সারাদেশে পূজামণ্ডপে হামলা : চাঁদপুরে সংঘর্ষে নিহত ৩

আগের সংবাদ

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের টার্গেট কী? প্রথম ম্যাচে মাহমুদউল্লাহ-সাকিবের মাঠে নামা নিয়ে দোটানা

পরের সংবাদ

আমাদের দাদুভাই

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৫, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

আমাদের সবার প্রিয় দাদুভাই রফিকুল হক গত ১০ অক্টোবর মায়াময় পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন অনন্তলোকে। কিছু কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসেন কিছু উৎকৃষ্ট কর্ম রেখে যেতে। এই কিছু কিছু মানুষের মধ্যে দাদুভাই একজন। তার কর্মগুণ এবং ভালোবাসা বিস্তৃত হওয়ার কারণে রফিকুল হক নামটির সাথে দাদুভাই শব্দটি যুক্ত হয়ে সবার ভালোবাসা পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। রফিকুল হক নামটি সীমাবদ্ধ থাকেনি। তার নাম উচ্চারণ করতে রফিকুল হক দাদুভাই বলতে হয়। না হলে যেন ভালোবাসা এবং পরিচিতি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শিশুসাহিত্যে ও শিশুদের কল্যাণমূলক কাজে তার অবদান অনস্বীকার্য। এখানে এরকম আরেকজন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করতে পারি, তিনি রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই।
দাদাভাই এবং দাদুভাই দুজনেরই উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য ছিল একটি। শিশুগঠনে ভূমিকা রাখা এবং শিশুসাহিত্যের উন্নয়ন করা। রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই শিশু-কিশোর সংগঠন গড়ে তোলেন ‘কেন্দ্রীয় কচি-কাঁচার মেলা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে রফিকুল হক দাদুভাই শিশু-কিশোর সংগঠন গড়ে তোলেন ‘চাঁদের হাট’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরকে কেন্দ্র করে কচি-কাঁচার মেলা এবং দৈনিক পূর্বদেশের চাঁদের হাট পাতাকে কেন্দ্র করে চাঁদের হাট শিশু-কিশোর সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই শিশু-কিশোর সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল শিশুরা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-খেলাধুলা চর্চার মাধ্যমে সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। কেননা এই শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ, তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত হবে। সুতরাং ভিত পাকাপোক্ত ভাবে তৈরির দায়িত্ব নিয়েছিলেন তারা।
কচি-কাঁচার মেলার অনুরূপ রফিকুল হক দাদুভাই প্রতিষ্ঠিত চাঁদের হাট থেকেও অসংখ্য শিশু-কিশোর সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠেছে যারা সমাজ ও রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন। দাদুভাইয়ের এই কৃতিত্ব সাধারণ মানুষের মনেও আসন পেতে রেখেছে। এছাড়াও তিনি শিশুসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত। লিখেছেন অসংখ্য কবিতা, গান, নাটক, রূপকথা প্রভৃতি। শিশুসাহিত্যে অবদানের জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ছড়াকার হিসেবে রয়েছে তার ঈর্ষণীয় খ্যাতি। ‘বেঁচে থাকি’ শিরোনামে একটি ছড়ার উদ্ধৃতি করছি-

‘ধানের গাছের তক্তা দিয়ে
বাঁধছে যারা ঘর
সেই ঘরে যে ডিম পেড়েছে
সেও কি তাদের পর!
ডিম পেড়েছে শালিক পাখি
চড়–ই পাখির নানি
কুঁড়ে ঘরের ছোট্ট বাবুই
আমরা সে সব জানি।

ঝড় উঠবে ঘর পুড়বে
উড়বে শালিক পাখি
সেই দুদিনের পথ চেয়ে তো
আমরা বেঁচে থাকি।’

