এ মাসের ১৫ দিনে ডেঙ্গু রোগী ছাড়ালো ৩ হাজার

আগের সংবাদ

ভস্মীভূত হিন্দুপল্লীজুড়ে আতঙ্ক : মূল হোতাসহ ৪৬ জন গ্রেপ্তার, থানায় দুই মামলার প্রস্তুতি, প্রতিবাদে রংপুরে বিক্ষোভ > সাম্প্রদায়িক হামলা

পরের সংবাদ

কয়েকটি ঘটনা বাংলাদেশের সেক্যুলার চরিত্রকে নষ্ট করতে পারবে না!

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৮, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৮, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে গত কয়েকদিন যেসব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেছে, সেগুলো নিয়ে আমাদের সবার মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার অনেক বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বী বন্ধু, সহকর্মী, শিক্ষার্থী, প্রতিবেশী ও পরিজনকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা জানিয়েছি। দশমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে ই-কার্ড পাঠিয়েছি। আমাকেও অনেকে শুভ বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন। কিন্তু সবার মধ্যে কেমন জানি একটা ‘মন ভার ভার’ ভাব লক্ষ করেছি। এবারের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যেসব অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটেছে, তাতে করে এ রকম ‘মন ভার ভার’ ভাবটা খুবই স্বাভাবিক এবং সে কারণেই এটা আমাকে অস্বাভাবিক পীড়া দিচ্ছে। কয়েকজন আমার শুভেচ্ছার উত্তর দিয়েছেন এভাবে, ‘এ রকম বিজয়া দশমী যেন আর না আসে’। কেন জানি মনে হচ্ছে, বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বী আমার বন্ধু, সহকর্মী, শিক্ষার্থী, প্রতিবেশী ও পরিজনের কাছে আমার ‘মুখটা’ খানিকটা ছোট হয়ে গেছে। সংখ্যালঘুর ধর্ম পালনের অধিকারের যথাযথ ও নিশ্চিদ্র সুরক্ষা দিতে না পারার ব্যর্থতা সংখ্যাগুরু হিসেবে আমাকে তীব্রভাবে পীড়া দিচ্ছে। যদিও বিষয়টি একেবারেই সে রকম নয়। কেননা, এদেশের মানুষের এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যে সেক্যুলার ইতিহাস আমাদেরকে একটা গর্বের জায়গা দিয়েছে, সেটা এত দ্রুত নষ্ট হয়ে যাবে, এটা তো হয় না। তাই এটা মেনে নেয়া কষ্টকর যে, এ বছরের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কয়েকটি ঘটনা আমাদের মধ্যে তীব্র অস্বস্তি তৈরি করেছে। কেননা এ বছর সনাতন ধর্মাবলম্বীরা খানিকটা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে এবং ‘মন ভার ভার’ অবস্থা নিয়ে সার্বজনীন দুর্গোৎসব পালন করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত কুমিল্লা থেকে। পূজামণ্ডপে পবিত্র কুরআন শরিফ রাখার গুজব ছড়িয়ে ধর্মীয় অনুভূতিকে উসকে দিয়ে এক ধরনের ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে, যার মধ্য দিয়ে গোটা বাংলাদেশে একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। কুমিল্লার পুরো ঘটনাটাই যে একটি বিশেষ মহলের সাজানো চিত্রনাট্য সেটা ইতোমধ্যে পরিষ্কার হয়ে গেছে। বাংলাদেশে অনেক ঘটনার পেছনে যে একটি বিশেষ মহলের যড়যন্ত্র আছে এবং একটা রাজনৈতিক প্লট তৈরির পরিকল্পনা থাকে সেটা যখনই সামনে আনার চেষ্টা করা হয়, তখন অনেকেই ‘সবকিছু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে বিচার করা যাবে না’ বলে পুরো ঘটনাকেই হালকা করে দেয়। কিন্তু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বলেও একটা ব্যাপার যে আছে সেটাকে অস্বীকার করার কিছু নেই। কেননা কুমিল্লার ঘটনা এ রকমই একটি ঘটনা, যা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছে, যা দিয়ে সারাদেশে একটা ধর্মীয় উত্তেজনা তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। যার সূত্র ধরে কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ল²ীপুর, কুড়িগ্রাম, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট এবং ভোলাসহ দেশের প্রায় ৭০টি পূজামণ্ডপে হামলা হয়েছে বলে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ দাবি করেছে। এক লিখিত বক্তব্যে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট রানা দাশগুপ্ত আরো দাবি করেন, ৭০টি পূজামণ্ডপের পাশাপাশি ৩০টি বাড়ি ও ৫০টি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক, লজ্জাস্কর এবং নিন্দনীয়। এ বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই যে, কিছু ধর্মান্ধ, উগ্র এবং কূপমণ্ডূক ছাড়া এ ঘটনায় আমার সবাই চরমভাবে ব্যথিত, মর্মাহত এবং লজ্জিত। আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, বর্বরদের আদতে কোনো ধর্ম নেই, ধর্মান্ধদের সত্যিকার অর্থে মানুষ ও মানবতার প্রতি কোনো সহমর্মিতা নেই, উগ্রদের কোনো জাত-বিচার নেই এবং কূপমণ্ডূকদের কোনো ধর্মীয় ও মানবিক অনুভূতি নেই। আর নেই বলেই তারা অনায়াসে অন্যের ধর্মীয় স্থাপনায় এবং অনুভূতিতে আঘাত করতে পারে। আর নেই বলেই এরা পূজামণ্ডপে হামলা করতে পারে। কিন্তু এটা সত্যিকার বাংলাদেশ নয়। এটা এদেশের কতিপয় ধর্মান্ধ, উগ্র এবং কূপমণ্ডূকের ন্যক্কারজনক আস্ফালন। কতিপয় উগ্রবাদীর ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড ঐতিহাসিক পরম্পরায় গড়ে ওঠা সেক্যুলার বাংলাদেশে চরিত্রকে কোনোভাবেই মøান করতে পারে না।
১৯৪৭ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ১৯০ বছরের ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে যে বিউপনিবেশিকরণ ঘটে সেটা ছিল প্রধানত দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে : হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা ও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা যাবে হিন্দুস্তানে আর মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা ও মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা যাবে পাকিস্তানে। এ রকম একটি পিকুলিয়ার তত্ত্বের ভিত্তিতে একটি ধর্মভিত্তিক দেশ বিভাজন যখন ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবল প্রভাবশালী ডিসকোর্স হিসেবে রাজনৈতিক ময়দানে সক্রিয়, সেখানে পুরোপুরি ধর্মনিরেপক্ষ একটি রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র কাঠামোর বাইরে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম করে বাংলাদেশে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম লাভ করেছিল, শুরুতেই সে আওয়ামী লীগের নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। কিন্তু পরবর্তীতে সেটা আওয়ামী লীগ নাম ধারণ সব ধর্মের, বর্ণের, জাতির একটি সেক্যুলার-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়, যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এভাবেই এদেশের জন্ম থেকেই রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ একটি সেক্যুলার রাষ্ট্র। আর সে কারণেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেক্যুলারিজমকে এদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূল নীতির একটি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রয়োজনে কেউ কেউ ধর্মকে রাষ্ট্রের সঙ্গে মেলানো এবং মেশানোর চেষ্টা করেছে বটে, কিন্তু এদেশে বেশিরভাগ মানুষ মৌলিকভাবে ও চরিত্রগতভাবে ধর্ম নিরপেক্ষ। এদেশের গ্রামে-গঞ্জে মেঠো বাংলার ব্রাত্যজনরা মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান একত্রে এক সঙ্গে অত্যন্ত চমৎকার হৃদ্ধতার সঙ্গে বাস করে। সেখানে মুসলমানদের ঈদ যেমন একটি সর্বজনীন সামাজিক উৎসব, তেমনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গাপূজাও একটা বড় মাপের সর্বজনীন সামাজিক উৎসব। এসব উৎসবে একে অন্যের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া এবং নানান ধরনের উৎসবের খাওয়া-দাওয়া করা এদেশের গ্রামীণ জীবনের চিরাচরিত অনুষঙ্গ। মফস্বল শহরগুলোতেও ঈদ এবং পূজায় একে অন্যের বাড়িতে দাওয়াত খাওয়ার রীতি একটা দীর্ঘ বছরের সামাজিক রীতি-নীতি ও আচার-রীতির অংশ। সুতরাং কতিপয় বর্বর ও উগ্র ধর্মান্ধদের এসব ঘটনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক সেক্যুলার চরিত্রকে কোনোভাবেই নষ্ট করতে পারবে না। বাংলাদেশের চরিত্রকে কষ্ট করে নষ্ট করার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু এদেশের মানুষের হাজার বছরের সেক্যুলার জীবনাচার, মনোবৃত্তি এবং ধর্মনিরপেক্ষ দর্শনকে কোনোভাবেই মøান করতে পারবে না। তবে এ ঘটনাগুলো যে রাষ্ট্রের চরিত্রে অল্প-বিস্তার আঁচড় লাগাচ্ছে, সেটা অনস্বীকার্য।
পরিশেষে বলব, পূজামণ্ডপে হামলার ঘটনা একেবারেই অপ্রত্যাশিত ও অনাকাক্সিক্ষত। এবং এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে নিন্দনীয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম ঘটেছে তা কিন্তু নয়। এবং অতীতেও এ ধরনের অভিজ্ঞতা আছে বলেই প্রতি বছর পূজা মণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তার আয়োজন করতে হয়। বাংলাদেশের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশে কেন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজার সময় একটা অদৃশ্য আতঙ্কের মধ্যে ধর্মীয় উৎসব পালন করতে হয়, সেটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা জরুরি হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি যারা এসব ঘটনাকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চান, তারা প্রকারান্তরে এসব ঘটনা ঘটানোর পেছনে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর যে রাজনৈতিক এজেন্ডা, সেটাকেই বেখেয়ালে সাবস্ক্রাইভ করেন। কেননা এসব ঘটনা ঘটানোর মধ্যে যে মূলত ‘সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণের চেষ্টা’ আছে, সেটাই বেখেয়ালে উদ্ধৃতি করে প্রকারান্তরে উগ্র-ধর্মান্ধদের এজেন্ডাকে আমরাই বাস্তবায়ন করে দিচ্ছি কিনা, সেদিকে খেয়াল রাখাটাও জরুরি। শেষান্তে এ রকম কয়েকটি ঘটনার জন্য যে আমার বন্ধু, সহকর্মী, শিক্ষার্থী, প্রতিবেশী ও পরিজনের মতো যেসব সনাতন ধর্মাবলম্বী ‘মন ভার ভার’ করে দিনতিপাত করছে বা করছেন, তাদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন : নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়