বাংলার সংস্কৃতিতে মজলেন ম্যাক্রোঁ : রাহুলের ‘ভাঙাবাড়ি’তে গানের আড্ডা, উপভোগ করেন নৌভ্রমণ ও নৌকাবাইচ
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাগজ প্রতিবেদক : কখনো ‘আমি বাংলায় গান গাই’, কখনো ‘নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা, কোন দূরে যাও চইলা’- এমন সব গানে রবিবার মাঝরাতে মুখর হয়ে উঠেছিল ‘ভাঙাবাড়ি’। যাকে কেন্দ্র করে এ আয়োজন তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। বাংলা না বুঝলেও যে কোনো দেশের স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি রয়েছে তার তুমুল আগ্রহ। সেই আগ্রহ থেকেই সঙ্গীতশিল্পী রাহুল আনন্দ ও চিত্রশিল্পী ঊর্মিলা শুক্লা দম্পতির ‘ভাঙাবাড়ি’র স্টুডিওতে অতিথি হয়েছিলেন ম্যাক্রোঁ। দেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘জলের গান’। শেকড়ের গানে সব সময়ই সরব এ দলটি। এ দলের প্রধান সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও বাদ্যযন্ত্রী রাহুল আনন্দ। ঢাকার ধানমন্ডিতে ভাড়া থাকেন। পুরনো এ ভাড়া বাড়িটিকে রাহুল ভালোবেসে নাম দিয়েছেন ‘ভাঙাবাড়ি’। সেই ভাঙাবাড়িতে যেন বসেছিল চাঁদের হাট। গত রবিবার রাত পৌনে ১২টার দিকে রাহুল আনন্দের বাসায় হাজির হন ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এতটাই বাংলার লোক-ঐতিহ্যের আবহে ডুবে ছিলেন- সূচি অনুযায়ী রাহুল আনন্দের স্টুডিওতে ৪০ মিনিটের মতো অবস্থানের কথা ছিল তার; তবে সেটা বাড়তে বাড়তে ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটে গিয়ে থেমেছে। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ফরাসি প্রেসিডেন্টের সম্মানে আয়োজিত ভোজসভা শেষে রাহুলের স্টুডিওতে গিয়েছিলেন ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। রাহুলের স্টুডিওতে বসে গান শুনেছেন ম্যাক্রোঁ, বাংলাদেশের সংস্কৃতি প্রসঙ্গে জেনেছেন। সেই সঙ্গে উপহার দিয়েছেন ও পেয়েছেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের জন্য বাসার ফটকের সামনের অংশ ফুল দিয়ে সাজিয়েছেন রাহুল-শর্মিলা। এতে ছিল গোলাপ ও গাদা। ফুলের সাজসজ্জা দেখে বিমোহিত হয়েছেন বিশিষ্ট অতিথি। একই সঙ্গে রাহুলের সংগ্রহে থাকা বাদ্যযন্ত্রের ভাণ্ডার দেখেও মুগ্ধ হয়েছেন তিনি। এর কারণও আছে। রাহুলের ‘ভাঙাবাড়ি’ যেন রীতিমতো বাদ্যযন্ত্রের জাদুঘর। কী নেই সেখানে! দ্রৌপদী, পাগলা, পদ্মা, মনদোলা, তোতাবান, চন্দ্রবান- বাহারি সব নামে দেয়ালজুড়ে থরে থরে সাজানো রয়েছে বাদ্যযন্ত্র।
ফকির লালন সাঁইয়ের ‘আর কি বসবো এমন সাধুর সাধবাজারে/না জানি কোন সময় কোন দশা ঘটে আমারে’ গানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আসর। এরপর রাহুল পরিবেশন করেন প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের ‘আমি বাংলায় গান গাই’।
গান পরিবেশন শেষে রাহুল আনন্দ বলেন, ‘মহামান্য প্রেসিডেন্ট, আপনার এই আগমন আমাদের দেশের জন্য, আমার পরিবার ও বন্ধুদের জন্য বিরাট আনন্দের।’ রাহুল আনন্দ যে একতারা বাজিয়ে গান গেয়েছেন সেটি উপহার দেন ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে। তিনি সেটি হাতে পেয়ে বাজানোর চেষ্টা করেন।
মরমী শিল্পী আব্দুল আলীমের ‘নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইলা’ গানটি গাইতে গাইতে রাহুল তাকে দেখিয়ে দেন কীভাবে বাজাতে হবে। তারপর দুজন এক সঙ্গে একতারা বাজাতে থাকেন। রাহুল বলেন, এ পরিবেশনাকে বলতে পারেন বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের দুই সংগীতশিল্পীর সম্মিলন! প্রেসিডেন্ট হলেও আপনি দারুণ সংগীতশিল্পী। আশা করি, এই উপহার (একতারা) আপনার কাছে বাংলাদেশকে মনে করিয়ে দেবে। এটি প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি করা। এটাই আমার স্টাইল।’ এসব বলতে বলতে নিজের স্টুডিওর অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র দেখাতে থাকেন প্রেসিডেন্টকে। ফরাসি প্রেসিডেন্টের তরফ থেকে একটি কলম উপহার পেয়েছেন রাহুল।
