ড. মাহবুবুল হকের দুর্লভ সংগ্রহশালা
প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রাম নগরীর লালখানবাজার, বাগঘোনায় এম আর সিদ্দিকী বাড়ির গেট পেরিয়ে পাশে একটা সরু গলি ভেতরে ঢুকে গেছে। সেখানে ১০৫ নম্বর বাড়িটির নাম ‘অন্তরা’। এই বাড়িতেই আশৈশব বসবাস করছেন দুই বাংলার অন্যতম সেরা গবেষক ড. মাহবুবুল হক। গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩ অপরাহ্ণে আমি প্রাবন্ধিক শাকিল আহমদকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হয়েছিলাম মাহবুব স্যারের বাড়ির দোতলায় অবস্থিত বিশাল লাইব্রেরি ও দুর্লভ সংগ্রহশালা দর্শনে। আমরা পৌঁছাতেই ৭৫ ছুঁইছুঁই মাহবুব স্যার এগিয়ে এসে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন।
বাসায় ঢুকে বিস্মিত হতে হলো। থাকার ঘর নয়, যেন সাজানো-গোছানো একটি বৃহৎ কলেবরের লাইব্রেরি। রুমে রুমে রয়েছে পড়ার ব্যবস্থাও। খুব যতেœ সাজানো বই। অনেক সময় সেলফের উপরে উঠে ছাদে গিয়ে ঠেকেছে। স্যার তার ৬টি রুমে লাইব্রেরির বইগুলো ঘুরে ঘুরে আমাদের দেখান। কোন শেলফে কী ধরনের বই আছে সেগুলো আমাদের কাছে উপস্থাপন করেন। লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে বিভিন্ন রচনাবলি, মুহাম্মদ এনামুল হক রচনাবলি, বঙ্কিম রচনাবলি, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ রচনাবলি, রমেশশীল রচনাবলি, রবীন্দ্র রচনাবলি, নজরুল রচনাবলি, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনাসংগ্রহ ইত্যাদি। স্যারের সংগ্রহে আছে জাতীয় চরিতাবিধান, যেটিতে ভারতবর্ষের বিভিন্ন মনীষীর জীবন চরিত উল্লেখ আছে। বিজ্ঞান জাতীয়, শিক্ষাবিষয়ক, সোভিয়েত সাহিত্য, বিভিন্ন দেশের ভাষা শিক্ষার বই।
প্রাচীন পত্রিকার মধ্যে পাওয়া গেল পঞ্চাশের দশকের সাপ্তাহিক কোহিনুরের বাঁধাই করা অনেক সংখ্যা। আরব্য রজনীর গল্প, নবারুণ শিশু সাহিত্য পত্রিকার শ্রাবণ ১৩৮৮ (১৯৮১)। থিসিস ভাষা পরিকল্পনার স্বরূপ, ডা. লুৎফর রহমান রচনাবলি, গবেষণা কক্ষে গিয়ে পাওয়া যায় স্যারের দুষ্প্রাপ্য ও দুর্লভ সংগ্রহের বিশাল ভাণ্ডার। সেখানে রয়েছে মাহবুব স্যারের ব্যক্তিগত পত্র সংরক্ষণ, ভাষা ব্যাকরণবিষয়ক বই, নিজের লেখা বই (সংরক্ষিত কপি) সাহিত্যতত্ত্ব, অভিধান, (কয়েকটি ভাষার প্রচুর অভিধান সে সংগ্রহে আছে)। স্যার জানালেন, বিভিন্ন ভাষার অভিধান সংগ্রহ তার নেশা। বইয়ের সঙ্গে সখ্যতা গড়তে গিয়ে অভিধান সংগ্রহের নেশা তাকে পেয়ে বসে। তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উপহার হিসেবে নিজের অনেক বই দিয়েছেন। নজরুল তারিখ অভিধান তার লাইব্রেরিতে স্মৃতিকথামূলক বইয়ের সংগ্রহ প্রচুর। চিঠিপত্র যোগাযোগের ফাইলগুলোতে সংরক্ষিত আছে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের চিঠিপত্রগুলো। এই চিঠিগুলোতেই পাওয়া যাবে গবেষক ড. মাহবুবুল হকের সঙ্গে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিদগ্ধ মহলের পত্র যোগাযোগের ঐতিহাসিক তথ্য ও স্মৃতি। যেখান থেকে আমরা সাহিত্যবিষয়ক অনেক নির্যাস খুঁজে নিতে পারি। সেখানে আরো আছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নথি, প্রকাশকদের ফাইল, বই প্রদান তালিকা, বানান ও সম্পাদনা, ফাইল। এক জায়গায় আছে বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষকদের গ্রন্থ। সংগ্রহ যেমন- যেখানে আনিসুজ্জামান, আলাউদ্দিন আল আজাদ, মুনীর চৌধুরী, সুকুমার সেন, সুখময় মুখোপাধ্যায়, ক্ষেত্রগুপ্ত, হাসান হাফিজুর রহমান, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সুপ্রকাশ রায়, অহধিৎ উরষ ্ অভরধ উরষ প্রমুখের প্রবন্ধগ্রন্থ।
বই সংগ্রহ ও বই পাঠের নেশা কীভাবে হলো এ প্রশ্নের উত্তরে ড. মাহবুবুল হক জানালেন, কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় থেকে বৃত্তির টাকা দিয়ে বই সংগ্রহ করে পড়তেন। তখন চট্টগ্রামের ৪৬টি প্রাইমারি স্কুলের মধ্যে তিনি প্রথম হয়েছিলেন। ওই বৃত্তির টাকা দিয়ে ৬ আনা ৮ আনা দামে দেব সাহিত্য কুটিরের কলকাতার ডিটেকটিভ শিশুতোষ উপন্যাস সংগ্রহ করতেন। রোমাঞ্চকর সিরিজের বইগুলোর মধ্যে ছিল : দস্যু মোহন সিরিজ, দস্যু বাহারাম সিরিজ। এসএসসি পরীক্ষার পর তিনি শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র পুরো পড়ে শেষ করেন। নজরুল, সুকান্ত ও রবীন্দ্রনাথের বইও প্রায় পড়া শেষ হয়ে যায়।
বর্তমানে ১০৫ ‘অন্তরা’ যে বিল্ডিংয়ে তিনি থাকেন এটির ঠিকানা আগে ৬৬ বাগঘোনা ছিল। মূলত ১৯৫৮ থেকেই এই সংগ্রহশালা শুরু হয়। রেলওয়ে চাকুরে বাবা কো-অপারেটিভ ক্রেডিট সোসাইটির লোন নিয়ে তখনকার মাত্র ১ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে ৫ গন্ডার এই জায়গাটি ক্রয় করেন, যেটির উপর আজকের এই বিশাল সংগ্রহশালা গড়ে উঠেছে। তাই তিনি তার বাবার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি জানান ১৯৭১-এ পাকিস্তানি হানাদারদের আক্রমণের মুখে এই বাড়ি পরিত্যক্ত হয়। এই সময় উইপোকার আক্রমণে বেশ কিছু বই নষ্ট হয়ে যায়। তার ৬৫ বছরের সংগ্রহশালা থেকে অভিধান, বিশ্বকোষ, সাময়িক পত্র দিয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থগারকে। বিগত ২ বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বই উপহার দেয়া শুরু করেছেন। কুমিল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (সিসিএন), চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশালের জাতীয় করি কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহীতে ড. মাহবুবুল রহমান পরিচালিত আর্কাইভ ও লাইব্রেরিতে অধিকাংশ বই উপহার হিসেবে প্রদান করেছেন তিনি। এছাড়া এনায়েত বাজার মহিলা কলেজ, ঢাকা বন্ধন পাঠাগারে কিছু বই উপহার হিসেবে দেয়া হয়েছে। স্যার আরো জানালেন বইঘরের পর নিউজফ্রন্ট ও তার প্রতিষ্ঠিত বই বিপণি ‘কথাকলি’ ছিল চট্টগ্রামের অভিজাত বইয়ের দোকান। ১৯৮১ সালে সৃজনশীল বই বিপণি হিসেবে ‘কথাকলি’ স্থাপন করা হয়। চন্দনপুরায় যৌথ মালিকানায় ‘বর্ণরেখা’ নামে প্রেসের ব্যবসা শুরু হয়। তখন তিনি পাশাপাশি রাঙ্গুনিয়া কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেছিলন। তখন দেশে সামরিক স্বৈরাচার সরকার ক্ষমতায় থাকায় দেশের সাহিত্য সাংস্কৃতি জগতে এক ধরনের বন্ধ্যত্ব বিরাজ করছিল। তিনি ভাবলেন গণতান্ত্রিক প্রগতিমনা মানব দরদি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য এই ধরনের একটি বই বিপণি গঠন করা দরকার। সেই সময় ‘কথাকলি’ উদ্বোধনের জন্য ঢাকা থেকে ছুটে এসেছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল। স্যারের সংগ্রহশালা ঘুরতে ঘুরতে স্মৃতিতাড়িত হয়ে ড. মাহবুবুল হক এসব তথ্য জানালেন। সময় গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতেই ভেতরের রুম থেকে সালেহা ভাবি আমাদের জন্য চা-নাশতার ব্যবস্থা করলেন।
স্যারের কাছে প্রশ্ন ছিল এই বিশাল লাইব্রেরির সংরক্ষণে যে যতœ এবং আন্তরিকতা দরকার সেটা কীভাবে হচ্ছে। তিনি জানালেন, তার স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষিকা সালেহা বেগমের নিরন্তর পরিশ্রমে ও একাগ্র আন্তরিকতায় এই সংগ্রহশালার বইগুলো পরম যতেœ আছে। তিনি মায়ের মমতায় এই বইগুলোকে আগলিয়ে রেখেছেন। তিনি তার গবেষণা কাজের সহযোগী কম্পিউটার অপারেটর মো. দেলোয়ার হোসেনের কথাও উল্লেখ করলেন।
ড. মাহবুবুল হকের এই বিশাল সংগ্রহশালার অন্যতম সংরক্ষক সালেহা বেগমের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্মৃতিকাতর হয়ে বলেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মাহবুব ঘর ছেড়ে যুদ্ধে চলে যায়। আমার শাশুড়ি বইগুলো ট্রাংকে ভরে বুকে আগলিয়ে রেখে বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখতেন, যাতে শত্রæরা মাহবুবের সন্ধানে এসে সেগুলো পুড়িয়ে না ফেলে।
সালেহা বেগমও রাজনীতি, শিল্প-সংস্কৃতির পরিবার থেকে উঠে এসেছেন মাহবুবুল হকের পরিবারে। তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে বিয়ের পর এ বাড়িতে এসে দেখলাম বাংলো স্টাইলে লম্বা পড়ার রুমে সারি সারি বইয়ের শেলফ। আমি একদিন বইগুলো বের করে ঝাড়তে গিয়ে দেখি অনেক মূল্যবান বই উইপোকায় ধরে ফেলেছে। তখন থেকে বইকে ছারপোকা মুক্ত রাখার দায়িত্ব নিজের হাতে নেই। মাহবুব ডিজাইন করে বইয়ের মাপ দিয়ে শেলফগুলো বানিয়ে নিত। মাহবুব বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে গেলে সেখান থেকে অনেক বই নিয়ে আসতেন। সেগুলো আমি সাজিয়ে রাখতাম, ঘরভর্তি খবরের কাগজ ও বই বাথরুম পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। ড্রয়িংরুম, বেডরুমের বইগুলো সব আমি মাঝে মাঝে কর্পুর দিয়ে রাখতাম। আমাদের ছেলেমেয়েদেরও বই পাঠে প্রচণ্ড উৎসাহ ছিল। অনেক বই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছে। এলাকার স্থানীয় একজন লোক সালাম মাঝে মাঝে এসে এই বইগুলো পরিচ্ছন্নতার কাজ করত। ড্রয়িংরুমে বই ছাড়া অন্য কিছু ছিল না বলে আমি কখনো মন খারাপ করিনি। ছেলেমেয়েরা সানন্দে এসব গ্রহণ করেছে। বরং বইয়ের কারণে ড্রয়িং রুম আরো বেশি শোভাবর্ধন করেছে বলে আমার মনে হয়। কাঠের শেলফগুলো ঘুণে ধরা ছিল, আমি সেগুলো স্প্রে করে রাখি। কর্পুর দিয়ে বইয়ের ভেতর দিই, যাতে তেলাপোকায় নষ্ট না হয়। দেশের বাইরে যখন যেতাম তখন মাহবুব শুধু সেখানকার প্রাচীন লাইব্রেরির খবর নিতেন। বইয়ের প্রতি তার এত মমতা ছিল বই বিলি করে দেবেন এটা কখনো ভাবেননি। কিন্তু বর্তমান সময়ে তিনি অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় মানুষের কাজে লাগবে এই ভেবে তিনি তার সংগ্রহশালার কিছু বই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গ্রন্থগারে দিয়ে দিয়েছেন।
ড. মাহবুবুল হকের এই বিশাল দুর্লভ সংগ্রহশালায় সুবিন্যস্তভাবে রয়েছে বাঙালি জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য, সৃজনশীল সাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধের নানা অনুসঙ্গসহ বিশ্বসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য উপাদান। এই সংগ্রহশালায় তিনি নিজেই যেমন আলোকিত হয়েছেন, তেমনি অন্যদেরও জ্ঞান বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। এই সংগ্রহশালার বই অনেক গবেষকের কাজে লেখেছে। অনেকের মননচর্চার সহায়ক হয়েছে এসব বই। তিনি আশা করেন, তার অবর্তমানে রেখে যাওয়া যোগ্য উত্তরসূরিও সংগ্রহশালার যথাযথ সংরক্ষণ করে জ্ঞান বিস্তারে আগামী প্রজন্মকে সহায়তা করবে।
