ঋণের সুদ নিয়ে ভাববেন না : প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২০

** সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সব স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকবে ** কৃষি উৎপাদন বাড়াতে মনোযোগ বাড়ানোর ওপর জোর ** ৬৪ জেলাতেই আইসিইউয়ের ব্যবস্থা করা হবে **

কাগজ প্রতিবেদক : করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, স্কুল-কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটাও আমরা এখন খুলব না। করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে অন্তত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্কুল-কলেজ সবই বন্ধ থাকবে। কাজেই যখন এটা থামবে, আমরা তখনই খুলব।

গতকাল সোমবার গণভবন থেকে রাজশাহী বিভাগের ৭টি জেলায় ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। গণভবন প্রান্তে ভিডিও করফারেন্সের সঞ্চালনা করেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব আহমেদ কায়কাউস। গতকালের সংযুক্ত জেলাগুলো হলো- জয়পুরহাট, বগুড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নওগাঁ ও নাটোর। এ সময় জেলা প্রশাসক, জনপ্রতিনিধি, সিভিল সার্জন, পুলিশ সুপার, সেনা কর্মকর্তা, ইমাম ও সাংবাদিকদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সবাইকে এখন এক হয়ে কাজ করতে হবে। করোনা মোকাবিলায় যারা দিন-রাত পরিশ্রম করছেন তাদেরও সহযোগিতা করতে হবে। সবাই মিলেই আমরা এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাব ইনশাআল্লাহ।

রাজশাহী বিভাগের জেলাগুলোতে করোনা রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুব ভালো একটা জিনিস দেখলাম। এই জেলাগুলো এখনো সেই রকম সংক্রমিত হয়নি, যথেষ্ট ভালো আছে। এটা ধরে রাখতে হবে। যেন আর কেউ সংক্রমিত না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে নজর দেবেন।

সরকারি কোষাগারে ভিক্ষার ১০ হাজার টাকা দেয়ায় শেরপুরের ভিক্ষুক নাজিমউদ্দিনের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়েছে। একজন ভিক্ষুক ভিক্ষাবৃত্তি করে খায়। একটা সাধারণ মানুষ, একসময় কৃষি কাজ করতেন। এক্সিডেন্ট করে তার পা ভেঙে যায়।

তারপর আর কাজ করতে পারেননি। ভিক্ষা করে জীবন চালান। এভাবে ভিক্ষা করে করে মাত্র ১০ হাজার টাকা তিনি জমা করেছিলেন থাকার ঘরটা ঠিক করবেন বলে। একটা মাত্র পাঞ্জাবি, ছেঁড়া কাপড় গায়ে। তার ঘরে খাবারও ঠিকমতো নেই। কিন্তু তারপরও সেই মানুষটা জমানো ১০টি হাজার টাকা তুলে দিয়েছেন করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য। আমি মনে করি, সারাবিশে^ তিনি একটা মহৎ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। ওই টাকা দিয়ে আরো দুইটা জামা কিনতে পারতেন। খাবার কিনতে পারতেন। নিজের জন্য অনেক কিছু চিন্তা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। এই যে একটা মহৎ উদারতা দেখালেন। এত বড় মানবিক গুণ আমাদের অনেক বিত্তশালীর মাঝেও দেখা যায় না। অনেক সময় দেখি, অনেক বিত্তশালী হা-হুতাশ করেই বেড়ায়। তাদের নাই নাই অভ্যাসটা যায় না। চাই চাই ভাবটাই সবসময় থেকে যায়।

মসজিদে সীমিত আকারে নামাজ পড়ার কথা উল্লেখ করে দেশের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সবাইকে বলব, ঘরে বসে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন। রমজানে আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, যাতে বাংলাদেশ এই দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশ মুক্তি পায়। সারা বিশ্বের মানুষ যেন মুক্তি পায়। আর যেন এভাবে মানুষের জীবন ক্ষয় না হয়। আশা করছি, এই অবস্থাটা থাকবে না। এই দুঃসময় আমরা কাটিয়ে উঠব। আবার আমাদের সব শিল্প-কলকারখানা চালু হবে। দেশের অর্থনীতি সচল হবে।

সংকট মোকাবিলায় কৃষি উৎপাদনের প্রতি মনোযোগ বাড়াতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাসহ বিশেষজ্ঞরা মন্দা বা দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা করছেন। এজন্য আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। বেশি করে খাদ্যশস্য ফলাতে হবে। কারণ কৃষি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কৃষি থেকে খাদ্যশস্য, সবজি, মসলা, মাছ-মাংস সবই পাওয়া যায়। কৃষিতে মনোযোগ দিন। আপনারা কৃষি উৎপাদন বাড়ান। তাতে আমরা নিজেরা যেমন খেতে পারব, অন্যদেরও সাহায্য করতে পারব।

ঋণের সুদ নিয়ে ব্যবসায়ীদের চিন্তা না করার অভয় দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, যারা ইতোমধ্যে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেছেন, করোনায় সবকিছু বন্ধ থাকায় আপনাদের তো ঋণের সুদ হয়ে গেছে, সেটার জন্য চিন্তা করবেন না। কারণ এই সুদ এখনই নেয়ার কথা না। এ বিষয়ে আমি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করব। সুদগুলো যাতে স্থগিত থাকে এবং পরবর্তীতে কতটুকু মাফ করা যায় আর কতটুকু দিতে পারেন সেটা বিবেচনা করা হবে। কাজেই সেটা নিয়ে কেউ দুশ্চিন্তায় ভুগবেন না। এইটুকু বলব, আমাদের সব থেকে বড় কথা, মানুষকে বাঁচিয়ে রাখা আর আমাদের জীবন জীবিকার পথটা উন্মুক্ত রাখা।

বগুড়া জেলায় মতবিনিময়ের সময় করোনা ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য নতুন করে আরো দুই হাজার ডাক্তার ও ছয় হাজার নার্স নিয়োগ দেয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই চিকিৎসক ও নার্সদের করোনা চিকিৎসার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। ইতোমধ্যে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে যারা রয়ে গেছেন তাদের থেকে আমরা নিচ্ছি। ছয় হাজার নার্সও নিয়োগ দেব। প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। এদের করোনার বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। বিদেশ থেকে লোক এনেও আমরা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাব। পর্যায়ক্রমে ৬৪ জেলাতে এটা করা হবে। যাতে কোনো জায়গায় মানুষের চিকিৎসার অসুবিধা না হয়। এছাড়া প্রত্যেক জেলায় আমরা আইসিইউর ব্যবস্থা করব। আমরা স্বাস্থ্যসেবাটার দিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিচ্ছি। প্রত্যেক জেলাতেই কিন্তু যেটা ভালো হাসপাতাল, সেখানে আইসিইউর ব্যবস্থা করব।

ভিডিও কনফারেন্সে পাবনা জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বলেন, মে মাসের চার বা পাঁচ তারিখে রূপপুর প্রকল্পে আরো ১৬২ জন বিদেশি আসবেন। তাদের ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে দুটি ভবন প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এরপর প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাশিয়ায় আবার নতুন করে করোনার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এজন্য রূপপুর প্রজেক্টে যারা আসবেন তাদের আগে কোয়ারেন্টাইনের ব্যবস্থা করতে হবে। কোয়ারেন্টাইন শেষ হলে কাজে লাগাতে হবে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj