×

মুক্তচিন্তা

নারী আসলে কিসে আটকায়?

Icon

কাগজ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৩, ০৮:৩৭ পিএম

নারী আসলে কিসে আটকায়?

কাজী বনফুল: লেখক ও কলামিস্ট

সম্প্রতি নারীকে এক প্রকার মাছ, অথবা গারদের কয়েদি মনে করে বাঙালি ফেসবুক কৌতূহলীরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে জানতে চাচ্ছে নারী আসলে কিসে আটকায়?

নারী কিসে আটকায় তার আগে দেখা যাক নারীকে যুগে যুগে হাজার হাজার বছর ধরে কারা আটক করে নিক্ষেপ করেছে যন্ত্রণার শিবিরে কারা বারবার ছুঁড়ে ফেলেছে অন্ধকারের আবদ্ধ কূপে।

হাজার হাজার বছরের ইতিহাস ঘাটলে আমরা নারীর উপর করা পাশবিক অত্যাচারের ইতিহাসই লক্ষ্য করবো। বেশি দিন আগের কথা নয় এই কিছু দিন আগেও একটা প্রথা চালু ছিল ভারতবর্ষে। সেই প্রথার নাম হচ্ছে সতীদাহ প্রথা, যার সারমর্ম হচ্ছে, মরবে স্বামী নামক পুরুষ অথচ সেই সাথে প্রাণ দিতে হবে তার সহধর্মিণীকেও। যদি একজন স্বামীর মনে স্ত্রীর জন্য এতোটুকুও দয়ার সৃষ্টি হতো তাহলে সে কখনোই চাইতো না যে আমার চিতায় আমার স্ত্রীও জ্বলুক। স্বামীর মরনের সাথে তাকেও সেই স্বামীর সাথে সহমরণে যেতে হবে আহ্ এর চেয়ে নির্মম আর কি হতে পারে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে জোরপূর্বক ধর্মের নামে জলন্ত আগুনে নিক্ষেপ। রামমোহন রায় প্রভাবশালী হওয়ার পরও তিনি এর বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে তাকে মারধরও করা হয়েছে এবং অত্যাচারও করা হয়েছে। তারপরে আবার কি হলো "বিধবাবিবাহ" নিয়ে সংগ্রাম। তৎকালীন সময়ে স্বামী কোন কারণে মারা গেলে ১৮ বছরের মেয়েটাও আর বিয়ে করতে পারতো না তার সারাজীবন বৈধব্য নিয়েই কাটাতে হতো কি অমানবিক ও পাশবিক প্রথা। সেই সংগ্রামের নায়ক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, তাকেও সমাজচূত করা হয় এই বিধবাবিবাহের পক্ষে কথা বলার জন্য। বিদ্যাসাগরকেও আমরা নাস্তানাবুদ করতে পিছুপা হইনি। আবার আসি রাজা বাদশাহ দরবারে। রাজা বাদশাহর দরবারে তো নারী ছাড়া আবার তাদের আসর ভারীই হতো না মানে পরিপূর্ণ হতো না। আরবে যুদ্ধ হলে যুদ্ধ শেষে সেখানে যে নারীদের পাওয়া যেত তাদেরকে বিবেচনা করা হতো গনিমতের মাল হিসেবে। অনেক অঞ্চলে আবার কন্যা সন্তানের জন্ম হলে তাকে জীবন্ত কবরও দেওয়া হতো।

আমি এমন একজনকে চিনি যিনি নারী দিবসে নারীর মুক্তি ও স্বাধীনতার কথা বলে ফেসবুক গরম করার দুইদিন পরেই সে নিজের বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে গিয়ে সেখানে গরুর হাটে গরু কেনাবেচার মত তার হাত-পা, চুল,নখ, হেটে দেখানো সহ সব কিছুই পরখ করে দেখেছে। সবশেষে মেয়েটা যখন তাকে একটু হেটে দেখাতে বলেছে তখনই বেঁধেছে বিপদ। এই মেয়ের ভদ্রতার বালাই নাই এই মেয়ের মা-বাবা মেয়েকে সুশিক্ষা দিতে পারে নাই আরো কত কি। এই হচ্ছে আমাদের নারীবাদীদের অবস্থা, মুখে মুক্তির বুদবুদ তোলা আর কর্মে নারীকে গরুর হাটে তোলা।

