×

মুক্তচিন্তা

সংস্কৃতি ও রাজনীতি : ঊনবিংশ শতক ও একবিংশ শতক

Icon

কাগজ অনলাইন প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০১৮, ০৮:০০ পিএম

ধর্মভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদ যে বিভেদ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে উসকে দিচ্ছে, এর শেষ কোথায়? উনিশ শতকের নবজাগরণ যেমন সীমাবদ্ধতা দুর্বলতা নিয়েও আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোকবর্তিকা, তেমনি বিংশ শতক আমাদের কাছে বিভেদ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের। এর মধ্যে উজ্জ্বলতম আলো হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন স্বদেশ প্রতিষ্ঠা।

স্বাভাবিক কারণেই উনিশ শতকে অবিভক্ত বাংলার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে বর্তমানের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক-সামাজিক আন্দোলনের তুলনা প্রায়শই মাথায় ঘুরপাক খায়। প্রসঙ্গত, কিছুদিন আগে আমাদের দ্বিধাবিভক্ত পরিবারের সদস্য ছোট ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে অনুষ্ঠানে কলকাতা গিয়ে নজরে এলো সেখানে উনিশ শতকের সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি নিয়ে গভীর আলোচনা হচ্ছে।

ঢাকা ফিরে ওই শতক নিয়ে যখন নানামুখী ভাবনা ভাবছি, তখন একদিন বাড়ির কর্ত্রী অফিস থেকে এসে বললেন, যারা জি বাংলার সিরিয়াল দেখতে উৎসুক, তারা বলাবলি করছেন, ওগুলো ক্রমে ধর্মমুখী হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে কোনো একটি দৈনিক মনে হয় ইনকিলাব পত্রিকায় দেখলাম, বাংলাদেশে ইসলামি উপন্যাস ও বই খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। পবিত্র ধর্ম নিয়ে মাতামাতি বর্তমানে সময়ের হাওয়া। অথচ উনিশ শতক ছিল যেন ঠিক উল্টো। এই দুই শতক নিয়ে স্বাধীনতা দিবসের বিকেলে কর্মহীন অবসরের মধ্যে ভাবতে গিয়ে তুলনামূলক দৃশ্যপট আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল। জ্ঞানের পরিধি অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিধায় ঊনবিংশ শতাব্দীর ঘটে যাওয়া অতীত ঘটনাপ্রবাহের সামান্য কিছু আমার জানা আর একবিংশ শতক তো মাত্র দুই দশক অতিক্রম করতে যাচ্ছে, তাই সবটা জানার প্রশ্নই ওঠে না। এতদসত্ত্বেও মন দুই শতকের তুলনার মধ্যে ডুবে গেল।

প্রসঙ্গত, বাংলা তথা ভারতের জন্য অষ্টাদশ শতক (১৭০১-১৮০০) ছিল একান্তই দুর্ভাগ্যের। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে পরাজয়ের ভেতর দিয়ে ‘গৌরব-রবি’ অস্তমিত হয়ে ব্রিটিশদের পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হই আমরা। শিল্প বিপ্লবের ভেতর দিয়ে ইংল্যান্ড যখন গণতন্ত্রের যুগে প্রবেশ করছে, ফ্রান্সে যখন সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার বাণী নিয়ে বিপ্লব হচ্ছে; তখন আমাদের এই পরাধীনতা ছিল বিধিলিপির মতো দুর্ভাগ্যজনক। আসলে অষ্টাদশ শতক এক অর্থে ছিল আমাদের জন্য অন্ধকারময়। প্রাচীন যুগের গ্রামীণ সমাজ, যাকে বলা হয়ে থাকে এশিয়াটিক সমাজ, কার্ল মার্কস যাকে বলেছেন প্রাচ্য স্বৈরাচার; সেই আত্মসর্বস্ব অনড় কূপমণ্ডূক নিষ্ঠুর সমাজের ওপর চেপে বসা ঔপনিবেশ স্বৈরাচার তাই অতি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল। এর প্রমাণ ফকির বিদ্রোহ, মহারাজা নন্দ কুমারের ফাঁসি, এগারোশ ছিয়াত্তরের মন্বন্তর প্রভৃতি।