এরকম অসংখ্য প্রশংসনীয় ছড়া তার রয়েছে। তার ছড়ার বিষয়-বৈচিত্র্য, শব্দ বিন্যাস নতুনত্বের দাবিদার এবং দৃষ্টান্তযোগ্য। অধিকাংশ ছড়া সমাজসচেতনতা, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সমসাময়িক ঘটনা উপজীব্য করে রচিত। ছড়াসাহিত্যের ইতিহাসে দুটি ঘটনা আমাকে অবাক করেছে। একটি হলো- ১২ নভেম্বর ১৯৭০ সালে প্রবল সামুদ্রিক জলোচ্ছ¡াসে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলবর্তী স্থানে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানি, ঘরবাড়ি, গবাদিপশু বিলীন হয়ে যায়। এ বিষয় নিয়ে রফিকুল হকের একটি ছড়া তৎকালীন দৈনিক পূর্বদেশের সম্পাদকীয় হিসেবে প্রকাশিত হয়। অপরটি হলো- ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর চিকিৎসার জন্য লন্ডন গমন করেন। তখন রফিকুল হক ‘ঘরে ফিরা আইসো বন্ধু’ শিরোনামে একটি ছড়া লিখেন যেটা দৈনিক পূর্বদেশের প্রথম পাতায় বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ প্রকাশিত হয়। ছড়ার এমন প্রকাশনার নজির আর আছে কী না তা আমার জানা নেই।
রফিকুল হক শুধু ছড়া লিখেই প্রশংসিত হয়েছেন তা নয়। তার লেখা বেশ কিছু গান বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য একটি গান হলো- ‘নাইয়ারে নায়ের বাদাম তুইল্যা কোন দূরে যাও চইলা’। সেটি আবদুল আলীমের কণ্ঠে গীত হয়েছে এবং গ্রামে-গঞ্জে বহুল প্রচারিত ও প্রশংসিত হয়েছে। আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ‘নিথুয়া পাথার কান্দে’ শিরোনামে একটি নাটক ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
১৯৩৭ সালের ৮ জানুয়ারি জন্ম নেয়া আমাদের দাদুভাই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন সাংবাদিকতা। দৈনিক পূর্বদেশ ছাড়াও তিনি দৈনিক জনতা, দৈনিক রূপালী, দৈনিক আজাদ, দৈনিক লাল সবুজ, বাংলাদেশ অবজারভারসহ বিভিন্ন পত্রিকায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ ২০০৪ সাল থেকে তিনি দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় ফিচার এডিটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। রফিকুল হক তার শিশুসাহিত্যে অসামান্য কৃতিত্বের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার ছাড়াও পেয়েছেন ভারতের বিহারের রাজধানী পাটনায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন ‘স্ক্রোল অব অনার’, নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য বিশেষ সম্মাননা, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, চন্দ্রাবতী একাডেমি পুরস্কার প্রভৃতি।
ব্যক্তিগতভাবে পূর্ব পরিচয় থাকলেও রফিকুল হক দাদুভাইয়ের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হয় অনেক পরে। কচি-কাঁচার মেলা করার সুবাদে রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের সান্নিধ্য বেশি পেয়েছি। তার মৃত্যুর একযুগ পরে আনন ফাউন্ডেশন নামে একটি শিশু সংগঠন প্রতিষ্ঠা করি এবং সেই সময় থেকে দাদুভাইয়ের সাথে আমার সম্পর্কটা সুদৃঢ় হয়। আনন ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছেন এবং শিশুদের সাথে কথা বলেছেন। আনন ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে একজন মন্ত্রী অথবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেখানে দাদুভাইকে আমরা আনন ফাউন্ডেশনের ৬ষ্ঠ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সম্মান জানাতে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনি। ভালোবেসে তাকে আমি আমার একটি ছড়ার বই উৎসর্গ করি। আমার পারিবারিক অনুষ্ঠানেও তিনি সপরিবারে এসেছেন অনেকবার। এই স্মৃতিগুলো এখন বড় বেদনার হয়ে বুকে বাজছে।

সকল কৃতিত্ব, সকল অর্জন, সকল ভালোবাসা, সব কিছু রেখে আমাদের দাদুভাই চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। আমাদের চলায় বলায় তার কথা বারবার স্মরণে আসবে। আমরা মনে করি সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মান একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার প্রাপ্তির যোগ্য।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়