তাহলে ভাবুন নারীর উপরে করা যুগে যুগে পুরুষের এমন অত্যাচারের একটা বড় রকমের ফিডব্যাক থাকবে না এটা তো হতেই পারে না। এখন সেই নারীই আবার পুরুষের জন্য এমন এক মমতার খাঁচা নির্মাণ করেছে যেখানে কেবল ইনি আর তিনিই থাকবেন আর কেউ নয়। পুরুষ কখন কোথায় আছে, কি খাচ্ছে, কি করছে, সবকিছুই ভিডিও কলে দেখিয়ে সান্ত্ব করতে হচ্ছে নারীর সেই মমতার আগুনকে। এমন মমতার অত্যাচারের কারাগার একদিনে তৈরি হয়নি দীর্ঘ সময়ের সাইড এফেক্টেই গড়ে ওঠেছে এই মানসিক জেলখানা। এই অতিরিক্ত ভালোবাসার অত্যাচার পুরুষ আর নিতে পারছে না তাই তারা নিরবে নিভৃতে চিৎকার করে বলছে "এ খাঁচা ভাঙাবো আমি কেমন করে"

পৃথিবীতে দিবস থাকলে নারী-পুরুষ উভয়েরই থাকা উচিৎ শুধুমাত্র নারীর কেন? কাউকে উপলক্ষ করে তার মুক্তির কথা বলে তাকে নিয়ে দিবস উদযাপন মানে তাকে দুর্বল ও অসহায় ভাবে উপস্থাপন করা। যখনই আমরা তাদেরকে সমকেন্দ্রিক চিন্তা ও স্বাধীনতার সুযোগ না দিয়ে তাদের উপহার দিয়েছি নারী দিবস তখনই তাদেরকে আমরা মানসিক ভাবে বুঝিয়ে দিয়েছি যে তারা দুর্বল তারা আমাদের করুনা ছাড়া চলতে পারবে না। তাই তাদের মুক্তির জন্য অবশ্যই একটা দিবস দরকার আর সেই দিবসের নাম করণ করা হয়েছে নারী দিবস।

একটা পুরুষ বিয়ে করার ইচ্ছে পোষণ করলেও বাবা-মা তাকে বিয়ে করাতে চায় না অথচ একটা মেয়ে মানসিক ভাবে প্রস্তুত হওয়ার আগেই ১৩-১৪ বছর হলেই তাকে জোরপূর্বক বিয়ে দিতে পারে কারণ তার শক্তি পুরুষের চেয়ে কম বলে। আমি অনেক মেয়েকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র সামাজিক ও পারিবারিক চাপের কারণে তাকে নপুংসকের সাথেও ঘর করতে হতে দেখেছি। যা একটি মানবিক অপরাধ।

একজন পুরুষ ঘরে তিন বউ থাকার পরেও আবার আরেকটা বিয়ে করে চারের ঘরের নামতা পূরণ করতে পারে কারণ নারী পুরুষের তুলনায় দুর্বল। কোন নারীই কোন পুরুষকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দিবে না। নারীরা সতীনের ঘরকে নরকের সমান মনে করে। পুরুষ কেবল তার শক্তির কারণেই অধিক বিবাহ করতে পারে।

