সারাদেশে পূজামণ্ডপে হামলা : চাঁদপুরে সংঘর্ষে নিহত ৩

আগের সংবাদ

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের টার্গেট কী? প্রথম ম্যাচে মাহমুদউল্লাহ-সাকিবের মাঠে নামা নিয়ে দোটানা

পরের সংবাদ

ছড়া-সাহিত্যের পুরোধা ব্যক্তিত্ব

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৫, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

বাংলাদেশের ছড়া-সাহিত্যে রফিকুল হক এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব। শিশুসাহিত্য রচনার পাশাপাশি শিশুসংগঠক হিসেবে তিনি পালন করেছেন অবিস্মরণীয় ভূমিকা। ‘দাদুভাই’ নামেই তিনি সমধিক পরিচিত ও খ্যাতিমান।
প্রচুর ছড়া লিখেছেন রফিকুল হক দাদুভাই। লিখেছেন সস্নেহে, সযতেœ। তার বিশেষত্ব হলো ছোট-বড় সবাই তার লেখা পড়েন এবং পছন্দ করেন। ছোটদের মনের নানান সূ² ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলো তিনি গভীরভাবে অনুধাবন করেছেন। তাদের আবেগ-অনুভূতি, আশা-আকাক্সক্ষা, ভাবনা-চিন্তা, কল্পনাগুলো অনুভব করেছেন অন্তর দিয়ে। ফলে তার রচনায় আমরা প্রত্যক্ষ করি এর সুন্দর ও সহজ প্রতিফলন। তার মন জুড়ে ছিল শিশুরা। তার বুক যেন ভালোবাসার বিশাল পুকুর।
তাই তিনি অকপটে লিখতে পেরেছেন :
এই ছড়াটা ছোট্ট খোকার
ওই ছড়াটা খুকুর
বুকের আড়ে লুকিয়ে রাখি
বিশাল পদ্মপুকুর।
রফিকুল হক ছোটদের জন্য গড়ে তুলেছেন এক নিটোল নির্মল জগৎ। সে জগৎ হাসি-খুশির, আনন্দ-মজার, স্নেহ-ভালোবাসার। বড়দের জগতের বাইরে এ জগৎটা ভিন্ন এক জগৎ। এখানে হয়তো যুক্তি নেই, হয়তো বুদ্ধি কাজ করে না, হয়তো চিন্তা জাগ্রত নয় বলা যেতে পারে, অদ্ভুত মজার জগৎ। এর লক্ষ্য কেবল আনন্দ খোঁজা, এর উদ্দেশ্য শুধু হাসি-খুশির সন্ধান পাওয়া। ছোটদেরই একান্ত জগৎ। মনের কোণে নিভৃত এ জগৎটিকে অসাধারণ উপমায় সাজিয়েছেন রফিকুল হক। তাই তিনি বলতে পেরেছেন :
হাসি চাই হাসি
আলো হাসি
ভালো হাসি
বড় ভালোবাসি।

যে হাসিতে রোষ নাই
যে হাসিতে দোষ নাই
যে হাসিতে লাল ফুল
সে হাসি তো নয় ভুল।

হাসি চাই হাসি
ঢেলে দিতে
পৃথিবীতে
সুধা রাশি রাশি।

রফিকুল হকের স্বাতন্ত্র্য ও কৃতিত্ব এখানেই যে, মজা ও আনন্দের উপাদানের মধ্য দিয়ে তিনি তার পাঠককে অসাধারণ কিছু বাণী বা বক্তব্য উপহার দিয়েছেন, যা অবশ্যই শিক্ষণীয়। শিশু-মনস্তত্ত্ব গভীরভাবে অনুধাবন করে তাদের পছন্দের জগৎকে ছড়ায় যেমন রূপদান করেছেন, তেমনি তাদের সুষ্ঠু মানসিক বিকাশের লক্ষ্যে কাজ করেছেন অত্যন্ত সূ²ভাবে। ছোটদের মানসগঠনে সাহিত্যিকদের ভূমিকা যে অসামান্য, তা তিনি মনে রাখেন সবসময়।

রোদ্দুর
রোদ্দুর
কী ভীষণ রোদ্দুর
হাঁটছি
হাঁটছি
হাঁটছি তো হাঁটছি
মানা নেই
জানা নেই
যেতে হবে কদ্দূর
কদ্দূর?

চলো চলি
ডেকে বলি,
হেঁটে চলি
পথ গেছে যদ্দূর
রাগে জ্বলে
ওরা বলে
দেখছো না
চলমনে
খুব কড়া রোদ্দুর?

ছড়াটির মধ্য দিয়ে লেখক তার পাঠক বা শিশু-কিশোরদের একলা হাঁটার ক্ষেত্রে সাহস জুগিয়েছেন পরোক্ষ ভঙ্গিতে। রবীন্দ্রনাথের সেই গানটির কথা মনে করিয়ে দেয় ছড়াটি: ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে।’
প্রচলিত নীতি বা উপদেশ প্রচারের ধারাকে সযতেœ এড়িয়ে তিনি ছোটদের মাঝে সস্নেহে বিলিয়ে দিয়েছেন আনন্দ উপহার, সঞ্চার করেছেন সাহস। অন্যদিকে, তার বেশিরভাগ ছড়ায় পশু-পাখিও বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। সেই পশু-পাখি ছড়ায় এমন সজীব হয়ে ধরা দেয়, যেখানে ছোটদের মন তৎক্ষণাৎ সাড়া দেয়।
বিল্লি বলে, ম্যাঁও
জলদি করে
শুঁটকি পোড়া
আইন্যা মোরে দাও!
একটা চালের
কণা এনে
মুরগি বলে, ন্যাও।
মুরগি-বেড়ালের মেলায় আনন্দ উপভোগ করল শিশুরাই। লেখার মধ্যে যে দৃশ্য অংকন করেছেন লেখক, তা চোখের সামনে অপরূপ হয়ে ধরা দেয়। আবার ‘কোন মেয়েটা’ ছড়ায় দেখি:
কোন মেয়েটা রাগলে কথা কয় না?
-ময়না।
কোন্ মেয়েটার দু’চোখ ভরে কান্না?
-পান্না।
কোন মেয়েটা সবার চেয়ে ল²ী?
-পক্ষী।
প্রসাদগুণে এবং প্রত্যক্ষতার গুণে এ ছড়া যে জীবন্ত হয়ে উঠলো, তা অনস্বীকার্য। এখানে আত্মসচেতন বৈদগ্ধ্যের কিছুই নেই, অথচ মনকে ধরে আশ্চর্য ক্ষমতা বিদ্যমান। সরল কোমল ও উদার শিশুমন গড়ে তোলার কাজে আজীবন ব্রতী ছড়াশিল্পী রফিকুল হক। তার ছড়া ছোটদের মনকে সহানুভূতিশীল করে তোলে তেমন, তেমনি করে তোলে সংস্কারমুক্ত। তার রচনার মধ্য দিয়ে তিনি ভবিষ্যতে প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চান এমন বার্তা, যে বার্তা সহানুভূতির, স্পর্শ করে সকলের মন। ‘ঘুড়ি’ নামের এক ছড়ায় তিনি লিখেছেন :
ঘুড়ি বললো
‘উড়ি?
দূর আকাশে
দেখাই কারিকুরি?’

সুতো বললো
ওড়ো,
হাওয়ায় ভেসে
মনের সুখে ঝোরো!’

লাটাই বলে
‘দাঁড়া,
সুতো ছিঁড়লে
ঘুড়ির কম্ম সারা!’

নামলো হঠাৎ
বৃষ্টি গুঁড়ি গুঁড়ি
অমনি খতম
ঘুড়ির বাহাদুরি।

ঘুড়ির বাহাদুরির চিত্র আঁকতে গিয়ে লেখকের বাহাদুরিই প্রকাশ পেয়েছে লেখায়। মহত্তর জীবন ভাবনার প্রতিফলন ঘটেছে এখানে। বাস্তবের রূপ-রঙ স্বচ্ছন্দে ধরা পড়েছে সেখানে। আনন্দের সঙ্গে সাহসিকতার, আগ্রহের সঙ্গে প্রতিযোগিতার, কৌতূহলের সঙ্গে দুঃখের সংঘাত এখানে সক্রিয়। তবু অকৃত্রিম ও অনন্য সৃষ্টি কর্ম হিসেবে এটি বিবেচিত হবে নিঃসন্দেহে।
ছোটদের মনোজগৎ তার করায়ত্ত এবং শিশু-মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণে তিনি সচেতন ও যতœশীল বলেই তার সৃষ্টিসম্ভারে রয়েছে ছোটদের কোমল সুকুমার বৃত্তিগুলো বিকাশের উপযুক্ত উপাদান। কখনো তিনি প্রকৃতি ও প্রাণী জগতের নানা অন্তরঙ্গ ও বিশ্বস্ত ছবি উপহার দিয়েছেন, আবার কখনো মনোহারি ছন্দে ভুলিয়ে দিয়েছেন শিশুমন। ‘হালুম’ ছড়ায় দেখি:

