×

সম্পাদকীয় ও মুক্তচিন্তা

মৃতের চিৎকার : তারুণ্যের অভিনব প্রতিবাদ

Icon

প্রকাশ: ০৭ মে ২০২৩, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

মৃতের চিৎকার : তারুণ্যের অভিনব প্রতিবাদ
ঈশ্বরের আশীর্বাদ হয়ে আমাদের নদী আসে কখনো শীতল জলধারা প্লাবনে কখনো ভাসে নদী আমাদের পলি দেয় শস্যে ভরে দেয় মাঠ কখনো বা পারাপারে পূর্ণ করে তোলে খেয়া ঘাট, প্রকৃতির শোভন সবুজ মায়া নদী ধরে রাখে নদীর আনন্দে পক্ষীকুল নাচে ডাকে শাখে শাখে আমাদের শৌর্য-বীর্যের স্মৃতিকে নদী নিয়ে যায় নানা ঘাটে স্বার্থান্ধতায় নদীকে তবু টেনে নিয়ে যাই শূন্যের তল্লাটে। নদী যদি হয় বেআব্রু ধর্ষকামীর লালসায় অভিমানে আর নৈঃশব্দ্যে নদীরা দ্রুত মরে যায়। (আত্মঘাতী নদীকূল \ ফরিদ আহমদ দুলাল) অভিমানী নদীর হয়ে কোন কোন আয়োজনের পক্ষে কথা বলাটা দায় মনে করি এবং আমার বিশ্বাস, এ ধরনের আয়োজনের পক্ষে কথা বলার এবং সঙ্গে থাকার দায় সমাজের সচেতন দশজনেরও। যে আয়োজনের কথা বলছি, সে আয়োজনের একদিন আগেও আমি বিষয়টি সম্পর্কে কিছু অবগত ছিলাম না, আমাকে কেউ কোথাও আমন্ত্রণও করেননি- কথাও বলেননি; তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে কারো কারো পোস্টে আয়োজনের পক্ষে প্রচারণা দেখেছি, সে অর্থে ‘আম’ আমন্ত্রণও পেয়েছি; কিন্তু সেসব পোস্ট পড়ে বিস্তারিত জানতে পারিনি, নিজের মতো করে কিছুটা ধারণা করে নিয়েছি এবং বিষয়টিতে আগ্রহও জন্ম নিয়েছে। না, বিষয়টিকে আমার সুচিন্তিত গোছানো উদ্যোগ মনে হয়নি; তবে তারুণ্যের উদ্যোগকে মান্যতা দিতে মনে কোনো দ্বিধারও জন্ম হয়নি। আয়োজনটি ছিল ৫ মে সকাল সাড়ে ১০টায় ব্রহ্মপুত্রের হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে গান-কবিতা পাঠ-প্রতিবাদ এবং চিৎকার-চেঁচামেচি। তারুণ্যের এই অভিনব প্রতিবাদের ভাষায় মনে মনে খুশিই হয়েছি। কিন্তু আমার পক্ষে বেশিক্ষণ হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে কর্মসূচিতে যুক্ত থাকা সম্ভব নয়, অন্যদিকে অনুষ্ঠানে গিয়ে নদীতীরে চেয়ারে বসে থেকে নিজের সীমাবদ্ধতা এবং তারুণ্য-সংকটের কথা জানান দিতেও রাজি নই বলে নিজেকে সযতেœ দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। শুক্রবার সকাল থেকেই দৃষ্টি রাখছিলাম ফেসবুকে। আমার বিশ্বাস ছিল, আজকের এই প্রযুক্তিনির্ভর সময়ে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করবে। ‘মৃতের চিৎকার’ শোনা বা চাক্ষুষ করার আগেই একজনের একটা স্ট্যাটাস দৃষ্টিতে এলো; যেখানে তিনি লিখেছেন- ‘রহস্য!!!!!! কার আয়োজনে? ব্যক্তি না সংগঠন??? আয়োজকের নাম নেই। ব্যক্তির নাম-ছবি সাঁটিয়ে পোস্টার বানিয়ে প্রচারের জন্য মেসেঞ্জারে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। জনে জনে নাম, ছবি দিয়ে দিয়ে আহ্বান। জানা গেল যার নাম-ছবি দিয়ে প্রচারণা, তিনিই জানেন না এ আয়োজনের বিস্তারিত। লুকিয়ে ঘাপটি মেরে থেকে কোন সংগঠন আজ সকাল সাড়ে ১০টায় নিজের নামের সাফল্য প্রচার করবে এমন অকৌশলে?????????????????’