অর্জন করেই ছাড়লো তারা।

আমরা দেখেছি বাঙালি সংস্কৃতির পুনরাবাহন। দেখেছি নানা সাংস্কৃতিক সংগঠনের জন্ম, গণসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলসঙ্গীতের ব্যাপক প্রসার, দেখেছি নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আলপনার পুনঃস্থাপন, দেখেছি নাটকে যে সব স্থানে বাধা দেয়া হতো, সেসব জায়গায় বাধাকে বাধাহীন করে তুলতে, যে সব স্থানে অভিনয়কালে পুরুষকে নারী সাজিয়ে অভিনয় মঞ্চে তুলতে হতো সে সব স্থানে আবার নারীই নারী চরিত্রে অভিনয় শুরু করতে। দেখেছি শহরে-বন্দরে, হাটে-বাজারে সর্বত্র দোকানপাটসহ নানা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড আরবি, উর্দু, ইংরেজির পরিবর্তে বাংলায় নতুন করে লিখতে।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবির স্বীকৃতির পরবর্তীকালে দেখা গেছে বাংলা সাহিত্যের প্রসারে বাঙালি কবি সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিকদের নতুন নতুন বই লিখতে ও প্রকাশ করতে, বইমেলার প্রচলন হতে, ধীরে ধীরে নারী শিক্ষার প্রসার ঘটতে। বস্তুত সমাজে এক বিশাল ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হতে এবং ধীরে ধীরে সমাজদেহ থেকে সাম্প্রদায়িকতা উচ্ছেদ বা হ্রাসের প্রক্রিয়া চালু হতে। একে একে নানা অসাম্প্রদায়িক ছাত্র, যুব সংগঠন রাজনৈতিক দল গঠিত হতে শুরু করলো এবং এ জাতীয় সংগঠন হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম হলো। দেশব্যাপী বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তার শাখার বিস্তার ঘটায় তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ধীরে ধীরে অসাম্প্রদায়িক চেতনার ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টা পরিস্কার উপলব্ধিতে এলো। গণতন্ত্রী দল নামে বিরোধী রাজনৈতিক দল গঠিত হলো।

বিদ্যমান সংগঠনগুলো তাদের নামের সাম্প্রদায়িক অংশ বর্জন করে অসাম্প্রদায়িক সংগঠনে পরিণত হওয়ায় প্রক্রিয়াও শুরু হলো। ১৯৫৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ তার নামের মধ্য থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি তুলে দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগ এবং ১৯৫৬তে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সম্পাদক শেখ মুজিবর রহমান, তাজউদ্দিন প্রমুখের উদ্যোগে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি তুলে দিয়ে আওয়ামী লীগে পরিণত হওয়ার মতো তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটতে শুরু করে।

১৯৫৪’র নির্বাচনে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট অসাধারণ এবং একচ্ছত্র বিজয় অর্জন করে শাসক মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটিয়ে। পরবর্তীতে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, অতঃপর শহীদ সোহরাওয়ার্ধীর বৈরুতে আকস্মিক মৃত্যু ঘটলো শেখ মুজিবের হাতে আওয়ামী লীগের একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পূর্ববাংলা স্বায়ত্তশাসন, ৬ দফা, ছাত্র সমাজের ১১ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক নির্বাচনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের অকল্পনীয় বিজয় ঘটলো। কিন্তু তার হাতে কিছুতেই পাকিস্তানি সামরিক শাসক গোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর না করে ভিন্ন পথে কর্তৃত্ব জোর করে ধরে রাখতে উদগ্রীব হয়ে পড়ে। শুরু করে ব্যাপক গণহত্যা-বাঙালি নিধন। নিরস্ত্র বাঙালিকে তখন ঘুরে দাঁড়াতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত জাতীয় ঐক্য, জাতীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নয় মাসব্যাপী সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বহু আকাক্সিক্ষত বাংলাদেশ নামক নতুন ধর্মরিপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। আকাশে রক্তিম সূর্যের উদয় হয়।

অতঃপর বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ১৯৭২-এর সংবিধান প্রণয়ন ও বাংলাদেশের মৌলিক রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র সংবিধানে গৃহীত হওয়াতে ভাষা আন্দোলনের আদর্শিক বিজয়ের পরিপূর্ণতা আসে।

১৯৪৮ থেকে ১৯৭২ মাত্র ২৪ বছরে কি বিশাল বিজয়ই না অর্জিত হয়েছিল। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র বা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি ধর্মীয়, শৈল্পিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে বাঙালি সংস্কৃতির বহুবিধ বিকাশ উন্নয়নের কি অপূর্ব অনুকূল পরিবেশই না সৃষ্টি হয়েছিল।

তাই হিসাব-নিকাশ কি পাওয়া যায়? ভাষা আন্দোলনের বিপুল অর্জনের পাশাপাশি আমরা হারালাম কতটুকু? মৌলিক আদর্শিক বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে? বর্জনের পথেই কি হঁাঁটছি না আমরা শহীদদের আদর্শ বাস্তবায়নের নামে?

একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতি, আত্মনির্ভরতার অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার বদলে আমদানি নির্ভর অর্থনীতি দিয়ে দেখাল উন্নয়ন করা যাবে না। আমরা হতে চাই অধিক থেকে অধিকতর রপ্তানির ক্ষমতাসম্পন্ন, নতুন নতুন শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে বেকারত্বমুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত এক নবীন বাংলাদেশ ভাষা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যা থাকবে দীপ্তমান। সেই বাংলাদেশে সবাই তার নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে। আমরা তেমনই ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার- রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকবে না- এ নীতি প্রতিষ্ঠায় দেশ আজো অঙ্গীকারবদ্ধ।

রণেশ মৈত্র : রাজনীতিক ও কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

আখাউড়ায় যুক্ত হলো নতুন ইউনিয়ন

আখাউড়ায় যুক্ত হলো নতুন ইউনিয়ন

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসে তোপের মুখে পেন্টাগন প্রধান

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসে তোপের মুখে পেন্টাগন প্রধান

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে চরাঞ্চলে হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে

প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে চরাঞ্চলে হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে

এআই দিয়ে আপত্তিকর ছবি বানিয়ে চাঁদা আদায়, অতঃপর...

এআই দিয়ে আপত্তিকর ছবি বানিয়ে চাঁদা আদায়, অতঃপর...

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App