সাক্ষাৎকার : মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম > পরিস্থিতি মোকাবিলায় দরকার সর্বদলীয় ঐক্য

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২০

ঝর্ণা মনি : বিশ^জুড়ে ছড়িয়ে পড়া মহামারি করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯ এর ভয়ঙ্কর থাবা বাংলাদেশকেও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে মন্তব্য করে কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এ জন্য সর্বদলীয় ঐক্য প্রয়োজন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে যার যা কিছু ছিল তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবিলায় আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। এখন পরিস্থিতি আরো অনেক বেশি ভয়াবহ। সরকারের ওপর ভরসা করে তাকিয়ে থাকার কোনো সুযোগ নেই। যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। গতকাল শুক্রবার ভোরের কাগজকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকারে তার দল, সরকারের করণীয় সম্পর্কে কথা বলেন সেলিম।

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, এখন বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য জনগণকে নিজেদের আত্মরক্ষার পথ নিজেদেরই বেছে নিতে হবে। গ্রামে গ্রামে আত্মরক্ষা কমিটি গড়ে তুলতে হবে। বাইরের কাউকে গ্রামে ঢুকতে দেয়া যাবে না। এদিকে এখন ধান কাটার মৌসুম। এ বিষয়েও ভাবতে হবে। চিকিৎসক, কবিরাজসহ গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্যোগে গ্রাম রক্ষা আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তিনি বলেন, চীন, কিউবা, ভিয়েতনামের কাছ থেকে করোনা মোকাবিলার শিক্ষা নিয়ে মানুষের মৌলিক মানবিক চাহিদার দিকে নজর দিতে হবে। আমাদের নতুন পথে চলতে হবে। যে পথ আমরা একাত্তরে যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছিলাম।

সরকারের কঠোর সমালোচনা করে সিপিবি সভাপতি বলেন, করোনা মোকাবিলার কোনো প্রস্তুতি নেয়নি বাংলাদেশ। সময় পেয়েছিল প্রচুর। কিন্তু খামাকা কালবিলম্ব করেছে। প্রশাসন, রাষ্ট্রযন্ত্র, সরকারের একাগ্রতা, মনোযোগের চূড়ান্তভাবে অভাব ছিল। টেস্টিং কিট, সরঞ্জাম সরবরাহ করেনি। চিকিৎসকদের সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এর কোনো সদুত্তরও নেই! দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য খাতের সমালোচনা করে সেলিম বলেন, মহামারি মোকাবিলা করা দূরের কথা; সাধারণ অসুখ সারানোর মতো অবস্থাই আমাদের নেই। একদিকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রাইভেটাইজেশনের ভিত্তিতে পরিচালিত এবং অদক্ষ। অন্যদিকে বাজেটে স্বাস্থ্য খাত অবহেলিত। দুঃখজনকভাবে এই খাতে অপ্রতুল বরাদ্দ। এই বরাদ্দ দিয়ে দেশের স্বাভাবিক স্বাস্থ্যসেবা সামলানো সম্ভব নয়।

সামাজিক দূরত্ব নয়, প্রয়োজন সামাজিক বন্ধন মন্তব্য করে সিপিবি প্রধান বলেন, করোনা ভাইরাসের কোনো চিকিৎসা নেই। বিশ^জুড়ে লাখে লাখে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলা হচ্ছে। তবে আমি বলি, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে প্রয়োজন সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করা। কারণ এই মহামারিতে সামাজিক বন্ধন, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাইকে সবার পাশে দাঁড়াতে হবে। মানুষকে বাঁচাতে হবে। দূরত্ব হবে শরীর থেকে শরীরের। মন থেকে মনের নয়।

দরিদ্র-শ্রমজীবী মানুষকে বাঁচাতে সরকার ইতোমধ্যেই প্রায় এক লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা দিয়েছে। আর কী কী উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন- এমন প্রশ্নের জবাবে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, সরকার বলছে ঘরে থাকার কথা। কিন্তু পেটের ভাত যদি নিশ্চিত না হয় তাহলে ঘরে নিশ্চিন্তে দিন কাটাবে কী করে? সরকার শ্রমজীবী-কর্মজীবী-দরিদ্র মানুষদের কমপক্ষে দুই-তিন মাসের জন্য খাবারের কার্ড করে দিক। সেনাবাহিনীর মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে তাদের কাছে খাবার পৌঁছে দিক। দেখবেন অন্ততপক্ষে দরিদ্র মানুষ কেউ আর ঘর থেকে বের হবে না। তিনি বলেন, আমরা আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আর্জি জানিয়েছিলাম পোশাক শ্রমিকদের জন্য বিকাশ অ্যাপে অথবা নিজস্ব অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। নতুনা কোনো টাকা তাদের হাতে পৌঁছাবে না। প্রধানমন্ত্রী অবশ্য এই উদ্যোগ নিয়েছেন এবং তাদের জন্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা দিয়েছেন। এ জন্য তাকে অনেক ধন্যবাদ।

করোনা ভাইরাস নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন মন্তব্য করে সেলিম বলেন, আমাদের দেশে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়সহ বেশ কিছু বিশ^বিদ্যালয়েই অনেক মাইক্রোবায়োলজিস্ট রয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই অত্যন্ত মেধাবী। ভয়ঙ্কর এই পরিস্থিতির উত্তরণের তারাও গবেষণা করতে পারেন। অথচ কেউ আমরা গবেষণার বিষয়ে কোনো কথা বলছি না।

করোনা সংকটে সারাদেশে সিপিবি কি দায়িত্ব পালন করছে- এমন প্রশ্নের জবাবে সিপিবি সভাপতি বলেন, আমাদের নেতাকর্মীরা ১৭ মার্চ থেকেই মাঠে রয়েছেন। ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন, উদীচীর নেতাকর্মীরা কয়েক লাখ মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার তৈরি করে বিতরণ করেছেন। চাল, ডাল, তেল, সাবান বিতরণ করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষার নিয়মাবলি সম্পর্কে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এছাড়া নয় সদস্যবিশিষ্ট কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এর আহ্বায়ক করা হয়েছে সাজ্জাদ জহির চন্দনকে।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj