ধান ব্যাংক

রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২০


এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে পুরো মে মাস পর্যন্ত বোরো ধান কাটার মৌসুম। সাধারণত হাওর অঞ্চলে সবার আগে ধান কাটা শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে মে মাসের শেষ পর্যন্ত এই ধান কাটা চলতে থাকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী এ বছর সারাদেশে ৪৭ লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। এখন পর্যন্ত মাঠে ফসলের অবস্থা ভালো। কৃষক ভালো ফলন আশা করছে। আবহাওয়াসহ সবকিছু অনুক‚ল থাকলে এ বছর ২ কোটি টন ধান পাওয়া যেতে পারে।

এদিকে মহামারি করোনা ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে সারা বিশে^র মতো বাংলাদেশেও যানবাহন, অফিস, আদালত, স্কুল-কলেজ সব কিছু বন্ধ। এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে। আবার অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রধান ফসল বোরো ধান পাকছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সরকার বিশেষ বিবেচনায় ইতোমধ্যে হাওর অঞ্চলে কম্বাইন্ড হারভেস্টারসহ ধান কাটা-মাড়াইয়ের যন্ত্র পাঠাচ্ছে। এসব কৃষি যন্ত্রপাতি কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করার জন্য মোট মূল্যের অর্ধেকেরও বেশি ভর্তুকি দেয়া হচ্ছে। কৃষি শ্রমিকদের যাতায়াতে কড়াকড়ি শিথিল করা হচ্ছে, যাতে করে কৃষক ও কৃষি শ্রমিকরা নিজেদের নিরাপদ দূরত্বে রেখে সঠিক সময়ে এবং দ্রুততার সঙ্গে ধান ঘরে তুলতে পারে। এখন শিলাবৃষ্টিসহ ঝড়-তুফানের মৌসুম। সুতরাং সর্বনাশ হওয়ার আগেই যেন কৃষক তার কাক্সিক্ষত ফসল ঘরে তুলতে পারে।

কৃষক ধান ঠিকমতো ঘরে তুলতে পারলেও দুশ্চিন্তা থেকেই যায়। উৎপাদিত ধানের সঠিক বাজারমূল্য পাবে তো! গত কয়েক বছরের বাজার পরিসংখ্যান কৃষকদের মোটেই অনুক‚ল নয়। অনেক ক্ষেত্রেই কৃষকরা ৫০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে, যেখানে উৎপাদন খরচই ৭০০-৮০০ টাকারও বেশি। কৃষক যাতে ধানের সঠিক মূল্য পায়, সেজন্য এ বছর বাংলাদেশ সরকার ২৬ টাকা কেজি দরে ৬ লাখ টন ধান সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করবে। এছাড়া মিল মালিকদের কাছ থেকে ১১ লাখ ৫০ হাজার টন চাল সরকার ক্রয় করবে। যদিও এই চাল ক্রয়ের বিষয়টি কৃষকদের সরাসরি কোনো উপকারে আসবে না। যেখানে কৃষক ২ কোটি টনেরও বেশি ধান উৎপাদন করছে, সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে ন্যায্যমূল্যে মাত্র ৬ লাখ টন ধান ক্রয় করলেই কি ধানের বাজারে এর প্রভাব পড়বে! কৃষক কি বাকি ধানের ন্যায্যমূল্য পাবে! যদি না-ই পায়, তাহলে এর সমাধান কোথায়! খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই কৃষিকে বাঁচাতে হবে। আর কৃষিকে বাঁচাতে হলে সবার আগে কৃষককে বাঁচতে হবে।

দেখা গেছে, ধান কাটার সঙ্গে সঙ্গেই কৃষক ধান বাজারজাত করছে। কারণ ধান বিক্রি করে তাকে দেনা শোধ করতে হবে। শ্রমিকের খরচ দিতে হবে। সারের মূল্য শোধ করতে হবে। সেচের খরচ দিতে হবে। সে কারণে বাংলাদেশের সব প্রান্তের কৃষক যখন তাদের হাজার হাজার মণ বোরো ধান বিক্রির জন্য বাজারে নিয়ে যায়, বাজারে ধানের মূল্যে ধস নামে। আর এই সুযোগে ফড়িয়া এবং মিল মালিকরা অত্যন্ত কম মূল্যে কৃষকের কষ্টার্জিত ধান ক্রয় করে তাদের গোলা ভর্তি করে। এরপর যখন ২-৩ মাস পরে ধানের দাম বাড়তে থাকে, তখন ফড়িয়ারা সুযোগ বুঝে তা বিক্রি করে বিশাল অঙ্কের টাকা মুনাফা করে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কৃষকরা যদি কোনো না কোনোভাবে তাদের এই উৎপাদিত ধান ২-৩ মাস ঘরে রাখতে পারত তাহলে কি এই কৃষকরা তাদের ধানের উপযুক্ত মূল্য পেত! এটা ঠিক, গরিব কৃষকের বাড়িতে ধান রাখার মতো অত জায়গা বা অত বড় গোলা ঘর নেই। আবার এটাও ঠিক যে, কৃষককে ধান বিক্রি করেই তার দেনা শোধ করতে হবে। শ্রমিকের খরচ, সারের খরচ, পানির খরচ, কীটনাশকের খরচসহ যাবতীয় খরচ এই ধান বিক্রি করেই শোধ করতে হয়। আর সেজন্যই এই কৃষককে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ধান বিক্রি করতে হয়। কোটি টাকার মালিকরা তাদের ঋণের টাকা শোধ না করলেও, এই কৃষকদের দেনা তাদেরই শোধ করতে হবে এবং তারা তা করেও।

আমরা কি এ অবস্থা উত্তরণে ধান ব্যাংক কার্যক্রম চালু করতে পারি! আরডিআরএসে থাকাকালে আমরা মঙ্গা নিরসনে রংপুরে ধান ব্যাংক কার্যক্রম চালু করেছিলাম। সেখানে গরিব কৃষি শ্রমিকদের আশি^ন-কার্তিক মাসে মঙ্গার সময়ে কাজের অভাবে না খেয়ে থাকতে হতো। তারা ওই সময়ে অর্থাৎ আশি^ন-কার্তিক মাসে ধান ব্যাংক থেকে ধান পেত এবং মঙ্গার সময়ে খেতে পারত। পরবর্তী সময়ে ধান কাটার মৌসুমে ওই কৃষি শ্রমিক সমপরিমাণ ধান একইভাবে ধান ব্যাংকে রাখত। এর ফলে ওই কৃষি শ্রমিক বা তার পরিবারকে কম মূল্যে আগাম শ্রম বিক্রি করতে হয়নি। মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়নি। কম মূল্যে ছাগল-মুরগি বিক্রি করে ক্ষুধা নিবৃত করতে হয়নি। আমার সেই বেশ কয়েক বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকেই বোরো মৌসুমে ধান ব্যাংকের এই ধারণা।

আমরা জানি বাংলাদেশে প্রতিটি গ্রামেই কমবেশি অবস্থাপন্ন কৃষক আছেন এবং তাদের গোলাঘর বা ধান রাখার ঘর আছে। তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে নিজ গ্রামে কৃষকের কল্যাণে সেটিকে ধান ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করতে দিতে পারে। আবার অনেক গ্রামে বেশকিছু অব্যবহৃত স্থাপনা আছে। যেটিকে সংস্কার করে ধান রাখার জন্য গোলাঘর বা ধান ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র উপক‚ল অঞ্চলে অনেক সাইক্লোন শেল্টার আছে, সেখানের একটি কক্ষকেও ২-৩ মাসের জন্য ধান ব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার সমাজের অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরাও ধান ব্যাংক করার জন্য এগিয়ে আসতে পারে। আবার ব্র্যাক, আরডিআরএসসহ সারাদেশে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য স্থাপনা আছে, সেগুলোকেও সংস্কার করে ধান ব্যাংক করা যেতে পারে।

গ্রামের ৫০ থেকে ১০০ পরিবার একজোট হয়ে এ ধরনের ধান ব্যাংক করার উদ্যোগ নিতে পারে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং স্থানীয় প্রশাসন এই উদ্যোগকে সহায়তা করতে এগিয়ে আসতে পারে। বন্যায় তলিয়ে যাবে না এমন স্থানকে ধান ব্যাংক বাস্তবায়নে নির্বাচন করতে হবে। প্রতিটি কৃষক পরিবারের থেকে একজন সক্রিয় কৃষক এই ধান ব্যাংকের সদস্য হবেন। এই সদস্যরাই মূলত ধান ব্যাংকের প্রকৃত মালিক হবেন। সদস্যরা নিজেদের মধ্য থেকে ৩-৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি নির্বাহী কমিটি করবে এবং তারাই ধান ব্যাংকটি পরিচালনা করবে। এই কমিটি একজনকে নিয়োগ করবে, যিনি ধান ব্যাংকের দৈনন্দিন দেখভাল করবেন। ধান ব্যাংকটির সংস্কার, পরিচালনার খরচ ইত্যাদি ধান ব্যাংকের সদস্যরা তাদের ধান রাখার পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে আর্থিক সহায়তা করবেন। ধান ব্যাংকটি ব্যবহারের জন্য ওই ঘরের মালিককে কিছু অনুদান দিতে হতে পারে। সে খরচও একইভাবে সংশ্লিষ্ট কৃষক সদস্যরা বহন করবেন। তবে এক্ষেত্রে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা স্থানীয় প্রশাসন বা ইউনিয়ন পরিষদ সহায়তার হাত বাড়াতে পারে। আবার সমাজের অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরাও নিজ এলাকায় ধান ব্যাংক করার জন্য এগিয়ে আসতে পারে, যা অন্য সময়ে এলাকায় ক্লাব ঘর বা জনহিতকর কোনো কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যেতে পারে, ধান ব্যাংকে ধান সংরক্ষণ করার জন্য প্রতি কেজি ধানের জন্য সর্বোচ্চ ২-৩ টাকা খরচ হয়। আর ধান ব্যাংক থেকে ধান বিক্রি করে প্রতি কেজি ধান থেকে ১০-১৫ টাকার অধিক মুনাফা ঘরে আসে। তাই কোনো কৃষক যদি ১ টন বা ১ হাজার কেজি ধান ধান ব্যাংকে রাখে, তাহলে ধান ব্যাংকে রাখার জন্য তার নিট মুনাফা হবে ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। শুধু বোরো মৌসুমে নয়, ধান ব্যাংকের এই কার্যক্রমটি আমন মৌসুমেও করা যেতে পারে। আমরা আশা করি, বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বোরো ধানের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে এর উপযোগিতা বিশ্লেষণ করবে। অন্তত পাইলট প্রোগ্রামের আওতায় এ বছর কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে ধান ব্যাংক কার্যক্রমটি গ্রহণ করতে পারেন।

ড. এম জি. নিয়োগী : ডেপুটি প্রজেক্ট লিডার, ইউনির্ভাসিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj