সারাদেশে পূজামণ্ডপে হামলা : চাঁদপুরে সংঘর্ষে নিহত ৩

আগের সংবাদ

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের টার্গেট কী? প্রথম ম্যাচে মাহমুদউল্লাহ-সাকিবের মাঠে নামা নিয়ে দোটানা

পরের সংবাদ

আফগানিস্তানের বর্তমান দুর্দশার দায় কাদের

প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ আপডেট: অক্টোবর ১৫, ২০২১ , ১২:০০ পূর্বাহ্ণ

আফগানিস্তানের শাসনভার হাতে নেয়া ও মন্ত্রিসভা গঠনের পর তালেবানদের ভূমিকা গণতন্ত্রী ও মানবিক হওয়া দূরে থাক, আরো স্ববিরোধী ও ঘোলাটে হয়ে উঠেছে তাদের একাধিক ঘোষণায় ও কর্মে। বিশেষ করে নারী সমাজের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে। শরিয়া আইন নিয়ে একমাত্র পাকিস্তান ছাড়া কারো সমর্থন পায়নি তালেবানি শাসন।
দেখে শুনে মনে হচ্ছে তাদের লক্ষ্য কোনো অজুহাতে, কোনোমতে বিশ্বশক্তির একাংশের হলেও সমর্থন আদায় করে নেয়া। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। না হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট কারণও রয়েছে। তাদের স্ববিরোধী আচরণ একটি দুটি নয়, অনেক। শুরুতে তাদের মুখপাত্র যেসব ভালো ভালো কথা বলেছিল, তাতে কারো কারো মন ভিজলেও আফগান শিক্ষিত নারীসমাজ ও গণতন্ত্রীরা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করেননি।
বিশেষত আফগান নারীরা ভোলেননি প্রথম পর্বে মোল্লা ওমর প্রভাবিত তালেবানদের শাসনকালের তিক্ত ঘটনাবলীর কথা। বিশ্ববাসী ভোলেনি বিশ্বের সর্বোচ্চ বুদ্ধমূর্তি ধ্বংসের কথা, নারী নিগ্রহ এবং গণতন্ত্রী নরনারী নিগ্রহ ও হত্যার কথা।
এবার তারা ধীরপায়ে কৌশলী পদক্ষেপে বিশ্বগণতন্ত্রীদের ফাঁকি দিতে চেয়েছে, যা ধোপে টেকেনি। না টেকার কারণ তাদের অগণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড। যে নিরপেক্ষ চরিত্রের আফগানিস্তানকে এতদিন বিশ্ববাসী দেখে এসেছে সেই আফগানিস্তানের চরিত্র তালেবানরা এবার আরো একপা এগিয়ে বদলে ফেলেছে। দেশটির নতুন নাম ইসলামিক এমিরেট (আমিরাত) অব আফগানিস্তান। জাতীয় পরিচয়পত্রও বদলে ফেলা হয়েছে। আমাদের একটি দৈনিকে সংবাদ শিরোনাম (২৯.৯.২০২১) পাসপোর্ট বদলে ফেলছে তালেবান। পরিবর্তনটা শুধু রাষ্ট্রীয় চরিত্র পরিচয় ও কাগজে-কলমে নয়, আরো ভয়ংকর শাসনতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে। আমাদের একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম পড়ে অনেকে শিউরে উঠবেন। ‘শাস্তি হিসেবে অঙ্গচ্ছেদ ফেরাচ্ছে তালেবান’ (২৫.৯.২০২১)।
ইতোপূর্বে আমরা বলেছি, তালেবানরা তাদের প্রথম পর্বের (১৯৯৬-২০০১) শাসনামলে হেন দুষ্কর্ম নেই যা করেনি। সে সুযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতার প্রকাশ ঘটায় তাদের অনুগত পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করে আফগানিস্তানে। এ ব্যবস্থা পছন্দ করেনি স্বাধীনচেতা আফগানরা। কিন্তু আফগান নারীরা শিক্ষা ও পেশাগত সুযোগ সুবিধার কারণে বিদেশি শাসনের বিরোধিতা করেনি।
তাই ব্যাপক বিরোধিতা ও সীমিত সমর্থন নিয়েই সামরিক শক্তির জোরে পরোক্ষ আফগানিস্তান শাসন করেছে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘ সময় ধরে। ভেতরে ভেতরে নিঃশব্দ সমর্থন নিয়ে এর মধ্যে শক্তি সঞ্চার করেছে নীরবে চতুর তালেবান নেতৃত্ব। মার্কিনি শাসনের চাপে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির বিকাশ ঘটেনি আফগানিস্তানে, ঘটতে দেয়নি মার্কিনি সাম্রাজ্যবাদ।
এর পরিণাম যেমন আফগান রাজনীতির জন্য শুভ হয়নি, তেমনি হয়নি মার্কিনিদের জন্যও। শেষোক্তের জন্য তাদের শাসনের পরিণাম ব্যুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়, যা তালেবানদের জন্য শক্তি বৃদ্ধির সহায়ক হয়ে ওঠে। ঘটতে থাকে একের পর আত্মঘাতী বিস্ফোরক বোমা হামলা মার্কিনি সেনাকেন্দ্রে বা অনুরূপ অন্যত্র। কিছুতেই, কোনো ব্যবস্থাতে কিংবা ড্রোন হামলায় তালেবানি হামলা থামানো যাচ্ছিল না। প্রাণহানি ঘটছিল লাগাতার মার্কিন মেরিন ও নাগরিকদের।
গতিক ভালো নয় বুঝে চতুর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তালেবানদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি সম্পন্ন করেন। উল্লেখ থাকে যে, তারা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে গোটা মার্কিন সেনাবহর প্রত্যাহার করবে। এটা শুধু তালেবানদের নয়, সাধারণ আফগান নাগরিকদেরও সুস্পষ্ট দাবি ছিল। স্বদেশে কোনো সুবিধার বিনিময়ে কেউ বিদেশি সেনার উপস্থিতি ও শাসন চায় না। এখানেই ছিল তালেবানদের পরোক্ষ শক্তি।
ট্রাম্পের শাসনামল পেরিয়ে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে ‘আফগানিস্তান ছাড়’ এ দাবি আরো জোরালো হয়ে ওঠে। বাইডেন তাই জেনারেলদের দাবি ও চাপ উপেক্ষা করে ট্রাম্প স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি দ্রুত কার্যকর করেন। সমর্থক আফগানের (বিশেষত নারীদের) অভিযোগ তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা না করে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার বিশ্বাস হননের শামিল। তাদের নেকড়ের মুখে ফেলে মার্কিনিরা পালিয়ে গেল।
পেন্টাগন অবশ্য পরে স্বীকার করেছে যে, আফগানিস্তানে তাদের হার হয়েছে। কিন্তু প্রাথমিক ভুলটা স্বীকার করেনি। ইতোমধ্যে নতুন বিপদ- আইএসের হামলা, যাদের বিরুদ্ধে তালেবানদের লড়তে হচ্ছে।
\ দুই \
আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চরম জটিলতায় নিক্ষিপ্ত। তেমনি সামাজিক অর্থনৈতিক অবস্থা। দেশটিকে চরম দুর্দশায় ফেলে দিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং পাকিস্তানের সমর্থন নিয়ে তালেবান, আলকায়েদা প্রভৃতি ধর্মীয় মৌলবাদী জঙ্গি সশস্ত্র গোষ্ঠী। এর মধ্যে নাম ঢোকাতে চাচ্ছে নিষ্ঠুর আইএস। পাকিস্তান চাচ্ছে আফগানিস্তানে তাদের পছন্দসই শরিয়ানীতি-ভিত্তিক ইসলামি রাষ্ট্র- আধুনিক ইসলাম তাদের পছন্দের নয়। ক্ষুব্ধ ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ একাধিক গণতান্ত্রিক দেশ ও পরাশক্তি।
