চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা : চালকের সহকারী শাহীরুল এখন কোটিপতি

আগের সংবাদ

তিস্তার তাণ্ডবে লালমনিরহাটে পথে বসেছে হাজারো পরিবার

পরের সংবাদ

আসামি ভোলার স্বীকারোক্তি : মুছাকে ভয় দেখিয়ে মিতুকে খুন করান বাবুল আক্তার

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৫, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

চট্টগ্রাম অফিস : সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের নির্দেশেই স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্বে ছিলেন বাবুল আক্তারের বিশ্বস্ত সোর্স কামরুল শিকদার ওরফে মুছা। মুছাকে ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে নিজের স্ত্রী মিতুকে খুন করান বাবুল আক্তার। শনিবার (২৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শফি উদ্দিনের আদালতে ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ কথা বলেন মিতু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি এহতেশামুল হক ওরফে ভোলা।
ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে গত শুক্রবার ভোলাকে যশোরের বেনাপোল থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এরপর শুক্রবার রাতে ভোলাকে বেনাপোল থেকে চট্টগ্রামে নেয়া হয়। মিতু হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই চট্টগ্রাম মহানগরের পরিদর্শক সন্তোষ কুমার চাকমা ভোরের কাগজকে বলেন, মিতু হত্যা মামলার আসামি ভোলা বেনাপোল দিয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। গোপন সংবাদ পেয়ে যশোরের বেনাপোল থেকে ভোলাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ভোলা ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। এরপর আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন। এদিকে হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই ‘নিখোঁজ’ আছেন বাবুল আক্তারের সোর্স কামরুল ইসলাম শিকদার মুছা। তবে তার স্ত্রী পান্না আক্তারের দাবি, মুছাকে ২০১৬ সালের ২২ জুন পুলিশ প্রশাসনের লোকজন তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ মিলছে না। পরবর্তী সময়ে মিতু হত্যা মামলায় মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার আদালতে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
আদালত সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে ভোলা পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের সঙ্গে পরিচয়, তার অনুরোধে মুছাকে চাকরি দেয়া থেকে শুরু করে মিতুকে হত্যার নির্দেশ পাওয়া এবং হত্যাকাণ্ডসহ বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। জবানবন্দিতে ভোলা জানিয়েছেন, বাবুল আক্তার ২০০৮ সালে চট্টগ্রামে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত থাকাকালে তার সোর্স ছিলেন কামরুল শিকদার ওরফে মুছা। মুছার সঙ্গে আগে থেকে পরিচয় ছিল ভোলার। জায়গা-জমিসহ নানা অভিযোগে ভোলার বিরুদ্ধে পুলিশের খাতায় কমপক্ষে ২০টি মামলা রয়েছে। মামলায় সহযোগিতা পাইয়ে দেয়ার কথা বলে বাবুলের সঙ্গে ভোলাকে পরিচয় করিয়ে দেন মুছা। মামলা থেকে অব্যাহতি পাইয়ে দেয়ায় বাবুলকে বিভিন্ন তথ্য দিতেন ভোলা। নগরের ডবলমুরিং থানা এলাকায় অবৈধ অস্ত্রের সন্ধানও দিয়েছিলেন এই ভোলা। সেই অস্ত্র উদ্ধার করে বাবুল আক্তার প্রশংসিত এবং পদকও পেয়েছিলেন। পরে বাবুল আক্তার বদলি হলেও ২০১১ সালের দিকে আবার নগর গোয়েন্দা পুলিশের

অতিরিক্ত উপকমিশনার হয়ে ফেরত আসেন। তখন বাবুলের নির্দেশে বাকলিয়ায় তার (ভোলা) বালুর ডিপোতে মুছাকে ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ দেন ভোলা।
জবানবন্দিতে বলা হয়, ২০১৬ সালের মে মাসের দিকে মুছা ভোলাকে জানায়, বাবুল আক্তারের সঙ্গে তার স্ত্রীর ঝামেলা আছে। বাবুল আক্তার বলেছেন, তার স্ত্রীকে খুন করতে হবে। এ জন্য ভোলা যাতে অস্ত্র সংগ্রহ করে দেন। মিতুকে খুনের কাজে মুছাকে সাহায্য করতে রাজি না হওয়ায় বাবুল আক্তার তাকে ডেকে বলেন, মুছাকে তিনি (বাবুল) একটা কাজ দিয়েছেন, ভোলা সাহায্য করতে না পারলেও যেন বাধা না দেয়, বাধা দিলে তার সমস্যা হবে। এতে ভয় পেয়ে ভোলা বিষয়টি কাউকে বলেননি। মিতুকে হত্যার পর সে দিন (২০১৬ সালের ৫ জুন) বিকেলে ভোলার অফিসে গিয়ে অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে মুছা। সে ভোলাকে বলে, এ কাজ করতে তিনি (মুছা) রাজি ছিলেন না কিন্তু তার কোনো উপায়ও ছিল না। মুছা এ কাজ না করলে ‘ক্রসফায়ারের’ হুমকি দিয়েছিলেন বাবুল। যার কারণে মুছা রাজি হতে বাধ্য হন। জবানবন্দিতে ভোলা জানান, মিতু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ভোলা সাড়ে তিন বছর পর জামিনে বেরিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে মুছাতে খুঁজতে থাকেন। মুছাকে না পেয়ে তার স্ত্রী পান্নাকেও মুছার সন্ধানে ফোন করেন ভোলা। তখন পান্না জানিয়েছিলেন, ঘটনার কয়েক দিন পর বাবুল আক্তার মুছাকে ফোন দিয়েছিলেন। মুছাকে নাকি সাবধানে থাকতে বলে দিয়েছিল। কয়েক দিন পর বাবুল আক্তার আবার ফোন দিলে মুছা ক্ষেপে গিয়েছিল। সে বলেছিল, আপনার জন্য এত বড় কাজ করলাম, এখন যদি পরিবারের ক্ষতি হয় তাহলে মুখ খুলে দেব। এরপর থেকেই মুছা পলাতক, তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না।
মিতু হত্যা মামলার আসামি এহতেশামুল হক ভোলাকে মিতু হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র-গুলিসহ ২০১৬ সালের ২৮ জুন নগরীর বাকলিয়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর জামিনে কারামুক্তি পান ভোলা। পরে বাবার করা মামলায় গত ১৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বেঞ্চ ভোলাকে চার সপ্তাহের জামিন দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে তাকে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়। গত ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ শেখ আশফাকুর রহমানের আদালতে জামিনের সময় বাড়ানোর আবেদন করলে আদালত তা নাকচ করে হাইকোর্টের নির্দেশনা পালন না করায় ভোলার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।
আগে যা ঘটেছিল : ২০১৬ সালের ৫ জুন সকালে নগরীর পাঁচলাইশ থানার জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে বাসার অদূরে গুলি ও কুপিয়ে খুন করা হয় বাবুলের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতুকে। স্ত্রী খুনের ঘটনায় পুলিশ সদর দপ্তরের তৎকালীন এসপি বাবুল আক্তার বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। মিতু হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম তার জবানবন্দিতে ‘হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি ভোলা সরবরাহ করেছিল’ বলে জানিয়েছিল। এদিকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদসহ নানা নাটকীয়তার পর ওই বছরের আগস্টে বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। মিতুর বাবা পুলিশের সাবেক পরিদর্শক মোশারফ হোসেন প্রথম দিকে জামাতার পক্ষে কথা বললেও পরে নিজেই সন্দেহের আঙুল তোলেন। মিতুর বাবা অভিযোগ করেন, তার মেয়েকে হত্যার পেছনে তার জামাইয়ের ‘যোগসাজশ’ রয়েছে বলে তার ধারণা। মামলা তদন্তের দায়িত্ব প্রথমে নগর গোয়েন্দা পুলিশ ডিবির কাছে থাকলেও ২০২০ সালের জানুয়ারিতে তদন্তভার পড়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর। এরপর ধীরে ধীরে জট খুলতে থাকে এই মামলার।
গত ১১ মে বাবুল আক্তারকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পিবিআই। তদন্তে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা পাওয়ায় ১২ মে ওই মামলার তার বিরুদ্ধে ৫৭৫ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয় পিবিআই। এর বিরুদ্ধে বাবুলের আইনজীবী নারাজি আদালতে আবেদন করেন। আগামী ২৭ অক্টোবর নারাজি আবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। এদিকে পিবিআইর চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমার দিন ১২ মে দুপুরে মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন বাদী হয়ে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় বাবুল আক্তারসহ আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার বাকি সাত আসামি হলেন- কামরুল ইসলাম শিকদার মুসা, এহতেশামুল হক প্রকাশ হানিফুল হক প্রকাশ ভোলাইয়া, মোতালেব মিয়া ওয়াসিম, আনোয়ার হোসেন, খাইরুল ইসলাম কালু, সাইদুল ইসলাম সিকদার সাক্কু এবং শাহজাহান মিয়া। এই মামলায় ওই দিনই বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করে রিমান্ডের আবেদন করা হলে আদালত পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে জবানবন্দি দেয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি তা দেননি। এরপর থেকে বাবুল আক্তার কারাগারে রযেছেন। গত ২৯ মে বাবুল আক্তারকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফেনী কারাগারে স্থানান্তর করা হয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়