ওই শতাব্দীতে চিন্তাও করা সম্ভব হয়নি পরবর্তী ঊনবিংশ শতকের নবজাগরণের কথা। পরাধীনতার মধ্যে আধুনিক শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সমাজ, রাজনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নতি বাংলাকে তখনকার ভারতের সর্বোচ্চ চূড়ায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিস্তার, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পণ্যের ব্যবহার তথা আধুনিক জীবনযাত্রার সঙ্গে তখন আসে যুক্তি, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি, ইতিহাসবোধ, অধিকার সচেতনতা, স্বদেশপ্রেম, মানবিকতাবোধ। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, ওই জাগরণের ছাপ পড়ে লোকজ সমাজেও। লোকজ সংস্কৃতিও সেই ধারায়ই বিকশিত হয়। লালন হচ্ছে এর প্রমাণ। জাতীয়তাবাদের উন্মেষের কালও ঊনবিংশ শতক। অতীতে এ দেশে কোনো লিখিত ইতিহাস বা ইতিহাস চর্চা না থাকায় তখন বঙ্কিমচন্দ্র দুঃখ করে বলেছিলেন, ‘বাঙ্গালার ইতিহাস চাই। নহিলে বাঙ্গালী কখনও মানুষ হইবে না।’ ইতিহাস লেখা ও চর্চা আর সেই সঙ্গে ঊনবিংশ শতকের প্রথম দিকে বাংলায় অধিকার সচেতনতা ঘিরে সামাজিক সংগঠন গড়ে ওঠার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, প্রথমে বাংলাভিত্তিক জাতীয়তাবোধ গড়ে উঠলেও শতাব্দীর শেষভাগে তা ভারতীয় জাতীয়তাবাদে রূপান্তরিত হয়। জাতীয়তাবোধের সঙ্গে রাজনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রথমটির অগ্রগতি ও গতিপ্রকৃতি অপরটিকে প্রভাবিত করে দুটোই অগ্রসর হতে থাকে।

উল্লেখ্য যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন, মেজদাদা (গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর) সেই সময় (ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে) বিখ্যাত জাতীয় সঙ্গীত ‘মিলে সবে ভারত সন্তান/একতান মনঃ প্রাণ/গাও ভারতের যশোগান’ রচনা করেছিলেন। বাংলার নবজাগরণই আসলে ভারতকে পথ দেখিয়েছিল। উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই বিংশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামী মহারাষ্ট্রের গোপাল কৃষ্ণ গোখেলে বলেছিলেন, ‘বাঙালি আজ যা ভাবে, ভারত ভাবে আগামীকাল।’ প্রসঙ্গত ভারতের রাজ্যগুলোর মধ্যে বাংলা ও মহারাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের দুই প্রধান কেন্দ্র। ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা ছিল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের উত্থানেরই ফলাফল। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, অতীত থেকে চলে আসা নানা সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা সত্ত্বেও নবজাগরণের চরিত্র বৈশিষ্ট্য ছিল অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ।

বলাই বাহুল্য ভারতের মানচিত্রে নেতৃত্বদানকারী বাংলার নবজাগরণের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতাগুলো যেন ছিল অখণ্ডনীয়ভাবে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় আমাদের ললাটের লিখন। অবস্থা পর্যবেক্ষণে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, পাশাপাশি বাস করলেও দুই প্রধান ধর্ম হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের জাতপাতের ঘেরাটোপের দেয়াল বাংলার নবজাগরণ ভাঙতে সক্ষম হয় না। যদিও ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ বা ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম হিন্দু- মুসলিম মিলনের এক ধরনের ভিত্তি সৃষ্টি করেছিল। এভাবে ঔপনিবেশিক ভারতে মিলনের উপাদান নানাভাবে প্রবাহিত থাকলেও এই ধারা অগ্রসর হয় নাই। হিন্দু সম্প্রদায়ের তফসিলি সম্প্রদায়ের মানুষ পড়ে থাকে নতুনভাবে গড়ে ওঠা সমাজের বাইরে। আর মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ অতীতে শাসক সম্প্রদায় ছিল বিধায় সেই মনোভাব বজায় রেখে থাকে আধুনিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রতি মুখ ফিরিয়ে। ধর্মাশ্রয়ী ফরায়েজিসহ কৃষক আন্দোলনগুলোর ভেতর দিয়ে তখন ওই সমাজের ক্ষোভ প্রকাশিত হতে থাকে। ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে মুসলিম সমাজ কিছুটা সংস্কারের মধ্যে গিয়ে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণের দিকে অগ্রসর হয়। তবে ওই চেতনার জন্ম নবজাগরণের কেন্দ্র বাংলায় হয়নি। আরো একটি দিক হলো কংগ্রেসের নেতৃত্বে ভারতে স্বাধীনতার আন্দোলন যখন ক্রমে রূপ পাচ্ছে, তখন মুসলিম সমাজ শতকের শেষ দিকে এসে ঝুঁকে যায় কাল্পনিক প্যান ইসলামি খেলাফত আন্দোলনের দিকে। এদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ইতিহাসের মধ্যে অতীতের শাসক হিসেবে গৌরবগাথা না থাকায় তারা জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত ও শানিত করার জন্য মূলত আশ্রয় নেয় ধর্মীয় কথা কাহিনীর। ভারতীয় জাতীয়তাবোধ জাগ্রত করার জন্য বাংলায় দুর্গাপূজা আর মহারাষ্ট্রে গণেশ পূজা সার্বজনীন করাটা ছিল এরই উদাহরণ। প্রসঙ্গত, গণেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপরিল্লিখিত জাতীয় সঙ্গীতটি ছিল কলকাতায় হিন্দুমেলার (১৮৬৭-৮০) জন্য রচিত।

প্রসঙ্গত, অতীত থেকে ইউরোপের জাতিগুলো বাণিজ্যের জন্য এশিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকায় গিয়ে স্বার্থ হাসিলের জন্য স্থানীয় বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায় ও আদিবাসী এথেনিক গ্রুপের মধ্যে বিভেদ উসকে দেয়। পরবর্তী সময়ে উপনিবেশ স্থাপন হলে ‘ভাগ কর শাসন কর’ এই হয় নীতি ও কৌশল। তারা বাংলা তথা ভারতে সেই নীতি কৌশল সুচতুরভাবে ব্যবহার করে। কংগ্রেসের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বিজাতিতত্ত্ব জনপ্রিয় হওয়ার সুযোগে ব্রিটিশরা ধর্মের রাজনীতিকরণে মদদ দেয়। ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই বছর থেকেই পূর্ব বাংলায় হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়। অবস্থা পর্যবেক্ষণে এটাই সত্য বলে মনে হয়, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ করে ১৯১১ সালে তা রদ করা ছিল জেগে ওঠা নিয়মতান্ত্রিকতাবাদী ও সন্ত্রাসবাদী ধারার জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন দমন ও বিপথগামী করার জন্য ব্রিটিশদের কূটকৌশল। প্রসঙ্গত, পরবর্তী সময়ে বিংশ শতকের (১৯০১-২০০০) দ্বিতীয় দশকে অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনকে একসঙ্গে করে অগ্রসর হওয়ার জন্য মহাত্মা গান্ধী প্রচেষ্টা নিলেও তা ফলবতী হয় নাই। এককথায় বলা যায়, ঊনবিংশ শতকে সর্বক্ষেত্রে বাংলার নবজাগরণ প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর বিংশ শতকে বাংলাকে এক রাখতে সক্ষম হয়নি। ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গা-ফ্যাসাদের ভেতর দিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাও বিভক্ত হয়।