। যিনি এ পোস্টটি দিয়েছেন, তার নাম উচ্চারণ করতে চাই না; কেন চাই না, সেটা পরে পরিষ্কার করতে চেষ্টা করব। তার আগে আসুন জেনে নিই, ‘মৃতের চিৎকার’ আয়োজনের আদ্যোপান্ত। ফেসবুকে ‘লাইভ’ দেখে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদ পরিবেশনা শুনে যতটা আমি বুঝতে পেরেছি, তার প্রেক্ষিতেই আমার কথা। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ জলপ্রবাহ ব্রহ্মপুত্র নদ, দীর্ঘ অসুস্থতায় অনাব্য হয়ে পড়েছে, ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ও আন্দোলনের মুখে সরকার ইতোমধ্যেই ব্রহ্মপুত্র খনন কাজ শুরু করেছে। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যে কাজ শেষ হতে চলল, তার ফল কী হলো? মানুষ দেখল জল-বালুর উড়াল, একদিকের বালু সরিয়ে অন্যদিক ভরাট হলো; জলপ্রবাহ সামান্য বাড়ল কি? এক ফোঁটাও বাড়েনি। বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৮ সাল থেকে ৪ বছরে এ পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদি প্রকল্পের ১০ শতাংশের কিছু বেশি কাজ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ এবং বরাদ্দ যদি বৃদ্ধি করা হয় তা হলে আশা করা যায় আগামীতে আরো যতœ ও গুরুত্বের সঙ্গে খনন কাজটি করা যাবে। যারা ৪ বছরে ১০ শতাংশ কাজও করতে পারেনি, তাদের ওপর কতটা ভরসা করা যায়? এমন প্রেক্ষাপটে বিক্ষুব্ধ তারুণ্য ‘মৃতের চিৎকার’ শিরোনামে একটি অভিনব প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছে। না, ওখানে কোনো আয়োজক ব্যক্তির নাম উচ্চারিত হয়নি, কোনো সংগঠনের নামও বলা হয়নি, এমনকি ‘স্বাগত ভাষণ’ দিয়ে কেউ বিরক্তির উদ্রেকও করেননি; কিন্তু যুক্ত ছিলেন ময়মনসিংহের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ। তারা কবিতা পড়ে, গান গেয়ে নাব্য ব্রহ্মপুত্র ফিরে পাওয়ার দাবি করেছেন। প্রতীকী জলসিঞ্চনে নিজেদের শুদ্ধ করতে চেয়েছেন, ব্রহ্মপুত্রকে বাঁচাবার আন্দোলনে নিজেদের ব্রতী করতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছেন এবং সর্বোপরি আমাদের বুকে তারুণ্যের শক্তি সম্পর্কে আশাবাদ জাগিয়ে দিয়েছেন; তাদের এ উদ্যোগকে কি খাটো করে দেখা যায়? যে ব্রহ্মপুত্রে আমরা দেখতাম বড় বড় পাটের নৌকা, নারিকেলের নৌকা, ধানবোঝাই নৌকা, স্টিমার-ট্রলার ছুটে যেত, মাঝিরা পাল উড়িয়ে দিয়ে গান ধরত, জেলেরা ঝাঁকা ভরে ভরে মাছ ধরত; বর্ষায় যে ব্রহ্মপুত্রে দেখতাম শুশুকেরা ডুবসাঁতার কাটছে; আজকের তরুণরা সেই ব্রহ্মপুত্র দেখেননি, কিন্তু তারা ব্রহ্মপুত্রের সে রূপ দেখতে আগ্রহী; তাদের এ আগ্রহের প্রতি সম্মান-সংহতি জানাতে সর্বস্তরের মানুষের কি সামান্য দায় নেই? আমি আমার দায়বদ্ধতা থেকেই ‘মৃতের চিৎকার’ কর্মসূচির প্রতি সংহতি প্রকাশের জন্য এবং এ দাবির সঙ্গে দেশের সচেতন মানুষকে সংযুক্ত থাকার আবেদন জানাতে, পাশাপাশি যারা এমন একটি দাবির বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে তাদের প্রত্যাখ্যান করার দাবিতে লিখতে বসেছি। দুর্বৃত্তের বিরোধিতা যদি কোনো ব্যক্তি বিশেষের বিচ্ছিন্ন দাবি হতো, তা হলে হয়তো পাশ কেটে যেতে পারতাম। কিন্তু কোনো সংঘবদ্ধ চক্র যদি নিজেদের সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সমাজ-সংস্কৃতির কর্মী পরিচয় দিয়ে দুরভিসন্ধিমূলক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে, আর ধান্দাবাজির দোকান খুলতে চায়; তা হলে সমাজ-সভ্যতার স্বার্থে তাদের প্রতিহত করা নিশ্চয়ই প্রতিটি দেশপ্রেমী মানুষের দায়িত্ব বলেই আমি মনে করি। ব্রহ্মপুত্রের হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে আজকের তারুণ্য যে ‘মৃতের চিৎকার’ করল, যে প্রতিবাদ জানাল; আসুন আমরা সেই চিৎকার-প্রতিবাদকে সারাদেশে ছড়িয়ে দিই। আমাদের যত নদ-নদী পরিবেশ দূষণ-বর্জ্য দূষণের শিকার, আমাদের যত নদী ভূমিদস্যুদের আগ্রাসনের শিকার, যারা প্রগতির মুখোশ পরে অগ্রযাত্রার বিপক্ষে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাদের অসৎ-দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে ভূমিকা রাখি! আসুন মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত থেকে ষড়যন্ত্রকারীদের জানিয়ে দিই, এই দেশ আমরা যুদ্ধ করে অর্জন করেছি, কারো অনুকম্পায় পাইনি! বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা আর জাতীয় সংগীতের জন্য ৩০ লাখ মানুষ বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে! দুই লক্ষাধিক মা-বোন তাদের সম্ভ্রম দিয়েছে! এই দেশের অগ্রযাত্রায় যারাই বাধা হয়ে দাঁড়াবে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার শক্তি বাঙালি রাখে! আসুন সমস্বরে বলি- আমরা আমাদের ১৩০০ নদী ফিরে পেতে চাই, যেন তারা থৈ থৈ জলে দুকূল প্লাবিত করে প্রতি বছর আমাদের জন্য বয়ে আনে উর্বর পলি, যেন তারা আমাদের পণ্য পৌঁছে দেয় ঘাট থেকে ঘাটে- বন্দর থেকে বন্দরে। তারুণ্যের আবাহনে ডাকা ‘মৃতের চিৎকার’ ছড়িয়ে যাক বাংলার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে! তারুণ্যের চিৎকারে ভেসে যাক দুর্বৃত্ত তথাকথিত সুশীলরা। ফরিদ আহমদ দুলাল : কবি, প্রাবন্ধিক ও নাট্যকার। swatantro@yahoo.com

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

জুম্মার দিন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সাইরেনের শব্দ

জুম্মার দিন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সাইরেনের শব্দ

খড় পোড়ানোর আগুনে ২০ বিঘা জমির গম পুড়ে ছাই

খড় পোড়ানোর আগুনে ২০ বিঘা জমির গম পুড়ে ছাই

পেট্রোল পাম্পে পুলিশ সদস্যের উপর হামলা

পেট্রোল পাম্পে পুলিশ সদস্যের উপর হামলা

কোটি টাকার মালামালসহ ডাকাত দলের ৮ সদস্য গ্রেপ্তার

কোটি টাকার মালামালসহ ডাকাত দলের ৮ সদস্য গ্রেপ্তার

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App