মাহমুদুর রহমান মান্না : খালেদা জিয়া এখন তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছেন

আগের সংবাদ

ওমিক্রন ঠেকাতে চার সুপারিশ

পরের সংবাদ

নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজ : প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের কারণে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

প্রকাশিত: নভেম্বর ২৮, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: নভেম্বর ২৮, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

সেবিকা দেবনাথ : গায়ে সাদা অ্যাপ্রোন, গলায় স্টেথোস্কোপ, নামের আগে লেখা থাকবে ‘ডা.’ আর তাদের সেবায় সুস্থ হবেন অসংখ্য রোগী- এই স্বপ্ন নিয়ে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়েছিল ৫২ জন তরুণ-তরুণী। কিন্তু স্বপ্নপূরণের শুরুতেই বড় ধাক্কার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই তাদের স্বপ্নপূরণের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা সবাই নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। শিক্ষার্থীদের দাবি সমস্যার সমাধান নতুবা মাইগ্রেশন।
কলেজটির চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইফুল্লাহ মাহমুদ ভোরের কাগজকে বলেন, কলেজে শিক্ষক নেই। আমরা ক্লাস করতে পারছি না। হাসপাতালে রোগী না থাকায় হাতে-কলমের শিক্ষাও হচ্ছে না আমাদের। পেশাগত পরীক্ষার পর আমরা কীভাবে ইন্টার্নশিপ করব তাও বুঝতে পারছি না। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এখানে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু এই স্বপ্নপূরণ হবে কিনা কিংবা কবে হবে তাও জানি না। ভর্তির সময় তারা আমাদের জাল ও ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ভুল বুঝিয়েছিল। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আগে থেকেই অভিযোগ ছিল তারপরও কেন ভর্তি হয়েছেন এমন প্রশ্নের উত্তরে একই বর্ষের শিক্ষার্থী ইমরান খান ইমন বলেন, আমরা ২০১৭-১৮ সেশনে জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশিত ভর্তি বিজ্ঞপ্তি দেখে এই মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে আসি। তখন কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের জানান, কলেজের অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার কারণে ২০১৬ সালে তাদের আগের শিক্ষার্থীরা মাইগ্রেশন করে অন্যত্র চলে গিয়েছে। তারা এটাও বলেছিলেন আমাদের প্রথম ব্যাচ ধরে কলেজের সব কার্যক্রম নতুনভাবে শুরু করবেন এবং তাদের আগের সব সমস্যারও সমাধান তারা করেছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, ক্লাস শুরুর পর ১ম বর্ষ কোনো সমস্যা ছাড়া কাটলেও ২য় বর্ষে এসে তারা জানতে পারে, এই কলেজের বিএমডিসি রেজিস্ট্রেশন তো নেই-ই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রেশনও তখন ছিল না। এ

বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হলে অতিদ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে কর্তৃপক্ষ বারবার আশ্বস্ত করেন। এই অবস্থায় ১ম প্রফেশনাল পরীক্ষার দুই দিন আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন এবং পরীক্ষার আগের রাতে ১০টার পর তারা প্রবেশপত্র পান। তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকলেও ফরেনসিক ল্যাবে আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি ছিল না। শুধু তাই নয়, করোনা অতিমারীতে অন্যান্য মেডিকেল কলেজগুলোতে অনলাইন ক্লাস হলেও কলেজ কর্তৃপক্ষকে বারবার ক্লাসের কথা বলার পরও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি প্রফেশনাল পরীক্ষার পরও ৪র্থ বর্ষের কোনো ক্লাসের ব্যবস্থা করেনি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ। অনেক বলার পর কয়েক মাস পর একজন শিক্ষকের মাধ্যমে সপ্তাহে দুটি ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু তখনো ৩ বিষয়ের মধ্যে বাকি ২টি বিষয়ের ক্লাসের ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
ভুক্তভোগীরা আরো জানান, যেখানে প্রতি বিষয়ের জন্য কমপক্ষে দুইজন করে স্থায়ী অধ্যাপক থাকার কথা সেখানে আগস্ট মাস থেকে ৩টি বিষয়ের একজন করে শিক্ষক দেয়া হয়েছে। যাদের মধ্যে একজন স্থায়ী এবং অন্য দুইজন অতিথি শিক্ষক। তার ওপর বেতনঘটিত সমস্যার কারণে শিক্ষকরা ক্লাস নেয়া বন্ধ রাখেন। এ কারণে অনেক অতিথি শিক্ষক চলে গেছেন।
অনিয়মের তালিকা এখানেই শেষ নয়। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ডাক্তার ও সুযোগ-সুবিধা না থাকার কারণে হাসপাতালটি রোগীশূন্য হয়েছে। ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম বর্ষে রোগীর সঙ্গে সরাসরি কাজ করার কথা থাকলেও পর্যাপ্ত রোগী না থাকায় ৩য় বর্ষে শিক্ষার্থীরা তাত্ত্বিক ক্লাস করে। বর্তমানে মেডিসিন ও সার্জারি বিভাগে কোনো ডাক্তার নেই। নেই কোনো এনেস্থেসিওলজিস্ট। ফলে কোনো ধরনের সার্জারিই সম্ভব নয়।
প্রতিষ্ঠানে এমন অনিয়মের প্রতিবাদ জানিয়ে লেকচার ক্লাস শুরুর কয়েক মাস পর টিউটোরিয়াল ক্লাসের ব্যবস্থা না করায় টিউটোরিয়াল শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ১০ দিনের মতো ক্লাস করা থেকে বিরত থাকে। সমস্যা সমাধান করার জন্য কর্তৃপক্ষকে বারবার বলা হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সমস্যা সমাধান ও বিএমডিসির দাবিতে চলতি বছরের ২১ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষার্থীরা সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। অনেক দিন পেরিয়ে গেলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ করেনি। সমস্যার সমাধানের দাবিতে ১৪ নভেম্বর স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে মানববন্ধন করে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। উল্টো গুম ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
জানা যায়, নানা অনিয়মের কারণে সমালোচিত এই প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৬ সালে জুন মাসে বেসরকারি মেডিকেল কলেজের নীতিমালার শর্তপূরণ না করে শিক্ষাকার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অপরাধে নাইটিংগেলসহ ৪টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ উচ্চ আদালতে এ আদেশ স্থগিতাদেশ চেয়ে রিটের ভিত্তিতে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে ৫২ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি না করাতে পারলেও ২০১৯-২০ সালে ৯ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয় এই প্রতিষ্ঠানে। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষেও কোনো শিক্ষার্থী এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়নি।
তবে প্রতিষ্ঠানে এসব অনিয়মের কথা স্বীকার করতে নারাজ কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন আহমেদ চৌধুরী ও কলেজের অধ্যক্ষ দীপক কুমার সান্যালকে এ বিষয়ে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। তবে এর আগে এক দৈনিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে দীপক কুমার সান্যাল শিক্ষক না থাকায় ৩য় ও ৪র্থ বর্ষে থাকা ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের ৫২ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। আর নাইটিংগেল মেডিকেল কলেজের নির্বাহী সমন্বয়কারী নূর ইমাম মেহেদী জানান, তারা নিয়মানুযায়ী শিক্ষার্থী ভর্তি করেছেন। শিক্ষকও আছেন। নির্দিষ্ট কারিকুলামপূর্ণ করেই সময়মতো বিএমডিসির নিবন্ধন পাবেন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়