কৃষক ও কৃষিকে রক্ষা করতেই হবে

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২০


করোনা ভাইরাস যে আমাদের অর্থনীতিকে কোন অতলে নিয়ে যাবে ভাবতেও কষ্ট হয়। আমাদের রক্ষাকবচ কৃষি, এই মুহূর্তে সেই কৃষির কথাই ভাবছি। কয়েকদিনের মধ্যেই বোরো ধান ঘরে তোলার কাজ শুরু হবে, কোথাও কোথাও হয়তো কাজটি শুরুও হয়ে গেছে সীমিত পরিসরে। তবে কর্মযজ্ঞ অনুভব করা যাবে হাওর অঞ্চলে এ ধান কাটা শুরু হলে- যার আর তেমন বিলম্ব নেই। হাওরের ফসল কাটা নিয়ে প্রতি বছরই শঙ্কা থাকে। খুব দ্রুত কাটতে হয় ফসল, নতুবা ঢলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কখনো আবার ঢলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ সারতে হয়। এ সময়ে স্বাভাবিক যে চিত্রটি দৃশ্যমান হয় তাহলো কৃষি শ্রমিকের সংকট। এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে সংকট আরো প্রবল হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

হাওর অঞ্চলে ফসল কাটার কাজ স্থানীয় কৃষি শ্রমিক দ্বারা করা সম্ভব হয় না। স্থানীয় কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা আগেও পর্যাপ্ত ছিল না, এখন তো নয়ই। একটু সচ্ছলতার মুখ দেখলেই বর্তমানে আর কেউ কৃষি শ্রমিক হতে চান না। যাদের অন্য উপায় নেই তারাই ভরসা এ খাতের। উত্তরবঙ্গের মঙ্গাপীড়িত কিছু এলাকাসহ দূরদূরান্তের অভাবী একদল মানুষ হাওরের ফসল কাটার কাজটি করতে আসেন। করোনার কারণে দেশের যাতায়াত ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ। অন্যদিকে এখনই সময় হাওর অঞ্চলের দিকে যাওয়ার। তারা যদি না যেতে পারেন তাহলে তাদের নিজেদের রুটিরুজির সংকট হবে, হাওরের ফসল কাটা বিঘ্নিত হবে। আমাদের বোরো ধানের একটা বড় অংশের জোগানদাতা হাওর অঞ্চল। সেখানে সংকট হওয়ার অর্থ গোটা দেশের সংকট হওয়া।

বিষয়টি নিয়ে যে কেবল আমরা ভাবছি এমন হয়তো নয়, সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলও ভাবছে নিশ্চয়ই। তবে ভাবতে ভাবতে সময় নিঃশেষ হয়ে গেলে বিপদ ঠেকানো যাবে না। আশা করি কৃষি মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে ত্বরিত সিদ্ধান্ত নেবে।

বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর যা পাওয়া যাচ্ছে তাতে এবার বোরো ধানের ফলন কম হতে পারে। কয়েক বছর ধরে ধানের দাম কম পাওয়া এর কারণ। কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন। খরচ কমানোর জন্য তাদের অনেকেই বাজার থেকে উচ্চ ফলনশীল বীজ না কিনে নিজের ঘরে সংগ্রহ করা বীজ ব্যবহার করছেন ফলন কম হবে জেনেও। এ অবস্থায় যদি কাটার কাজটিও নির্বিঘ্নে না করা যায় তাহলে সংকট প্রবল হবে। করোনার তীব্র আক্রমণের মুখেও সরকারকে এখন পর্যন্ত দিশা হারাতে হয়নি গুদামে পর্যাপ্ত খাদ্যশস্য মজুত আছে বলে। এর ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে চাইলে বোরোর ফলন ঠিকমতো ঘরে তোলার ব্যাপারে সবাইকে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকতে হবে।