রাহুল আনন্দ বলেন, তিনি বলেছেন, আমি যেন এ কলম দিয়ে গান, কবিতায় প্রকৃতির কথা লিখি, সেই গান, কবিতা তিনি শুনবেন। আমি ছোট মানুষ, আমার সাধ্যের মধ্যে তাকে সুখী করার চেষ্টা করেছি।
গান-আড্ডার মাঝে ব্ল্যাক কফি খেয়েছেন এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। এর বাইরে আর কোনো খাবার খাননি তিনি। আড্ডার একপর্যায়ে রাহুলকে ফরাসি প্রেসিডেন্ট জিজ্ঞাসা করেন, তোমার স্বপ্ন কী? রাহুল আনন্দ বলেন, ‘সবুজ পৃথিবী দেখতে চাই।’ এরপর ম্যাক্রোঁ জানতে চান, ‘সে ক্ষেত্রে তোমার ভূমিকা কী?’ রাহুল আনন্দ বলেন, ‘আমি যেখানেই গান করি, সেখানেই গাছ লাগানো, নদী-প্রকৃতির যতœ নেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করি। ১৯৯৪ সাল থেকে ফাঁকা জায়গায় আমি গাছ লাগাই, কিছুদিন আগে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তেও গাছ লাগিয়েছি।’ রাহুল আরো বলেন, ‘আমি বাদ্যযন্ত্র বানাতে ভালোবাসি। বাদ্যযন্ত্র বানাতে কাঠ লাগে, কাঠের জন্য গাছ দরকার। আর আমি নিজেকে পাখি মনে করি। পাখির জন্য গাছ অপরিহার্য। আমি গাছ না লাগালে পরবর্তী সময় যন্ত্র বানানোর জন্য গাছ কোথায় পাব? পাখিরা কোথায় থাকবে?’
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ একজন সংগীত-অনুরাগী। তিনি নিজেও শখের বশে গান করেন। এ বছর এপ্রিলে প্যারিসের রাস্তায় গান গাইতে দেখা গেছে তাকে, পরে সেই ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি একজন পিয়ানিস্টও।
১৯ ঘণ্টার সফরের দ্বিতীয় দিনে গতকাল সোমবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ধানমন্ডির ৩২ নম্বর জাদুঘরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানান। সেখানে পৌঁছালে তাকে স্বাগত জানান জাতির পিতার ছোট মেয়ে শেখ রেহানা ও তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববিসহ বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের কর্মকর্তারা। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানোর পর জাদুঘর পরিদর্শন করেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। কিছুটা সময় হেঁটেছেন ধানমন্ডি লেকেও। এ সময় পরিদর্শন বইতে স্বাক্ষর করেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠকের পর তুরাগ নদে নৌকা ভ্রমণে যান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট। এটি একটি অনির্ধারিত নৌভ্রমণ ছিল।
নৌভ্রমণের জন্য যে জাহাজটি ব্যবহার করা হয় সেটি ফ্রেন্ডশিপ এনজিওর।
নৌকায় চড়ে রাজধানীর উপকণ্ঠের তুরাগ নদ ঘুরে দেখেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। গতকাল সোমবার দুপুরে নৌকাভ্রমণে তার সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত সাবের হোসেন চৌধুরী, তথ্য ও স¤প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ফ্রেন্ডশিপের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক রুনা খান, ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিসের নির্বাহী সমন্বয়কারী সোহানুর রহমান প্রমুখ। বৃষ্টির মধ্যেই আমিনবাজার এলাকায় তুরাগ নদ ঘুরে ঘুরে দেখেন এবং নৌকা বাইচও উপভোগ করেন ম্যাক্রোঁ। এ সময় রাস্তার পাশের এক বিক্রেতা তাকে সিঙাড়া-সমুচা-জিলাপি খাওয়ার অনুরোধ করেন।
রাষ্ট্রীয় সফরের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে সোমবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে দুপুর ২টা ৪৮ মিনেটে বিশেষ ফ্লাইটে প্যারিসের উদ্দেশে রওনা হন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