হলদে রঙে
জলদি করে
আঁকতে গিয়ে বলদ,
ভাবছি বসে
হয়তো শেষে
থাকতে পারে গলদ।

হঠাৎ ছবির
মধ্য থেকে
বেরিয়ে এলো হালুম,
বলদ তো নয়
বাঘ ওটা যে
তক্ষুণি হয় মালুম।

রফিকুল হক একজন লোকজ-ঐতিহ্য ও সমাজসচেতন ছড়া-সাহিত্যিক। আহমাদ মাযহারের মতে, লোকায়ত ছড়া থেকে প্রেরণা নিয়ে প্রচুর স্বাতন্ত্র্যব্যক্তিত্ব আবৃত্তিযোগ্য ছড়া লিখেছেন রফিকুল হক। লোকছড়ার মতোই ধ্বনি চিত্রময়তা এবং রাজনীতি চেতনা তার ছড়ায় মেশামেশি হয়ে আছে।
১৯৪৭-এ ভারত বিভাগ তথা পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরুর আগে পর্যন্ত আজকের বাংলাদেশ নামে পরিচিত ভূখণ্ডটির চিন্তাচর্চার পরিচয় পাওয়া যায় বহু লেখকের রচনায়। ১৯৫২-এর ভাষা-আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন কিংবা ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যক্ষ প্রতিফলন লক্ষ করা যায় আমাদের বেশ কিছু ছড়া লেখকের সৃষ্টিসম্ভারে। এ সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বাভাস কোনো কোনো লেখক রচনায় বেশ স্পষ্ট। তার মধ্যে রফিকুল হক অন্যতম। ১৯৬৭ সালে তিনি লিখলেন একটি ছড়া। ছড়াটি এরকম:
ধা ধিন্্ ধিন্্ না
না তিন্্ তিন্্ না
হাসির দিন না
বাঁশির দিন না
না ঢাক না ঢোল
না খোল বীণ না।

তেড়ে কেটে ধিন
তেড়ে কেটে ধিন
খালি পেটে ধিন
ভারি সঙ্গিন।

তাক ধিনা ধিন
নাকতি নাতিন
বিশটা বছর
দেশটা স্বাধীন
হায়রে কপাল
আসলো যা দিন!

পাকিস্তান সৃষ্টির পর ২০ বছর ধরে দুর্যোগ-দুর্ভোগে দিন অতিবাহিত করার প্রসঙ্গটি তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন দুটো শব্দে : ‘হায়রে কপাল’। এর পরেই প্রশ্ন উত্থাপন করেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন লেখক রফিকুল হক : ‘আর কত হীন, কেঁদে কেটে দিন?’ এখানে লেখকের চিন্তার সঙ্গে মিশে গেছে তার শিল্পগুণ। স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন স্বাধীনতাযুদ্ধের আগেই, ১৯৬৭-এ।
আর সেই স্বাধীনতা আমরা কীভাবে পেলাম? এক নদী রক্ত পেরিয়ে, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে, হাজারো মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে। সেই প্রসঙ্গটি আমাদের প্রজন্মের কাছে রফিকুল হক তুলে ধরেছেন অত্যন্ত দক্ষতায়, সনিষ্ঠ আন্তরিকতায় এবং দেশপ্রেমের গভীরতায়।

নামতা গুনি,
নামতা গুনি
এক এক্কে এক
ইতিহাসের পাতায় এবার
নতুন কথা ল্যাখ।
দুই এক্কে দুই
দুঃখ কোথায় থুই।
তিন এক্কে তিন
ছিলাম পরাধীন