বর্তমান অবস্থায় ধান কাটার শ্রমিকরা যেন হাওর অঞ্চলে সহজে যেতে পারেন তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন পড়বে ‘বিশেষ’ ব্যবস্থার। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একার পক্ষে সেটি করা সম্ভব নয়, প্রয়োজন পড়বে সমন্বিত উদ্যোগের। জনসাধারণকে অবরুদ্ধ করে রাখার ব্যাপারে এখন মাঠে আছে স্বাস্থ্য, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, সড়ক পরিবহন প্রভৃতি মন্ত্রণালয়। সবাইকে প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে সুযোগ করে দিতে শ্রমিকদের হাওর অঞ্চলে যাওয়ার, একইসঙ্গে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও দিতে হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়কে এ ক্ষেত্রে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে হবে। দেশের বিভিন্ন স্থানে থাকা ফসল কাটার যন্ত্রও খুব দ্রুত পাঠাতে হবে সেখানে। উৎপাদিত ফসলের উপযুক্ত মূল্যও নিশ্চিত করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে ভাটার টান না পড়ে ধান উৎপাদনে। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতের কথা প্রতি বছরই বলে মন্ত্রণালয়, কিন্তু বাস্তবায়ন দেখা যায় না। এবার তার ব্যতিক্রম হোক সে প্রত্যাশায় থাকলাম। মাসখানেক পরে কাটা শুরু হবে সমতলভূমির ইরি ধানও। আউশ ধানের প্রতিস্থাপক ধরা যায় একে। নি¤œ ফলনের আউশ চাষের পরিবর্তে মানুষ এই ইরি ধানের আবাদ বেছে নিয়েছে উচ্চ ফলনের কারণে। করোনা পরিস্থিতি ফসলটি ঘরে তোলার সময় কেমন দাঁড়ায় বলা মুশকিল, তবে বিপদ থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তখনো সহায়তার প্রয়োজন পড়বে প্রায় একই ধাঁচের। কৃষি শ্রমিকের সংকট এখন সর্বত্র, সবসময়ের জন্য। ধান কাটার মেশিন যত দ্রুত দেশের সব জায়গায় পৌঁছানো যায় ততই মঙ্গল। মূল্যস্তরকে ন্যায্য প্রকৃতির রাখা তখনো প্রয়োজন পড়বে। কেবল আশার বাণী শোনালে হবে না, যেমন শোনানো হচ্ছে প্রতিটি মৌসুমের সময়। ঈপ্সিত মূল্য না পেয়ে হতাশাগ্রস্ত কৃষকের ধানের আবাদ ছেড়ে দেয়ার উপক্রম হয়েছে। সাধারণ মানুষের জানা না থাকলেও কৃষি মন্ত্রণালয় বা কৃষি অধিদপ্তরের নিশ্চয়ই জানা আছে যে, খরার কারণে সেচ বেশি লাগায় ইরির উৎপাদন খরচ এ বছর বেশি হবে। উৎপাদনের পরিমাণও কমে যেতে পারে, করোনা পরিস্থিতির জন্য সার ও কীটনাশক ঠিকমতো প্রয়োগ করতে না পারায়।

করোনার কারণে দেশের কৃষি ও কৃষি উপখাতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে ইতোমধ্যে। গ্রীষ্মকালীন আনাজ তরকারি, ফলমূল ইত্যাদি উৎপাদিত স্থানে পানির দরে বিকোচ্ছে। কৃষিজ উপখাত- যেমন পোল্ট্রি, ডেইরি, মৎস্য প্রভৃতির খামার প্রায় ধ্বংসের পথে। আম, কাঁঠাল, লিচুর বাগানসহ বিভিন্ন বাগান পরিচর্যার অভাবে ফলন ঘাটতিতে পড়বে। সহায়তা না পেলে এসব খাত-উপখাত মুখ থুবড়ে পড়তে পারে। এ রকম হাজারো আশঙ্কার ভেতর যদি ধান উৎপাদনের গতিও ধরে রাখা না যায় তাহলে পরিস্থিতি কতটা ভীতিকর হবে সহজেই অনুমেয়।

বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ ভবিষ্যতে কোন মাত্রায় গিয়ে ঠেকবে এ মুহূর্তে সেটি বলা সম্ভব না হলেও এখন পর্যন্ত তার স্বরূপ যা প্রত্যক্ষ করা গেছে তাতে নিশ্চিত বলা যায় বৈশ্বিক অর্থনীতি মারাত্মক সংকটে পড়তে যাচ্ছে। সেই সংকট থেকে রেহাই পাওয়ার উপায় আমাদেরও নেই। আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য, বিশেষত রপ্তানি কার্যক্রম নিশ্চিত বাধাগ্রস্ত হবে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের প্রধান দুই উপায়ের একটি রপ্তানি, অপরটি প্রবাসী আয়। এই প্রবাসী আয়ে ধস নামবে। বিদেশে যারা কর্মরত আছেন তাদের আয়রোজগার কমে যাবে, হয়তো ফিরেও আসবেন অনেকে। নতুন প্রবাসযাত্রা হ্রাস পেতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রার অর্জন কমে গেলে আমদানির লাগাম টানতে হবে। সেক্ষেত্রে বিলাস দ্রব্যের আমদানি কমিয়ে দিয়ে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের আমদানিতে আমাদের আমদানি কার্যক্রম সীমিত রাখা সঙ্গত হবে, সেটিই হয়তো করবেন নীতিনির্ধারকরা।

আশার কথা হলো, বাংলাদেশ অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের প্রায় সবই নিজে উৎপাদন করতে পারে। আমাদের জনসংখ্যার গরিষ্ঠ অংশ অনগ্রসর শ্রেণির। তাদের কাছে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বলতে বোঝায় চাল, ডাল, তেল, নুন, পেঁয়াজ, রসুন, আনাজতরকারির মতো আহারে ব্যবহার্য পণ্য। আমিষের জন্য মাছ, মাংস, ডিম, দুধের উৎপাদনও আমরা নিজেরা করতে পারি। পায়ের চপ্পল, সাধারণ পরিধেয়র জন্যও আমাদের পরনির্ভরশীল হওয়ার প্রয়োজন নেই। এই অনগ্রসর শ্রেণির প্রয়োজন মাথায় রেখে সরকার যদি বর্তমান প্রেক্ষাপটে উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর কার্যকর উদ্যোগ নেয় তাহলে সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলোর সন্ধানলাভ কঠিন হবে না। অগ্রসর শ্রেণির জন্য ভাবনা আপাতত না ভাবলেও চলবে, নিজেদের চাওয়া-পাওয়া তারা নিজেরাই মিটাতে পারবে।

মজিবর রহমান : লেখক, প্রাবন্ধিক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj