নজরুল-কাব্যে প্রকৃতি
প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বিদ্রোহী ছিলেন একথা সর্বত্র শোনা যায়, কিন্তু নজরুল ইসলাম প্রকৃতির কবি ছিলেন সাহিত্যের আলোচকদের মুখেও খুব একটা শোনা যায় না। স্বাভাবিকভাবেই মনে হয় প্রকৃতির স্নিগ্ধ সৌম্য রূপের সঙ্গে বিদ্রোহীর কোথাও যেন বিরোধ রয়েছে। বিদ্রোহ মানেই অতিক্রম করার আকাক্সক্ষা, বিরাজমান সীমাবদ্ধতার সূত্রকে ছিন্ন করতে চাওয়া। প্রকৃতি প্রেমিকের স্থিত সমাহিত আত্মার সঙ্গে তার যেন মেলে না। বিদ্রোহী ও প্রকৃতির কবি এই দুটি অভিধা তাই একই সঙ্গে প্রায়ই প্রযুক্ত হয় না। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ্য করলে এ দুটির কোথায় যেন ঐক্য মেলে। বাংলা কবিতার ক্ষেত্রেও আমরা তেমনটি দেখতে পাই। আমরা অনেকেই ভুলে যায় যে, জীবনানন্দ দাশের কবি-প্রকৃতির ধরনও ছিল বিদ্রোহজাত। এমনকি যে অর্থে নজরুল, শুরুতে জীবনানন্দ দাশও ছিলেন সেই অর্থে উচ্চকণ্ঠ। নানা পথ ও বাঁক অতিক্রম করে ‘রূপসী বাংলার কবিও একটি অধিকতর শ্রেয় সমাজের পক্ষে কবিতা লিখেছেন। তিমির হননের কবিতা রচনা করেছেন। জীবনানন্দের ধরনীর নিবিড় মমতার সঙ্গে তার বিদ্রোহী সত্তার তেমন কোনো বিরোধ হয়নি।
নজরুল ইসলাম তৎকালীন ঔপনিবেশিক শাসনের নিগূঢ় থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন। মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন সামাজিক ও মানসিক সীমাবদ্ধতা থেকে। ভেঙে ফেলতে চেয়েছিলেন কালচালিত অচলায়তন। নজরুলের এসব বিদ্রোহের অন্তরালে প্রবাহিত ছিল প্রকৃতি প্রেম এবং মানব প্রেমের ফল্গুধারা। ইংরেজ রোমান্টিক কবিদের সঙ্গে বিশেষ করে শেলি, বায়রণের সঙ্গে তাঁর একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায়। রোমান্টিক কবির মানস বিকাশ এবং প্রকাশ যখন বাধাগ্রস্ত হয় তখন তিনি হয়ে ওঠেন বিক্ষুব্ধ। নজরুল ইসলাম মূলত প্রেম প্রকৃতির কবি, পরিণামে রোমান্টিক তথা বিদ্রোহী। নজরুল মানসে ইংরেজ রোমান্টিক কবিদের ধরন ধারণের প্রজ্বল উপস্থিতি ছিল। শেলির সর্বপ্লাবী বিপুল গতিবেগ ও শাশ্বত বিস্ময়বোধ, কীটসের সূ² সুকুমার ইন্দ্রিয়ানুভূতি আর ওয়ার্ডসওয়াথের প্রকৃতি সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মবোধ নজরুলের অস্থির মানসিকতার মধ্যেও অভাব ছিল না।
নজরুলের হৃদয়-বেদনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে মিশেছিল প্রকৃতি, বিশেষ করে আবহমান বাংলার প্রকৃতি। প্রকৃতির প্রতীক দিয়েই তিনি তার নিজের এবং মানব মনের চিরন্তন আকুতিকে রূপ দিয়েছেন। মানুষ প্রকৃতির সন্তান, প্রকৃতির অসীম মমতায় গড়ে উঠেছে মানুষের জীবন। মানুষের সুখ-দুঃখ হাসি কান্না বিরহ বেদনার সুর আবহমানকালের সময় তরঙ্গ অতিক্রম করে প্রকৃতির শরীরে প্রবাহিত হচ্ছে। পৃথিবীতে মানুষ আসার আগেই প্রকৃতি মানুষের বসবাস উপযোগী হয়ে নিজেকে তৈরি করেছিল। সৃষ্টির প্রথম প্রভাতে মানবসন্তান যখন চোখ মেলে তখন থেকে প্রকৃতির তার নিত্য সঙ্গী হয়ে ওঠে। প্রকৃতির মমত্বে মানুষ বেড়ে ওঠে। প্রকৃতি রুদ্র হলে মানুষের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই মানুষ আপন সত্তার মতো প্রকৃতিকে জেনেছে। প্রকৃতিকে দেখেছে। সমান্তরাল সত্তা হিসেবে। কবিরা প্রকৃতিতে মানবত্ব আরোপ করেছেন, প্রকৃতিকে করে তুলেছেন মানবীয় অনুভূতিশীল।
‘অগ্নি-বীণা’ এবং ‘দোলন-চাঁপা’ এ দুটি কাব্যগ্রন্থের কবিতা নজরুল ইসলাম প্রায় একই সময়ে রচনা করেন। ‘অগ্নি-বীণা’ কাব্যগ্রন্থে নজরুল যেখানে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুগের অগ্নিক্ষরা দিনের কবিতা রচনা করেছেন, সেখানে ‘দোলন-চাঁপা কাব্যগ্রন্থে কবি রচনা করছেন প্রেম ও প্রকৃতির শাশ্বত বাণী। বিশ্বাস করতেও অনেক সময়ে কষ্ট হয়, একই নজরুল ইসলামের এক হাতে বাঁশের বাশরি আর হাতে রণতূর্য। ‘দোলন চাঁপা’ কাব্যগ্রন্থ বাঁশরির তানে রচিত।
আবহমানকাল থেকে কবির কবিতার মাধ্যমে প্রকৃতির সঙ্গে তার যে অনুভূতির সম্পর্ক তা প্রকাশ করে আসছেন। দোলন চাঁপা কাব্যগ্রন্থে নজরুলের সেই প্রকাশ বাঙময় হয়েছে।
ধরণী দিয়েছে তার
গাঢ় বেদনার
রাঙা মাটিরাঙ্গা ধূসর আঁচলখানি
দিগন্তের কোলে কোলে টানি
পাখি উড়ে যায় যেন কোন্ মেঘ-লোক হ’তে
সন্ধ্যা-দীপ-জ্বালা গৃহ-পানে ঘর-ডাকা পথে।
আকাশের অস্ত-বাতায়নে
অনন্ত দিনের কোন বিরহিণী ক’নে
জ্বালাইয়া কনক-প্রদীপখানি
উদয়-পথের পানে যায় তার অশ্রæ-চোখ হানি।...
হেমন্তের এমনি সন্ধ্যায় যুগ যুগ ধরে বুঝি হারায়
উপুর হইয়া সেই স্তূপীকৃত বেদনার ভার
মুখ গুজে পড়ে থাকে; ব্যথা গন্ধ তার
গুমরিয়া গুমরিয়া কেঁদে কেঁদে যায়
এমনি নীরবে শান্ত এমন সন্ধ্যায়
ক্রমে নিশীথিনী আসে ছড়াইয়ান ধূলায় মলিন এলোচুল
সন্ধ্যা তারা নিভে যায়, হারায় দিবসের কূল।
(বেলাশেষে; দোলন-চাঁপা; নজরুল-রচনাবলি, ১ম খণ্ড, ১ম সংস্করণ, বা/এ, পৃ:-৫১)
উপযুক্ত উদ্ধার অংশে প্রকৃতিপ্রেমী জীবনানন্দের তুলনা খুঁজে পাওয়া যায়। ‘ঝরাপালক’ পর্যায়ে নজরুলের সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের বাচন ভঙ্গির সাযুজ্য তেমন ধর্তব্য নয়। পরবর্তীকালের রচনা থেকেও তাদের মানস এবং বাচন সাযুজ্য লক্ষ্য করা যায়। ধূসর পাণ্ডুলিপি থেকেই উদ্ধৃতি দেয়া যায় : ঘূপম ভুলা থেকে উদ্ধৃত দেয়া যায় :
যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝরে,
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের পরে শুয়ে রবে?
হেমন্তের ঝড়ে আমি ঝরিব যখন-
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের পরে শুয়ে রবে?...
আমার বুকের পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল
তুমি কি চেয়েছিলে শুধু তাই! শুধু তার স্বাদ
‘দোলন-চাঁপা’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশকালে নজরুল ছিলেন ঔপনিবেশিক কারাগারে। কবি-বন্ধু শ্রী পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায় এই গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছিলেন, সে আজ বন্দি। রাজার দেয়া লৌহ-নিগড়ে তার অন্তরের বিদ্রোহী-বীর কোন দেবতার আশীষ নির্মাল্য দেখতে পেল, তাই সাদরে বরণ করে নিল তাকে আপন বলে। তারপর একদিন যখন বাংলার যুবক আবার জলদমন্দ্রে বাধা-বন্ধহারা হয়ে স্বাধীনচিত্ত ভরে বাংলার চির শ্যামল চির অমলিন মাতৃমূর্তি উন্মাদ আনন্দে বক্ষে টেনে নেবে, সেই শুভ আরতিলগ্নে। ইমনকল্যাণ সুরে যে নহবতের রাগিনী বেজে উঠবে, তাতে হে কবি, তোমার প্রেমভৈরব-গাথা-তোমার অন্তর বহ্নি-ব্যথা সন্ধ্যা-রাগ রক্তে আপনি বেজে উঠবে; জননীর শ্যামলবক্ষে তোমার স্মৃতি ব্যথা ভরাতুর হয়ে সকল পূজার মাঝে বারে বারে তোমাকেই স্মরণ করিয়ে দেবে, হে কবি সে আজ নয়।
শ্রী পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়ের উপযুক্ত উদ্ধৃতির মধ্যে নজরুল মানসের প্রেম প্রকৃতি ও বিদ্রোহীর স্বরূপে ইঙ্গিত-সূত্র নিহিত রয়েছে।
চির শ্যামল বাংলা মায়ের রূপে আকুল কবি তার দেশমাতৃকার বন্দিনী রূপে ক্ষুব্ধ বিদ্রোহ। প্রেম ভৈরব গাথা কবির যে বহ্নি অন্তর দানব সরে গেলে আপনি বেজে উঠবে। নজরুলের রচনাতেই আমরা প্রথমে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাতন্ত্র্য ভূখণ্ডের উল্লেখ এবং তার রূপ প্রকৃতির যথার্থ বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করি। নজরুল লিখেছেন-
নমঃ নমঃ নমঃ বাঙলাদেশ মম
চির-মনোরম চির-মধুর...
হরিত অঞ্চল হেমন্তে দুলায়ে
ফেরে সে মাঠে মাঠে শিশির ভেজা পায়ে,
শীতের অলস বেলা পাতা ঝরার খেলা
ফাগুনে পরে সাজ ফুল বধূর\
এই দেশের মাটি জল ও ফুলে ফলে,
যে রস যে সুধা নাহি ভূমণ্ডলে,
এই মায়ের বুকে হেসে খেলে সুখে
ঘুমাব এই বুকে স্বপ্নাতুর \
রূপসী বাংলার প্রকৃতি ছিল ইতিহাস ও সময় চেতনার ভেতর দিয়ে পুরাণের যে বাংলা আমাদের মানসলোকে জাগরূক আছে তার। কিন্তু নজরুলে প্রকৃতি সমকালীন জীবন্ত ও নৈসর্গিক; স্পর্শযোগ্য ও দৃশ্যময়।
একি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী
ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবণী\
এছাড়া নজরুলের প্রকৃতির প্রধান বৈশিষ্ট্য- প্রকৃতির মধ্যে মানবিক গুণের আরোপ। প্রকৃতি কখনো মানবিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন উজ্জ্বল সত্তার উপস্থিতি নিয়ে হাজির হচ্ছে। আবার কখনো মানুষই হয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। অনেক সময়ে তার প্রকৃতি ও নারীকে আলাদা করে বোঝা যায় না। বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারির মতো প্রেম ও বৃক্ষ-প্রেমের কবিতা বাংলা কবিতায় বিরল। তার বৃক্ষ কখনো হয়ে ওঠে নারী-বৃক্ষ। যার সঙ্গে কবির সুখ দুঃখের ব্যথা বেদনার অংশীদারিত্ব শুরু হয়। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কবির মনেরও পরিবর্তন ঘটে। কবি কেবল প্রকৃতির মধ্যে মানবীয় গুণ অর্পণই করেননি প্রকৃতির অনুভূতিতেও মানবীয় অনুভূতি আরোপ করেছেন।
চমকিয়া জাগি ললাটে আমার কাহার নিশাস লাগে?
কে করে বীজন তপ্ত ললাটে, কে মোর শিয়রে জাগে?
জেগে দেখি মোর বাতায়ন পাশে জাগিছে স্বপনচারী
নিশিত রাতের বন্ধু আমার গুবাক-তরুর সারি!
(বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি : চক্রবাক)
প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের মনেরও পরিবর্তন ঘটে। প্রকৃতির বিভিন্ন। উপাদান এবং ঋতু স্বাতন্ত্র্যভাবে মানবীয় রূপ ধারণ করে। বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে এ দেশের কবিরা বারমাস্যার মাধ্যমে নায়িকার রূপ এবং মানসিক অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। আধুনিক কবিরা বারমাস্যার ভঙ্গি কবিতাতে ব্যবহার করেন না। কিন্তু বিভিন্নভাবে কবিতাতে ঋতু পরিবর্তনে নিসর্গের অবস্থান বর্ণনা করেন। নজরুল ইসলামও তার কবিতাতে বিভিন্ন ঋতুতে প্রকৃতি ও তাঁর প্রেমিকার অবস্থা বর্ণনা করেছেন।
পউষ এলো গো!
পউষ এলো অশ্রæ-পাথর হিম-পারাবার পারায়ে।
ঐ যে এলো গো-
কুজ্ঝটিকার ঘোম্টা-পরা দিগন্তরে দাঁড়ায়ে।
সে এলো আর পাতায় পাতায় হায়
বিদায়-ব্যথা হায় গো কেঁদে যায়,
অস্ত-বধূ (আ-হা) মলিন চোখে চায়।
(পউষ, দোলন-চাঁপা)
মানুষ প্রকৃতির সন্তান। মানুষের জীবন একটি দুর্গম ভ্রমণ। পথের সন্ধানে বেরিয়ে পথ খুঁজে পায় না সে। পশ্চাতে পড়ে থাকে এমন অসংখ্য স্মৃতি। পথ প্রতিবেশ আর অতীত-বিধুরতা নিয়ে তার যাত্রা। এই যাত্রা অনন্ত। পৃথিবীর জীবন শেষে সে এক নতুন যাত্রা শুরু করে।
বনের ছায়া গভীর ভালোবেসে
আঁধার মাখায় দিগবধুদের কেশে
ডাকতে বুঝি শ্যামল মেঘের দেশে
শৈলমূলে শৈলবালা নামে
উদাস পথিক ভাবে।
(পথহারা : দোলন-চাঁপা)
কিংবা
আজ দিগ্বালিকার আঁখি-পাতা অনেক দূরের কানন ছায়ে
কাঁপছে অভিমানে,
একলা আমার পথ দেখতে ঐ বালিকার চপল পায়ে
দিক হতে দিক পানে।
(সমর্পণ : দোলন-চাঁপা)
নজরুল ইসলাম প্রকৃতির প্রতি কখনো আত্মলীন দৃষ্টিভঙ্গি, কখনো বা প্রকৃতির ওপর বস্তুলীর দৃষ্টি আরোপ করেছেন।
উদয়ঘাটে হাসে যখন পোড়ার মুখী শশী
শশীর মুখ চেয়ে ভাবি শশী তোমার দোষী।
তার চোখের ঐ কাজল রাগই রুচির চাঁদে করলে দাগী
কলঙ্কী চাঁদ কাজল আঁখির সজল চাওয়ার বানে
দোষী শশীর কলঙ্ক তার আঁখির স্মৃতি আনে।
(পুবের চাতক : দোলন-চাঁপা)
আলাদা আলাদাভাবে প্রেম ও প্রকৃতি বিষয়ক কবিতা রচনার ক্ষেত্রে নজরুল ইসলাম। যেমন সার্থকতা অর্জন করেছেন। তেমনি প্রেম ও প্রকৃতিকে পারস্পরিক গুণ আরোপ করে কবিতার উৎকর্ষ সাধন করেছেন।
ফুটবে আবার দোলন-চাঁপা চৈতিরাতের চাঁদনী
আকাশ-ছাওয়া তারায় তারায় বাজবে আমার কাঁদনী।
চৈতী রাতের চাদনী।
ঋতুর পরে ফিরবে ঋতু
সে দিন হে মোর সোহাগ-ভীতু।
চাইবে কেঁদে নীল নভোগায়;
আমার মতন চোখ ভরে চায়
যে তারা তায় খুঁজবে-
বুঝবে সেদিন বুঝবে!
(অভিশাপ : অভিশাপ)
‘চৈতী হাওয়া’ কবিতায় কবি তার হৃদয়ের বিরহ বেদনাকে প্রকৃতির মধ্য দিয়ে এক অপূর্ব ভাষায় বর্ণনা দিয়েছেন।
শূন্য ছিল নিতল দীঘির শীতল কালো জল
কেন তুমি ফুটলে সেথা ব্যথায় নীলোৎপল?
আষাঢ় দীঘির রাঙলে মুখ
নিটোল ঢেউএর ভাঙলে বুক
কোন পুজারী নিলো ছিড়ে? ছিন্ন তোমার দল
ঢেকেছে আজ কোন দেবতার কোন সে পাষাণ তল?
(চৈতি হাওয়া : ছায়ানট)
কিংবা
বাদলা কালো ¯িœগ্ধা আমার কান্তা এলো রিমঝিমিয়ে,
বৃষ্টিতে তার বাজল নূপুর পায়জোরেরই শিঞ্জনি যে।
ফুটলো উষার মুখটি অরুণ, ছাইল বাদল তাম্বু ধারায়!
জমলো আসর বর্ষা বাসর, লাও সাকি লাও ভর পিয়ালায়।
(নিকটে : পুবের হাওয়া)
কবির বিদায়-ব্যথায় প্রকৃতি ব্যথাতুর হয়ে পড়ছে। যে মৃত্তিকা-মাতা কবিকে গভীর মমতায় ধারণ করেছে, যার আলো বাতাস বৃক্ষ লতা কবির শরীর গঠনে সাহায্য করেছে সেই প্রকৃতি কবির বিরহ সইবে কেমন করে। কবি যে সব সময় প্রকৃতির অনুষঙ্গগুলো কেবল নারীর প্রেম বিরহের ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন এমন নয়। মাতৃত্বে ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের অনুভূতিও আরোপ করেছেন। এই মায়ার পৃথিবী ছেড়ে যেতে কবির প্রাণ কাঁদে।
আমার বিদায়-রথের চাকার ধ্বনি ঐ গো এবার কানে আসে।
পুবের হাওয়া তাই কেঁদে যায় ঝাউএর বনে দীঘল শ্বাসে\
ব্যথায় বিবশ গুলঞ্চ ফুল
মালঞ্চ আজ তাই শোকাকুল
মাটির মায়ের কোলের মায়া ওগো আমার প্রাণ উদাসে\
(শেষের গান : ছায়ানট)
নজরুলের প্রেম ও প্রকৃতির কবিতার আলাদা পরিচয় বিধৃত করা কষ্টকর। নজরুল কাব্যের মূল প্রবণতা মূলত প্রেম প্রকৃতি সৌন্দর্যবোধ। কেবল একটি বা দুটি কবিতা উদ্ধৃতি করে তার এই পরিচয় সম্পূর্ণ করা যাবে না। যেমন তিনি প্রেম প্রকৃতিকে একই সঙ্গে অঙ্কন করেছেন তেমনি শুধু নারী প্রেম নিয়ে রচনা করেছেন অসংখ্য কবিতা। রচনা করেছেন ‘দেলনচাপা’, ‘ছায়ানট’, ‘পুবের হাওয়া’, ঝিঙেফুল’, ‘সিন্ধু-হিন্দোল’, ‘চক্রবাক’, ‘সন্ধ্যা’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ, যার অধিকাংশ কবিতা প্রেম প্রকৃতি নিয়ে রচিত হয়েছে। আর প্রেম ও প্রকৃতি বিষয়ক রয়েছে তাঁর অমূল্য সব গান। সুতরাং কেবল বিদ্রোহী বললে নজরুলের পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। নজরুল যেমন বিদ্রোহী তেমন প্রেম ও প্রকৃতির কবিও।
