টাকা ছাপানোই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের শেষ অস্ত্র : পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মত বিশেষজ্ঞদের

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২০

মরিয়ম সেঁজুতি : করোনা ভাইরাসে টালমাটাল বিশে^র প্রায় সবগুলো দেশের অর্থনীতি। তারপরও অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখতে বিশে^র বিভিন্ন দেশের সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এই মুহূর্তে নতুন মুদ্রা ছাপিয়ে সরকারকে অর্থ জোগান দিচ্ছে বিশে^র অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রান্তিক পর্যায়ের দরিদ্র মানুষের হাতে টাকার সরবরাহ বাড়াতে বাংলাদেশ এবং ভারতের মতো দেশগুলোকেও বেশি করে টাকা ছাপানোর পরামর্শ দিয়েছেন নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে নতুন টাকা ছাপানোর ব্যাপারে একমত নন বাংলাদেশের অনেক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, আমি মনে করি, এখনো টাকা ছাপানোর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। তিনি বলেন, নতুন টাকা ছাপানো দরকার হয় তখন, যখন অন্য সব রকম ব্যবস্থা শেষ হয়ে যায়। আমরা কিছু বিদেশি সাহায্য ইতোমধ্যে পেয়েছি। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে, বড় কয়েকটি প্রকল্প এডিপি থেকে বাদ দিয়ে সেই টাকাটা ফিরিয়ে আনা হবে। এসব থেকে টাকা এনেও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তবেই নতুন টাকা ছাপানোর আলোচনা হতে পারে। তিনি বলেন, নতুন টাকা ছাপানোটা ভালো ব্যবস্থাপনা না। এটা হলে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে। কোনো জিনিসপত্রের দাম ঠিক থাকবে না এবং এতে করে গরিবরাই আহত হবে বেশি।

মূলত চাহিদা যখন তীব্র হয় কিন্তু সেই তুলনায় অর্থের জোগান কম থাকে; তখনই টাকা ছাপিয়ে ভারসাম্য তৈরি করে সরকার। তবে টাকা ছাপানো অর্থ শুধু কাগজে নোটের সরবরাহ বাড়ানোই নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে সরকারের যে ৪টি অ্যাকাউন্ট আছে, সেখান থেকে অর্থ নেয়াকেও টাকা ছাপানো বলে। অ্যাকাউন্টগুলো হচ্ছে- ওভার ড্রাফট, ব্লুক ওভারড্রাফট, ওয়েজ এন্ড মিনজ বা ডব্লিউএএম এবং ট্রেজারি বন্ড। সংকটের সময় অ্যাকাউন্টগুলো থেকে দ্রুত অর্থ তুলে মানুষের চাহিদা পূরণ করা হয়, যা টাকা ছাপানো নামে পরিচিত। তবে টাকা ছাপানোর বিপদ অন্য জায়গায়। বাজারে যদি পণ্য সরবরাহ সীমিত থাকে এবং মানুষের হাতে অর্থ বেশি চলে যায় তখন মূল্যস্ফীতি হয়। টাকা থাকলেও পণ্য পাওয়া যায় না। পৃথিবীর অনেক দেশেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে টাকা থাকা সত্ত্বেও পণ্য পাওয়া যায় না।

করোনার এই দুর্যোগে বাংলাদেশের টাকা ছাপিয়ে দরিদ্র মানুষদের কাছে সরবরাহ করার ক্ষেত্রে ধু¤্রজাল তৈরি হয়েছে। করোনার সময় অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলো টাকা ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা এখনো সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এর কারণ উন্নত দেশগুলোয় ব্যাংকগুলোর জন্য নীতি-নির্ধারণী সুদহার শূন্য বা শূন্যের কাছাকাছি। ওই সব দেশের নীতি ছাড়ের কোনো সুযোগ না থাকায় তারা টাকা ছাপাতে বাধ্য। কিন্তু বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশে নীতি ছাড় দিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, উন্নত দেশগুলোর নীতি সমর্থন দেয়ার সুযোগ নেই। তাই তারা সরাসরি টাকা ছাপাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সমর্থন দেয়ার অনেক সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ সবটুকু ব্যবহার করার পর টাকা ছাপানোর প্রশ্ন আসবে। তবে বিশ^ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, টাকা ছাপিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে দরিদ্র কোটি মানুষের হাতে অর্থ তুলে দেয়া দরকার। যেহেতু এখন সরকারের হাতে টাকার তীব্র সংকট, তাই এটাই উত্তম পন্থা। তিনি বলেন, বাজারে এখন পর্যাপ্ত পণ্য রয়েছে, তাই টাকা মানুষের হাতে গেলে পণ্যের সংকট হবে না। মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিরও শঙ্কা নেই। পরে বিকল্প উৎস থেকে অর্থের সংস্থান হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিলে হবে। কিন্তু এই মুহূর্তে টাকা না ছাপানোর পক্ষে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, টাকা ছাপানোর এখনো সময় আসেনি। এখন সরবরাহের ক্ষেত্রে ডিপ্রেশন রয়েছে, মানুষের চাহিদা নেই। এ সময় মানুষের হাতে টাকা দিলে মূল্যস্ফীতি হবে। এখন বিশ^ব্যাংক, আইএমএফ, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান থেকে সাহায্য আনাই উত্তম। সুতরাং টাকা ছাপানোর আগে অনেক চিন্তা-ভাবনা করা দরকার।

আর সিপিডির বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজারে তারল্য বাড়ানোর চেষ্টা সরকার করছে। প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে নীতি ছাড় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থ সংকট কাটাতে টাকা না ছাপিয়েও বিকল্প অনেক ব্যবস্থা রয়েছে। উন্নয়ন কর্মসূচির বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন স্থগিত রাখাসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে টাকার সরবরাহ বাড়ানো যায়।

এদিকে টাকা ছাপানোকে শেষ অস্ত্র হিসেবে দেখছেন গবেষণা সংস্থা সানেম-এর নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। ভোরের কাগজকে তিনি বলেন, সরকারের যে বিভিন্ন অপ্রয়োজনীয় খরচ আছে, বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা, বাজেটে যে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো আছে- সেগুলোকে অবিলম্বে স্থগিত বা বাতিল করা দরকার। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সংস্থার ঋণ নেয়া যায়। তৃতীয় উপায় হিসেবে আছে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ। শেষ উপায় হিসেবে টাকা ছাপানোর পক্ষে এই অর্থনীতিবিদ।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj