চাকরি দেয়ার নামে প্রতারণা : চালকের সহকারী শাহীরুল এখন কোটিপতি

আগের সংবাদ

তিস্তার তাণ্ডবে লালমনিরহাটে পথে বসেছে হাজারো পরিবার

পরের সংবাদ

আমরা ভালো নেই

প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ২৫, ২০২১ , ১:০১ পূর্বাহ্ণ

আমরা যারা দেশে বসবাস করছি, তারা যে ভালো নেই সেটা তো বাড়িয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না। সেটা প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা বটে। করোনা এসে দশা আরো খারাপ করে দিল। গরিব মানুষ আরো গরিব হয়ে গেছে, মধ্যবিত্তের একাংশ গরিবদের সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। অবস্থাটা যে কতটা খারাপ হয়েছে বোঝা যাবে করোনার নির্মম দুঃশাসন থেকে বেরিয়ে আসার পরে। সমস্যাটা কেবল বাংলাদেশের নয়, সমগ্র বিশ্বেরই; কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যে অভিযোগটা ইতিহাসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে রয়ে যাবে সেটা হলো এই যে, সময় মতো যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। নেয়া হলে অবস্থা এতটা অগোছালো ও কষ্টদায়ক হতো না। করোনা মোকাবিলার জন্য প্রধান কর্তব্য ছিল দ্রুত টিকার বন্দোবস্ত করা; এবং খুব বড় ভুল হয়েছে একটি মাত্র সরবরাহকারীর ওপরে নির্ভর করাটা। যার দরুন টিকাদানের ব্যাপারে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার তলানিতে। শোনা যাচ্ছে, ভয় নেই, দেশেই টিকা উৎপাদিত হবে, বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে। এই পদক্ষেপটা আগে কেন নেয়া হলো না তা কিন্তু বোঝা গেল না। লক-আউট দেয়া নিয়ে যে অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে এবং তাতে পাবলিকের যে অমানুষিক দুর্ভোগ সহ্য করতে হয়েছে তা কোনো মতেই গ্রহণযোগ্য নয়। সর্বোপরি যা ধরা পড়ল তা হলো সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায় দুর্নীতি, অপর্যাপ্ততা ও বিশৃঙ্খলা কত ব্যাপক ও গভীরে প্রোথিত। তলে তলে ভালো ব্যবসা করে নিয়েছে প্রাইভেট সেক্টর। দুর্ভোগ যা, তা রোগাক্রান্ত বিপন্ন মানুষের।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার থাকার কথা রাজনীতিকদের নিয়ন্ত্রণে। অভিজ্ঞতা বলছে বাংলাদেশে সেটা নেই। কেউ কেউ বলেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবসায়ীদের হাতে। কথাটা অর্ধসত্য। নিয়ন্ত্রণ আসলে আমলাদের হাতে। রাজনীতিকদের বেশিরভাগই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এটা সত্য, তবে ব্যবসায়ীরা কাজ করেন আমলাতন্ত্রের আনুকূল্যে। আমলারা খুশি না থাকলে ব্যবসা এক কদম এগোয় না। বলাবাহুল্য, আমলাতন্ত্রের একটি শক্তিশালী অংশ পুলিশ ও র‌্যাব।
বর্তমান রাষ্ট্রযন্ত্রটিকে আমরা নিজেরা নিজেদের প্রয়োজনে তৈরি করিনি, উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছি। তৈরি করেছে ইংরেজ শাসকরা, তাদের সুবিধার জন্য। স্বভাবতই সেটি ছিল আমলাশাসিত। পাকিস্তান আমলে সামরিক-বেসামরিক আমলারা মনের সুখে রাষ্ট্রশাসন ও জনশোষণ করেছে। সহ্য করা অসম্ভব হওয়ায় সে রাষ্ট্রটিকে আমরা ভেঙে ফেলতে চেয়েছি। ভেঙেছিও। রাষ্ট্রযন্ত্রটি কিন্তু ভেঙেও ভাঙেনি। তার ভেতরের কলকব্জা আইন-কানুন প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের সম্পর্ক, সব কিছু সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। বললে ভুল হবে না যে, অতিব্যবহার ও অদক্ষ পরিচালনায় তা আরো যন্ত্রণাদায়ক হয়ে পড়েছে। ব্রিটিশ আমলে লন্ডনে তাও একটা পার্লামেন্ট ছিল, আমলাতন্ত্রের এক ধরনের দায় ছিল তার কাছে জবাবদিহিতার; পাকিস্তান আমলে আমলা শাসন ছিল পুরোপুরি স্বৈরাচারী, পার্লামেন্ট বলতে কোনো কিছু কাজ করেনি, ২২ বছর পরে যে সাধারণ নির্বাচনটি হলো তার পরিণতিতে কোনো জাতীয় সংসদ গঠিত হয়নি, সংবিধানও রচিত হয়নি, রাষ্ট্র গগনবিদারী ও মনুষ্য হত্যাকারী আওয়াজের মধ্যে ভেঙে পড়েছে। তা ভাঙল বৈকি, ভেঙে ছোট হয়েছে; কিন্তু চূর্ণবিচূর্ণ হয়নি, তাকে আবার আমরা দাঁড় করিয়েছি এবং ভার দিয়েছি শাসনকার্যের। রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক চরিত্রটি তাই রয়েই গেছে। এবং স্বাধীন বাংলাদেশে যেহেতু যথাযথ নির্বাচন হয়নি এবং হচ্ছেও না, তাই আমলাতন্ত্রকে জনপ্রতিনিধিদের কাছে জবাবদিহিতা করতে হয় না, হতে হয় না প্রশ্নের মুখোমুখি।
জনগণের জন্য আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে ভীতিকর অঙ্গটি হচ্ছে পুলিশ বাহিনী। পুলিশ বাহিনীও ব্রিটিশেরই সৃষ্টি। জনগণকে রক্ষা করার কথা বলা হলেও তাদের আসল দায়িত্ব ছিল জনগণকে দমন করা। লাল পাগড়ি দেখলে লোকে পড়ি তো মরি করে দৌড় দিত। পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রের স্বৈরাচার, বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর নিপীড়ন ও জনজুলুমের প্রত্যক্ষ প্রতিচ্ছবি ছিল পুলিশের দুরাচার। একাত্তর সালে রাষ্ট্রভাঙার যে যুদ্ধ তাতে পুলিশ বাহিনী অংশ নিয়েছে, অনেকে প্রাণ দিয়েছেন; কিন্তু নতুন রাষ্ট্র পুলিশ বাহিনীকেই আবার ডেকে এনে দায়িত্ব দিয়েছে তারা আগে যা করত তাই করতে। রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়নি; স্বদেশিদের দ্বারা পরিচালিত হলেও এ রাষ্ট্র জনগণের স্বার্থ দেখে না, দেখে শাসক শ্রেণির স্বার্থ; আগে যেমনটা দেখত। শাসক শ্রেণি নিজেদেরটা গুছিয়ে নিতে অতিশয় ব্যস্ত থেকেছে, পুলিশ বাহিনীও সেই সুযোগে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং এখন তাদের সদস্যদের কেউ কেউ রীতিমতো বেপরোয়া আচরণ করে থাকে যেমনটি আগে ভাবাও যেত না। একটা পরিচিত দৃষ্টান্ত, কক্সবাজারের থানা কর্মকর্তা প্রদীপকুমার দাসের তৎপরতা। এই লোক নিজের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বসেছিল; এবং এতদূর ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিল যে সেনাবাহিনীর একজন সাবেক মেজরকে কেবল হত্যাই করেনি, গলায় বুটের চাপা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। তারপরে নিহত ব্যক্তিটিকেই আক্রমণকারী দুর্বৃত্ত বলে দায়ী করে মামলা সাজানোর ব্যবস্থা করেছিল। পুলিশের লোকটি একা ছিলেন না, তার সঙ্গে তার ওপরে ও নিচে অন্য সহকর্মীরাও ছিলেন। তা থাকেন। দশে মিলেই কাজ করা হয়। ঢাকার কাছে সোনারগাঁও এলাকার এক বাজারে একজন পুলিশ সদস্য নিয়মিত চাঁদা তুলতেন। না দিলে আটক ও মামলার ভয় দেখাতেন। দুটিই ভয়ংকর জিনিস। আটক হলে নির্যাতন হয়, নির্যাতনে মৃত্যুও ঘটতে পারে। আর মামলা দেয়া তো খুবই সহজ ব্যাপার। পকেটে ইয়াবার কিছু বড়ি গুঁজে দিলে বাধা দেয় কে? তা ওই বাজারের দোকানদাররা একবার অত্যন্ত অতিষ্ঠ ও নিতান্ত মরিয়া হয়ে পুলিশের ওই লোককে আটক করে ফেলে ও গণধোলাই দেয়। তখন লোকটি যা বলেছে তাকে মিথ্যা মনে করার কোনো অজুহাত নেই। সে বলেছে, ‘আমার একার দোষ কী! আমি যা তুলি তা থেকে অন্য সহকর্মীদের ভাগ দেই।’ তাই তো! তা না হলে জোরটা আসে কোথা থেকে?
পুলিশ ঘুষ নেবে এটা সেই সূচনাকাল থেকেই অবধারিত। এখন তার মাত্রা ও প্রকারে বেশ বৈচিত্র্য এসেছে। আর নতুন যা যুক্ত হয়েছে তা হলো অপহরণ ও যৌন নির্যাতন। সড়ক পথে চট্টগ্রাম থেকে সোনার চাকতি (বার) নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছিলেন এক স্বর্ণকার। পথে ডিবির ওসিসহ পাঁচজন পুলিশ (ভুয়া নয় খাঁটি সোনার চেয়েও খাঁটি) স্বর্ণকারকে আটক করে, সোনার ১৫টি বার, যার দাম ১ কোটি টাকা লুট করে নেয়। স্বর্ণকার ভদ্রলোক বেশ সাহসী বলতে হবে, তিনি ফেনী মডেল থানাতে ওই পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। ভাগ্য ভালো, থানা মামলাটি নিয়েছে। আদালত ডিবির ওই সদস্যদের ৪ দিনের রিমান্ডও মঞ্জুর করেছেন। পুলিশই রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশকে। এমনটা তো ঘটে না। ঘটার কথাও নয়। রিমান্ডে নিলে পুলিশের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা কি-না তা অবশ্য জানা যাবে না। তবে পুলিশের স্বর্ণ ডাকাতির ওই ঘটনাটা যে খুব একটা ব্যতিক্রম, এমন নয়। ডেইলি ট্রিবিউন খবর দিচ্ছে বিভিন্ন সময়ে ২৩ জন পুলিশের বিরুদ্ধে স্বর্ণ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে। আর দৈনিক ইত্তেফাক জানাচ্ছে, নানা রকমের অপরাধে বছরে এখন দুই হাজার পুলিশ চাকরি হারাচ্ছে। এর মধ্যে টাকা বিনিময়কারীদের (মানি এক্সচেঞ্জার) জিম্মি রেখে টাকা আদায়ের অপরাধও রয়েছে। কয়েকদিন পরে ওই একই পত্রিকার খবর, ‘শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ : যেমন, চাঁদাবাজি, ঘুষ ও ধর্ষণ।’ পত্রিকাটির আরো খবর, পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। বিশেষজ্ঞরা আশা করি বলবেন, পুরনো জিনিস নতুন বোতলে ঢালা-ঢালিতে সময় ও শ্রম নষ্ট হবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না।
অপহরণও সমানে চলছে। হঠাৎ হঠাৎ মানুষ গুম হয়ে যায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রতি বছর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে। এ বছরও করেছে। তাদের সেই রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৯-১৯-এর ভেতর বাংলাদেশে ৮৩০ জন মানুষ গুম হয়েছে। বাংলাদেশের ওই সময়টাকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিহিত করেছে ‘গুমের দশক’ বলে। অপহৃতদের মধ্যে কাউকে মৃত পাওয়া গেছে, কেউ কেউ জীবিত ফেরতও এসেছে; কিন্তু তারা এমনই ভয় পেয়েছে যে নিখোঁজকালীন অভিজ্ঞতার বিষয়ে তাদের মুখ থেকে একটি শব্দও বের হয়নি। ৮১ জন মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে। অপহরণ কারা করেছে জানা যায় না, পুলিশ বলে এসব বেআইনি কাজ তারা করে না; কিন্তু পুলিশের তো দায়িত্ব এদের উদ্ধার করে আনা। পুলিশ তা করে না। বাংলাদেশের পুলিশ অদক্ষ এমন অভিযোগ কেউ করতে পারবেন না। এই লেখাটা লিখতে লিখতেই তো খবর এলো সিআইডির তিনজন সদস্য একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্টের নেতৃত্বে রংপুর থেকে ভাড়া করা একটি মাইক্রোবাসে চেপে দিনাজপুরে গিয়ে রাতের বেলা এক বাড়িতে হানা দেয় এবং সেখান থেকে একজন মহিলা ও তার পুত্রকে তুলে নিয়ে যায়। পরে মুঠোফোনে এই পরিবারটিকে তারা জানায় যে ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে, নইলে অপহৃতদের মুক্তি নেই। দর কষাকষি করে মুক্তিপণ ৮ লাখে নামানো সম্ভব হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে অবশ্য থানায় জানানো হয়েছিল। টাকা নিতে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এক জায়গায় এলে সিআইডির ওই সদস্যরা স্থানীয় থানার পুলিশের লোকদের উপস্থিতি টের পেয়ে মাইক্রোবাস নিয়ে চম্পট দেয়। ১০ কিলোমিটার ধাওয়া করে পুলিশ, শেষ পর্যন্ত নিজেদের সহকর্মী-বহনকারী ওই মাইক্রোবাসটিকে পাকড়াও করতে সমর্থ হয়। সিআইডির লোকরা এখন নাকি কারাগারে আছে আদালতের আদেশে। এ রকম অজস্র ঘটনা নিত্য আমাদের দেখতে ও শুনতে হচ্ছে। কিন্তু প্রতিকারের কোনো লক্ষণ তো দেখছি না। তাই অনায়াসে বলা যায়, আমরা ভালো নেই।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়