আমরা একটা ছেলে সন্তান হলে খুশি হই আর মেয়ে সন্তান হলে ঠিক তার বিপরীত।

আমরা যে গরু-ছাগল জবাই দিয়ে তার মাংস খেতে পারি এর কারণ কি জানেন কারণ তারা আমাদের চেয়ে দুর্বল। তারা যদি আমাদের চেয়ে শক্তিশালী হতো তাহলে বিষয়টা উল্টো ঘটতো তাদের বদলে আমরা তাদের কাছে জবাই হয়ে যেতাম। দেখবেন দেবতার সামনে পাঠাবলি এমনকি দুর্বল নরবলি ও হয় কিন্তু কখনো কি শুনেছেন যে সিংহ বলি, বাঘ বলি, হাতি বলি হয়েছে হয়নি কারণ এদের কে ধরতে গেলে স্বয়ং দেবতাও মানুষকে রক্ষা করতে পারতো না দেবতা নিজেও অস্তিত্ব সংকটে পড়তো।

এবার আসি নারী আসলে কিসে আটকায়?

হ্যাঁ নারী আটকায় তবে সে আটকানো কোন দৃশ্যমান বরশি অথবা জেলখানার কয়েদ খানা নয়, সেটা একটা ভালোবাসার প্রাচীরে ঘেরা বাবা নামক বিশ্বাস ও মমতার অদৃশ্য চাদর। সেই অদৃশ্য মমতার কয়েদখানা হচ্ছে তার বাবার হৃদয়। নারী সারাটা জীবন সব সম্পর্কে তার বাবাকে খুঁজে ফিরে। এমনকি তার যার সঙ্গে বিবাহ হয় তার ভেতরেও নারী তার বাবার ছায়া খুঁজে ফিরে।

নারী যেমন করে তার বাবার বিশ্বাস ও মমতায় আটকায় এমন করে নারী আর কোথাও আটকায় না।

আমি অনেক বোধসম্পন্ন নারীকে দেখেছি যারা সংসার এবং অন্যান্য কাজ উভয় ক্ষেত্রেই ভিষণ দৃঢ় মানসিক শক্তি সম্পন্ন এবং চিন্তা ও চেতনায় অনেক উন্নত। আমি সেই নারীর পেছনের গল্পটা জেনে এটা বুঝতে পেরেছি যে সেই নারীর বাবা-মা তাকে কালো চাদরে ঢেকে না রেখে বরং তাকে বাস্তবতার জ্ঞান শিখিয়েছে। হাতে কাগজের স্তুপ তুলে না দিয়ে হাতে বই তুলে দিয়েছে। নতুন একটা পরিবারকে আগলানোর গল্প শুনিয়েছে, প্রেম, মমতা, আবেগ সবই দিয়েছে তার মেয়েকে কিন্তু সেই প্রেম,মমতা, আবেগ তার মেয়েকে দুর্বল ও অন্ধকারে নিমজ্জিত করেনি বরং আলো দেখিয়েছে।

আরেক মা আমাকে জানিয়ে ছিলো যে তার মেয়ে যখন বড় হয়ে উঠছিল এবং বুঝতে শিখছিল তখন তিনি তার মেয়ের হাতে রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছ তুলে দিয়ে বলেছিলেন, প্রতিদিন একটি করে গল্প পড়বে আর আমাকে তার সারমর্ম বলবে। সঠিক উত্তর দিতে পারলে চকলেট পাবে। সেই গল্পগুচ্ছু ও চকলেটই তাকে পরবর্তীতে নিয়ে গিয়েছিল "প্রিন্সিপিয়া ম্যাথম্যাটিকা থেকে প্রিন্সিপলস অভ ম্যাথম্যাটিক্সের" কাছে। সেই মা আমাকে আরো বলেছিলেন আপনি সন্তানকে ছোট বেলায় যে রংতুলির আঁচড়ে আঁকবেন সন্তান ঠিক সেই আদলেই বড় হয়ে উঠবে।

নারী অবশ্যই কোন সামান্য বিষয় নয় আমাদের সমাজ সংস্কৃতি নারীকে বোঝাপড়ায় ছোট করে রেখেছে, চিন্তায় চেতনায় ছোট করেছে রেখেছে যুগে যুগে। নারীর মুক্তির পথে কাঁটা বিছিয়ে তার পথকে আমরাই রোধ করেছি যুগে যুগে। অথচ সেই কাঁটা যখন আমাদেরও বিদ্ধ করে তখন আমরা নারীদের উপর দোষারোপ করি অথচ নারীদের উপরে আমাদের করা পেছনের মর্মান্তিক ইতিহাস একদমই ভুলে যাই। আজ আমাদের গলায় নারীর দেওয়া যে অজ্ঞানতার কাঁটা বিধছে তা আমাদেরই পূর্বপুরুষদের তাদের ভেতরে রোপন করা কাঁটার বাগান যা এখনো চলমান রয়েছে। এই কাঁটা থেকে নিস্কৃতি এত সহজে মিলবে না। কোন মানুষকে আপনি অন্ধকারে রেখে তার ভেতর থেকে আলোর প্রত্যাশা করবেন এর চেয়ে অজ্ঞতা আর কিছুই হতে পারে না।

নারী আসলে কিসে আটকায় পুরুষ সমাজের এই যে জিজ্ঞেসা ও কৌতূহল এটা মূলত নারীর প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক ইঙ্গিত। এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয় আছে আর তা হলো আমরা হাজার হাজার বছর ধরে নারীদের কালো চাদরে অন্ধকারে ঢেকে রেখে আমরা উদযাপন করেছি মুক্ত পাখির মত স্বেচ্ছাচারী জীবন। সেই একই চাদর দিয়ে এখন তারা আবার আমাদের ঢেকে দিচ্ছে। যেখানে আমরা যুগ যুগ ধরে মুক্ত পাখির মত বিচরণ করেছি সেখানে তারা আবার আমাদের হঠাৎ আবদ্ধ করায় এই পরিবর্তন আমাদের জিন কোনভাবে মানতে পারছেনা। আমাদের জিন সব সময় নারীকে দোষারোপ করে নিজে মুক্তির পথ খুঁজে পেতে চাচ্ছে তাই এমন নেতিবাচক প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছে নারীকে কেন্দ্র করে যে নারী কিসে আটকায় অথচ প্রশ্নের কারণের যথার্থ স্রষ্টা আমরা নিজেরাই।

গাছ লাগাবেন নিম আর আশা করবেন কমলার তাতো হবে না। আমাদের নারীদের শুধুমাত্র পোশাকে আধুনিকতা এসেছে, চিন্তা এবং তাদের ধ্যানধারনা সেই আগের মতই আছে যা আমরা হাজার হাজার বছর ধরে তাদের মস্তিষ্কে রোপন করেছি।

সুতরাং নারী কিসে আটকায় তা নিয়ে উদ্ধিগ্ন না হয়ে বরং আমরা নিজেরাই কিসে আটকে আছি কোন অদৃশ্য শিকলের বেড়ি আমাদের আমিত্বের পথে বাঁধা হয়ে আছে তার সন্ধান করা বেশি জরুরি। সেই শিকল থেকে যতদিন না আমরা নিজেরদের মুক্ত করতে পারবো ততদিন কারোই মুক্তি নেই না নারীর পুরুষের।

লেখক পরিচিতি কাজী বনফুল: লেখক ও কলামিস্ট

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

রাশিয়ায় সামরিক বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ২৯

রাশিয়ায় সামরিক বিমান বিধ্বস্ত, নিহত ২৯

মেহেরপুর সীমান্ত থেকে ৫ হাজার লিটার তেল জব্দ

মেহেরপুর সীমান্ত থেকে ৫ হাজার লিটার তেল জব্দ

জনতা ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক হলেন মেঘনার ফজলুল করিম

জনতা ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক হলেন মেঘনার ফজলুল করিম

কুয়াকাটায় জালে ধরা পড়ল ২৩ কেজি ওজনের কোরাল, বিক্রি ৩০ হাজারে

কুয়াকাটায় জালে ধরা পড়ল ২৩ কেজি ওজনের কোরাল, বিক্রি ৩০ হাজারে

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App