এখানে বিশ্ব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নেয়া আবশ্যক। ঊনবিংশ শতকে ব্রিটিশ ছিল বিশ্ব ক্ষমতার রাজনীতিতে সর্বেসর্বা। ব্রিটিশ রাজত্বে সূর্য অস্ত যেত না কথাটা ছিল বহুল প্রচারিত। এই অবস্থাটা ভারত ও বাংলা যখন বিভক্ত হয় তখন বিরাজমান ছিল না। বিংশ শতকের শুরুতে কেবল মত চিন্তার দিক থেকে নয়, বাস্তবেও বিশ্ব ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রে বিভক্ত হয়ে যায়। বিশ্ব এক কেন্দ্র থেকে দ্বিকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। তখন এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থানে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে থাকলেও জাতীয়তাবাদের প্রধান সমস্যা ধর্মীয় ও জাতিগত বিভেদের ইস্যুটি তখন তেমন গুরুত্ব পায় না। আন্তর্জাতিকতাবাদ তথা সমাজতন্ত্র হয়ে ওঠে প্রধান ইস্যু। প্রসঙ্গত, ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে তখনকার ‘নতুন দুনিয়া’ আমেরিকার শিকাগো শহরের দুটি ঘটনা আমার মনকে প্রায়শই আলোড়িত করে। প্রথমত শিকাগো শহরে ১৮৮৬ সালের মে মাসের প্রথম দিকে শ্রমিক হত্যার রক্তাপ্লুত ঘটনা স্মরণে ১৮৯০ সাল থেকে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগান তুলে দুনিয়াব্যাপী মে দিবস পালিত হতে থাকে। দ্বিতীয়ত, ১৮৯৩ সালে ওই শিকাগো শহরেই অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব ধর্ম মহাসভা। ‘যত মত তত পথ’ বা ‘জীবে প্রেম করে যেই জন/সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’ মতের প্রধান প্রচারক বাংলার মনীষী বিবেকানন্দ সেই সভায় সর্ব ধর্মমতের মর্মবাণী এক এবং সমন্বয় নিয়ে বক্তব্য দিয়ে বিশ্ব ধর্ম মহাসম্মেলনের প্রধান ব্যক্তি রূপে অবির্ভূত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয়টা নয় প্রথমটা অর্থাৎ আন্তর্জাতিকতাবাদ ও সমাজতন্ত্র প্রধান ইস্যু হয়ে বিশ্ববাসীকে আলোড়িত করতে থাকে।

বিংশ শতকের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা পতনের পর বিশ্ব ব্যবস্থা আমেরিকার নেতৃত্বে এককেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। কিন্তু ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র লড়াইয়ের জের ধরে আফগানিস্তানে ধর্মীয় উগ্র সন্ত্রাসবাদের লালন এবং ধর্মীয় রাজনীতিকীকরণের যে অপকর্ম শুরু হয়, এরই ফলে একবিংশ শতকের শুরুতে ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে এককেন্দ্রিক বিশ্বের নেতা আমেরিকাকেই আঘাত করে। ধ্বংস হয় টুইন টাওয়ার। তাতে এককেন্দ্রিক বিশ্ব সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

এটা ছিল কার্যত এককেন্দ্রিক বিশ্বে আরো এক কেন্দ্র গড়ারই প্রচেষ্টা। এরই মধ্যে একবিংশ শতক দ্বিতীয় দশক পার না হতেই দেখা যাচ্ছে, এককেন্দ্রিক বিশ্ব হয়ে যাচ্ছে বহু কেন্দ্রে বিভক্ত। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বলয় বৃদ্ধির এই প্রতিযোগিতার বাহন হচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্র। আমেরিকা রাশিয়ার সঙ্গে কেবল চীন ভারতই নয়, উত্তর কোরিয়ার মতো ছোট দেশও শক্তি-কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে চাইছে। আর এই প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিকতাবাদকে দূরে ঠেলে দিয়ে বিশ্ব প্রেক্ষাপটেই কেবল নয়, একই দেশের অধিবাসীদের মধ্যে ধর্মীয় ও জাতিগত বিভেদ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ক্রমেই বিশ্বের প্রধান ধর্মমতগুলো দেশে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে আগ্রাসী হয়ে উঠছে। ফলে ধর্মীয় ও জাতীয় সংখ্যালঘুরা দেশে দেশে পড়ছে বিপাকে। শরণার্থী সমস্যা ক্রমেই এখন বিশ্বের প্রধানতম সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রসঙ্গত, আমাদের উপমহাদেশ আগে থেকেই ধর্মীয়ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। আর আমাদের বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষার নীতি নিয়ে স্বাধীন হলেও বিংশ শতকের শেষ দিকে পঁচাত্তরের পর চলে যায় ধর্মকে রাজনীতিকরণের দিকে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তা ব্যবহার করে। এরই ফলে বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাবে আমাদের উপমহাদেশ ও দেশের ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতে অশান্ত ও অসহনীয় হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি শিক্ষা, শিল্প-সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে আমূল পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মূল্যবোধ হচ্ছে অধঃপতিত। আমরা যেন মধ্যযুগে ফিরে যাচ্ছি। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে কী হতো কে জানে! এই দলকেও এখন ভারসাম্য বজায় রাখতে কেবল ছাড় দিতে হচ্ছে। এক কথায় ঊনবিংশ শতকের নবজারগণের প্রভাব, যার প্রভাব পড়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধে, তা থেকে বর্তমান জাতীয় ও বিশ্ব পরিস্থিতির ঢেউ আমাদের ক্রমশ যেন আরো দূরে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্বের দেশে দেশে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের যেন আগ্রাসী উত্থান ঘটছে।

এই বিষয়টা নিয়ে স্বাধীনতা দিবসের বিকালে ভাবতে গিয়ে অনেক সময়ের মতো মন বিষণ্ণতায় ভরে গেল আর প্রশ্ন জাগল ধর্মভিত্তিক উগ্র জাতীয়তাবাদ যে বিভেদ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে উসকে দিচ্ছে, এর শেষ কোথায়? উনিশ শতকের নবজাগরণ যেমন সীমাবদ্ধতা দুর্বলতা নিয়েও আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্যের আলোকবর্তিকা, তেমনি বিংশ শতক আমাদের কাছে বিভেদ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাতের। এর মধ্যে উজ্জ্বলতম আলো হচ্ছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন স্বদেশ প্রতিষ্ঠা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুসহ লাখো শহীদের রক্তস্নাত পবিত্র এই আলোকবর্তিকা। পারব কি আমরা ঊনবিংশ শতকের সেই আলোকবর্তিতার সঙ্গে বিংশ শতকের আমাদের জাতির আলোকবর্তিকার সংযোগ অব্যাহতভাবে বাড়িয়ে স্বাধীনতার মর্মবাণীর দিকে অগ্রসর হতে? বিশ্ব কি পারবে ধর্ম-বর্ণ-জাতি গোষ্ঠী-শ্রেণি নির্বিশেষে সংহতি সৌভ্রাতৃত্ব ন্যায়বিচার তথা যুক্তিবাদী মানবিক সমাজ ফিরিয়ে আনতে?

শেখর দত্ত : রাজনীতিক, কলাম লেখক।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

ঈদের দিন সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু

ঈদের দিন সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু

কোরবানি দিতে গিয়ে সারাদেশে অন্তত ৫৭৬ জন জখম

কোরবানি দিতে গিয়ে সারাদেশে অন্তত ৫৭৬ জন জখম

আদ-দ্বীনে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আসামি করে মামলা

আদ-দ্বীনে ৬ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আসামি করে মামলা

দেশের ৬ অঞ্চলে ঝড়ের পূর্বাভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা

দেশের ৬ অঞ্চলে ঝড়ের পূর্বাভাস, নদীবন্দরে সতর্কতা

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App