চার এক্কে চার
রক্ত পারাপার।

পাঁচ এক্্কে পাঁচ, আর
ছয় এক্কে ছয়
তিরিশ লক্ষ লাশের দামে
কিনে নিলাম জয়।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কিংবা আমাদের মহান স্বাধীনতা নিয়ে শিশু-কিশোর উপযোগী এর চেয়ে উৎকৃষ্ট রচনা আর হতে পারে?
অন্যদিকে, গর্কি ’৭০ ছড়াটি লিখে জীবিতকালেই রফিকুল হক পরিণত হয়েছেন কিংবদন্তিতে। লেখাটি সমসাময়িক দেশ-কাল-সমাজের ভাবনায় সম্পৃক্ত ও সমৃদ্ধ। লোকজ সুর ও স্বভাবগত সারল্যের কারণে ছড়াটি জায়গা করে নিয়েছে পাঠকের অন্তরে।
ছেলে ঘুমোলো বুড়ো ঘুমোলো
ভোলা দ্বীপের চরে
জেগে থাকা মানুষগুলো
মাতম শুধু করে।
ঘুমো বাছা ঘুমোরে
সাগর দিলো চুমোরে

খিদে ফুরোলো, জ¦ালা জুড়োলো
কান্না কেন ছি?
বাংলাদেশের মানুষ বুকে
পাষাণ বেঁধেছি!

রফিকুল হকের ছড়ার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো বিষয় ও প্রকাশভঙ্গির সামঞ্জস্য। তার ছড়ায় যে কোনো বিষয়ের সহজ, সরল ও সরস উপস্থাপন বেশ উপভোগ্য। আমি যখন তার ছড়া পড়ি, আমার মনে হয় আমি একটি রেলগাড়িতে চড়ে ভ্রমণ করছি। ‘পুঁ ঝিক্্ ঝিক্্/পুঁ ঝিক্ ঝিক্/ দেশ ঘুরবি/চল নির্ভীক। … হায় হায়রে / গাড়ি ধায়রে / ঝক্্ ঝক্কা / সব ফক্কা।’ অধিকাংশ ছড়ার শব্দে, বিষয়ে ও ছন্দে পাওয়া যায় লোকজ ছড়ার চিরন্তন আমেজ, সৌন্দর্য ও সারল্য।
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
বর্গি এসে দেশ ছেয়েছে
অনেক দিনের কথা
ঘাটতি আজও হয়নি পূরণ
তাই কি নীরবতা?

শালি ধানের চিড়ে
বিন্নি ধানের খই
উড়কি ধানের মুড়কি মুড়ি
ডালায় মা তোর কই?

এমনই বৈচিত্র্যে ভরা রফিকুল হকের ছড়াসম্ভার। তিনি কোমল ছোটদের মানসিক ও নৈতিক চরিত্র গঠনে অত্যন্ত সচেতন, তেমনি রচনাগুণে নিজেকে একজন দায়িত্বশীল লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট হয়েছেন। ব্যক্তিগত আবেগ-উচ্ছ¡াস, অনুভব-অনুভূতি ও স্নেহ-প্রীতির সঙ্গে লেখকসত্তার চমৎকার মেলবন্ধনে সৃষ্টি হয় তার এক একটি অপূর্ব ছড়া। তার রচনার বিষয়বৈচিত্র্য যেমন অসাধারণ, তেমনি ভাববৈচিত্র্যও অতুলনীয়। বৈচিত্র্যটা তার চিন্তা-চেতনায়, ভাষাশৈলী নির্মাণে, ছন্দ-সাযুজ্যে, শব্দ যোজনায়, লেখার আঙ্গিকে, সর্বোপরি অনন্য উপস্থাপনায়। তিনি লেখালেখিকে মনে করেন দায়িত্বের অংশ। তাই তিনি সব জায়গায় সজাগ, সচেতন ও যতœশীল।
পান্তা ভাতে ঘি, বর্গি এলো দেশে, নেবুর পাতা করমচা, ঢামেরিক, আমপাতা জোড়া জোড়া, সমকালীন ছড়া প্রভৃতি ছড়াগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি তুলে ধরেছেন নিজের স্বাতন্ত্র্যবোধ ও ঔজ্জ্বল্য। তার রচনাগুণেই তিনি অনন্য, সপ্রতিভ ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়