আমাদের একটি দৈনিকে সংবাদ শিরোনাম : ‘আফগানিস্তানে পাকিস্তানের ভূমিকায় সতর্ক কোয়াড’। কোয়াড মানে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, জাপান- এই চার রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সহযোগিতা জোট। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে তালেবানকে ৫ শক্তির চাপ সামলাতে হচ্ছে। স্বীকৃতি দূর অস্ত। অথচ আফগানিস্তানের তালেবানি শাসন চাইছে তাদের স্বীকৃতি। কিন্তু সমস্যা হলো, একদিকে তারা চাইছে বিশ্ব শক্তির স্বীকৃতি, যেজন্য তাদের স্ববিরোধী ভূমিকা। একদিকে তারা বলছে মেয়েরা স্কুলে যাবে, অন্যদিকে চলছে নারী নিগ্রহ এবং সমাজে নারীর শরিয়া নীতিমাফিক অবস্থান। এছাড়া চেষ্টা আফগানিস্তানকে কট্টর ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করা। স্বভাবত বাংলাদেশসহ বিশ্বের গণতন্ত্রী দেশগুলো স্বীকৃতির প্রশ্নে ‘অপেক্ষা কর এবং দেখ’- এই নীতি অবলম্বন করছে। বাংলাদেশ যেন ভুলে না যায় যে, তালেবানসহ ধর্মীয় মৌলবাদী শক্তির আফগানিস্তান আগ্রাসনের প্রথম পর্বে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ বাঙালি তরুণদের কণ্ঠে সেøাগান উঠেছিল, ‘বাংলা হবে আফগান’। তখন বাংলাদেশ অবশ্য জঙ্গিদের সম্পর্কে কঠিন অবস্থান নিতে ভুল করেনি।
আমরা চাই এ ব্যাপারে বাংলাদেশ বরাবর কঠিন অবস্থানে থাকুক, জঙ্গিবাদ নির্মূল অভিযান অব্যাহত থাকুক। লক্ষ্য করার বিষয় একটি সংবাদ শিরোনাম : ‘তালেবানকে নিষিদ্ধের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটররা’ (২.১০.২০২১)। এ ব্যাপারে রিপাবলিকান সিনেটররাও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে এক সারিতে। সবার সতর্ক দৃষ্টি এখন চীন ও রাশিয়ার দিকে। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে তারা কি এ ব্যাপারে অগণতান্ত্রিক ভিন্নমত প্রকাশ করবে।
তবে এটা ঠিক যে আফগানিস্তানে তালেবান ও মার্কিনি শাসন দেশটিকে চরম রাজনৈতিক নৈরাজ্য ও অর্থনৈতিক দুর্দশার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। তাই একদিকে আফগাস্তিান থেকে অসহায় শরণার্থীদের দেশ ত্যাগ, অন্যদিকে স্থানীয়দের অর্থনৈতিক দুর্দশা। তালেবানরা অর্থনৈতিক বিপর্যয় সামাল দিতে পারছে না। তাই তালেবানদের আপ্রাণ চেষ্টা বিশ্ব শক্তির স্বীকৃতির জন্য। এসবই মার্কিনি রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মৌলবাদের ক্ষমতা লিপ্সার পরিণাম।
আফগান নাগরিকদের দুর্দশার প্রতীক একটি দৈনিকের সংবাদ শিরোনাম : ‘সম্পদে ধনী আফগানরা যখন দরিদ্র’ (২.১০.২০২১)। ধনীদেরই যখন এই অবস্থা, তখন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত আফগানদের কথা না বললেও চলে। এ অবস্থার দায়ভাগে একটি প্রতিবেদন পড়েছিলাম- যার শিরোনাম ‘আফগানিস্তানের এ অবস্থার জন্য দায়ী কে?’ এ সস্পর্কে মন্তব্য নি®প্রয়োজন। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত সচেতন পাঠকমাত্রেই এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে নিতে পারবেন।
আহমদ রফিক : লেখক, গবেষক ও ভাষাসংগ্রামী।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ভোরের কাগজ লাইভ এর দায়ভার নেবে না।

জনপ্রিয়